বিশিষ্ট ইরানি কবি,গবেষক, ভুগোলবিদ, পর্যটক ও দার্শনিক নাসের খসরু কাব’দিয়’নির জীবন ও অবদান।

গত পর্বের আলোচনায় আমরা জেনেছি সত্য ও বাস্তবতার স্বরূপ হৃদয়ঙ্গমের জন্য অধীর হয়ে পড়ার পর নাসের খসরু স্বপ্নে দিক-নির্দেশনা পেয়ে হজব্রত পালন করতে যান এবং সাতটি বছর সফরে কাটিয়ে দেন। এ সময় তিনি তিনবার হজ করেন এবং তিন বছর মিশরে থাকেন। এরপর নাসের খসরু স্বদেশে ফিরে এসে দরবারের জীবন ছেড়ে দিয়ে নির্জনে ইবাদত ও সংযম সাধনায় মশগুল হন।  তিনি এ সময় ইসমাইলি মতবাদ প্রচার করতে গিয়ে নানা মহলের বিরোধিতার শিকার হয়ে বালখ থেকে নির্বাসিত হয়ে বাদাখশানে যান।


এক সময়ের প্রভাবশালী প্রশাসক ও রাজ-দরবারের কবি নাসের খসরু তার সফরনামার শুরুতে ওই স্বপ্নের ঘটনার কথা তুলে ধরেছেন। এই স্বপ্ন তার জীবনে এনেছিল আমূল পরিবর্তন। এই ঘটনা প্রসঙ্গে  নাসের খসরু লিখেছেন:
‘এক রাতে স্বপ্নে দেখলাম কেউ যেন আমায় মানুষের হুঁশ বা প্রজ্ঞাকে কমিয়ে আনে এমন পানীয় বা মদ থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন ও বলছেন, হুঁশ বা সচেতনতার অধিকারী হওয়াই ভালো। আমি বললাম, জ্ঞানীরা তো এ জিনিস ছাড়া পার্থিব দুঃখ দূর করার আর কিছুই বানাতে পারেননি। তিনি বললেন, বেঁহুশ ও আত্মহারা হওয়ার মধ্যে শান্তি বা সুখ নেই। যারা মানুষকে অসচেতনতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে তারা হচ্ছে অক্ষম হাকিম বা অক্ষম প্রাজ্ঞ। বরং এমন কিছু চাওয়া উচিত যা মানুষের প্রজ্ঞা ও চেতনাকে বাড়ায়। আমি বললাল: আমি তা কোথায় পাব? উনি বললেন: যে সাধনা করে সে-ই পায়। এরপর কিবলা তথা পবিত্র কাবার ঘরের দিকে ইশারা করলেন এবং আর কিছুই বললেন না।’


নাসের খসরু আরও লিখেছেন: ‘গত রাতের ঘুম থেকে জেগে উঠলাম। এখন আমাকে ৪০ বছরের ঘুম থেকে জেগে উঠতে হবে।’
এরপর নাসের খসরু তার সমস্ত আচার-আচরণ সংশোধনের সিদ্ধান্ত নেন এবং মক্কার দিকে রওনা হন। তিনি হিজরি ৪৩৭ সনে মার্ভ থেকে সফর শুরু করেন। তার সঙ্গে ছিল নিজেরই ভাই আবু সায়িদ ও এক ভারতীয় গোলাম।


নাসের খসরু উত্তর ইরান হয়ে সিরিয়া যান ও সেখান থেকে এশিয়া মাইনর এবং এরপর ফিলিস্তিন, মক্কা ও মিশরে যান। এরপর আবারও মক্কা ও মদিনায় যান খসরু। কাবা ঘর জিয়ারত করে তিনি দক্ষিণ ইরান দিয়ে স্বদেশে ফিরে এসে বালখের দিকে রওনা হন। তার এই সফরে সময় কেটেছে মোট সাত বছর। এ সময় তিনি তিন হাজার ফারসাঙ্গ পথ ভ্রমণ করেন। এক ফারসাঙ্গ সমান প্রায় সোয়া ছয় কিলোমিটার। এই সফরের পর নাসের খসরুর জীবন পুরোপুরি বদলে যায়। আর বিশ্ববাসী উপহার পায় ‘সফরনামা’ নামের এক ঐতিহাসিক ও প্রামাণ্য তথ্যবহুল সফর-বৃত্তান্ত।


নাসের খসরু মিশরে তিন বছর ধরে থাকার সময় ইসমাইলি মাজহাবের অনুসারীদের সঙ্গে পরিচিত হন এবং এই মাজহাব গ্রহণ করেন। এই মাজহাবের অনুসারীরা মনে করেন ইমাম জাফর সাদিক (আ)’র পর ইমামতের দায়িত্ব পেয়েছিলেন ইসমাইল নামের তাঁর এক পুত্র যিনি এখনও জীবিত আছেন ও গোপনে জীবন-যাপন করছেন।


ইসমাইলিরা বুদ্ধিবৃত্তিকে ব্যাপক গুরুত্ব দিত। আর এ বিষয়টি নাসের খসরুকে আকৃষ্ট করেছিল। এ অবস্থায় তিনি মিশরের ফাতেমিয় খলিফা আলমুসতানসার বিল্লাহর (৪২০-৪৮৭ হিজরি) সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ পান। ফাতেমিয় খলিফারা ইসমাইলি মাজহাবের প্রচার-প্রসারে জড়িত ছিলেন। খলিফা আলমুসতানসার নাসের খসরুকে খোরাসানের ‘হুজ্জাত’ হিসেবে নিয়োগ দেন।


