সরকারের মাদকবিরোধী অভিযান ভালো এবং স্বাভাবিক একটি বিষয় তবে শুধুমাত্র আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দিয়ে মাদকবিরোধী অভিযোন পরিচালনা করে এর কোনো সুফল পাওয়া যাবে না। রেডিও তেহরানকে দেয়া সাক্ষাৎকারে এমন মন্তব্য করেছেন বিশিষ্ট মানবাধিকার কর্মী, মায়ের ডাক ও হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির উপদেষ্টা জনাব নূর খান লিটন।

তিনি আরো বলেন, মাদকবিরোধী অভিযানের মধ্য দিয়ে সমাজে যে শঙ্কা ও ভয়  দেখা দিয়েছে তাতে ভোটের জন্য ভয়মুক্ত পরিবেশ তৈরিতে বাধা সৃষ্টি করবে।
পুরো সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরা হলো। এটি গ্রহণ ও উপস্থাপনা করেছেন গাজী আবদুর রশীদ।

  • আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনী বিচারালয়ের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড চালিয়েই যাচ্ছে।
  • গত এক দশকের বেশি সময় ধরে দেশে ক্রসফায়ার চলছে। একটির বিচার এখনও হয় নি এবং কোনো জবাবদিহিতাও নেই।
  • মনে করার যথেস্ট কারণ রয়েছে যে এ ধরনের ঘটনায় বিরোধী দলের রাজনৈতিক কর্মীদেরকেও হত্যা করা হয়েছে।  
  • গ্রাউন্ড পর্যায়ের মানুষদের মারা হচ্ছে। এ কারণে মানুষের মধ্যে একটা সন্দেহ দেখা দিয়েছে যে বড় বড় হোতাদের আড়াল করার জন্য গ্রাউন্ড লেভেলের লোকদের হত্যা করা হচ্ছে অর্থাৎ যাতে কোনো কানেকশন খুঁজে না পাওয়া যায়।

রেডিও তেহরান:  বাংলাদেশে গত বেশ কিছুদিন ধরে মাদকবিরোধী অভিযান চলছে। নিশ্চয় এটা সরকারের পক্ষ থেকে একটা ভালো উদ্যোগ। আপনি কীভাবে দেখছেন এই অভিযানকে?
 

মাদকবিরোধী   অভিযান

নূর খান লিটন:  দেখুন, দেশে যেভাবে মাদকের বিস্তার ঘটেছে সেই অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের মাদকবিরোধী অভিযান একটি স্বাভাবিক বিষয়। মাদক যখন দেশের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় তখন সরকার স্বাভাবিকভাবেই এর বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করবে এটাই প্রত্যাশিত। কিন্তু....

রেডিও তেহরান:  কিন্তু আপনি চলমান অভিযানে বন্দুকযুদ্ধের কথা বলছেন, আমি সে বিষয়ে জানতে চাইব- এতে এ পর্যন্ত সর্বশেষ ৯১ ব্যক্তি নিহত হয়েছে যারা সবাই মাদক ব্যবসায়ী বলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দাবি করেছে। তবে এসব হত্যাকাণ্ডকে বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বলা হচ্ছে। সামগ্রিকভাবে আপনি কীভাবে দেখছেন বিষয়টিকে?


নূর খান লিটন:  দেখুন, বেশকিছু ভিকটিম পরিবার এরইমধ্যে দাবি তুলেছেন যে তাদের সন্তান বা স্বজনদেরকে রাতের বেলা বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে পরে ক্রসফায়ারের নামে হত্যা করা হয়েছে।

অনেকে আবার এমনও দাবি করেছেন যে তাদের সাথে মাদকের কোনো সংশ্লিষ্টতা না থাকা সত্ত্বেও ভয়-ভীতি প্রদর্শন করে তাদের কাছ থেকে টাকা নেয়া হয়েছে। আর আমরা বিগত দিনে ক্রসফায়ারের নামে যেসব হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হতে দেখেছি সেখানে নানা শ্রেণি পেশার মানুষ রয়েছে। এতে মনে করার যথেস্ট কারণ রয়েছে যে এসব ঘটনায় বিরোধী দলের রাজনৈতিক কর্মীদেরকেও হত্যা করা হয়েছে।  

