গত আসরগুলোতে আমরা বলেছি, ইসলামের প্রাথমিক যুগে মুসলমানদের রাজনৈতিক তৎপরতা চালানোর অন্যতম কেন্দ্র ছিল মসজিদ।

মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) মুসলিম সমাজের গুরুত্বপূর্ণ প্রায় সব কাজ মসজিদে বসে আঞ্জাম দেয়ার মাধ্যমে রাজনীতির সঙ্গে মসজিদের অঙ্গাঙ্গী সম্পর্কের বিষয়টি নিজ উম্মতকে দেখিয়ে দিয়ে গেছেন। ইসলামে রাজনীতির অর্থ শঠতা ও প্রতারণাসহ যেকোনো উপায় অবলম্বন করে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়া নয়।  বরং ইসলামে মহান আল্লাহর দিক নির্দেশনা অনুযায়ী সমাজ পরিচালনার উদ্দেশ্যে ইসলামি নীতিমালার আলোকে রাজনৈতিক তৎপরতা চালানোর অনুমতি রয়েছে।  এ ধরনের তৎপরতা চালানোর জন্য এমন একটি স্থানের প্রয়োজন যেখানে বসে মুসলমানরা নির্বিঘ্নে তাদের কর্মতৎপরতা চালাতে পারেন এবং ইসলামের নীতিমালা থেকে বিচ্যুত হওয়ারও আশঙ্কা না থাকে। এরকম একটি স্থান হিসেবে মসজিদের কোনো তুলনা চলে না।

              

ইরানের ইস্পাহান শহরের ঐতিহাসিক শেখ লুৎফুল্লাহ মসজিদ 

       

মুসলমানরা যখন মসজিদে এক কাতারে শামিল হয়ে একসঙ্গে নামাজ আদায় করেন তখন তাদের অন্তরের ব্যবধান দূর হয়ে যায় এবং তাদের চিন্তাধারা পরস্পরের নিকটবর্তী হয়ে যায়। তাদের মধ্যে বন্ধুত্ব ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন দৃঢ় হয়। সেইসঙ্গে নিজেদের অজান্তেই তাদের মধ্যে রাজনৈতিক ও আদর্শগত দিক দিয়ে একটি বন্ধন তৈরি হয়ে যায়। পাশাপাশি মসজিদে উপস্থিতির ফলে মুসল্লিদের রাজনৈতিক দূরদৃষ্টিও বাড়তে থাকে। এই কাজে মসজিদের খতিব সাহেব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন। তিনি রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলী মুসল্লিদের সামনে তুলে ধরে এসব ব্যাপারে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি বর্ণনা করেন। এর মাধ্যমে তিনি সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক জ্ঞান বৃদ্ধিতে সহায়তা করেন। এ ছাড়া, মসজিদে বসে জনগণের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আলাপ-আলোচনা করলে মুসল্লিদের চিন্তা ও জ্ঞানের পরিধি বৃদ্ধি পায়।

 

মানুষের উদাসীনতা দূর করার ক্ষেত্রেও মসজিদ অনন্য ভূমিকা পালন করে। ইসলামে মুসলমানদেরকে গাফলাত বা উদাসীনতা পরিহার করার আহ্বান জানানো হয়েছে। মহান আল্লাহ’র প্রতি উদাসীনতার তো কোনো সুযোগ ইসলামে নেই। সেইসঙ্গে সমাজের চলমান পরিস্থিতি, রাজনৈতিক হালচাল এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনের খবরাখবর সম্পর্কে একজন মুসলমান উদাসীন থাকতে পারে না। উদাসীনতা পরিহারকে ইসলামে এতটা গুরুত্ব দেয়া হয়েছে যে, মেরাজের রাতে আল্লাহ তায়ালা এ বিষয়টি বিশ্বনবী (সা.)কে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। সেই রাতে মহানবীকে জানানো হয়, যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভুলে যায় মহান আল্লাহও তাকে ভুলে যান এবং এ অবস্থায়ই তার মৃত্যু হয়।

