গত আসরে আমরা বলেছি ইন্টারনেটের ভালো ও মন্দ দু'টি দিকই রয়েছে। তবে ইন্টারনেটের নিয়ন্ত্রণহীন ব্যবহারের কারণে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিশু-কিশোররা।

অনেক অভিভাবকই ইন্টারনেট সম্পর্কে অজ্ঞ হওয়ায় এ ধরণের নিয়ন্ত্রণহীনতা দিনে দিনে বাড়ছে। শিক্ষার পরিবর্তে কখনো কখনো তারা কুশিক্ষা গ্রহণ করছে। শিশু-কিশোরদের একটি প্রবণতা হলো নিজেকে প্রকাশ করা এবং অন্যকে অনুসরণ করা। আত্মপ্রকাশ ও অনুসরণের প্রবণতা তাদেরকে কৌতূহলপ্রিয় করে তুলে। কৌতুহলের বশে তারা নতুন কিছু জানতে চায়,শিখতে চায়। এ স্বতঃস্ফূর্ত আকাঙ্খাকে সঠিক পথে পরিচালনা করতে হবে। আর তাহলেই ছেলেমেয়েরা ভবিষ্যৎ জীবনে,কর্মক্ষেত্রে এবং সমাজে সফল মানুষ হতে পারবে। আজকের আসরে আমরা ইন্টারনেটের সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব নিয়ে আলোচনা করব।

বর্তমানে প্রতিটি সমাজেই ইন্টারনেট তথা ভার্চুয়াল জগত এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছে। এর ফলে কেউই আর তা থেকে দূরে থাকতে পারছে না। এ অবস্থায় ইন্টারনেট ব্যবহারে সচেতন না হলে গোটা সমাজই মারাত্মক সংকটের মুখে পড়বে। কোনো কোনো মানুষের মধ্যে ইন্টারনেটের প্রতি আসক্তি এতটাই বেশি যে, তাদেরকে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হচ্ছে। পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশে বিশেষকরে চীনে ইন্টারনেট এবং ভিডিও গেমসে আসক্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসার জন্য বেশ কিছু নিরাময় কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছে। পরিস্থিতি এখন এমন পর্যায়ে যাচ্ছে যে, বিশ্বের প্রতিটি দেশেই এমন নিরাময় কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে। কারণ ইন্টারনেটে আসক্ত মানুষের সংখ্যা প্রতিটি দেশেই বাড়ছে। বর্তমান বিশ্বের তরুণ সমাজের অনেকেই প্রতিদিন কয়েক ঘন্টা স্মার্ট ফোন, আইফোন, ট্যাব, ল্যাপটপ অথবা কম্পিউটার নিয়ে ব্যস্ত থাকে। তারা অনলাইনে অথবা অফলাইনে নানা ধরণের তৎপরতা চালায়। এদের কেউ কেউ ভার্চুয়াল জগত বা ইন্টারনেটের প্রতি মারাত্মকভাবে আসক্ত।

মনোবিজ্ঞানীরা এটাকে 'ডিজিটাল মাদক’ হিসেবে আখ্যায়িত করে থাকেন। বৈজ্ঞানিকভাবে স্মার্ট ফোন, আইফোন, ট্যাব, ল্যাপটপ ও কম্পিউটারের মতো ডিজিটাল ডিভাইসের ক্ষতির বিষয়টি প্রমাণিত। শিশু-কিশোরদের জন্য এ ক্ষতি আরো বেশি হয়। রাস্তায় কিংবা স্কুলে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, অনেক শিশুর চোখে সমস্যা। শিশুকালেই চশমা ব্যবহার করতে হচ্ছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এর কারণ হচ্ছে ডিজিটাল মাদকাসক্তি। শুধু শিশুরা নয়, বড়দের অনেকেই অফিসে কিংবা বাসায় কোনো কারণ ছাড়াই সচেতন বা অবচেতনভাবে ফেসবুকে থাকছেন। এর পাশাপাশি অনেকে আসক্ত হচ্ছেন পর্ণগ্রাফিতে। এভাবে হয়তো মনের অজান্তেই তারা অনেক সময় নষ্ট করে ফেলছেন। 

রাতে ঘুমানোর সময় এ ধরনের একটা ডিভাইস হাতে নিয়ে শুতে গিয়ে অনেকেই নির্দিষ্ট সময়ের অনেক পরে ঘুমান। এ অভ্যাস আস্তে আস্তে ঘুম না আসার কারণে পরিণত হচ্ছে। অধিকাংশ শিশুই মোবাইলে গেম খেলে অথবা কার্টুন দেখে। বর্তমান সময়ে শিশুরা যে ভিডিও গেমস পছন্দ করে, তার অধিকাংশেরই উপজীব্য হচ্ছে হিংস্রতা, মারামারি ও যুদ্ধ। এ কারণে এসব বিষয় শিশু-কিশোরদের ওপর মানসিক, শারীরিক ও সামাজিক প্রভাব ফেলে। চিকিৎসকদের ভাষ্য মতে, ইন্টারনেট তথা ভার্চুয়াল জগতের প্রতি আসক্তির কারণে একজন ব্যবহারকারী প্রথমেই মাথা ব্যথার মতো সমস্যায় ভুগতে শুরু করেন। শিশু-কিশোরদের মধ্যে এ অবস্থা বেশি দেখা যায়। মাথা ব্যথার পর চোখের সমস্যা দেখা দেয় এবং মেরুদণ্ডে সমস্যা হয়।

