রমজানের রোজার উদ্দেশ্য হল তাক্‌ওয়া বা খোদাভীতি অর্জন। খোদাভীতি মানুষকে সব ধরনের অন্যায়, পাপ ও অধঃপতন থেকে রক্ষা করে। তাক্‌ওয়া খোদায়ি নানা পরীক্ষায় উৎরে যেতে মানুষকে সাহায্য করে। খোদায়ি পরীক্ষাগুলো সবার জীবনেই আসে।

যেমন, একটা মিথ্যা কথা বললেই আপনি হয়তো অনেক অর্থ, সম্পদ বা সুযোগ-সুবিধার অধিকারী হতে পারেন। কিন্তু আল্লাহর ভয় ও আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আপনি তা করলেন না। এটা এক খোদায়ি পরীক্ষা যাতে আপনি উৎরে গেলেন। কিংবা ধরুন কোথাও একটা অবৈধ আনন্দের সুযোগ আছে। কেউই সেটা দেখবে না-একমাত্র আল্লাহ বা তাঁর ফেরেশতারা ছাড়া। -এটাও এক খোদায়ি পরীক্ষা। আপনি সেই অবৈধ আনন্দ পাবার সুযোগ নিতে পারেন চোখ বা কোন অঙ্গ দিয়ে। কিন্তু আল্লার ভয় ও আল্লাহর সন্তুষ্টিকে প্রাধান্য দেয়ার ইচ্ছে থাকলে আপনি তা করবেন না। একটা মিথ্যা সাক্ষ্য দিলে আপনি অনেক অর্থ বা বিপুল সম্পদের অধিকারী হতে পারেন। কিন্তু আপনি যদি তা না করেন আল্লাহকে সাক্ষী মেনে তাহলে আপনি খোদায়ি পরীক্ষায় পাস করলেন। কোথাও কারো বিরুদ্ধে জুলুম হচ্ছে- আপনি তা দেখছেন। এখানে প্রতিবাদ জানানো বা ন্যায়ের পক্ষে কথা বলা ছিল জরুরি। কিন্তু এখানে সত্য কথা বললে বা প্রতিবাদ জানালে বিপদ, কষ্ট বা ঝামেলায় পড়ায় আশঙ্কা আছে। ঝামেলার ভয়ে আপনি তা করলেন না। এখানে খোদাভীতির পরীক্ষায় আপনি ব্যর্থ হলেন।

বৈধভাবেও যে কোনো সম্পদ বা সাফল্য অর্জনের পর খোদাভীরু মানুষের কাজ হল প্রথমেই আল্লাহর প্রশংসা করে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। আপনি যদি তা না করেন তাহলে অহংকার ও এর পথ ধরে বিচ্যুতির শিকার হতে পারেন আপনি। আপনার ভাবা উচিত যে মহান আল্লাহর সাহায্য না থাকলে আপনি সফল হতেন না। বিশ্বের অনেক বড় বড় সাম্রাজ্য, শক্তিশালী জাতি ও সভ্যতা ধ্বংস হয়ে গেছে অহংকার ও এর পথ ধরে আসা নানা অবিচার বা বিচ্যুতির কারণে। খোদাভীতি থাকলে সেসব ধ্বংস হত না।   

অনেক সময় এমনও দেখা যায় দুঃখ ও কষ্টের মধ্যে মানুষ সৎ পথে থাকে। কিন্তু প্রাচুর্যের সময় তারা ভোগবাদী হয়ে ওঠে এবং নানা বিচ্যুতির শিকার হয়। এর কারণ খোদাভীতিকে অব্যাহত রাখতে না পারা। অতীতের নানা জাতি ও ধর্মের বিচ্যুতির কারণ হল এটা।  বলা হয় মহান আল্লাহ বিপদ, দারিদ্র ও দুঃখ-কষ্ট দিয়েও পরীক্ষা করেন আবার ধন-সম্পদ ও সুখময় প্রাচুর্য দিয়েও পরীক্ষা করেন। তাই খোদাভীতি বজায় রাখা সব সময়ই অপরিহার্য।

