আমরা গত আসরে সত্যবাদিতা নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করেছি। সত্য কথা বলা, সৎ থাকা ইত্যাদি মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার গুরুত্বপূর্ণ একটি উপায়।

মনোবিজ্ঞানীদের মতে কেউ যদি সত্যবাদী হয়, সদাচারী হয় সে অবশ্যই অসংখ্য উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা আর ঝামেলা থেকে মুক্তি পায়। এর কারণ হলো বেশিরভাগ দু:খ-কষ্ট আর ঝামেলার উৎস হলো মিথ্যা এবং অহমিকা। সুতরাং সত্যবাদিতাই জীবনের সুখ ও স্বাচ্ছন্দ্যের নিয়ামক শক্তি।

আমরা পবিত্র কুরআনের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছিলাম যে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মুমিনদেরকে তাকওয়ার দিকে আহ্বান করার পাশাপাশি সত্যবাদীদের সহযোগী হবারও আহ্বান জানিয়েছেন। পবিত্র কুরআনের সূরা তাওবার ১১৯ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে:

'হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্যবাদীদের সহযোগী হও'। সুতরাং সত্যবাদী হবার পাশাপাশি সত্যবাদীদের সহযোগী হওয়াটাও গুরুত্বপূর্ণ একটি দায়িত্ব। আজকের আসরেও আমরা তাই সত্যবাদিতার ইতিবাচকতা নিয়ে আরও কিছু কথা বলার চেষ্টা করবো।

ঈমানদারদেরকে বলা হয়েছে পরহেজগার হতে এবং সত্যবাদীদের সহযোগী হতে।এখানে সত্যবাদী বলতে তাদেরকেই বোঝানো হয়েছে যাদের চিন্তা-চেতনায়,কথাবার্তায়,কাজেকর্মে এবং প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষে বিন্দুমাত্র মিথ্যার নামগন্ধও তো নেই ই বরং সমস্ত অস্তিত্বজুড়ে রয়েছে শুধুই সততা ও সত্যবাদিতা।এই গুরুত্বপূর্ণ ও অনন্য সাধারণ বৈশিষ্ট্য বা গুণ অর্জন করার জন্য এবং আপন ব্যক্তিত্বের উন্নয়ন সাধনের জন্য প্রয়োজন অন্তরকে সত্য ও পবিত্রতায় পরিপূর্ণ করে তোলা।আপনার মনের আয়নাটিকে যখন পরিষ্কার, পূত-পবিত্র ও দূষণমুক্ত করে তুলবেন তখন আপনি আপনার অজান্তেই অনুভব করতে পারবেন যেন জীবনের লক্ষ্যগুলোকে সুস্পষ্টভাবে দেখতে পাচ্ছেন।

এর ফলে আপনার আত্মসম্মানবোধ ধীরে ধীরে বেড়ে যাবে,কয়েক গুণ বেড়ে যাবে আপনার মহত্ব,ঔদার্য ও সাহসিকতা।অপরদিকে আপনার প্রতি অন্যান্যদের আকর্ষণ ও বিশ্বাস আরও দৃঢ় হবে।প্রাচীন একটি প্রবাদ আছে এরকম :"সততার নাও পাথরে আঘাত খেলেও খেতে পারে,অসম্ভব কিছু নয়,কিন্তু ডুবে যাবে না কখনোই"। একথার অর্থ হলো সততা ও সত্যবাদিতার চর্চা করার পরও আপনি যে-কোনো সময় বা যে-কোনোভাবে সমস্যায় পড়ে যেতেই পারেন। তবে এই সমস্যা একেবারেই সামান্য এবং সাময়িক। এর মাধ্যমে বরং আপনার প্রতি অন্যদের আস্থা এবং বিশ্বাস আরও দৃঢ় হবে। যার ফলে আপনার সাফল্যের কারণ হয়ে উঠবে এই সমস্যা। আপনি যদি সাহসিকতার সঙ্গে প্রকৃত সত্য প্রকাশ করতে পারেন, তখন দেখবেন অন্যরা আপনার এই সততা ও বীরত্বের ব্যাপক প্রশংসা করছে এবং আপনার প্রতি তাদের বিশ্বাস আগের তুলনায় অনেক বেড়ে গেছে।       

