গত আসরে আমরা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নবুওয়াতপ্রাপ্তির পর ১৩ বছর তাঁর মক্কায় অবস্থানের সময়কার উল্লেখযোগ্য কিছু ঘটনা নিয়ে আলোচনা করেছি।

আজকের আসরে আমরা বিশ্বনবীর হিজরত থেকে শুরু করে মদীনায় ইসলামি হুকুমত প্রতিষ্ঠা পর্যন্ত সময়ের ঘটনাবলী নিয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করব। 

নবুওয়াতপ্রাপ্তির পর যতই দিন যাচ্ছিল রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র মুখনিসৃত ঐশী বাণী শুনে খোদাভীরু লোকজন দলে দলে মুসলমান হতে লাগলেন। এই মহামানব লোকজনকে এক আল্লাহর ইবাদত করার আহ্বান জানাতে থাকেন। সেইসঙ্গে মূর্তিপূজা, ক্রীতদাস প্রথা ও সুদ খাওয়াসহ তৎকালীন জাহেলি সমাজে প্রচলিত সব ভ্রান্ত ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কথা বলা শুরু করেন আল্লাহর রাসূল। এসব ব্যাপারে আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা কুরআনের আয়াত মক্কার কাফেরদের শঙ্কিত করে তোলে। মুহাম্মদ (সা.) ১৩ বছর মক্কায় অত্যন্ত কঠিন ও দুর্বিষহ পরিস্থিতিতে ইসলাম প্রচার করেন। শেষ পর্যন্ত কাফেরদের চরম দমনপীড়ন ও অপমান থেকে মুক্ত হয়ে উপযুক্ত পরিবেশে দ্বীনের প্রচার ও চর্চা করার জন্য আল্লাহর নির্দেশে সব সঙ্গীসাথীকে নিয়ে রাসূলে খোদা মক্কা থেকে তৎকালীন ইয়াসরিব বা মদীনায় হিজরত করেন। মদীনায় মুসলমানদের জীবনে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা হয়।

ইসলামে আল্লাহর রাস্তায় দ্বীন প্রচারের উদ্দেশ্যে হিজরত করাকে জিহাদের সমতূল্য বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সব ধরনের অন্যায় অভ্যাস, খারাপ কাজ ও কুসংস্কার ত্যাগ করে নূর বা আলোর দিকে ধাবিত হওয়াকে হিজরত বলা হয়। মক্কার পাপাচারে পরিপূর্ণ সমাজ থেকে বিশ্বনবী ও তাঁর সাহাবীদের তুলনামূলক উত্তম স্থান মদীনায় হিজরত করার ফলে ইসলামের বিজয়, প্রচার ও বিশ্বব্যাপী প্রসারের দ্বার উন্মুক্ত হয়ে যায়। ইসলামের ইতিহাসে হিজরতের গুরুত্ব এতটা অপরিসীম যে দ্বিতীয় খলিফার জামানায় হযরত আলী (আ.)-এর প্রস্তাবে হিজরতের বছর থেকে হিজরী সাল গণনা শুরু হয়।

ইয়াসরিবে সে যুগে ইহুদি এবং কয়েকটি মুহাজির গোত্র বসবাস করত। এসব  গোত্রের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল বনু আউস ও বনু খাজরাজ গোত্র। অর্থনৈতিক ও সামাজিক দিক দিয়ে ভিন্ন ভিন্ন জাতির এই সহাবস্থানের কারণে ইয়াসরিবের জনগণের মধ্যে নতুন ধর্মকে গ্রহণ করার মানসিকতা প্রস্তুত হয়ে ছিল। প্রতি বছর হজের মওসুমে ইয়াসরিব থেকে যারা মক্কায় যেতেন তারা ইসলাম সম্পর্কে ধারনা লাভ করতেন। অনেকে আল্লাহর রাসূলের কাছে গিয়ে তাঁর পবিত্র হাতে বায়াত নিয়ে ইসলাম গ্রহণ করতেন।

নবুওয়াতপ্রাপ্তির ১২তম বছরে ইয়াসরিব থেকে ‌১২ ব্যক্তি মক্কায় আসেন। তাঁরা মক্কার ‘আকাবাহ’ নামক স্থানে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে বায়াতের শপথ নেন ও ইসলাম গ্রহণ করেন। এই বায়াতকে ‘প্রথম আকাবার’ বায়াত নামে অভিহিত করা হয়। ইয়াসরিবে ফিরে যাওয়ার সময় আল্লাহর রাসূল (সা.) ‘মুসআব বিন উমাইর’ নামের একজন জ্ঞানী সাহাবীকে এসব নও মুসলিমের সঙ্গে পাঠিয়ে দেন। তাকে ইয়াসরিবের জনগণকে ইসলামের সঙ্গে পরিচিত করানোর পাশাপাশি কুরআন শিক্ষার দায়িত্ব দেয়া হয়। এই কৃতকর্মা সাহাবীর প্রচেষ্টায় অল্পদিনের মধ্যে ইয়াসরিবের প্রচুর মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেন। 

