গত আসরে আমরা সাংস্কৃতিক আগ্রাসন মোকাবিলায় মসজিদের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করার পাশাপাশি ইরানের ইয়ায্‌দ জামে মসজিদ নিয়ে কথা বলেছি।

আজকের আসরের প্রথম অংশেও আমরা সাংস্কৃতিক আগ্রাসন মোকাবিলায় মসজিদের আরো কিছু ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করব। আর শেষাংশে থাকবে ইরানের বোরুজের্‌দ জামে মসজিদ পরিচিতি।

গত আসরগুলোতে আমরা বলেছি, মসজিদ শুধু নামাজ আদায় বা ইবাদত বন্দেগির স্থান নয়। সেইসঙ্গে সামাজিক ও রাজনৈতিক তৎপরতা চালানোর পাশাপাশি জ্ঞান শিক্ষা করার কেন্দ্র হিসেবেও আল্লাহর এই ঘরের যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে। যারা ধর্মীয় বিধিবিধান মেনে চলতে ইচ্ছুক, যারা হেদায়েতপ্রাপ্ত হয়ে আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য অর্জন করতে চান সেইসব পবিত্র অন্তরের অধিকারী মানুষ মসজিদে আগমন করেন। এ ধরনের সুমহান অভিন্ন লক্ষ্যকে সামনে রেখে যেসব মুসল্লি মসজিদে উপস্থিত হন তাদের মধ্যে সমাজের বিভিন্ন অঙ্গনে ভালো কাজ করার অনুপ্রেরণা তৈরি হয়। এসব অঙ্গনের একটি হতে পারে সাংস্কৃতিক অঙ্গন। ইসলামের শত্রুরা মুসলমানদের ক্ষতি করার জন্য এই অঙ্গনে আগ্রাসন চালানোর ষড়যন্ত্র করে যাচ্ছে। তারা সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের জন্য অত্যাধুনিক সব প্রযুক্তি ও মিডিয়া ব্যবহার করছে। এই আগ্রাসন প্রতিহত করার জন্য মুসলমানদের প্রয়োজন শক্তিশালী একটি ঘাঁটি এবং সুপরিকল্পিত কর্মসূচি প্রণয়ন।

ইরানের বোরুজের্‌দ জামে মসজিদ

সাংস্কৃতি আগ্রাসন প্রতিহত করার জন্য মুসলমানরা যেসব ঘাঁটি ব্যবহার করতে পারেন তার মধ্যে সর্বোত্তম হচ্ছে মসজিদ। মসজিদে নিয়মিত যাতায়াতকারী মুসল্লিরা ধর্মীয় বিশ্বাস, ঈমান ও আমলের দিক দিয়ে একটি কাঙ্ক্ষিত অবস্থানে পৌঁছে গেছেন বলে তাদের পক্ষে এই আগ্রাসন রুখে দেয়া সম্ভব। ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের স্থপতি ইমাম খোমেনী (রহ.) এ সম্পর্কে বলেন: “যদি মসজিদসহ ইসলামি কেন্দ্রগুলো শক্তিশালী হয় তাহলে ইসলামের বড় বড় শত্রুকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো শক্তির ব্যাপারে মনে বিন্দুমাত্র শঙ্কা যেন কাজ না করে। আপনারা শুধুমাত্র সেদিনকে ভয় পাবেন যেদিন আপনারা ইসলাম থেকে দূরে সরে যাবেন এবং মসজিদে যাতায়াত বন্ধ করে দেবেন।”

 

একটি সংস্কৃতিকে রক্ষা করার জন্য সেটি সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান থাকা প্রয়োজন। একটি দেশের জনগণ যদি তাদের সংস্কৃতি সম্পর্কে গভীর জ্ঞান রাখে এবং এর শক্তিশালী দিকগুলোকে সঠিকভাবে শনাক্ত করতে সক্ষম হয় তাহলে শত্রুদের সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ওই দেশে প্রভাব বিস্তার করতে পারে না। উন্নত নৈতিক গুণাবলী ও মূল্যবোধ থেকে সেই দেশের মানুষকে দূরে সরানো কষ্টসাধ্য ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। মসজিদে ধর্মীয় সংস্কৃতির শিক্ষা ও চর্চা হয় বলে এখানে যাতায়াতকারী মুসলমানদের মধ্যে নিজেদের সংস্কৃতি সম্পর্কে শক্তিশালী চেতনা তৈরি হয়। এই চেতনা সমুন্নত থাকলে তাদের ওপর বিজাতীয় সংস্কৃতির কোনো প্রভাব পড়ে না। মসজিদ থেকে পাওয়া ধর্মীয় শিক্ষা মুসলমানদের বিশ্বাসের ভিতকে শক্তিশালী করে এবং তারা সাংস্কৃতিক আগ্রাসন রুখে দেয়ার অদম্য অনুপ্রেরণা লাভ করে।

