ইসলামের প্রধান ইবাদতগৃহ মসজিদ মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে নানামুখী ভূমিকা ও প্রভাব রাখতে পারে। ইসলামের প্রাথমিক যুগ থেকে বহু বছর পর্যন্ত মসজিদ ছিল মুসলিম সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক তৎপরতার প্রধান কেন্দ্র।

বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) রাষ্ট্র পরিচালনার প্রধান সব কাজ মসজিদে বসে আঞ্জাম দিতেন।  এভাবে তিনি জনগণের সামনে এই ধর্মীয় কেন্দ্রের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন এবং মসজিদ যে শুধুমাত্র ইবাদতের স্থান নয় সেটি বোঝানোর চেষ্টা করেছেন। 

বিশ্বনবীর পক্ষ থেকে যেকোন ঘোষণা শোনার জন্য মানুষ এই মসজিদে সমবেত হতো। রাজনীতির সঙ্গে মসজিদের অঙ্গাঙ্গি সম্পর্ক শুধু রাসূলুল্লাহ (সা.)’র জীবদ্দশায় নয় বরং তাঁর ওফাতের পরও চলতে থাকে বহু বছর।

 ইরানের ইস্পাহান নগরীর সাইয়্যেদ মসজিদ

 

হিজরি সপ্তম শতাব্দির প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ইবনে আবি আল-হাদিদ এ সম্পর্কে লিখেছেন: “তৃতীয় খলিফার হত্যাকাণ্ডের পর জনগণ যখন পরবর্তী খলিফা হিসেবে ইমাম আলী (আ.)’র কাছে বায়াত বা আনুগত্যের শপথ নেয়ার জন্য আসে তখন তিনি এ দায়িত্ব গ্রহণে অপারগতা প্রকাশ করেন। কিন্তু জনগণের পক্ষ থেকে তিনি এতটা চাপের মুখে পড়েন যে, শেষ পর্যন্ত তাদের দাবি মেনে নেন। কিন্তু এক ভাষণে তিনি বললেন: “যদি আমাকে বায়াতের শপথ নিতেই হয় তাহলে তা হতে হবে মসজিদে। কারণ, আমি চাই না আমার সঙ্গে তোমাদের আনুগত্যের শপথ গোপনে সংঘটিত হোক; বরং এটি হতে হবে মুসলমানদের সমবেত হওয়ার প্রধান কেন্দ্র মসজিদে। ”এরপর হযরত আলী (আ.) উঠে দাঁড়ান। সবাই তার পেছন পেছন গিয়ে মসজিদে প্রবেশ করে এবং সেখানেই জনগণের কাছ থেকে আনুগত্যের শপথ গ্রহণ করেন ইমাম আলী (আ.)। ”

 

ইউরোপের প্রখ্যাত ইসলাম গবেষক মারসেল এ. বোয়িজার্ড মুসলমানদের সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক জীবনের পাশাপাশি মুসলিম ঐক্য প্রতিষ্ঠায় মসজিদের ভূমিকা তুলে ধরতে গিয়ে বলেন: “বিশ্ব মুসলিমের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠায় মসজিদ হচ্ছে একটি শক্তিশালী উপাদান। এ দিক দিয়ে মসজিদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব উপেক্ষা করা যায় না। সমসাময়িক যুগে মুসলমানদের মধ্যে আবার ইসলামি চেতনা জেগে উঠেছে। তারা আবার অত্যাচারী শাসকদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের কেন্দ্র হিসেবে মসজিদকে ব্যবহার করতে চায়। এই প্রক্রিয়া চলতে থাকলে মসজিদ আবার ইসলামের প্রাথমিক যুগের ভূমিকায় ফিরে যেতে পারবে। বিভিন্ন দেশের মসজিদের ভেতর লাইব্রেরি ও কমিউনিটি সেন্টার প্রতিষ্ঠার বিষয়টি এ বাস্তবতা তুলে ধরছে। সেইসঙ্গে একথাও প্রমাণিত হচ্ছে যে, মসজিদকে যারা শুধুমাত্র নামাজ আদায়ের কেন্দ্র হিসেবে মনে করে তাদের ধারণার বিপরীতে এটি মুসলমানদের সামাজিক ও রাজনৈতিক তৎপরতার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।

 