বন্দুকযুদ্ধ

সাম্প্রতিক সময়ে মাদকবিরোধী অভিযানে যে ৯১ জন নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে সেখানে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী এবং সরকারের পক্ষ থেকে একই কথা বলা হচ্ছে যে, মাদক ব্যবসায়ীদেরকে যখন আটক করার চেষ্টা করা হয় তখন তারা পুলিশের ওপর বা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর গুলি চালায় এবং পাল্টা গুলিতে তারা নিহত হয়। এক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যায় নি যে দুপক্ষের গোলাগুলিতে তারা মারা গেছে। বরং অনেক ক্ষেত্রে সন্দেহ করার যথেস্ট কারণ রয়েছে যে, তাদেরকে আটক করা হয়েছে এক জায়গা থেকে আর হত্যা করা হয়েছে অন্য জায়গায়। এ ধরনের একটা সন্দেহ জনমনে আছে। 

তাছাড়া এমন একটা সময় মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে যখন বাংলাদেশে একটা নির্বাচনের আবহ তৈরি হচ্ছে। সামনে আমাদের জাতীয় সংসদ নির্বাচন। সাধারণ মানুষ যাতে শঙ্কামুক্তভাবে সেই নির্বাচনে অংশ নিতে পারে, তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে সেরকম একটা পরিবেশ থাকা দরকার। তবে এধরনের অভিযানের মধ্য দিয়ে সমাজে যে শঙ্কা ও ভয়  দেখা দিয়েছে তাতে ভোটের জন্য ভয়মুক্ত পরিবেশ তৈরিতে বাধা সৃষ্টি করবে।

রেডিও তেহরান: বিএনপি’র পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হচ্ছে- নির্বাচনের আগে বিরোধীদেরকে ঘায়েল বা নির্মূল করার জন্য সরকার মাদকবিরোধী অভিযানের নামে হত্যার মিশনে নেমেছে। এ অভিযোগ সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন।

নূর খান লিটন: দেখুন, বিএনপির পক্ষ থেকে যে অভিযোগ করা হয়েছে সেরকম একটি শঙ্কা মানুষের মধ্যে রয়েছে। আমরা বিগত চার থেকে পাঁচ বছর ধরে লক্ষ্য করছি সরকার বলছে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নের জন্য সন্ত্রাসীদেরকে ধরা হচ্ছে। তবে আমরা দেখেছি সন্ত্রাসীদের পাশাপাশি এমন কিছু রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী ঘটনার শিকার হয়েছে যার সাথে ক্রসফায়ারের সম্পর্ক থাকার সুযোগ নেই।

রেডিও তেহরান:  সম্প্রতি জাপা চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হোসেইন মুহম্মদ এরশাদ বলেছেন, মাদকসম্রাটরা সংসদেই আছে কিন্তু তাদের কিছু হচ্ছে না। এরশাদের এই বক্তব্য কতটা গ্রহণযোগ্য?

 

বন্দুক যুদ্ধ

নূর খান লিটন: দেখুন, মাদক ব্যবসায়ীদের ব্যাপারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে যে প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে সংসদ সদস্য জনাব বদি সাহেবের নাম সেখানে রয়েছে। আর এ বিষয়টি স্বীকার করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেছেন  সংসদ সদস্য বদির ব্যাপারে তথ্য আছে কিন্তু প্রমাণ নেই। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই স্বীকারোক্তির মধ্য দিয়ে কিন্তু একটা বিষয় স্পষ্ট যে প্রাথমিক যে অনুসন্ধান চালানো হয়েছে সেখানে অন্যদের ক্ষেত্রে যেমন তথ্য পাওয়া গেছে সংসদ সদস্য বদির ব্যাপারেও সেই একইরকম তথ্য পাওয়া গেছে। 

এখন প্রমাণের ক্ষেত্রে এই উচ্চতার মানুষ যখন কোনো কিছুর সাথে যুক্ত থাকে তখন তার সেই সম্পৃক্ততা কিন্তু স্বশরীরী উপস্থিতির মধ্যে থাকে না। তিনি এমন একটি আবহ তৈরি করেন যাতে তার লোকেরা ব্যবসাটি পরিচালনা করতে পারেন এবং তা থেকে তিনি মাশোহারা বা একটা বখরা পান। অথবা তিনি টাকা বিনিয়োগ করবেন ব্যাবসার জন্য। ফলে স্বাভাবিক চোখে এবং স্বাভাবিকভাবে সংসদ সদস্য বদিকে এরমধ্যে পাওয়া যাবে না। তাকে পেতে হলে তার যেসব সহযোগি রয়েছে তাদেরকে গ্রেফতার করে জিজ্ঞাসাবাদ করতে হবে। অথচ আমরা দেখছি গ্রাউন্ড পর্যায়ের মানুষদের মারা হচ্ছে। এ কারণে মানুষের মধ্যে একটা সন্দেহ দেখা দিয়েছে যে বড় বড় হোতাদের আড়াল করার জন্য গ্রাউন্ড লেভেলের লোকদের হত্যা করা হচ্ছে অর্থাৎ যাতে কোনো কানেকশন খুঁজে না পাওয়া যায়।

রেডিও তেহরান: মাদক চোরাচালান বন্ধে চলমান অভিযান কতটা ভূমিকা রাখবে বলে আপনার মনে হয়?  