নাসের খসরু যখন হেজাজ ও মিশর থেকে ফিরে আসেন স্বদেশে তখন তার বয়স হয়েছিল ৫০ বছর। এ সময়ে ইরানে শুরু হয় সালজুকদের শাসন। খসরু ইরানে এসেই চলে যান বালখে এবং সেখানে ইসমাইলি মতবাদ প্রচার শুরু করেন। এই কাজের জন্য তিনি বালখের চার দিকেই একদল প্রচারককে পাঠান। তিনি নিজেও সুন্নি আলেমদের সঙ্গে বিতর্কে লিপ্ত হতেন। ফলে ধীরে ধীরে তার বিরোধী ও শত্রুর সংখ্যা বাড়তে থাকে।  এ অবস্থায় নাসের খসরুর জীবন-যাপন কঠিন হয়ে পড়ে। এমনকি নাসের খসরুকে হত্যা করার ফতোয়াও জারি করা হয়।


ইরানের সালজুক আমির-ওমরাহ ও সুন্নি আলেমসহ সব শ্রেণীর জনগণ নাসের খসরুর বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। শত্রুতা ও বিরোধিতা বেড়ে যাওয়ায় নাসের খসরু খোরাসানের অন্যান্য শহরে যান এবং মাজান্দারানের কোনো কোনো শহরে আশ্রয় নেয়ার চেষ্টা করেন।  এ অবস্থায়ও ইসমাইলি মতবাদ প্রচার অব্যাহত রাখেন তিনি। তিনি দৃশ্যত মাজান্দারানের অনেক মানুষকে ইসমাইলি মতবাদে আকৃষ্ট করতে সক্ষম হন। কিন্তু তার পরও নাসের খসরুর সুদিন ফিরে আসেনি। তিনি যেখানেই যেতেন সেখানেই লাঠি ও পাথরের আঘাত তৈরি হয়ে থাকতো তার জন্য।  অবশেষে তিনি চলে যান বদাখশানে। এখানকার ইয়ামগান অঞ্চলের পার্বত্য এলাকায় খসরুর দিন কাটতো নিঃসঙ্গ অবস্থায়। এ অবস্থায় তিনি বই লেখার কাজে মনোনিবেশ করেন। নাসের খসরু এ অঞ্চলে ছিলেন মোট ১৫ বছর। তিনি তার বেশিরভাগ লেখালেখী এখানেই সম্পন্ন করেছিলেন। এখানেই ইসমাইলি মতবাদে বিশ্বাসী আলী বিন আসাদ বিন হারেসের অনুরোধে নাসের খসরু ‘জামেয়াল হিকমাতাইন’ শীর্ষক বইটি লেখেন। এ সময় হারেস খসরুর পৃষ্ঠপোষক ছিলেন।


নাসের খসরু জীবনের শেষের দিকে বদাখশানের ইয়ামগানেই ছিলেন এবং এ অঞ্চলেই মারা যান। এ শহরেই তাকে কবর দেয়া হয়।  নাসের খসরু  বদাখশান অঞ্চলে দীর্ঘ দিন ধরে অবস্থান করায় সেখানে এবং বোখারা ও খুকান্দসহ আশপাশের নানা অঞ্চলে ইসমাইলি মতবাদের অনুসারীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছিল। আজও এ অঞ্চলে এই মাজহাবের অনেক অনুসারী দেখা যায়।
নাসের খসরুর লেখা কয়েকটি বই হল: সফরনামা বা ভ্রমণ-বৃত্তান্ত, ‘খ’ন ইখওয়ান’, ‘গোশায়েশ ওয়া রহায়েশ’,‘জামিউল হিকমাতাইন’,‘জাদুল মুসাফেরিন’ এবং ‘ওয়াজহে দ্বিন’। ‘সফরনামা’ বইয়ে উঠে এসেছে ভুগোল বিষয়ক তথ্যসহ বহু জাতির সমাজ ও সংস্কৃতি বিষয়ক নানা ঐতিহাসিক ও প্রমাণ্য তথ্য।


‘সফরনামা’ ছাড়া খসরুর সব বইই মূলত ইসমাইলি বিশ্বাস বা চিন্তাধারা বিষয়ক বই।  প্রাঞ্জল, সহজ ও সাবলিল ভাষায় লেখা নাসের খসরুর এসব বই এখনও পাওয়া যায়।


‘খান ইখওয়ান’ বইটিতে রয়েছে নৈতিকতা ও ইসমাইলি বিশ্বাস বা চিন্তাধারা বিষয়ক আলোচনা। ‘গোশায়েশ ওয়া রহায়েশ’ বইটিতে রয়েছে ইসমাইলি দর্শন, সৃষ্টি তত্ত্ব, মুক্তি, আত্মা ও জ্ঞান তত্ত্ব বিষয়ক দার্শনিক আলোচনা। জামিউল হিকমাতাইন ও জাদুল মুসাফিরিনও হচ্ছে ইসমাইলি দর্শন বা এ সংক্রান্ত চিন্তাধারা বিষয়ক বই।  শেষোক্ত বইটি লেখা সম্পন্ন হয়েছিল ৪৫৩ হিজরিতে।
 অনেকেই কবি হিসেবে নাসির খসরুকে হাফিজ, সা’দি, রুমি ও মৌলানার সমকক্ষ শক্তিমান কবি বলে মনে করেন।# 

পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবু সাঈদ/  ২৯

২০১৮-০৫-২৯ ১৮:১৩ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য