গত আসরে আমরা বলেছিলাম, ইসলামে রাজনীতির অর্থ হচ্ছে সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে সমাজ পরিচালনার লক্ষ্যে আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করা। এই কাজের জন্য মসজিদ হচ্ছে সবচেয়ে উত্তম স্থান।

মসজিদে এক কাতারে নামাজে দাঁড়ালে মুসলমানদের মধ্যে ঐক্য ও সহমর্মিতা জোরদার হয় এবং এই পবিত্র স্থানে তাদের রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি পায়। দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের চেয়ে জুমা ও ঈদের নামাজের খুতবায় রাজনৈতিক বক্তব্য বেশি থাকে। মসজিদের খতিবরা দেশ ও দেশের বাইরের রাজনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরে এ ব্যাপারে মুসল্লিদের করণীয়-বর্জনীয় তুলে ধরেন। এর ফলে মুসলিম সমাজ রাজনৈতিকভাবে অনেক বেশি সচেতন হয়ে ওঠে।

অবশ্য দৈনিক পাঞ্জেগানা নামাজেরও রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে। ইসলামি শাসনে পরিচালিত দেশের জন্য নিয়মিত এই নামাজ অনুষ্ঠান ওই দেশের রাজনৈতিক শক্তিমত্তাকে ফুটিয়ে তোলে। কখনো কখনো এই ধরনের নামাজের আগে বা পরে খতিবকে ধর্ম ও রাজনীতি নিয়ে বক্তব্য রাখতে দেখা যায়। অনেক দেশে মসজিদ-ভিত্তিক সমাজসেবামূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে যারা দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

মসজিদ মুসলমানদের মধ্যে ঐক্য শক্তিশালী করার পাশাপাশি তাদেরকে ইসলামের শত্রুদের শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে উদ্বুদ্ধ করে। শত্রুকে চেনা হচ্ছে একটি রাজনৈতিক দর্শন যা মসজিদে যাতায়াতের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে শানিত হয়। বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা (সা.)’র মতে, শত্রুকে শনাক্ত করে তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার মধ্যে মানুষের বুদ্ধিবৃত্তির পরিচয় পাওয়া যায়। তিনি শত্রুকে শনাক্ত করার গুরুত্ব তুলে ধরতে গিয়ে বলেছেন: “তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি সবচেয়ে বুদ্ধিমান যে তার সৃষ্টিকর্তাকে চিনে নিজের জীবনে তার নির্দেশ বাস্তবায়ন করেছে। এ ধরনের মানুষ নিজের শত্রুকেও চিনতে পারে এবং সর্বশক্তি দিয়ে তার বিরুদ্ধাচরণ করে।” রাসূলুল্লাহর এই হাদিস থেকে এটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, শত্রুকে শনাক্ত করতে পারলেই মানুষ নিজেকে এবং সমাজকে শত্রুর ষড়যন্ত্র থেকে রক্ষা করতে পারবে। শত্রুকে চিনতে না পারা এবং তাকে উপেক্ষা করার ক্ষতি সম্পর্কে আমিরুল মু’মিনিন হযরত আলী (আ.) বলেছেন: “শত্রু  যদি একজনও হয় তারপরও সে মুসলমানদের ক্ষতি করার জন্য যথেষ্ট।”

শত্রুর ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ এবং ধর্মীয় মূল্যবোধ রক্ষার ঘাঁটি হচ্ছে মসজিদ। কারণ, মসজিদের ইমাম ও খতিবগণ পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের পাশাপাশি জুমা ও ঈদের নামাজে ইসলামের শত্রুর পরিচিতি তুলে ধরার পাশাপাশি তাদের ষড়যন্ত্র নস্যাতের উপায় বর্ণনা করেন।  ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানে প্রতি জুমার নামাজের খুতবায় দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং শত্রুদের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করে তোলা হয়। জুমার নামাজের বিরুদ্ধে শত্রুদের ষড়যন্ত্রের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী বলেছেন: “শত্রুরা জুমার নামাজের বিরুদ্ধেও ষড়যন্ত্র করছে। দেশে গুরুত্বপূর্ণ কোনো ঘটনা ঘটলেই শত্রুরা অপেক্ষায় থাকে জুমার নামাজের খুতবায় এ সম্পর্কে কি বলা হয়। তারপর তারা বিষয়টি নিয়ে সমাজে নানা জল্পনা ছড়িয়ে দেয়। এরপর তারা রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করে। এ ব্যাপারে রাষ্ট্র সচেতন রয়েছে। কেউ যদি ভেবে থাকে জুমার নামাজকে কেন্দ্র করে তাদের ষড়যন্ত্রের ব্যাপারে ইসলামি প্রজাতন্ত্র উদাসীন তাহলে সে মারাত্মক ভুলের মধ্যে রয়েছে।”