ইরানের বোরুজের্‌দ জামে মসজিদ

মসজিদে বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠান আয়োজন, বিশেষ করে তরুণ ও যুবসমাজের জন্য দ্বীন শিক্ষার ব্যবস্থা করা, নবী-রাসূল ও ইমামদের জীবনীর সঙ্গে তাদেরকে পরিচয় করানোর মতো কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হলে বিজাতীয়দের সাংস্কৃতিক আগ্রাসন প্রতিহত করার ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়। কারণ, নিজের ধর্মীয় শিক্ষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে মুসলিম তরুণ সমাজের একটি বড় অংশের পরিচয় না থাকার কারণে তারা পশ্চিমা বিজাতীয় সংস্কৃতির প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে। মসজিদের ইমাম ও খতিবগণ যদি যুগের চাহিদার প্রতি লক্ষ্য রেখে সুন্দর ও আকর্ষণীয়ভাবে ধর্মীয় শিক্ষাগুলো তরুণ সমাজের সামনে তুলে ধরতে পারেন তাহলে যুবসমাজ আর বিজাতীয় সংস্কৃতির প্রতি আকৃষ্ট হবে না। তখন মসজিদ হবে ইসলামি সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ রক্ষা করার প্রধান ঘাঁটি।

ইরানের বোরুজের্‌দ জামে মসজিদ

ইসলামের অবশ্য পালনীয় কর্তব্যগুলোর একটি হচ্ছে আমরু বিল মা’রুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার- অর্থাৎ সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ। এই কর্তব্য পালনের সবচেয়ে উপযুক্ত স্থান হচ্ছে মসজিদ। ইসলামি শাসনব্যবস্থায় মুসলমানরা একদিকে যেমন পরস্পরকে সৎকাজে আদেশ ও অসৎকাজে বাধা প্রদান করবে তেমনি রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রেও এই কর্তব্য পালন করতে হবে। যেসব মসজিদের ইমাম সরকারের হস্তক্ষেপ ছাড়াই মুসল্লিদের পক্ষ থেকে নিয়োগপ্রাপ্ত হন তারা রাষ্ট্রের দায়িত্বশীলদের প্রতি এই দায়িত্ব খুব ভালোভাবে সম্পাদন করতে পারেন। রাষ্ট্রের দায়িত্বশীলদের ভুলগুলো সংশোধন করে দিতে পারেন। পাশাপাশি খতিবদের দ্বীনি শিক্ষার সান্নিধ্যে থেকে সাধারণ মুসল্লিদের মধ্যে প্রবল ঈমানি শক্তি তৈরি হয়। একটি সমাজে মসজিদে যাতায়াতকারী মুসল্লির সংখ্যা যত বেশি হয় সেই সমাজের ঈমানি শক্তিও তত দৃঢ় হয়। সেই সমাজের মুষ্টিমেয় কিছু লোক পাপ কাজ করতে চাইলেও তা সম্ভব হয় না। এ ছাড়া, দুর্বল ঈমানের মুসলমানরাও নিয়মিত মসজিদে আসা-যাওয়া করতে করতে নিজেদের ঈমানকে শক্তিশালী করতে সক্ষম হন।

ইরানের বোরুজের্‌দ জামে মসজিদ

আসরের এ পর্যায়ে আমরা ইরানের মধ্যাঞ্চলীয় বোরুজের্‌দ শহরের ঐতিহাসিক জামে মসজিদের সঙ্গে আপনাদের পরিচয় করিয়ে দেব। ইরানে ইসলাম আগমনের পরপরই যেসব মসজিদ নির্মিত হয়েছিল বোরুজেরদ জামে মসজিদ সেসবের অন্যতম। একটি প্রাচীন অগ্নিমন্দিরের উপর এই মসজিদ নির্মিত হয়েছিল বলে কেউ কেউ ধারণা করলেও পরবর্তীতে খননকাজ চালিয়ে এই ধারণার স্বপক্ষে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। একটি ঐতিহাসিক বর্ণনায় বলা হয়েছে, একবার বোরুজেরদ শহরের শাসক হামুলে বিন আলী বোরুজেরদি আব্বাসীয় খলিফার প্রতিনিধি আবুদেল্‌ফকে বোরুজেরদ শহর সফরের আমন্ত্রণ জানান। আলী বোরুজেরদি তার শহরে জামে মসজিদ নির্মাণের জন্য আবুদেলফকে শহরের বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখান। এক পর্যায়ে একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত অগ্নিমন্দির দেখে আবুদেলফ সেখানেই জামে মসজিদ নির্মাণের নির্দেশ দেন। 