 

পবিত্র কুরআনে উদাসীন ব্যক্তির জীবনকে পশু বা তার চেয়েও নিকৃষ্ট হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সূরা আ’রাফের ১৭৯ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন, “নিঃসন্দেহে আমি জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেছি বহু জ্বিন ও মানুষ। তাদের অন্তর রয়েছে, তা দ্বারা চিন্তা করে না, তাদের চোখ রয়েছে, তা দ্বারা দেখে না, আর তাদের কান রয়েছে, তা দ্বারা শোনে না। তারা চতুষ্পদ জন্তুর মত; বরং তাদের চেয়েও নিকৃষ্ট। তারাই হল উদাসীন, শৈথিল্যপরায়ণ।”

এই আয়াতে মানুষ ও পশুর জীবনের মধ্যকার ব্যবধানটি স্পষ্ট করে দিয়েছেন মহান আল্লাহ। আর সেটি হচ্ছে উদাসীনতা পরিহার ও সচেতন জীবন। পশু এবং মানুষ উভয়েরই চোখ ও কান আছে এবং তারা উভয়েই দেখতে ও শুনতে পায়। কিন্তু উভয়ের চিন্তাশক্তি একরকম নয়। মানুষ যদি চিন্তাশক্তিকে কাজে লাগিয়ে সৃষ্টির রহস্য এবং এর স্রষ্টা মহান আল্লাহকে চিনতে না পারে তাহলে পশুর সঙ্গে তার কোনো পার্থক্য থাকে না। সে কোনো কিছু না বুঝেই অন্যকে অনুসরণ করে; ফলে তাকে বিভ্রান্ত করা শয়তানের পক্ষে সহজ হয়। অথচ সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে মানুষের যেমন চিন্তার স্বাধীনতা থাকা উচিত ছিল তেমনি উদাসীনতা পরিহার করে সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা ছিল তার অবশ্যপালনীয় কর্তব্য।

 

বন্ধুরা, আসরের শুরুতেই যেমনটি বলেছি, এ পর্যায়ে আমরা আপনাদেরকে ইরানের ইস্পাহান শহরের ঐতিহাসিক শেখ লুৎফুল্লাহ মসজিদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেব। ইস্পাহানের বিখ্যাত এই মসজিদটি নির্মাণ করেন ইরানের প্রথম শাহ আব্বাস। হিজরি ১০১১ থেকে ১০২৮ সাল পর্যন্ত অর্থাৎ ১৬০২ থেকে ১৬১৯ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ১৮ বছর ধরে এই মসজিদটি নির্মাণ করা হয়। ইস্পাহানের বিখ্যাত নাকশে জাহান চত্বরের পূর্ব পার্শ্বে এবং আলীকাপু রাজপ্রাসাদের উল্টোদিকে এই মসজিদ অবস্থিত। ইমাম মসজিদের পাশে অবস্থিত শেখ লুৎফুল্লাহ মসজিদের দিকে তাকালে প্রথমেই যে বিষয়টি নজরে আসবে তা হলো এটির গম্বুজের পাশে কোনো মিনার নেই। যখন বিশ্বের বিখ্যাত প্রায় সব মসজিদে মিনার থাকে তখন এই মসজিদে গম্বুজ না থাকার বিষয়টি যেকোনো মানুষকেই বিস্মিত করে।

