নাসের খসরু কাব’দিয়’নি ছিলেন পঞ্চম হিজরি তথা খ্রিস্টিয় একাদশ শতকের একজন বড় ইরানি মনীষী।

তাঁর পুরো নাম আবু মুয়িইন নাসের বিন খসরু বিন হারেস কাব’দিয়’নি বালখি। নাসের খসরুর জন্ম হয়েছিল ৩৯৪ হিজরিতে তথা খ্রিস্টিয় ১০০৩ বা ১০০৪ সালে প্রাচীন খোরাসানের বালখ অঞ্চলে। তার উপাধি ছিল হুজ্জাত। হুজ্জাত শব্দের অর্থ দলিল, বা কারণ। তিনি নিজের কবিতায় নিজেকে খোরাসান অঞ্চলের হুজ্জাত বলে উল্লেখ করেছেন। ফাতেমিয় খলিফাদের পক্ষ থেকে নাসের খসরুকে এই উপাধি দেয়া হয়েছিল। ইসমাইলি মাজহাবের মধ্যে এটি  ছিল একটি সম্মানজনক ধর্মীয় খেতাব বা পদ। 

নাসের খসরু তার ভ্রমণ-বৃত্তান্তের শুরুতে নিজেকে ‘কাব’দিয়’নি মারভাজি’ বলে উল্লেখ করেছেন। তাই অনেকেই মনে করেন তিনি ছিলেন মার্ভের কাব’দিয়’ন অঞ্চলের অধিবাসী। এ অঞ্চলের প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে নাসের খসরু সেখানে ছিলেন। তিনি তার কবিতার অনেক পংক্তিতে বালখ্‌কে নিজের স্বদেশ বা বাড়ি বলে উল্লেখ করেছেন। এখানে ছিল তার বাড়ি, বাগান ও পরিবার। তাই কোনো কোনো পংক্তিতে বালখ্‌কে তিনি স্মরণ করেছেন গভীর স্মৃতি-কাতরতা নিয়ে।

 

নাসের খসরুর লেখা বইগুলো থেকে জানা যায় তার বাবার পরিবারও সরকারি প্রশাসনিক পেশায় জড়িত ছিল। আর এমন পরিবারে জন্ম নিয়েও তাকে অতিক্রম করতে হয়েছে নানা চরাই-উৎরাই।

 

নাসের খসরুর শৈশব কেটেছে প্রচলিত নানা বিদ্যা শিক্ষায়। প্রখর মেধা নিয়ে তিনি পড়েছেন দর্শন, জ্যোতির্বিজ্ঞান ও মহাকাশ-বিদ্যা, চিকিৎসা-শাস্ত্র, খনিজ-বিদ্যা, ইউক্লিডিও জ্যামিতি, সঙ্গীত, ধর্মীয় বিদ্যা, চিত্রাঙ্কন, ব্ক্তৃতা ও সাহিত্যসহ আরও নানা বিষয়।

 

নানা বিষয়ের জ্ঞান অর্জন করা ছাড়াও নাসের খসরু মিশরে পাটিগণিত, বীজগনিত ও জ্যামিতি শেখাতেন। ফার্সি ছাড়াও আরবি ভাষার ওপরও তার পুরোপুরি দখল ছিল। তার লেখাতেই এ বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

 

যৌবনেই সৃষ্টি-রহস্যসহ ধর্মীয় নানা বিষয়ের জবাব খোঁজার চেষ্টা করতেন নাসের খসরু। তাই নানা ধর্ম ও মাজহাব নিয়ে ব্যাপক গবেষণা করেছেন তিনি।

নাসের খসরু যৌবনেই শিক্ষকতা করেছেন এবং ৩০ বছরে উপনীত হওয়ার আগেই তিনি খোরাসানের রাজ-দরবারে স্থান করে নেন। সে যুগে খোরাসান ছিল লেখক ও কবিদের বেহেশত। নাসের খসরু ৪০ বছর বয়স পর্যন্ত এখানে ছিলেন। প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন ছাড়াও তিনি এখানে সাহিত্য চর্চা করে খ্যাতি অর্জন করেন। তাকে সে সময় বলা হত ‘আদিব’ বা জ্ঞানী এবং ‘দাবিরে ফাজেল’ বা গুণধর-শিক্ষক।

 

নাসের খসরুর ‘সফরনামা’ বা ভ্রমণবৃত্তান্ত থেকে জানা যায় তিনি সুলতান মাহমুদ ও মাসউদ গজনভীকে দেখেছেন তাদের রাজ-দরবারে। সুলতান তাকে ‘খাজেহ খাতির’ বলে ডাকতেন। এর অর্থ হল বড় বা মহান ব্যক্তিত্ব।  

 

সম্ভবত নাসের খসরু বালখে সরকার-কাঠামোয় ক্ষমতা ও প্রভাব অর্জন করেছিলেন। সালজুকদের হাতে বালখ তথা গজনভীদের শীতকালীন রাজধানীর পতন ঘটলে  খসরুর প্রভাব ও মর্যাদা বেড়ে যায়। সালজুকরা ৪৩২ হিজরিতে বালখ দখল করলেও নাসের খসরু মার্ভে তার প্রশাসনিক পদ রক্ষা করতে সমর্থ হন। এরপর খসরুর মধ্যে ঘটে যায় এক আত্মিক বিপ্লব। এ বিপ্লব বদলে দেয় তার পুরো জীবন। এই বিপ্লবের আগ পর্যন্ত খসরু অন্যান্য দরবারি কবিদের মতই কেবল রাজা-বাদশাহদের গুণ-কীর্তণেই ব্যবহার করেছেন তার লেখনী। সে সময় তিনি তাদের মৌখিক প্রশংসাও করতেন। 