এদিকে, হক ও বাতিল বা সত্য ও মিথ্যাকে চেনা হচ্ছে মুমিনের আরেকটি বৈশিষ্ট্য যার জন্য সূক্ষ্মদৃষ্টি ও দূরদর্শিতার প্রয়োজন। দূরদর্শী ব্যক্তি হচ্ছেন তিনি যিনি সমাজের প্রতিটি ঘটনা পর্যবেক্ষণ করে সেখান থেকে সত্য ও মিথ্যাকে আলাদা করতে পারেন। ইমাম রেজা (আ.) জুমার নামাজের খুতবার গুরুত্ব তুলে ধরতে গিয়ে বলেছেন: ‘হক ও বাতিলের পার্থক্য তুলে ধরে বাস্তব পরিস্থিতি জনগণকে বুঝিয়ে দেয়ার জন্য খুতবা এত গুরুত্বপূর্ণ।’ জুমার নামাজে কেন খুতবার বিধান রাখা হয়েছে এবং এর দু’টি অংশই বা কেন?- এমন প্রশ্নের উত্তরে ইমাম বলেছেন: ‘জুমার নামাজে সমাজের সর্বস্তরের জনগণ ও রাষ্ট্রের দায়িত্বশীলদের একত্রে পাওয়া যায় বলে এখানে খুতবা দিতে বলা হয়েছে। এই খুতবায় সবার জন্য আল্লাহ তায়ালার নির্দেশ পৌঁছে দিতে হয়। সমাজের চলমান ঘটনাবলী বিশ্লেষণ করে খোদায়ী বিধানে এই মুহূর্তের করণীয় তুলে ধরতে হয়। কোনো বিপদ আসলে আল্লাহর আইন মেনে কীভাবে সে বিপদ থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে সে পথও বাতলে দিতে হয়। খুতবা দু’টি হওয়ার কারণ, একটিতে শুধুমাত্র ধর্মীয় কথাবার্তা ও আল্লাহ তায়ালার প্রশংসা তুলে ধরা হয় এবং দ্বিতীয় খুতবায় সামাজিক ও রাজনৈতিক দিক দিয়ে শিক্ষামূলক বয়ান থাকতে হয়।’

ইসলামের ইতিহাসে এমন অনেক নজীর রয়েছে যে, রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর জামায়াতের নামাজ প্রভাব ফেলেছে। এর সর্বোৎকৃষ্ট উদাহরণ- মক্কা বিজয়ের পর মসজিদুল হারামে প্রথম বিশাল জামায়াত অনুষ্ঠান। ইতিহাসে এসেছে, এই জামায়াতের নামাজের বিশালত্ব দেখে আবু সুফিয়ান ও তার সঙ্গীরা পরাজয় মেনে নিয়েছিল। আবু সুফিয়ান দেখতে পায়, বিশ্বনবী (সা.) সবার আগে এবং বাকি হাজার হাজার মুসলমান তাঁর পেছনে নামাজে দাঁড়িয়ে গেছেন। তিনি তাকবির বলার সঙ্গে সঙ্গে হাজার হাজার মানুষ রুকু ও সিজদায় চলে যাচ্ছে। নামাজের পরেও দেখা যায়, রাসূলুল্লাহর আনুগত্য করার জন্য মুসলমানরা পরস্পরের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত রয়েছে, তাঁর আদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করছে। এই শৃঙ্খলা, আনুগত্য ও রাসূলের মহানুভবতা দেখে আবু সুফিয়ানের আর কোনো উপায় থাকে না এবং তিনি দলবলসহ বিনাযুদ্ধে আত্মসমর্পন করেন।

