গত আসরে আমরা বলেছি,বর্তমানে প্রতিটি সমাজেই কিছু মানুষ ইন্টারনেট তথা ভার্চুয়াল জগতের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ছে।

কোনো কোনো মানুষের মধ্যে ইন্টারনেটের প্রতি আসক্তি এতটাই বেশি যে, তাদেরকে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হচ্ছে। পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশে বিশেষকরে চীনে ইন্টারনেট এবং ভিডিও গেমসে আসক্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসার জন্য বেশ কিছু নিরাময় কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছে। এসব নিরাময় কেন্দ্রে ইন্টারনেটে আসক্ত মানুষের ভিড় দিন দিন বাড়ছে। আজকের আসরে ইন্টারনেট তথা ভার্চুয়াল জগতের প্রতি আসক্তি নিয়ে আরও আলোচনা করব।

বর্তমানে মানব জীবনে ইন্টারনেট তথা ভার্চুয়াল জগতের প্রভাব এক অনস্বীকার্য বাস্তবতা। তবে বিজ্ঞানের এই আশীর্বাদ এখন কোনো কোনো ক্ষেত্রে দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দেখা দিয়েছে। মানব জীবনে ইন্টারনেটের প্রভাব এখন এতটাই বেশি যে, তরুণদের মাঝে এখন তা সংক্রামক ব্যাধির মতো ছড়িয়ে পড়ছে। তরুণদের একটা অংশ প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা ধরে ইন্টারনেট ব্যবহার করে। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, যারা সপ্তাহে ৩৮ ঘণ্টার বেশি ইন্টারনেট নিয়ে ব্যস্ত থাকে তাদেরকে ইন্টারনেটে আসক্ত বলা হয়। তবে যারা দিনে দুই-তিন ঘণ্টা ইন্টারনেটে কাজ করেন তাদেরকে ইন্টারনেটে আসক্ত বলা যাবে না। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, যারা দৈনিক পাঁচ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে ইন্টারনেট নিয়ে ব্যস্ত থাকেন, তাদের অবশ্যই মনোচিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত। মনোচিকিৎসারা মনে করেন, ইন্টারনেটে আসক্ত ব্যক্তিরা দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়েন,একাকীত্ববোধ করেন এবং তাদের মধ্যে একধরণের হতাশা কাজ করে।

ইরানের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ এসোসিয়েশনের সভাপতি ডা. আহমাদ জালিলি  এ প্রসঙ্গে বলেছেন,বর্তমানে বিশ্বব্যাপী মানসিক সমস্যার একটা বড় কারণ হলো ইন্টারনেটে আসক্তি। তিনি আরও বলেছেন,ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট নিয়ম  মেনে চলা উচিত। এ ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট কাঠামো থাকা জরুরি। সবার উচিত ইন্টারনেট ব্যবহারের বিষয়ে প্রশিক্ষণ ব্যবহার করা। মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, ইন্টারনেট ব্যবহারের কারিগরি দিকগুলো সবারই জানা। কিন্তু ইন্টারনেটে কী ধরনের কাজ করা উচিত, কী ধরনের সাইটে যাওয়া উচিত এবং ইন্টারনেটে বিদ্যমান কী ধরনের তথ্য-উপাত্ত বিশ্বাসযোগ্য-এসব বিষয়ে সবারই প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। কারণ সাইবার জগতে অপরাধের প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। এ বিষয়টি জানা না থাকলে সহজেই ধোঁকা খেতে পারেন যে কোনো ব্যক্তি। এ ধরণের প্রশিক্ষণ অল্প বয়সীদের জন্য বাধ্যতামূলক করা উচিত।