সাম্প্রতিক সময়ে মুসলিম বিশ্বে বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলন গড়ে উঠেছে। এসব আন্দোলন প্রমাণ করে, মুসলমানরা বহু শতাব্দির ঘুম থেকে জেগে উঠছে এবং তারা আবার মুসলিম সভ্যতার যুগে ফিরে যেতে চায়। এসব আন্দোলনের নেতারা মুসলমানদেরকে অত্যাচারী শাসকদের মোকাবিলায় নিজেদের অধিকার আদায়ে সচেতন করে তোলার লক্ষ্যে মসজিদে বিভিন্ন শিক্ষা ও প্রশিক্ষণমূলক কর্মসূচি গ্রহণ করতে পারেন।  সমসাময়িক যুগে মুসলিম বিশ্বের যেসব অবিসংবাদিত নেতা ইসলামে রাজনীতির সঙ্গে ধর্মের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের বিষয়টি বাস্তবে প্রমাণ করে গেছেন তাদের অন্যতম হলেন ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের প্রতিষ্ঠাতা ইমাম খোমেনী (রহ.)। তিনি ইরানের ইসলামি বিপ্লবের সময় আপামর জনসাধারণের উদ্দেশে এক বক্তব্যে বলেন: “মেহরাব অর্থ হচ্ছে হারবের স্থান। হারব মানে যুদ্ধ। মসজিদের মেহরাব থেকেই শয়তানের পাশাপাশি শয়তানি অপশক্তিগুলোর বিরুদ্ধে জিহাদ শুরু করতে হবে। অতীতে ইসলামের জিহাদগুলো মসজিদে বসেই পরিচালিত হতো। আপনারা ইসলামি বিপ্লবকে সফল করার জন্য মসজিদগুলোকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ রাখুন। ”

 

বিগত কয়েক দশকে মুসলিম দেশগুলোর সামাজিক ও রাজনৈতিক সংকটগুলোর কারণে মসজিদের রাজনৈতিক ভূমিকা প্রবল থেকে প্রবলতর হয়েছে। মসজিদের খতিবগণ তাদের খুতবায় দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট কিংবা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মুসলমানদের জন্য তৈরি হওয়া সমস্যার বিবরণ তুলে ধরে এ ব্যাপারে মুসল্লিদের সচেতন করে তোলেন।  ছোট-বড় সব মসজিদের খুতবায় মোটামুটি তিনটি বিভাগ থাকে।  প্রথমত, খতিবগণ ইসলামের প্রাথমিক যুগের ঘটনা তুলে ধরেন, কুরআন ও হাদিসের বাণী শোনান এবং নবী-রাসূলদের জীবনী উপস্থাপন করে সেখান থেকে শিক্ষা নেয়ার জন্য মুসল্লিদের প্রতি আহ্বান জানান। স্বাভাবিকভাবেই এ ধরনের খুতবায় সাধারণ মানুষের জন্য থাকে রাজনৈতিক শিক্ষা। খুতবার দ্বিতীয় পর্যায়ে দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যা ও সংকটের কথা তুলে ধরা হয়। আর তৃতীয় পর্যায়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আধিপত্যকামী ও সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর মোকাবিলায় বিশ্বের মুসলমানদের নানা সমস্যা ও সংকটের কথা উপস্থাপন করা হয়।

 

বন্ধুরা, আসরের এ পর্যায়ে আমরা আপনাদেরকে ইরানের ঐতিহাসিক ইস্পাহান শহরের সাইয়্যেদ মসজিদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেব।  এই মসজিদের নির্মাণকাজ শুরু হয় হিজরি দ্বাদশ শতাব্দির শেষভাগে এবং তা শেষ হয় ত্রয়োদশ শতাব্দির মাঝামাঝি সময়ে। বর্তমানে ইস্পাহানের চাহারবাগ এভিনিউ’র কাছে মসজিদটি অবস্থিত। মসজিদের অনন্য কারুকাজ কাজার শাসমানলে নির্মিত মসজিদটিকে অনন্য বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করে তুলেছে। মরহুম হুজ্জাতুল ইসলাম সাইয়্যেদ মোহাম্মাদ বাকের শাফতি ব্যক্তিগত উদ্যোগে মসজিদটি নির্মাণ করেন।  তাঁর নামেই মসজিদটি সাইয়্যেদ মসজিদ হিসেবে পরিচিতি পায়। হিজরি ‌১২৪৫ সাল মোতাবেক ১৮২৯ খ্রিস্টাব্দে সাইয়্যেদ মোহাম্মাদ বাকের আট হাজার বর্গমিটার জায়গার ওপর এই মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ইরানের তৎকালীন কাজার শাসক ফতেহআলী শাহ দেখতে পান সাইয়্যেদের একার পক্ষে এতবড় মসজিদের নির্মাণ কাজ শেষ করা সম্ভব নয়। তাই তিনি এটির নির্মাণকাজে আর্থিক অনুদান দেয়ার প্রস্তাব দেন কিন্তু সাইয়্যেদ মোহাম্মাদ বাকের সে প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন।

