গত আসরে আমরা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত থেকে শুরু করে মদীনায় ইসলামি হুকুমত প্রতিষ্ঠা পর্যন্ত সময়ের ঘটনাবলী নিয়ে কথা বলেছি। আজকের আসরে আমরা মদীনায় ইসলামি শাসন প্রতিষ্ঠার পর থেকে মক্কা বিজয় পর্যন্ত সময়ের ঘটনাবলী নিয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করব।

আল্লাহর রাসূল (সা.) মদীনায় ইসলামি শাসন প্রতিষ্ঠা করে মানব ইতিহাসে একটি আদর্শ ও ন্যায়ভিত্তিক শাসনব্যবস্থার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। এ শাসনব্যবস্থায় তিনি কখনোই ক্ষমতা, প্রভাব-প্রতিপত্তি কিংবা সুখ্যাতির প্রত্যাশা করেননি। তিনি শুধু চেয়েছিলেন মানবসমাজকে এমন একটি শাসনব্যবস্থা উপহার দিতে যেখানে মানুষ একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কারো ইবাদত করবে না এবং তাঁর সঙ্গে অন্য কাউকে শরীক করবে না। সেইসঙ্গে সব গোত্র ও জাতির অধিকার সমুন্নত থাকবে এবং জনগণ শান্তি, নিরাপত্তা ও ভ্রাতৃত্বপূর্ণ পরিবেশে জীবনযাপন করবে।

রাসূলুল্লাহ (সা.) মদীনায় প্রবেশের পর থেকে আল্লাহর ইচ্ছায় এমন প্রজ্ঞাপূর্ণ নীতি গ্রহণ করেন যার ফলে অভ্যন্তরীণ ও বহিঃশত্রুরা মুসলমানদের কোনো ক্ষতি করতে পারেনি। তিনি মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপনের লক্ষ্যে তাদের মধ্য থেকে দু’জন দু’জন করে পরস্পরের সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপন করে দেন। এভাবে প্রায় একশ’ জন মুসলমান পরস্পরের সঙ্গে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হন। আল্লাহর রাসূল (সা.) নিজে হযরত আলী (আ.)’র সঙ্গে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন তৈরি করেন। এই সম্পর্ক স্থাপনের ফলে মক্কায় সহায় সম্বল ফেলে কপর্দকহীন অবস্থায় মদীনায় আগমনকারী মুহাজিররা আনসারদের ধন সম্পদের অধিকারী হন। এমনকি তারা আনসারদের সম্পদের উত্তরাধিকারীও হয়ে যান।

মদীনার প্রধান রাজনৈতিক সমস্যা ছিল বনু আউস ও বনু খাজরাজ গোত্রের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা শত্রুতা এবং এই দুই গোত্রের সঙ্গে ইহুদিদের বিদ্বেষপূর্ণ সম্পর্ক। মহানবী মদীনায় প্রবেশ করার বছরই আল্লাহর নির্দেশে একটি রাজনৈতিক চুক্তি করেন। পরস্পরের প্রতি মুসলমানদের কর্তব্য, অমুসলিমদের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক, মদীনায় বসবাসরত মুসলমান, ইহুদি ও মুশরিকদের পক্ষ থেকে আল্লাহর রাসূলকে নেতা হিসেবে গ্রহণ করা ইত্যাদি ছিল এই চুক্তির প্রধান কয়েকটি ধারা। চারটি অধ্যায় ও ৩৭ ধারার এ চুক্তিতে সব ধর্ম ও মতের লোকেরা স্বাক্ষর করার ফলে মদীনায় রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ইসলামি হুকুমতের ভিত্তি মজবুত হয়।

মদীনায় মুনাফিকদের উপস্থিতি এবং তাদের ষড়যন্ত্র ইসলামের প্রচার ও প্রসারের পথে ছিল বড় অন্তরায়। মুশরিক ও ইহুদিদের বিরুদ্ধে বদর, ওহুদ ও খন্দকের যুদ্ধে মুনাফিকদের কার্যকলাপ তাদের গোপন ষড়যন্ত্রকে সবার সামনে স্পষ্ট করে দেয়। মুসলমানদের মধ্যে ঘাপটি মেরে থাকা এই মুনাফিক গোষ্ঠী ইসলামের শত্রুদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রক্ষা করত এবং স্পর্শকাতর সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় শত্রুদের পক্ষে কথা বলত। মদীনায় হিজরতের পরবর্তী ১০ বছরে কাফেরদের সঙ্গে মুসলমানদের যেসব যুদ্ধ হয় সেগুলো ছিল ইসলামি হুকুমতকে শত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যে। ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী এ সম্পর্কে বলেন: “রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সবগুলো যুদ্ধ ছিল আত্মরক্ষামূলক। এর অর্থ এই নয় যে, প্রতিটি অভিযানে তিনি হামলার শিকার হওয়ার জন্য বসে থাকতেন। যদি তিনি বর্ম পরিধান করে প্রস্তুতি না নিতেন, শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য সর্বোচ্চ শক্তির প্রদর্শন না করতেন তাহলে ইসলামের সেই প্রাথমিক দিনগুলোতেই কাফের-মুশরিকরা ইসলামি সমাজকে ছিন্নভিন্ন করে ফেলত। এ কারণে আল্লাহর রাসূল বাধ্য হয়ে সুসজ্জিত অবস্থায় যুদ্ধের ময়দানে অবতীর্ণ হতেন।”

আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনের সূরা আ’রাফের ১৫৮ নম্বর আয়াতে বিশ্বনবী (সা.)কে উদ্দেশ করে বলেন: “ (হে রাসূল আপনি) বলে দিন, হে লোকসকল! আমি নিঃসন্দেহে তোমাদের সবার প্রতি আল্লাহর প্রেরিত রাসূল।” এই আয়াতের বলা হচ্ছে, বিশ্বনবী কেবল আরব উপত্যকার মানুষের জন্য নবী হয়ে আসেননি, বরং গোটা বিশ্ববাসীর জন্য রাসূল হিসেবে প্রেরিত হয়েছিলেন। এ কারণে তিনি সপ্তম হিজরিতে বড় সাম্রাজ্যগুলোর অধিপতি, খ্রিস্টান নেতা ও গোত্র প্রধানদের উদ্দেশে চিঠি লিখে তাদেরকে ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণ করার আহ্বান জানান। এ সময় মদীনায় মুসলমানদের অবস্থা অনেকটা সুসংহত ছিল।

এসব চিঠিতে আল্লাহর রাসূল যে বক্তব্য তুলে ধরেন তাতে ইসলামের প্রচার ও প্রসারে তাঁর বিশেষ পদ্ধতি পরিলক্ষিত হয়। তিনি সে সময় যেসব চিঠি লিখেছিলেন তার ১৮৫টির বিষয়বস্তু এখনও সংরক্ষিত রয়েছে। এসব চিঠির ভাষা থেকে বোঝা যায়, তিনি যুক্তি, বিচারবিশ্লেষণ, জান্নাতের সুসংবাদ ও জাহান্নামের ভয় দেখিয়ে বিশ্ববাসীকে ইসলামের দিকে আহ্বান করেছেন। একদিন তিনি বিভিন্ন দেশে পাঠানোর উদ্দেশ্যে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিনিধিদের উদ্দেশে বলেন: “আপনারা আল্লাহর বান্দাদেরকে উপদেশ দেবেন। রাষ্ট্র পরিচালনায় নিয়োজিত ব্যক্তিরা যদি তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা মানুষদের হেদায়েতের জন্য চেষ্টা না চালায় তাহলে আল্লাহ তাদের জন্য জান্নাত হারাম করে দেবেন। আপনারা দূরদূরান্তে গিয়ে আল্লাহর তৌহিদের বাণী বিশ্ববাসীর কানে পৌঁছে দিন।”

আল্লাহর রাসূল রূপা দিয়ে একটি আংটি তৈরি করেন যাতে ‘মুহাম্মাদ রাসূলুল্লাহ’ কথাটি খোদাই করা ছিল। ওই আংটিকে তিনি প্রতিটি চিঠির শেষে নিজের সিলমোহর হিসেবে ব্যবহার করেন। তাঁর প্রেরিত প্রতিনিধিরা একইদিন ইরান, রোম, হাবাশা, মিশর, ইয়ামামা ও বাহরাইনের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। রাসূলের এই দাওয়াতি কাজের ফলস্বরূপ মদীনা থেকে ইসলাম দ্রুতগতিতে বিশ্বের দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ে। এর আগে একই পদ্ধতির বদৌলতে একদিন মদীনাবাসী ইসলাম গ্রহণ করেছিল। বলা হয়ে থাকে, কুরআনের মাধ্যমে মদীনা বিজয় হয়।  

রাসূলে আকরাম (সা.) ষষ্ঠ হিজরির জিলকাদ মাসে কোনোরকম যুদ্ধের প্রস্তুতি ছাড়াই ওমরাহ করার লক্ষ্যে মক্কার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। মক্কার কুরাইশ অধিপতিরা কয়েকজন দূত পাঠিয়ে হুদায়বিয়া নামক স্থানে আল্লাহর রাসূলের সঙ্গে একটি সন্ধিচুক্তি করেন যা ইতিহাসে হুদায়বিয়ার সন্ধি হিসেবে পরিচিত। ওই চুক্তিতে বলা হয়েছিল, মুসলমানরা যেমন কুরাইশ ও তার আত্মীয়-স্বজনের ওপর হামলা করতে পারবে না তেমনি কুরাইশের লোকজনও মুসলমানদের কোনো ক্ষতি করবে না। চুক্তিতে আরো বলা হয়, ওই বছর মুসলমানরা ওমরাহ না করেই মদীনায় ফিরে যাবেন এবং পরের বছর মক্কায় এসে ওমরাহ করে নেবেন। কিন্তু এর কিছুদিন পর অষ্টম হিজরিতে কুরাইশরা এই চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করে। তারা আর্থিক সহায়তা দানের মাধ্যমে গোপনে মুসলমানদের একটি মিত্র গোত্রের ওপর হামলা চালিয়ে ২০ ব্যক্তিকে হত্যা করে। এই কাপুরুষোচিত হামলার পর আল্লাহর রাসূল (সা.) সাহাবীদের নিয়ে মক্কার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন।