নবুওয়াতপ্রাপ্তির ১৩তম বছরে মদীনার আরো বহু মানুষ হজ্ব করতে মক্কায় আসেন এবং স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর হাতে কালিমা পড়ে মুসলমান হয়ে যান।

কুরাইশের কাফের সর্দাররা ইয়াসরিবের লোকদের দলে দলে ইসলাম গ্রহণের খবর পেয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে দমনপীড়নের মাত্রা আরো বাড়িয়ে দেয়। তাদের অত্যাচার এতটা চরমে পৌঁছে যে, মুসলমানদের পক্ষে মক্কায় বসবাস করা অসম্ভব হয়ে ওঠে। এ অবস্থায় মুসলমানরা আল্লাহর রাসূলের কাছে ইয়াসরিবে হিজরত করার অনুমতি চান। রাসূলে খোদা তাদেরকে সে অনুমতি দিয়ে বলেন, মহান আল্লাহ আপনাদের জন্য ইয়াসরিবে নিরাপদ আবাসস্থল নির্ধারণ করেছেন।

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নির্দেশ পাওয়ার পর মুসলমানরা মক্কার কাফের সর্দারদের অগোচরে একজন একজন করে কিংবা ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে ইয়াসরিবে যেতে থাকেন। এক পর্যায়ে মক্কায় আল্লাহর রাসূল, তাঁর কয়েকজন ঘনিষ্ঠ সাহাবী এবং নারী ও বয়োবৃদ্ধ ব্যক্তিরা ছাড়া কর্মক্ষম আর কোনো মুসলমান অবশিষ্ট ছিল না।  কুরাইশ অধিপতিরা বিষয়টি টের পেয়ে চরম শঙ্কাবোধ করে এই ভেবে যে, অচিরেই ইয়াসরিবে মুসলমানরা তাদের বিরুদ্ধে শক্ত ঘাঁটি গড়ে তুলবে। বিষয়টি নিয়ে শলাপরামর্শ করার জন্য কাফের সর্দাররা বৈঠকে বসে। বৈঠকে অংশ নেয় ৪০ জন কুরাইশ সর্দার যাদের সবার বয়স ছিল ৪০ বছরের বেশি।

বৈঠকের শুরুতে আবু জেহেল প্রস্তাব করে, মুহাম্মাদ (সা.)কে হত্যা করার জন্য যেকোনো এক ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেয়া হোক। তাকে হত্যা করার পর যদি বনু হাশিম গোত্র এর প্রতিবাদ করে তাহলে তাদেরকে ১০ ব্যক্তির রক্তমূল্য পরিশোধ করা হবে। আরেকজন রাসূলে খোদাকে বন্দি করে রাখার এবং তৃতীয় এক ব্যক্তি তাঁকে মক্কা থেকে নির্বাসনে পাঠানোর প্রস্তাব দেয়। কিন্তু এসব প্রস্তাবের সবগুলোই অযৌক্তিক বলে প্রত্যাখ্যাত হয়। আবু জেহেলের প্রস্তাব এজন্য প্রত্যাখ্যান করা হয় যে, মুহাম্মাদ (সা.)কে হত্যার জন্য যাকে পাঠানো হবে বনু হাশিম গোত্র শুধু তার গোত্রের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরবে এবং বাকি গোত্রগুলো ঝামেলামুক্ত থেকে যাবে। এ কারণে কোনো গোত্র এই কাজ করতে রাজি হয়নি।

অবশেষে একজন প্রস্তাব করে, সব গোত্রের একজন করে যুবক একসঙ্গে আল্লাহর রাসূলকে হত্যা করবে যাতে বনু হাশিম সবগুলো গোত্রের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরার সাহস না পায়। কাফের সর্দারদের বৈঠকে এই প্রস্তাবটি গৃহিত হয়। প্রত্যেক গোত্র থেকে একজন করে যুবক বাছাই করে সিদ্ধান্ত হয়, রবিউল আউয়াল মাসের এক তারিখ রাতে এই হত্যা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে। ওই রাতে মক্কার কাফেররা সারারাত রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ঘর অবরোধ করে রাখে এবং ভোররাতে তাঁর ঘরে হামলা চালায়। কিন্তু তারা রাসূলের বিছানায় হযরত আলী (আ.)কে দেখতে পায়। হযরত আলী নিজের জীবন বিপন্ন করে কাফেরদের ধোঁকা দেয়ার জন্য রাসূলের বিছানায় শুয়ে থাকেন। এ অবস্থায় কাফেররা হযরত আলীকে ফেলে আল্লাহর রাসূলকে ধরতে মক্কার চারদিকে তল্লাশি শুরু করে। তিনদিনেও তাঁকে না পাওয়ার পর তারা হতোদ্যম হয়ে তল্লাশি কাজ বন্ধ করে দেয়।