 

 

ফতেহআলী শাহ সে সময় সাইয়্যেদকে বলেন: আপনার কাছে তো রাজভাণ্ডার নেই যে, এতবড় মসজিদের নির্মাণকাজ একাই সম্পন্ন করবেন। এর উত্তরে সাইয়্যেদ বাকের বলেন: আমাকে এটি নির্মাণকাজে সাহায্য করবেন সেই মহান সত্ত্বা যার ধনভাণ্ডার অসীম। সাইয়্যেদের এ বক্তব্য শোনার পর ফাতেহআলী শাহ’র আর কোনো কথা থাকে না এবং তিনি এ মসজিদ নির্মাণে সহায়তা করার পরিকল্পনা থেকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য হন।

 

মজার ব্যাপার হচ্ছে, সাইয়্যেদ মোহাম্মাদ বাকের শাফতি সারাজীবন অত্যাচারী শাসকদের মোকাবিলায় জনগণের পাশে ছিলেন। এ কারণে বহুবার তাকে হত্যার হুমকি দেয়া হয় এবং একাধিকবার হত্যা প্রচেষ্টার হাত থেকে তিনি প্রাণে রক্ষা পান। তবে শেষ পর্যন্ত ১২৬০ হিজরি মোতাবেক ১৮৪৪ খ্রিস্টাব্দে এই মুসলিম মনীষী ৮৫ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। তাঁর ওসিয়ত অনুসারে সাইয়্যেদ মসজিদের পাশে তাঁকে সমাহিত করা হয়।

 

 

ইস্পাহানের সাইয়্যেদ মসজিদের আয়তন ৮০৭৫ বর্গমিটার। এটি দুই পাশে রয়েছে বিশাল দু’টি আঙ্গিনা। মসজিদে প্রবেশ করার জন্য এর উত্তর ও দক্ষিণের দুই প্রধান ফটক দিয়ে ঢুকে এই আঙ্গিনা পার হতে হয়। মসজিদের ভেতরেই রয়েছে একটি মাদ্রাসা এবং এর তালেবুল এলমদের থাকার জন্য রয়েছে ৪৫টি কক্ষ। উত্তর দিকের প্রধান ফটকের দু’পাশে ও মাথার উপরে মনোরম টাইলসের ওপর নানা রঙের কারুকাজের পাশাপাশি রয়েছে বাহারি ক্যালিগ্রাফির সমাহার। এই ক্যালিগ্রাফির একাংশ জুড়ে রয়েছে পবিত্র কুরআনের বাছাই করা কিছু আয়াত। কাজার যুগের প্রখ্যাত ক্যালিগ্রাফিস্ট মোহাম্মাদ বাকের শিরাজির নেতৃত্বে এই কারুকাজগুলো করা হয়েছে।  সাইয়্যেদ মসজিদে রয়েছে একটি বড় গম্বুজ ও দু’টি মিনার। এ ছাড়া এই মসজিদের তিনদিকে রয়েছে ছাদযুক্ত বারান্দা। তালেবুল এলমদের থাকার জন্য তৈরি ছোট কক্ষগুলো এসব বারান্দার সঙ্গে সংযুক্ত। সাইয়্যেদ মসজিদের একটি বড় পিলারের মাথায় স্থাপিত বিশাল ঘড়ি ইস্পাহান শহরের সুনাম বাড়িয়েছে। এই পিলারটি মসজিদের দক্ষিণ দিকের বারান্দার ছাদের উপর স্থাপিত।  মসজিদের উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে সাইয়্যেদ মোহাম্মাদ বাকের শাফতির মাজার অবস্থিত। #

পার্সটুডে/মুজাহিদুল ইসলাম/ মো: আবু সাঈদ/ ১১

২০১৮-০৫-১১ ১৮:৪৫ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য