তিনি সূরা ফাতহ তেলাওয়াত করতে করতে সোজা মসজিদুল হারামে চলে যান এবং আল্লাহর ঘর তাওয়াফ করতে শুরু করেন। মুসলিম সেনাবাহিনী ইসলামের পতাকা হাতে উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব ও পশ্চিমের প্রবেশদ্বার দিয়ে মক্কা শহরে প্রবেশ করেন। বিশাল মুসলিম বাহিনীর এ আগমন দেখে কাফের সর্দাররা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়েন এবং রাসূলুল্লাহ তাদের কি বিচার করেন তার অপেক্ষা করতে থাকেন। এসব ব্যক্তি অতীতে মুসলমানদের বিরুদ্ধে অসংখ্য অপরাধ করেছিল। আল্লাহর রাসূল ও তাঁর সাহাবীদের ওপর অত্যাচার চালানো থেকে শুরু করে যুদ্ধের দামামা বাজানো ও সহিংসতা ছড়িয়ে দিয়ে বহু মানুষের রক্ত ঝরানোর মতো মারাত্মক অপরাধ তারা করেছে। ফলে এসব কাফের নিজেরাও জানত, রাসূলুল্লাহ যদি তাদের কাছ থেকে কঠিন প্রতিশোধ গ্রহণ করেন তাহলে অন্যায় কিছু হবে না। এ কারণে তারা প্রত্যেকে ভয়ে কাঁপছিল। কিন্তু রাসূলে খোদা (সা.) তাঁর সাহাবীদের নির্দেশ দেন, তোমরা  ঘোষণা করে দাও, যারা নিজেদের ঘরে অবস্থান করবে অথবা মসজিদুল হারামে যাবে কিংবা আবু সুফিয়ানের ঘরে প্রবেশ করবে তারা নিরাপদ। তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হবে না। কম্পিত কুরাইশ নেতাদের চোখে চোখ রেখে তিনি বলেন: “আপনাদের কোনো ভয় নেই। মহান আল্লাহ আপনাদের ক্ষমা করে দিয়েছেন। তিনি ক্ষমাশীলদের মধ্যে সবচেয়ে বড় ক্ষমাকারী। আপনারা চলে যান। ক্ষমা করে দিলাম।”

মক্কা বিজয়ের এই ইতিহাসখ্যাত ঘটনায় মহানবীর মহানুভবতা দেখে প্রায় দুই হাজার মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেন। এদের কাউকে ইসলাম গ্রহণ করতে বাধ্য করা হয়নি। প্রকৃতপক্ষে মক্কা বিজয় এবং ইসলামের সুমহান ক্ষমা প্রদর্শনের এ ঘটনার পর আরব উপত্যকায় আগের চেয়ে অনেক দ্রুতগতিতে ইসলাম ছড়িয়ে পড়ে। বিনা রক্তপাতের এই বিজয় ছিল আল্লাহর রাসূলের জন্য মহান গৌরবের বিষয়।

 

বর্তমানে বিশ্ব অঙ্গনে রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে ইসলাম সবচেয়ে প্রভাব সৃষ্টিকারী ধর্ম ও মতাদর্শে পরিণত হয়েছে। কিন্তু মুসলিম নামধারী কিছু নির্বোধ লোকের কারণে শত্রুরা ইসলামকে কথিত ‘হিংসা হানাহানি ও সন্ত্রাসীদের’ ধর্ম হিসেবে প্রচার করার সুযোগ পাচ্ছে। কিন্তু বিনা রক্তপাতে মক্কা বিজয় এবং ইসলামের জাত শত্রুদেরকে ক্ষমা করে দেয়ার সেই ঐতিহাসিক ঘটনা প্রমাণ করে বর্তমানে ইসলামের বিরুদ্ধে যেসব অপপ্রচার চালানো হচ্ছে তার কোনো ভিত্তি নেই। #

পার্সটুডে/মুজাহিদুল ইসলাম/ মো: আবু সাঈদ/  ২

২০১৮-০৬-০২ ১৫:৫৫ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য