কিশোর-কিশোরী ও তরুণ-তরুণীরা সাধারণত কৌতূহলী হয়। এ বয়সে তাদের মনে অনেক প্রশ্ন এসে ভিড় করে। তরুণ-তরুণীদের জীবনের এই জটিল স্তরে ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ এবং আদর্শ পিতা-মাতা ও শিক্ষকের দিকনির্দেশনা জরুরি। এ সময় তরুণ-মনে নানা ভাবের আদান-প্রদান হয়। তার মানসিক বিকাশ ঘটে। সততা,ন্যায় বিচার,যুক্তি-এসব নানা বিষয়ে তাদের মধ্যে ধারণা সৃষ্টি হতে থাকে। এ সময় হয়তো তার মানসিক অবস্থার হঠাৎ পরিবর্তন হতে পারে। এ সময় দক্ষ চিকিৎসকের মতো তার আবেগ-অনুভূতির মোকাবেলা করতে হবে। তাকে হতাশ না করে যথাসম্ভব সদুত্তর দেওয়ার চেষ্টা করতে হবে। একটি শিশুর বয়স যখন বাড়ে তখন তার সঙ্গে সেভাবেই আচরণ করতে হবে। তার ব্যক্তিত্বের পরিপ্রেক্ষিতেই তার সাথে আচার-আচরণ হওয়া উচিত। এজন্য প্রয়োজনে বাবা-মাকে সন্তান লালন-পালনের বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিতে হবে এবং সমাজবিজ্ঞানী ও মনোবিজ্ঞানীদের সঙ্গে কথা বলতে হবে। 

ইন্টারনেট তথা ভার্চুয়াল জগতের কারণে ছেলেমেয়েরা পরিবারের কাছ থেকে অনেক দূরে সরে যাচ্ছে। তারা সময় পেলেই এখন স্মার্ট মোবাইল,ল্যাপটপ ও কম্পিউটার নিয়ে সময় কাটাচ্ছে। ভার্চুয়াল জগতের দুর্নিবার আকর্ষণে নানা রকমের ক্ষতির শিকারও হচ্ছে তারা। যার সর্বশেষ সংস্করণ হিসেবে এসেছে প্রাণঘাতী নানা গেম। এ ধরণের গেমস-এ আসক্ত হয়ে শিশু-কিশোর-তরুণরা আত্মহত্যার মতো জাহান্নামি পথ বেছে নিচ্ছে। আর এতে নতুন করে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন অভিভাবকরা। এ থেকে উত্তরণের জন্য সন্তানদের বেশি সময় দেয়ার পাশাপাশি প্রযুক্তির ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিক সম্পর্কে সন্তানদের অবহিত করা এবং তাদের নিজেদেরকেও সচেতন হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন সমাজবিজ্ঞানী,শিক্ষাবিদ ও প্রযুক্তিবিদরা। বিশেষজ্ঞদের মতে,প্রযুক্তির প্রতি এ ধরণের আসক্তি জাতি গঠনের পথকে রুদ্ধ করতে পারে।

ভার্চুয়াল জগতের প্রতি আসক্ত শিশু-কিশোর ও তরুণরা মানুষের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে মিশতে না শেখে ইন্টারনেট ব্যবহারের মাধ্যমে সময় কাটানোকে প্রাধান্য দিচ্ছে। তারা মানবিক সমাজে না বেড়ে বরং ভার্চুয়াল জগতের মধ্যে বড় হচ্ছে। প্রযুক্তির অপব্যবহার যে শিশু-কিশোর ও তরুণদের মধ্যে নৈতিকতার অবক্ষয় ঘটাচ্ছে, তা সবাইকে উপলব্ধি করতে হবে। কারণ বিনোদনের নামেও অশ্লীলতা ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। এ অবস্থায় ভার্চুয়াল জগতে শিশু-কিশোর-তরুণদের অনিয়ন্ত্রিত বিচরণ কোনোভাবে কল্যাণকর হবে না। তবে এ ক্ষেত্রে শিশু-কিশোর-তরুণদের ওপর কতটুকু নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা যুক্তিসঙ্গত তা নিয়ে বিজ্ঞ মহলে আরও আলোচনা হওয়া উচিত। মাত্রাতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ যেমন ক্ষতির কারণ হতে পারে তেমনি নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি পুরোপুরি এড়িয়ে যাওয়াও ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। পরিবারের পাশাপাশি প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উচিত এ বিষয়ে সতর্ক হওয়া এবং ইন্টারনেটে আসক্তির কারণ,প্রতিকার ও পরিণতি নিয়ে ক্লাসের ব্যবস্থা করা। পাশাপাশি গণমাধ্যমকে এ ক্ষেত্রে জোরালো ভূমিকা পালন করতে হবে।#

 

পার্সটুডে/সোহেল আহম্মেদ/মো: আবুসাঈদ/  ৩০

২০১৮-০৫-৩০ ১৭:৪৪ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য