ইয়াসরিবের কেন্দ্রস্থল থেক ছয় কিলোমিটার দূরে কুবা এলাকা অবস্থিত। এর আগে মক্কা থেকে যেসব মুসলমান হিজরত করে ইয়াসরিবে এসেছেন তারা কুবা এলাকার নও মুসলিমদের ঘরে আতিথেয়তা পেয়েছেন। তারা আল্লাহর রাসূলের হিজরতের খবর শুনে প্রতিদিন তাঁর আগমনের জন্য পথ চেয়ে বসে থাকতেন। যেদিন তিনি কুবায় প্রবেশ করেন সেদিন মদীনার ৫০০ লোক ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনি দিয়ে তাঁকে স্বাগত জানান। রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজের কন্যা ফাতিমা সালামুল্লাহি আলাইহা ও হযরত আলী (আ.)সহ আরো কয়েকজন ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ের জন্য অপেক্ষা করতে কয়েকদিন কুবায় অবস্থান করেন। এ সময় তিনি সেখানে একটি মসজিদ নির্মাণ করেন যেটি কুবা মসজিদ নামে বিখ্যাত। এটিই হচ্ছে মুসলিম বিশ্বের প্রথম মসজিদ। এরপর তিনি ইয়াসরিব শহরে যান যেখানে বসবাস করছিল বনু আউস ও বনু খাজরাজ গোত্রের পাশাপাশি কয়েকটি ইহুদি সম্প্রদায়।

 

ইয়াসরিবের মুসলমানদের প্রত্যেকে আল্লাহর রাসূল (সা.)-এর আতিথেয়তা করে ধন্য হতে চাচ্ছিলেন। তারা ভেবে রেখেছিল, যে গোত্রের বাড়ির সামনে তাঁর উট থামবে সেই গোত্রের সম্মান বেড়ে যাবে। বিষয়টি আঁচ করতে পেরে রাসূলে খোদা কাউকে অসন্তুষ্ট না করার লক্ষ্যে ঘোষণা করেন: তিনি নিজে উটকে কোথাও থামাবেন না। উট নিজের ইচ্ছায় যার বাড়ির সামনে বসে পড়বে তিনি সে বাড়ির আতিথেয়তা গ্রহণ করবেন। শেষ পর্যন্ত উটটি আবু আইয়ুব আনসারি নামক সাহাবীর বাড়ির সামনে গিয়ে বসে পড়ে। আবু আইয়ুব খুশি মনে উট থেকে রাসূলের আসবাবপত্র নিজের ঘরে নিয়ে যান। তার ঘরে মাত্র দু’টি কক্ষ ছিল যার একটিতে তিনি আল্লাহর রাসূলের থাকার ব্যবস্থা করে দেন। পরবর্তীতে নির্মিত মসজিদে নববীর পাশে নিজের জন্য ছোট ঘর বা হুজরা নির্মাণের আগ পর্যন্ত সাত মাস রাসূলুল্লাহ (সা.) আবু আইয়ুবের ঘরে অবস্থান করেন। রাসূলে খোদার আগমনের খবর পেয়ে ইয়াসরিবের লোকজন আরো বেশি আনন্দে ইসলাম গ্রহণ করতে থাকেন।  আল্লাহর রাসূল ইয়াসরিব শহরের নতুন নামকরণ করেন মদীনাতুর রাসূল যা মদীনা নামেই বেশি পরিচিতি পায়।

এ সময় মক্কাসহ অন্যান্য স্থান থেকে মদীনায় হিজরতকারী মুসলমানের সংখ্যা বহুগুণ বেড়ে যায়। মদীনার অতিথিপরায়ণ মুসলামনরা খুশিমনে মুহাজিরদেরকে নিজেদের ধন-সম্পদের অংশীদার করে তাদেরকে আপন করে নেন। এ সময় থেকে মদীনার মুসলমানরা আনসার হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন। অল্পদিনের মধ্যেই মদীনার প্রায় সব মানুষ মুসলমান হয়ে যান। সেখানে একটি মুসলিম সমাজ প্রতিষ্ঠিত হয় এবং আল্লাহর পাঠানো ওহীর দিকনির্দেশনার ভিত্তিতে এই সমাজ পরিচালিত হতে থাকে।#

পার্সটুডে/মুজাহিদুল ইসলাম/ মো: আবু সাঈদ/  ২৫ 

ট্যাগ

২০১৮-০৫-২৫ ১৫:১৭ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য