বোরুজেরদ জামে মসজিদটির নির্মাণকাজ বিভিন্ন যুগে সম্পন্ন হয়েছে। এটির নির্মাণকাজ প্রথম শুরু হয় হিজরি তৃতীয় শতাব্দি বা খ্রীস্টিয় নবম শতকে। প্রথমে নির্মিত মসজিদের নকশায় মসজিদের পাশাপাশি, আলাদা ওজুখানা, জলাধার, দরিদ্র লোকদের থাকা-খাওয়ার স্থানসহ আরো অনেকগুলো আলাদা আলাদা অংশ ছিল। কিন্তু এগুলোর বেশ কয়েকটি অংশের অস্তিত্ব এখন আর নেই। তবে মসজিদের পাশে এখনো রয়েছে ওজুখানা যেখানে প্রবেশ করতে হয় বড় একটি করিডোরের মধ্যদিয়ে। এই করিডোরটি এক সময় গরীব মানুষের থাকা-খাওয়ার স্থান হিসেবে ব্যবহৃত হতো। শুধু দরিদ্র মানুষ নয় দূরদূরান্ত থেকে আগত পথিকরা সাময়িক অবস্থানের জন্য এই গরীবখানায় আশ্রয় পেতেন। সমাজের বিত্তশালী মানুষের অর্থে এই গরীবখানা পরিচালিত হতো।

ইরানের বোরুজেরদ শহরের আবহাওয়া অনেকটা চরমভাবাপন্ন। অর্থাৎ শীতকালে এখানকার আবহাওয়া প্রচণ্ড ঠাণ্ডা এবং গ্রীষ্মকালে প্রচণ্ড গরম। আবহাওয়ার এই তারতম্যকে মাথায় রেখে বোরুজেরদ জামে মসজিদের মূল হলরুম নির্মাণ করা হয়েছে। এর ফলে গ্রীষ্মকালের প্রচণ্ড গরমে এই হলরুম তুলনামূলক ঠাণ্ডা এবং শীতকালের প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় তুলনামূলক গরম থাকে। ফলে মুসল্লিরা আরামের সঙ্গে নামাজ আদায়  করতে পারেন। এই মসজিদে রয়েছে একটি গম্বুজ ও দু’টি মিনার। ইরানের অন্যান্য মসজিদের মতো এখানেও মূল ফটক দিয়ে ঢোকার পর রয়েছে খোলা চত্বর।

বোরুজেরদ জামে মসজিদের দর্শনীয় অংশগুলোর অন্যতম হচ্ছে এটির নয় ধাপবিশিষ্ট মিম্বর। কাঠের তৈরি এই মিম্বরটি বর্তমানে মসজিদের প্রধান হলরুমে স্থাপিত রয়েছে। এর গায়ে খোদাই করে এটি নির্মাণের তারিখ লেখা রয়েছে। এখান থেকে জানা যায়, মিম্বরটি হিজরি ১০৬৮ সালে নির্মিত হয়েছে। এই মসজিদে স্থাপিত পাথর ও শিলালিপিতে অনেক শিক্ষণীয় বিষয় ও কথাবার্তা লিপিবদ্ধ রয়েছে। এসব শিলালিপীর সবচেয়ে পুরনোটি হিজরিত তৃতীয় শতকের শেষভাগ এবং হিজরি চতুর্থ শতকের গোড়ার দিকে স্থাপিত হয়েছে। এ ছাড়া, মসজিদের বারান্দার পাশে হিজরি ১২০৯ সালে স্থাপিত হয়েছে লৌহনির্মিত একটি শিলালিপি। মসজিদের পশ্চিম দিকের প্রবেশ পথে এখনো চোখে পড়ে সাফাভি রাজবংশের শাসক দ্বিতীয় শাহ আব্বাসের একটি ফরমান। এটি হিজরি ১০২২ সালে স্থাপিত হয়। মসজিদের গম্বুজের উপর এটি নির্মাণের যে তারিখ খোদাই করে লেখা আছে সেটি হিজরি ১০৬৯ সালের।

১৯৮০ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত ইরানের ওপর ইরাকের চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধের সময় সাদ্দাম বাহিনী বোরুজেরদ জামে মসজিদে বোমাবর্ষণ করে। এর ফলে মসজিদটির ব্যাপক ক্ষতি হয় এবং এর উত্তর দিকের কিছু অংশ ধসে পড়ে। এ ছাড়া, বিভিন্ন যুগে সংঘটিত ভূমিকম্প এবং অতিবৃষ্টিতেও মসজিদটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ২০০৬ সালের ভূমিকম্পে মসজিদটির প্রায় অর্ধেক অংশ ধসে পড়ে। বর্তমানে এটির মেরামত ও পুনর্নির্মাণের কাজ চলছে।#

পার্সটুডে/মুজাহিদুল ইসলাম/ মো: আবু সাঈদ/  ২8

২০১৮-০৫-২৮ ১৭:৪৭ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য