মাদক চোরাচালান

নূর খান লিটন: দেখুন, শুধুমাত্র আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দিয়ে মাদকবিরোধী অভিযোন পরিচালনা করে এর কোনো সুফল পাওয়া যাবে বলে আমি অন্তত মনে করি না। এতে সাময়িক একটা স্বস্তি আসতে পারে কিন্তু চূড়ান্ত অর্থে এর মাধ্যমে মাদক সংকটের সমাধান হবে না, আমাদেরকে মাদক থেকে মুক্তি দেবে না। এক্ষেত্রে জনগণকে যুক্ত করার বিষয়টি প্রাধান্য পাওয়া উচিত ছিল। জনসচেতনা তৈরি করতে হবে। পাড়া মহল্লার জনগণকে উদ্ধুদ্ধ করে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার দরকার ছিল মাদক মুক্ত সমাজ গড়তে। বেশ কিছুদিন ধরে আমরা লক্ষ্য করছি সবক্ষেত্রেই সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে আমরা একটা অভিযান চালিয়ে তার মধ্যে দিয়ে একটা ভালো ফলাফল আশা করি। তবে বিগত দিনের অভিজ্ঞতায় এটি কখনও ভালো ফলাফল দিয়েছে বলে আমার মনে পড়ে না।

রেডিও তেহরান:  জনাব নূর খান সবশেষে যে বিষয়টি জানতে চাইবো সেটি হচ্ছে- যে কোনো অপরাধীকে আইনের আওতায় এনে তাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হবে। কিন্তু-এক্ষেত্রে তারা তো সে সুযোগ পাচ্ছে না। বন্দুকযুদ্ধে মারা যাচ্ছে বলে দাবি করা হচ্ছে।  তো এ বিষয়টি সম্পর্কে আপনার বিশ্লেষণ কী?

নূর খান লিটন: আমরা আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীকে অস্ত্র যেমন দিয়েছি মাদক-সন্ত্রাস নিবারণের জন্য তেমনি আরেক হাতে কিন্তু আইনের একটি বই দিয়েছি। কী পদ্ধতিতে তারা সেই অস্ত্র ব্যবহার করবে সে সম্পর্কে আইনে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দেয়া আছে। সাম্প্রতিককালে আমরা লক্ষ্য করছি আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর মনো জগতে একধরনের বিষয় কাজ করছে। তারা ভাবছে অপরাধীদের ধরে আমরা যদি বিচারালয়ে সোপর্দ করি তাহলে তারা মুক্তি পেয়ে আবার পুরনো কর্মে লিপ্ত হয়। আর সেই জায়গা থেকে তারা স্বল্পতম সময়ের মধ্যে নিজের হাতে বিচার তুলে নেন এবং আমাদের বিচারালয়ের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলী প্রদর্শন করেই যাচ্ছেন। একারণে বলছি গত বেশ  কয়েক বছর ধরে এ ঘটনাগুলো ঘটছে। 


গত প্রায় একদশক বা তারও বেশি সময় ধরে দেশে ক্রসফায়ার চলছে। একটির বিচার এখনও পর্যন্ত হয় নি। অভিযোগ আকারে আসলেও সেটা আমলে নেয়া হচ্ছে না অথবা গুরুত্ব পাচ্ছে না। একদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিজের হাতে আইন তুলে নিচ্ছেন এবং আমাদের বিচারালয় ও আইনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে একেরপর পর বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন। এ বিষয়ে কোনো জবাবদিহিতা নেই। মানবাধিকার কর্মী হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে আমরা দাবি করে আসছি এ বিষয়ে একটি নিরপেক্ষ আস্থাভাজন তদন্ত কমিশন গঠন করতে হবে। তারা এ বিষয়ে তদন্ত করে দেখবেন আসলে বন্দুকযুদ্ধ হচ্ছে  নাকি বন্দুকযুদ্ধের নামে একে হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করে সাধারণ মানুষ অথবা বিরোধী রাজনৈতিক মতের মানুষ অথবা সমাজে একটা ভয়ার্ত পরিবেশ সৃষ্টির জন্য এটি কাজে লাগানো হচ্ছে।#


পার্সটুডে/গাজী আবদুর রশীদ/২৮
 

২০১৮-০৫-২৮ ২১:২৩ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য