• আর্জেন্টিনার নওমুসলিম 'জুলিয়াস অগাস্টিন'-এর ইসলাম গ্রহণের কাহিনী

'নওমুসলিমদের আত্মকথা' শীর্ষক ধারাবাহিকের এ পর্বে আর্জেন্টিনার নও-মুসলিম 'জুলিয়াস অগাস্টিন'-এর মুসলমান হওয়ার কাহিনী এবং ইসলাম সম্পর্কে  তাঁর কিছু বক্তব্য ও চিন্তাধারা তুলে ধরা হলো:   

আর্জেন্টিনার নওমুসলিম 'জুলিয়াস অগাস্টিন' ছিলেন পারিবারিকভাবে খ্রিস্টান। বাবা ছিলেন আদালতের উকিল। জুলিয়াস পড়াশোনা করেছেন চিত্র-কলা ও ভাস্কর্য নির্মাণ বিভাগে।

জুলিয়াস কয়েক বছর আগে ইসলামের সঙ্গে পরিচিত হন এবং মুসলমান হন। তিনি শিয়া মাজহাবকে নিজের মাজহাব হিসেবে বেছে নেন। তার বর্তমান নাম খলিল। তিনি এখন ইসলাম ধর্ম শিক্ষা বিষয়ে পড়াশোনা করছে। ফলে খলিল এখন একাধারে ধর্মতত্ত্বের ছাত্র এবং অন্যদিকে একজন শিল্পী।

ইসলাম এমন এক ঐশী ধর্ম যা গড়ে তুলতে চায় এক পবিত্র বিশ্ব। এ ধর্মের সদস্য হতে পারেন বিশ্বের যে কোনো শ্রেণী বা জাতির মানুষ। ইসলামের দৃষ্টিতে সব মানুষেরই রয়েছে সমান অধিকার। এ ধর্মের রয়েছে নৈতিক, আধ্যাত্মিক ও শিক্ষামূলক নানা আকর্ষণ। আর এইসব আকর্ষণের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু হল পবিত্র কুরআন। কুরআনের সূক্ষ্ম নানা যুক্তি ও উচ্চতর শিক্ষা মানুষকে দেখায় সৌভাগ্যের পথ। ইসলাম মানুষকে দেয় চিন্তার স্বাধীনতা ও দৃষ্টিকে করে প্রসারিত। এ ধর্ম সব সময়ই মানুষকে চিন্তাশীল ও সত্য-সন্ধানী হতে বলে।

অগাস্টিন চিন্তা ও গবেষণার মাধ্যমেই সত্য ধর্মের সন্ধান করেছেন। তিনি এ প্রসঙ্গে বলেছেন:

'পড়াশোনা ও গবেষণার মাধ্যমেই আমি খুঁজে পেয়েছি ইসলাম। যদিও আমি ছিলাম একজন খ্রিস্টান। কিন্তু খ্রিস্ট ধর্ম আমাকে কখনও সন্তুষ্ট করতে পারেনি। তাই অন্য ধর্ম ও সংস্কৃতির সন্ধান করতাম। ফলে শুরু করি গবেষণা ও অনুসন্ধান। খ্রিস্ট ধর্মের নানা শাখা বা গ্রুপ সম্পর্কেও আমি জানতাম। কিন্তু এইসব ধর্মমত গ্রহণ করাও ছিল আমার জন্য সমস্যার বিষয়। কারণ, ঘুরে-ফিরে এসব শাখা বা গ্রুপ (বিকৃত হয়ে-পড়া) ধর্ম খ্রিস্ট ধর্মের দিকই ফিরে আসে। এরপর শুরু করি বৌদ্ধ ধর্ম নিয়ে পড়াশোনা ও গবেষণা বা অনুসন্ধান। এ ধর্ম সম্পর্কে অনেক বই পুস্তক পড়েছি। বৌদ্ধদের অনুসরণ করতে গিয়ে ৫ বছর পর্যন্ত গোশত খাইনি, শুধু নিরামিশ খেতাম। কিন্তু এ ধর্মও আমার নানা প্রশ্নের সন্তোষজনক বা গ্রহণযোগ্য জবাব দিতে পারেনি। ফলে হতাশা ও বিভ্রান্তির মধ্যেই কাটছিল দিন। অবশেষে এক পুরোনো বন্ধুর সঙ্গে দেখা হল। তাকে খুব ভালোভাবে চিনতাম এবং এমনকি তার আচার-আচরণ সম্পর্কেও জানতাম।  কিন্তু দেখলাম যে তার ব্যক্তিত্ব, আচার-আচরণ ও দৃষ্টিভঙ্গি বদলে গেছে। বুঝলাম যে তিনি মুসলমান হয়েছেন। ফলে তার কাছ থেকে ইসলাম সম্পর্কে তথ্য পাচ্ছিলাম। আর এইসব তথ্য ছিল আমার জন্য খুবই আকর্ষণীয়। এটাও বুঝলাম যে এই মহান ধর্মই আমার এই পুরনো বন্ধুকে দিয়েছে উন্নত অনেক নৈতিক গুণ।'

আসলে অগাস্টিনের অন্তরে জেগে উঠেছিল খোদাপ্রেমের আলো। আর এই প্রেমই তাকে সত্যের দিকে এগিয়ে নিচ্ছিল। তিনি এ প্রসঙ্গে বলেছেন: আমার বন্ধুর মধ্যে যে পরিবর্তন ঘটল তা নিয়ে আমি এক পূর্ণাঙ্গ গবেষণার সিদ্ধান্ত নেই। যখনই তার সঙ্গে দেখা হত তখন আমরা ইসলামসহ সব বিষয় নিয়েই কথা বলতাম। ধীরে ধীরে আমাদের মধ্যে যোগাযোগ ও আলোচনা বেড়ে যায়। মহান আল্লাহর দয়ায় ইসলাম সম্পর্কে আরো বেশি জানতে সক্ষম হই। এ ধর্ম আমার অনেক প্রশ্নের জবাব দিতে সক্ষম হয়।