বন্ধুরা,এবারে যথারীতি মসজিদ পরিচিতিমূলক আলোচনা। গত আসরে আমরা বলেছিলাম, ইরানের ইস্পাহান নগরীতে অবস্থিত ঐতিহাসিক শেখ লুৎফুল্লাহ মসজিদে কোনো মিনার নেই। এ ছাড়া, ইরানের অন্যান্য বড় মসজিদের সঙ্গে এই মসজিদের আরেকটি পার্থক্য হচ্ছে, এই মসজিদের প্রবেশপথে উন্মুক্ত কোনো আঙিনা নেই। ধারনা করা হয়, নাকশে জাহান চত্বরের নির্মাণশৈলির সঙ্গে মিল রাখতে গিয়ে প্রবেশদ্বারের সঙ্গেই মসজিদটি নির্মাণ করা হয়েছে। এই মসজিদের আরেকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এটি নাকশে জাহান চত্বরের উত্তর থেকে দক্ষিণমুখী চত্বরে পূর্ব পার্শ্বে অবস্থিত হলেও অত্যন্ত শৈল্পিক উপায়ে এটিকে ৪৫ ডিগ্রি কোণে স্থাপন করা হয়েছে যাতে মুসল্লিরা ক্বিবলামুখী হয়ে মসজিদে প্রবেশ করতে পারেন। মসজিদটির মেহরাব নির্মাণ করা হয়েছে উজ্জ্বল টাইলসের উপর অতি সূক্ষ্ম কারুকাজের মাধ্যমে। মেহরাবের পাশে দুটি শিলালিপির ওপর খোদাই করে এটির নির্মাতার নাম লেখা রয়েছে। যে স্থাপত্যশিল্পী মেহরাবটি নির্মাণ করেন তার নাম মোহাম্মাদরেজা ইবনে ওস্তাদ ইবনে হোসেইন বানা ইস্পাহানি।

শেখ লুৎফুল্লাহ মসজিদের ভেতরে স্থাপিত আরো কিছু শিলালিপিতে বিশ্বনবী (সা.) ও ইমাম জাফর সাদিক (আ.)’র বর্ণিত কিছু হাদিস স্থান পেয়েছে। সুন্দর ক্যালিগ্রাফির সাহায্যে এসব হাদিস ফুটিয়ে তুলেছেন ইরানের তৎকালীন বিশিষ্ট ক্যালিগ্রাফিস্ট আলীরেজা আব্বাসি। এ ছাড়া, এসব হাদিসের চারপাশে সুন্দর ডিজাইন করে লেখা রয়েছে বিভিন্ন আধ্যাত্মিক কবিতা। মসজিদের বিশাল গোলাকৃতি গম্বুজের চূড়ার উচ্চতা ভূমি থেকে ৩২ মিটার। ইরানের অন্যান্য মজদিরে গম্বুজের তুলনায় এই উচ্চতাকে কমই বলতে হবে। এই গম্বুজের একটি বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য হচ্ছে দিনের বিভিন্ন সময়ে এর ভেতরের রঙের পরিবর্তন। সকালবেলা গম্বুজটিকে মেটে রঙের, দুপুরে গোলাপী এবং সন্ধ্যাবেলায় এটিকে ছাই রঙের বলে মনে হয়। গম্বুজটি এমনভাবে নির্মাণ করা হয়েছে যাতে সূর্যের আলো এক এক সময় ভিন্ন ভিন্ন কোণে গম্বুজের ভেতর নিক্ষিপ্ত হয়। গম্বুজের উচ্চতা এর চেয়ে বেশি হলে এটির মাধ্যমে রঙের পরিবর্তন করানো সম্ভব হতো না এবং মসজিদটি তার সৌন্দর্য হারাতো।

শেখ লুৎফুল্লাহ মসজিদের গম্বুজটির আরেকটি অনন্যসাধারণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, সূর্যের আলোর মাধ্যমে এটির ভেতরে ময়ূরের প্রতিচ্ছবি স্থাপন। মসজিদে পশুপাখীর ছবি আঁকার কোনো প্রচলন যেমন ইসলামে কোনোকালেই ছিল না তেমনি শররিয়তের বিধানেও তা নিষিদ্ধ। কিন্তু এই ময়ূরের নকশা এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যে, শুধুমাত্র সন্ধ্যাবেলায় কিছুক্ষণের জন্য সূর্যের আলো এই পাখির আকৃতিতে মসজিদের গম্বুজের ভেতরে নিক্ষিপ্ত হয় যা দেশি-বিদেশি পর্যটকদের বিস্মিত করে।

তো বন্ধুরা, ধরনীর বেহেশত মসজিদ শীর্ষক ধারাবাহিকের আজকের আসর থেকেও বিদায় নিতে হচ্ছে। আমাদের সঙ্গ দেয়ার জন্য আপনাদের সবাইকে অসংখ্য ধন্যবাদ।#

পার্সটুডে/মুজাহিদুল ইসলাম/ মো: আবু সাঈদ/  ২০

ট্যাগ

২০১৮-০৫-২০ ১৮:৪৮ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য