ইফতারে ইরানি শরবত

এক সময় মক্কার কাফিররা মুসলমানদের ওপর অবর্ণনীয় নানা নির্যাতন ও নৃশংস পাশবিক আচরণ করেছিল। কিন্তু মক্কা বিজয়ের পর মুসলমানরা সেই একই কাজে লিপ্ত হননি প্রতিশোধ নেয়ার নামে। এখানেও সংযম ও ক্ষমাশীলতা ছিল এক বড় পরীক্ষা। মহানবী (সা)'র নেতৃত্বে বেশিরভাগ মুসলমানই সে পরীক্ষায় উৎরে যেতে পেরেছেন। আমাদের জীবনেও মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে এ ধরনের নানা পরীক্ষা ঘুরে-ফিরে আসবে। তাই শক্তি ও সম্পদের প্রাচুর্য যেন আমাদেরকে খোদাভীরুতার পথ ও সংযমের পথ থেকে বিচ্যুত না করে সে জন্য সব অবস্থায় তাকওয়াকে ধরে রাখার অনুশীলন করতে হবে। তাকওয়া থাকতে হবে জীবনের সব ক্ষেত্রেই: সাংস্কৃতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, পারিবারিক, ব্যক্তিগত ও রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রসহ সবক্ষেত্রেই। খোদাভীরু মানুষকে সবক্ষেত্রেই দূরদর্শী ও প্রখর দৃষ্টির অধিকারী হতে হবে: তাকে চোখ-কান খোলা রেখে বুঝতে হবে কারা দেশ, জাতি ও ইসলামের শত্রু এবং তারা কোন্ ক্ষেত্রে কি কি ষড়যন্ত্র করছে! আর এসবের মোকাবেলায় তথা খোদায়ি পরীক্ষার আলোকে তাকে কি দায়িত্ব পালন করতে হবে।  পবিত্র রমজান আমাদেরকে এমনই উন্নত মানের মুসলমান হতে শেখায় ও সেই জন্য কষ্ট করার বা সংযম-চর্চার আহ্বান জানায়। সব অবস্থায় ন্যায়বিচার, সত্য ও আল্লাহর পথে অবিচল থাকার এবং সঠিক কাজটি বা সঠিক দায়িত্ব পালনের ধৈর্য তথা খোদাভীতি বা তাকওয়ার শক্তি অর্জনের জন্য রোজা রাখা জরুরি। আর এ জন্যই মহান আল্লাহ যুগে যুগে সব জাতির জন্যই রোজা ফরজ করেছিলেন।

পবিত্র রমজানের ফজিলত সম্পর্কে বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ জনাব মুনির হুসাইন খানে বলেছেন, "ইমাম সাদিক (আ.) বলেছেন, তিনটি জিনিসের উৎপত্তি মহান আল্লাহর রহমত (দয়া ও করুণা ) থেকে ১. রাত্রি জাগরন ও তাহাজ্জুদের (রাতের) নামায আদায় করা, ২. দ্বীনী ভাইদের সাথে দেখা – সাক্ষাৎ এবং ৩. রোযা (সওম)।"

বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা) বলেছেন, যে তারা জিহবাকে অর্থহীন বা অপ্রয়োজনীয় কথা বলা থেকে বিরত রাখতে পারবে আমি তার জন্য বেহেশতের গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তা দিচ্ছি। ইসলামী বর্ণনায় এসেছে: মহান আল্লাহ যাকে ভালোবাসেন তাকে দান করেন ধর্মের জ্ঞান এবং সে ব্যক্তি ঘুমাবে কম, কথা বলবে কম ও খাবে কম।

মেরাজ সফরের সময় এক পর্যায়ে মহানবী (সা) মহান আল্লাহর কাছে তাঁর নৈকট্য লাভের পথগুলো জানতে চাইলে মহান আল্লাহ বলেন: তোমার দিনকে কর রাত ও রাতকে কর দিন। আর তা করবে ঘুমকে ইবাদতে ও খাবারকে ক্ষুধায় বদলে দিয়ে।

মহান আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের মুহূর্ত দুটি: সিজদার সময় ও ক্ষুধার্ত থাকার সময়। মহান আল্লাহ আমাদেরকে এসব হাদিস অনুযায়ী জীবন গড়ার সুযোগ দিন। 

পার্সটুডে/আমির হুসাইন/আশরাফুর রহমান/৬

২০১৮-০৬-০৬ ১৬:৩০ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য