ভার্চুয়াল জগতের নানা গেমস ও কার্টুনের প্রভাবে অনেক শিশুই সহিংসতার দিকে ঝুঁকে পড়ছে। গেমস খেলতে খেলতে শিশু-কিশোরদের মধ্যে শুধু জয়ের মাসনিকতা গড়ে উঠছে। পরাজয় মেনে নেয়া বা সইতে পারার মানসিকতা তাদের তৈরি হয় না। ফলে পরাজয় না সইতে পেরে তারা ব্যাপকভাবে হতাশ হয়ে পড়ে। এর প্রভাব পড়ে জীবনের সব কিছুর ওপর। এ ধরণের নানা কারণে ইন্টারনেটে আসক্ত শিশু-কিশোররা সামাজিকভাবে বিকশিত হয় না। তাদের মধ্যে এ ধারণা গড়ে উঠে যে, ইন্টারনেট ভিত্তিক গ্রুপগুলোই হলো সবচেয়ে আধুনিক চিন্তা-চেতনার অধিকারী। নিজে যে গ্রুপের সদস্য সেই গ্রুপের চিন্তা-চেতনার বাইরে অন্য কিছু সে ভাবতে পারে না। এ কারণে এক পর্যায়ে তার দৃষ্টিভঙ্গিও একপেশে হয়ে উঠে। 

ভার্চুয়াল জগতের বাইরে বাস্তব জগত তার কাছে তুচ্ছ মনে হয়। এভাবে এক পর্যায়ে সে নিজেকে স্বেচ্ছায় একঘরে করে ফেলে। এ ধরণের প্রবণতার কারণে অধিকাংশ শিশু আত্মকেন্দ্রীক হয়ে বেড়ে ওঠছে। ইন্টারনেটের প্রতি আসক্তি শিশুদের সামাজিক দক্ষতাও নষ্ট করছে। শিশু-কিশোররা সব সময় ইন্টারনেট নিয়ে ব্যস্ত থাকার কারণে সেখানে নানা বিনোদন খুঁজতে থাকে। কিন্তু এর পরিণতি হয় ভয়াবহ। মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেট ভিত্তিক কথিত শিশু বিনোদনের ভয়াবহ পরিনতির একটি চিত্র পাওয়া গেছে বাংলাদেশের ‘মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন'-এর এক জরিপে। এতে দেখা যায়, বাংলাদেশের  রাজধানী ঢাকায় স্কুলগামী শিশুদের প্রায় ৭৭ ভাগ পর্ণোগ্রাফি দেখে। অষ্টম শ্রেণী থেকে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত ঢাকার ৫০০ স্কুলগামী শিক্ষার্থীর ওপর জরিপ চালিয়ে দেখা গেছে, ছেলে শিশুরা সব সময় যৌন মনোভাব সম্পন্ন থাকে। যা নারীর জন্য যৌন নির্যাতনের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। যৌন মনোভাবের কারণে ওই বয়সের শিশু-কিশোরদের অসামাজিক কার্যকলাপের প্রবণতা বাড়ছে। এর ফলে বিয়ে ব্যবস্থার প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধাবোধ কমছে। অবাধ যৌনাচারের প্রতি ঝোক বাড়ছে যা পারিবারিক ব্যবস্থাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় মা-বাবা, অভিভাবক ও শিক্ষকদের আরও সচেতন হতে হবে। নিজেদের মধ্যে এ ধরণের আসক্তি থাকলে তা ত্যাগ করে সন্তানদের সুন্দর ভবিষ্যত গড়ার দিকে মনোনিবেশ করতে হবে। শিশুদের গল্প শোনাতে হবে, নানা ধরনের খেলা ও বেড়ানোর মতো নিরাপদ বিনোদনের ব্যবস্থা করতে হবে। শিশু-কিশোরদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ হয়- এমন খেলাধুলায় ব্যস্ত রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। সব মিলিয়ে বাবা-মা এবং আত্মীয়-স্বজনের পক্ষ থেকে পরিবারের শিশুদেরকের আারও  বেশি সময় দিতে হবে। এসবের মাধ্যমেই প্রযুক্তি ও অনলাইনের প্রতি আসক্তি অনেকটাই কমানো সম্ভব হবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। #

পার্সটুডে/সোহেল আহম্মেদ/মো: আবুসাঈদ/ ২২  

২০১৮-০৫-২২ ২০:২৩ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য