আমরা গত আসরে কথা রাখা বা অঙ্গীকার রক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি মানবিক গুণ নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করেছি। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন সূরা আলে-ইমরানের ছিয়াত্তর নম্বর আয়াতে অঙ্গীকার রক্ষা করাকে মোত্তাকিনদের পর্যায়ে পৌঁছার উপায় বলে উল্লেখ করেছেন।

যারা অঙ্গীকার রক্ষা করার মাধ্যমে ঐশী তাকওয়ার অধিকারী হয়েছে তাদের প্রতি আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ ও ভালোবাসার কথাও ঘোষণা করা হয়েছে।

মনোবিজ্ঞানীদের মতে পরিবারকেই প্রাথমিক শিক্ষাকেন্দ্র বলে অভিহিত করা হয়েছে। এই শিক্ষা কেন্দ্রের শিক্ষকগণ হলেন বাবা এবং মা। তার মানে শিশুকাল থেকেই পরিবারে শিশুদের জন্য সুস্থ সুন্দর এবং বেড়ে ওঠার একটি অনুকূল পরিবেশ তোলা বাবা মায়ের দায়িত্ব ও কর্তব্য। অঙ্গীকার কী জিনিস-একথা বোঝার মতো বয়স যখন শিশুদের হবে তখন থেকেই তাদেরকে সেই অঙ্গীকার রক্ষার প্রশিক্ষণ দিতে হবে। এটা কেবল মৌখিকভাবে শিক্ষা দিলেই চলবে না তাদেরকে বাস্তবেও এমনভাবে শিক্ষা দিতে হবে যাতে ওই অঙ্গীকারের বোধ ও চেতনা তাদের অন্তরাত্মায় গেঁথে যায়। গুরুত্বপূর্ণ এই বিষয়টি নিয়েই আজকের আলোচনা শুরু করার চেষ্টা করবো ইনশাআল্লাহ।

কুরআনে কারিম মানব সমাজের কাছে প্রত্যাশা করে তারা যেন তাদের কথার ওপর অটল থাকে বা অঙ্গীকার রক্ষার ব্যাপারে কোনোরকম অবহেলা না করে। সূরা বাকারার ১১৭ নম্বর আয়াতে অঙ্গীকার রক্ষা করাকে আল্লাহর নেক বান্দাদের অন্যতম গুণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সৎকাজের বর্ণনা দিতে গিয়ে এ আয়াতে বলা হয়েছে: "বরং সৎকাজ হচ্ছে এই যে,মানুষ আল্লাহ,কিয়ামতের দিন,ফেরেশতা আল্লাহর অবতীর্ণ কিতাব ও নবীদেরকে মনে প্রাণে মেনে নেবে এবং আল্লাহর প্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে নিজের প্রাণপ্রিয় ধন-সম্পদ,আত্মীয়-স্বজন,এতীম,মিসকীন,মুসাফির,সাহায্যপ্রার্থী ও ক্রীতদাসদের মুক্ত করার জন্য ব্যয় করবে। আর নামায কায়েম করবে এবং যাকাত দান করবে। যারা অঙ্গীকার করে তা পূর্ণ করবে এবং বিপদে-অনটনে ও হক-বাতিলের সংগ্রামে সবর করবে তারাই সৎ ও সত্যাশ্রয়ী এবং তারাই মুত্তাকী"।

সৎ, সত্যাশ্রয়ী এবং মুত্তাকিদের পরিচয় বা গুণ বর্ণনা প্রসঙ্গে কারও সঙ্গে করা অঙ্গীকার রক্ষা করার কথা বলা হয়েছে। সূরা মুমিনুনেও সৎ লোকের গুণ বর্ণনা প্রসঙ্গে আমানতের সুরক্ষা করা এবং অঙ্গীকার যথাযথভাবে পালন করার কথা বলা হয়েছে। এই সূরার ৮, ৯ এবং ১০ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে: "আর যারা নিজেদের আমানত ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে এবং নিজেদের নামাযগুলো রক্ষণাবেক্ষণ করে,তারাই এমন ধরনের উত্তরাধিকারী যারা নিজেদের উত্তরাধিকার হিসেবে ফিরদাউস লাভ করবে"। এ আয়াতে সুস্পষ্টভাবেই বলা হয়েছে, জান্নাত লাভের অন্যতম উপায় হলো আমানত ও অঙ্গীকার রক্ষা করা।