ইসলাম আবির্ভাবের আগে পথিককে পথ দেখানোর কাজে বড় বড় ভবনের উপরে মিনার নির্মাণ করা হতো। দূর থেকে কোথাও মিনার দেখা গেলে ধরে নেয়া হতো সেখানে কোনো শহরের অস্তিত্ব আছে।  ইসলামের আবির্ভাবের পর মিনার শুধুমাত্র মসজিদের অংশ হিসেবেই পরিচিতি পায়। মসজিদে আজান দিলে যাতে অনেক দূর থেকেও শোনা যায় সেজন্য মিনার নির্মাণ করা হয়। কিন্তু শেখ লুৎফুল্লাহ মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছিল শাহ আব্বাস ও তার দরবারের পারিষদবর্গের জন্য। শুরু থেকেই উদ্দেশ্য ছিল এই মসজিদে যেন সাধারণ মানুষ না আসে। এমনকি সাফাভি শাসনামলে যেসব পর্যটক ইস্পাহান ভ্রমণ করেছেন তাদের লেখায়ও এই মসজিদ সম্পর্কে তেমন কোনো কথা দেখা যায় না। এর দু’টি কারণ থাকতে পারে। এক. এই মসজিদের পাশে ইমাম মসজিদের মতো একটি বিশাল মসজিদ অবস্থিত বলে তুলনামূলক ছোট এই মসজিদটি পর্যটকদের নজরেই পড়েনি। অথবা দুই. এই মসজিদ বাদশাহ ও তার পারিষদবর্গের জন্য নির্ধারিত ছিল বলে পর্যটকরা সে মসজিদে প্রবেশ করার অনুমতি পাননি এবং এ সম্পর্কে তেমন কিছু জানতে পারেননি।

 

ইরানের অন্যান্য বিখ্যাত মসজিদের মতো শেখ লুৎফুল্লাহ মসজিদেও টাইলসের অপরূপ কারুকাজ করা হয়েছে। সাফাভি শাসনামলে ইরানের স্থাপত্যশিল্পের চরম বিকাশ ঘটেছিল এবং এই মসজিদ সেই সময়ে নির্মিত হয়। বলা হয়ে থাকে, শেখ লুৎফুল্লাহ মসজিদ নির্মাণের আগে এখানে আরেকটি মসজিদ ছিল এবং তার ধ্বংসাবশেষের উপর এটি নির্মিত হয়। ঐতিহাসিক দলিলে এসেছে, লেবাননের বিখ্যাত ফকিহ ও ইসলামি চিন্তাবিদ শেখ লুৎফুল্লাহ বিন আব্দুল কারিমের নাম অনুসারে এই মসজিদের নাম রাখা হয়। সাফাভি শাসকরা ইরানে শিয়া মাজহাব প্রচারের জন্য লেবাননে জন্মগ্রহণকারী এই ফকিহকে ইস্পাহানে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। শেখ লুৎফুল্লাহ ইস্পাহানে আসার পর সাফাভি শাহের নির্দেশে এই মসজিদ ও এর সংলগ্ন মাদ্রাসা নির্মিত হয়। লেবাননের এই আলেম এখানে ছাত্রদের দ্বীনি শিক্ষা দেয়ার পাশাপাশি এই মসজিদের ইমামতি করতেন।

 

শেখ লুৎফুল্লাহ মসজিদের প্রশংসা করেছেন সমসাময়িক যুগের বহু প্রাচ্যবিদ, গবেষক ও স্থাপত্যশিল্পী। এদের মধ্যে বিশ্বখ্যাত স্থাপত্যবিদ লুই কান বলেছেন: “আমি বাস্তবে নয়, শুধুমাত্র কল্পনায় তাও আবার সোনা ও রুপা দিয়েই কেবল এ ধরনের স্থাপনা নির্মাণ করতে পারব।”

তো বন্ধুরা, সময় শেষ হয়ে এসেছে বলে শেখ লুৎফুল্লাহ মসজিদ সম্পর্কিত আলোচনা আজকের আসরে শেষ করা সম্ভব হলো না। আগামী আসরে এই মসজিদ নিয়ে আরো কথা বলার আশা রইল। তখনও আপনাদের সঙ্গ পাওয়ার আশা রাখছি। #

পার্সটুডে/মুজাহিদুল ইসলাম/ মো: আবু সাঈদ/ ১৪

২০১৮-০৫-১৪ ১৯:১১ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য