 

কিন্তু আত্মিক বা চিন্তাগত পরিবর্তনের ফলে নাসের খসরুর কাছে স্বৈর শাসনাধীন দরবারের জীবনসহ পার্থিব জীবনের সব ধন-সম্পদ, খ্যাতি ও পদমর্যাদার গুরুত্ব যেন তুচ্ছ হয়ে ওঠে। মহাসত্য ও বাস্তবতার সন্ধানে তিনি সে সময়কার বড় বড় আলেমদের সঙ্গে আলোচনা করতেন। কিন্তু তাদের বেশিরভাগই কেবল বাহ্যিক জ্ঞানের অধিকারী হওয়ায় তারা খসরুর নানা প্রশ্নের সন্তোষজনক জবাব দিতে পারেননি এবং খসরু তাদের অন্ধ অনুসারী হতে রাজি হননি। ফলে নিশ্চিত বিশ্বাসে উপনীত হওয়ার জন্য খসরুর অনুসন্ধান ও জ্ঞান-সাধনা অব্যাহত থাকে।

 

মহাসত্য ও বাস্তবতা অনুসন্ধানের জন্য নাসের খসরু নানা দেশে ভ্রমণ করেন। তুর্কিস্তান, সিন্ধ ও ভারতে গিয়ে তিনি নানা ধর্মের বড় বড় ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে আলোচনা করেন।

নাসের খসরুর মধ্যে আত্মিক বা চিন্তাগত পরিবর্তনের কারণে তার জীবনে যে দিশাহারা ও ভবঘুরে পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটে তার অবসান ঘটেছিল বিশেষ একটি ঘটনার প্রভাবেওই ঘটনাটি হল ৪৩৭ হিজরিতে তথা খ্রিস্টিয় ১০৪৫ সনে ৪৩ বছর বয়সে দেখা একটি স্বপ্নএই স্বপ্ন খসরুর অস্থির ও ভবঘুরে অবস্থার অবসান ঘটায়।  সত্য ও বাস্তবতার সন্ধান পেতে তাকে কিবলা তথা পবিত্র কাবা ঘরের দিকে যেতে ইশারা করা হয়েছিল ওই স্বপ্নে। ফলে নাসের খসরু সব কিছুর মোহ ছেড়ে পবিত্র হজব্রত পালন করতে যান তার ভাইকে সঙ্গে নিয়ে। এই হজের সফরকে কেন্দ্র করে তিনি মোট সাত বছর ধরে সফরে ছিলেন। এ সময় খসরু তিনবার হজ পালন করেন ও  প্রায় তিন বছর ধরে মিশরে ছিলেন।

 

সফরের মধ্যেও নাসের খসরু প্রজ্ঞা ও বাস্তবতাকে হৃদয়ঙ্গম করার জন্য সুযোগ পেলেই জ্ঞানী ও চিন্তাশীল ব্যক্তিদের সঙ্গে মতবিনিময় করতেন। এভাবে আধ্যাত্মিক বাস্তবতা উপলব্ধির কিছু পর্যায় তিনি অতিক্রম করেন এবং তিনি ইসমাইলি মাজহাব গ্রহণ করেন। সফর শেষে তিনি ইরানে ফিরে আসেন। নাসের খসরু তার সাত বছরের এই সফরের অভিজ্ঞতাকে তিনি তুলে ধরেন সফরনামা নামক বইয়ে।

 

সফর থেকে ফিরে আসার পর নাসের খসরু নির্জন সাধনায় মশগুল হন ও চাকরি বা দরবারসহ পার্থিব সব তৎপরতা থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেন। এ সময় তিনি গোপেন ইসমাইলি মতবাদ প্রচারে মশগুল হন। এই মতবাদ নিয়ে তিনি বিরোধিতার শিকার হন এবং তাকে বালখে নির্বাসন দেয় হয়।

 

পরিস্থিতি কঠিন হয়ে পড়ায় নাসের খসরু আশ্রয় নেন বদাখশানে। সেখানে উঁচু পাহাড়ের চুড়ায় থাকতে বাধ্য হন তিনি। এই নিঃসঙ্গ ও করুণ অবস্থার কথা তিনি তুলে ধরেছেন নিজের কবিতায়। নাসের খসরু আক্ষেপ করে লিখেছেন, কোনো অপরাধ না করা সত্ত্বেও মাতৃভূমি খোরাসান ছেড়ে থাকতে হয়েছে তাকে দূরদেশের পাহাড়ে এবং তার বিরোধিতা করেছে তুর্কি, তাজিক, খোরাসানি-ইরানি ও ইরাকি। নাসের খসরু হিজরি ৪৮১ সন মোতাবেক ১০৮৮ সনে মারা যান নিঃসঙ্গ ও বিস্মৃত ব্যক্তিত্ব হিসেবে। তার বয়স হয়েছিল ৮৪ বা ৮৫। তার সম্পর্কে আমরা আরও কথা বলব আগামী আসরে। #

 

পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবু সাঈদ/  ১৯

২০১৮-০৫-১৯ ১৭:০৬ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য