কুরআনে কারিম মানুষের মধ্যকার অঙ্গীকার ও চুক্তির বিষয়গুলিকে এমনভাবে উল্লেখ করেছে যে মনে হয় সবকিছুই জীবন্ত এবং বাস্তব। জীবিত অবস্থাতেই যেন কিয়ামতের দিন তাকে জিজ্ঞেস করা হবে যে মানুষেরা বিশেষ করে মুসলমানেরা তার সঙ্গে কীরকম আচরণ বা ব্যবহার করেছে? বাস্তবে অর্থাৎ কাজেকর্মে তাদের দেয়া প্রতিশ্রুতি কি পালন করেছিল নাকি কথার সঙ্গে কাজের মিল ছিল না? নাকি তারা তাদের দেওয়া অঙ্গীকারের ওপর ততোটা আবদ্ধ ছিল না? পক্ষান্তরে পরিস্থিতি কি বিপরীত ছিল যে, তারা তাকে অনেক সম্মান দিয়েছে এবং বাস্তব কাজের ক্ষেত্রে অঙ্গীকার পালন করাকে নিজের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও জরুরি বলে মনে করেছে?

সূরা বনি ইসরাইলের ৩৪ নম্বর আয়াতে এ সম্পর্কে বলা হয়েছে: "... প্রতিশ্রুতি পালন করো,অবশ্যই প্রতিশ্রুতির ব্যাপারে তোমাদের জবাবদিহি করতে হবে"। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মুত্তাকি বা খোদাভীরুতা সম্পন্ন পরহেজগার বান্দার পর্যায়ে পৌঁছার উপায় হিসেবে অঙ্গীকার পালনের কথা বলেছেন। সূরা আলে-ইমরানের ৭৬ নম্বর আয়াতে এসেছে, যে বা যারা অঙ্গীকার রক্ষা করে এবং তাকওয়া অবলম্বন করে তারা নিজেদেরকে আল্লাহর দয়া, ভালোবাসা ও অনুগ্রহ লাভের উপযুক্ত বলে সাব্যস্ত করেছে। কুরআন সুসংবাদ দিচ্ছে যে প্রতিশ্রুতি ও অঙ্গীকার রক্ষাকারীদের উচিত আল্লাহ তায়ালার কাছ থেকে পবিত্র পুরস্কার লাভের জন্য অপেক্ষা করা। এ নিয়ে আরেকটু কথা বলবো মিউজিক বিরতির পর।

 

অঙ্গীকার রক্ষাকারীদের আল্লাহর কাছ থেকে পুরস্কার প্রাপ্তির বিষয়ে বলছিলাম আমরা। বলা হয়েছে পরকালে সৎকর্মশীল বিশেষ করে অঙ্গীকার পালনকারীদের জন্য রয়েছে আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁর সন্তুষ্টি এবং বসবাসের জন্য রয়েছে উপযোগী বেহেশত। এ সবই নেক বান্দাদের সৎ কাজের পুরস্কার। আলে-ইমরানের ৭৬ নম্বর আয়াতের শেষাংশে বলা হয়েছে: যে ব্যক্তিই তার অঙ্গীকার পূর্ণ করবে এবং অসৎ কাজ থেকে দূরে থাকবে,সে আল্লাহর প্রিয়ভাজন হবে।কারণ আল্লাহ মুত্তাকীদের ভালোবাসেন। সুতরাং এই সৎ গুণটি নিজের ভেতরে লালন করার চেষ্টা করতে হবে। বিশেষ করে অঙ্গীকার পালন করার বিষয়টি নিজ জীবনের একটি  বৈশিষ্ট্যে পরিণত করার চেষ্টা করতে হবে। যদি নিজের দেয়া কথা রক্ষার ব্যাপারে সৎ থাকা যাবে না বলে মনে হয় তাহলে কাউকে কথা না দেয়াই উত্তম। এমনকি কোনো কাজ করে দেয়ার ইচ্ছে থাকলেও কথা দেয়ার দরকার নেই। যতক্ষণ পর্যন্ত নিশ্চিত হওয়া না যাবে ততক্ষণ কথা না দেয়াটাই উত্তম।

কারও সঙ্গে যদি যোগাযোগ করবেন বলে মনে করেন, তবুও কথা দিবেন না যে অমুককে আমি ফোন করবো বা অমুকের সাথে যোগাযোগ করবো। যদি কোনো কারণে যোগাযোগ করা না হয়ে ওঠে তাহলে আপনার গ্রহণযোগ্যতা ওই লোকের কাছে আর থাকবে না। অথচ আপনি কথা না দিয়েও যদি কাজটি করে দিতে পারেন তাহলে আপনার প্রতি তার বিশ্বাস ও আস্থা যে কী পরিমাণ বেড়ে যাবে তা আপনি কল্পনাও করতে পারবেন না। এর ফলে আপনার পারিবারিক জীবন হয়ে উঠবে অনেক বেশি আকর্ষণীয়। #

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/মো:আবুসাঈদ/  ৩

২০১৮-০৬-০৩ ১৬:২৮ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য