ইসলামে পরিবার ব্যবস্থার মর্যাদা বহু অমুসলিমকে ইসলামের দিকে আকৃষ্ট করে। কারণ, ইসলামের পরিবার ব্যবস্থা বাবা-মা ও সন্তানদের মধ্যে নৈকট্য সৃষ্টি করে এবং তাদেরকে দেয় সুস্থ ও প্রফুল্ল জীবন। আর এই ব্যবস্থার সুবাদে পরিবারের সদস্যরা দুর্নীতি ও পাপ থেকে মুক্ত থাকে। বিশ্বনবী (সা.) পরিবার ব্যবস্থার কল্যাণের কারণেই বলেছেন, যে বিয়ে করল সে ধর্মের অর্ধেক রক্ষা করল।

মুসলমান হওয়ার পর নিজ পরিবারের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে আর্জেন্টিনার সাবেক অগাস্টিন বা নওমুসলিম খলিল বলেছেন: আমি মুসলমান হওয়ায় আমার পরিবার খুব ভয় পেয়ে যায়। কারণ, তারা ইসলামের বিরুদ্ধে মার্কিন ও ইহুদিবাদী প্রচার মাধ্যমের প্রচারণায় প্রভাবিত হয়ে ভাবত: ইসলাম সহিংসতাকামী। কিন্তু তারা যখন দেখল যে মুসলমান হওয়ার পর আমার আচরণ বরং উন্নত হয়েছে তখন তারা বুঝলেন যে মুসলমান হওয়াটা খারাপ কিছু নয়।  ফলে তাদের উদ্বেগ কেটে যায়। বরং আমি মুসলমান হওয়ায় তারা এখন গর্ব অনুভব করছেন। আর আমিও এতে খুশি হয়েছি।

খলিল জুলিয়াস শৈশব থেকেই ছিলেন শিল্পের অনুরাগী। তিনি শিল্প বিষয়ে পড়াশোনা অব্যাহত রেখেছেন। তিনি মুসলমান হওয়ার পর এখন ইসলাম প্রচারের কাজে শিল্পকে ব্যবহারের চেষ্টা করছেন। তিনি এ প্রসঙ্গে বলেছেন:

'মানুষের অনুভূতি ও মনের সঙ্গে রয়েছে শিল্পের সম্পর্ক। অনেক মানুষই ইসলাম সম্পর্কে কিছুই জানেন না। প্রথমে আধ্যাত্মিকতা ও সত্যকে মানুষের কাছে এমনভাবে তুলে ধরা উচিত যাতে মানুষ তা স্পর্শ করার অনুভূতি পায় এবং যাতে পরিবেশ গড়ে ওঠে। আর শিল্পই হচ্ছে এ জন্য সবচেয়ে ভালো পথ। এটা ঠিক যে বক্তৃতা ও আলোচনার মাধ্যমে ধর্ম ও জ্ঞান তুলে ধরব আমরা এবং তা প্রভাবও ফেলে, কিন্তু কেবল এই পথই যথেষ্ট নয়। শিল্প-মাধ্যম এক্ষেত্রে মানুষের ওপর বেশি প্রভাব রাখে ও মনের ওপর এই প্রভাব বেশি স্থায়ী হয়।'

তিনি এ প্রসঙ্গে আরো বলেন: "আশুরার ক্ষেত্রেও শিল্প মাধ্যমের প্রভাব অনেক বেশি। কারণ, শিল্প হচ্ছে বৈশ্বিক বা আন্তর্জাতিক ভাষা। কিন্তু আপনি যখন কেবলই বক্তৃতা দেবেন তখন যারা ধর্ম ও আশুরার সংস্কৃতি সম্পর্কে কোনো তথ্য জানে না, তাদের জন্য বিষয়টা গ্রহণ করা বেশ কঠিন। তাই আমিও শিল্পের মাধ্যমে প্রকৃত ইসলাম তুলে ধরার জন্য চেষ্টা করব। বিশ্বব্যাপী শিল্পীদের ভাষা অভিন্ন। কারণ, তারা অনুভূতিকে জাগিয়ে তোলা ও অন্তরের ভাষা দিয়ে যোগাযোগ করেন। কবি, শিল্পী, সঙ্গীতজ্ঞ ছায়াছবি নির্মাতা এবং অন্যান্য শিল্পীরা  ইসলামের শিক্ষা ও সংস্কৃতি প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। আমি নিজে ইসলামী সাংস্কৃতিক বিষয়গুলো, যেমন, আশুরার সংস্কৃতি ও অন্যান্য নিষ্পাপ ইমামদের জীবন এবং শাহাদতকে চিত্র শিল্পের মাধ্যমে আর্জেন্টিনা ও মার্কিন যুব সমাজের কাছে তুলে ধরতে চাই। আর এর প্রভাব অন্য মাধ্যমগুলোর চেয়ে বেশি হবে বলে আমি নিশ্চিত। "

এভাবে মহান আল্লাহ ইসলামের আলোকে জাগিয়ে তুলেছেন আর্জেন্টিনার নওমুসলিম 'জুলিয়াস অগাস্টিন'-এর হৃদয়ে। বাস্তবতা ও সত্যের আলোয় এখন তার হৃদয় ভরপুর।#

পার্সটুডে/আমির হুসাইন/আশরাফুর রহমান/১

   

২০১৮-০৬-০১ ১৭:৩৯ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য