আপনি যে ঘরটিকে এই সততার চর্চা করার জন্য শ্রেষ্ঠ বলে ভাবতে পারেন এবং এই গুণবৈশিষ্ট্যটি নিজের ভেতর চূড়ান্তভাবে ধারণ ও লালন করতে পারেন তা হলো আপনার অভ্যন্তর,মন বা আত্মা।আপনি আপনার জন্য একটা নিজস্ব জার্নাল তৈরি করতে পারেন।ওই জার্নালে আপনি আপনার অনুভূতি,চিন্তাভাবনাগুলোকে লিপিবদ্ধ করুন। খেয়াল রাখবেন আপনার অস্তিত্ব থেকে সততা ও সত্যবাদিতা যেন অনুপ্রাণিত হতে পারে অর্থাৎ কোনোভাবেই যেন মিথ্যার চর্চা না হয়। আপনার আবেগ-অনুভূতি এবং বিশ্বাস সম্পর্কে বিভিন্ন পরিস্থিতিতে লিখুন। চেষ্টা করুন আপনার ভয় ও শঙ্কার মুখোমুখি হতে অর্থাৎ সেগুলোকে মোকাবেলা করতে। আপনার ভেতরকার কোনোকিছুই লুকাবেন না।

এভাবে অনুশীলন করতে করতে কিছুদিন পর দেখবেন আপনার ভেতরটা মানে অন্তরাত্মা সততা, সত্যবাদিতা আর ন্যায়ে পরিপূর্ণ হয়ে গেছে।আপনি এখন আনমনেই অনুভব করবেন আগের তুলনায় অনেক বেশি প্রশান্তি কাজ করছে আপনার মনে।এরকম মানসিক অবস্থায় আপনি খুব সহজেই অন্যদের সঙ্গে সম্পর্ক ও যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ন্যায় ও সততার প্রয়োগ ঘটাতে পারবেন।এই ন্যায় ও সততার চর্চার অর্জন হলো গভীর ও সুদৃঢ় বন্ধুত্ব,সুখ-শান্তি এবং মুক্তি।

সততার অর্জন সম্পর্কে কথা বলছিলাম আমরা।পবিত্র কুরআনে এ ধরনের সত্য ও ন্যায়কামী লোকজনের উদ্দেশ্যে কুরআনে কারিমে সুসংবাদ দিয়ে বলা হয়েছে:এরা যে কেবল পার্থিব জগতেই মানসিক প্রশান্তি ও সুখ লাভ করবে তা নয় বরং পরকালীন জীবনেও যারা তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেছে এবং পৃথিবীতে কথাবার্তা, আচার আচরণে সততা ভিন্ন অন্য কোনো মিথ্যা বা অন্যায়ের আশ্রয় নেয় নি, তারা তাদের কর্মকাণ্ডের সীমাহীন পুরষ্কার লাভ করবে।সূরা মায়েদার ১১৯ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে:এটি এমন একটি দিন যেদিন সত্যবাদীদেরকে তাদের সততা মুনাফা দেবে। তাদের জন্য রয়েছে এমন বাগান যার নিম্নদেশে ঝর্ণাধারা প্রবাহিত হচ্ছে। এখানে তারা থাকবে চিরকাল। আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তারাও আল্লাহর প্রতি। এটিই সবচেয়ে বড় সাফল্য।

তো বন্ধুরা! আমাদের হাতে আজ আর সময় নেই। আল্লাহ আমাদেরকে যেন সত্যবাদীদের কাতারভুক্ত করেন এবং ইহকালীন শান্তি ও পরকালীন মুক্তি পাবার মতো সততার চর্চা করার তৌফিক দান করেন এই কামনা করে পরিসমাপ্তি টানছি আজকের আসরের। দীর্ঘ সময় ধরে যারা সঙ্গ দিলেন সবার প্রতি রইলো আন্তরিক শুভেচ্ছা।#

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/মো:আবুসাঈদ/ ১৭

ট্যাগ

২০১৮-০৫-১৭ ১৯:২৭ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য