রমজানে মহান আল্লাহর ভোজসভার এক অনন্য ও সবচেয়ে সুস্বাদু আইটেম হল আল্লাহর স্মরণ।

সুরা আহজাবের ৪১ থেকে  ৪৪ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন: হে ইমানদাররা, তোমরা আল্লাহকে স্মরণ কর, স্মরণ কর খুব বেশি মাত্রায়। সকাল ও সন্ধ্যায় তাঁর প্রশংসা কর। তিনি তোমাদের জন্য দরুদ পাঠান ও তাঁর ফেরেশতারাও তা করেন যাতে তোমরা নানা ধরনের অন্ধকার থেকে আলোতে আসতে পার। আল্লাহ মু'মিনদের প্রতি দয়ালু। যেদিন আল্লাহর সাথে মিলিত হবে; সেদিন তাদের তথা ফেরেশতাদের অভিবাদন হবে সালাম। তিনি তাদের জন্যে সম্মানজনক পুরস্কার প্রস্তুত রেখেছেন। 

-পবিত্র কুরআনের এ বাক্যগুলো নাজিল হয়েছিল এমন এক সময় যখন আহজাবের যুদ্ধসহ অনেকগুলো যুদ্ধের পর ইসলামী সমাজ অনেক শক্তিশালী ও সুসংহত হয়েছিল। অর্থাৎ বলা হচ্ছে- এতগুলো পরীক্ষা উৎরে যাওয়ার পর এখন খুব ভালো অবস্থার মধ্যে তোমরা আল্লাহকে ভুলে যেও না।  বরং খুব বেশি মাত্রায় আল্লাহকে স্মরণ কর। নানা ধরনের আাশপাশের  ঘটনা-প্রবাহ ও ব্যস্ততার মধ্যে তোমরা আসল লক্ষ্য আর দায়িত্বের কথা ভুলে যেও না। 

হযরত ইমাম হুসাইন (আ) বলেছেন, সব ফরজ দায়িত্ব ও ইবাদতেরই একটা সীমা বা সমাপ্তি আছে কেবল আল্লাহর স্মরণ ছাড়া। আল্লাহর জিকরের কোনো সীমা- পরিসীমা ও শেষ নেই। 

রমজানের রোজার পর আরেক রমজানের আগ পর্যন্ত আর রোজা রাখা ফরজ নয়। হজ করার পর আবারও হজ করা ফরজ নয়, প্রাত্যহিক ফরজ নামাজগুলো শেষ হলে আরও নামাজ পড়া জরুরি নয়। বাৎসরিক জাকাত ও খুম্‌স্‌ আদায়ের পর এ সংক্রান্ত কর্তব্য শেষ। কিন্তু আল্লাহর স্মরণ এমন এক বিষয় যে তাতে বেশি বেশি মশগুল থাকার ওপর ব্যাপক গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। মহান আল্লাহ তাঁর প্রতি অল্প ও কম স্মরণে সন্তুষ্ট নন। তাই বলছেন, হে ইমানদাররা, খুব বেশি বেশি আমাকে স্মরণ কর। এটাও স্মরণ করিয়ে দেয়া হচ্ছে যে- সেই আল্লাহকে স্মরণ কর বেশি বেশি যিনি ও তাঁর ফেরেশতারা ইমানদারদের প্রতি দরুদ পাঠান!

মহান আল্লাহর দরুদ মানে তাঁর অনুগ্রহ। আর ফেরেশতাদের দরুদ মানে আল্লাহর দরবারে মুমিনদের জন্য ফেরেশতাদের ক্ষমা প্রার্থনা।  আর এসবই করা হয় যাতে মুমিনরা অন্ধকারগুলো থেকে আসতে পারে আলোর দিকে। আমাদের চিন্তা-ভাবনায়, হৃদয়ে, চরিত্রে ও আচার-আচরণে কতই না অন্ধকার বা আলোহীনতা বিরাজ করছে! এসব দূর করতে দরকার খোদায়ি নুর বা আলো।  কখনও কখনও গোটা সমাজকে ঘিরে ফেলে নানা ধরনের পশুত্ব ও পাপের অন্ধকার। নেতৃবৃন্দসহ গোটা সমাজ তখন যেতে থাকে রসাতলে। তাই মুক্তির জন্য দরকার বিবেক, সত্য, ন্যায়পরায়ণতা, ইসলাম ও আধ্যাত্মিকতার আলো। মহান আল্লাহ সেইসব আলোতেই নিতে চান মুমিনদেরকে।  

মহাপুরুষরা তথা আল্লাহর ওলিরা আল্লাহর জিকর্‌ বা স্মরণের মধ্যে পান তাঁর সঙ্গে বসে থাকার মহা-আনন্দ। তাদের জন্য এ যেন মহাপ্রেম-অভিসারের আনন্দ। আর সাধারণ মুসলমানের জন্য রমজানের এইসব দিন ও রাতে ঠিক সেই উচ্চতর প্রেমেরই কিছু স্ফুলিঙ্গ বা আলোকচ্ছটা কিছু সময়ের জন্য স্বল্প মাত্রায় হলেও দেখা দিতে পারে।  কিন্তু আল্লাহর ওলি ও ইমামরা সব সময়ই আল্লাহর স্মরণের ও একান্ত সাহচর্যের প্রেমময় নেশায় মাতোয়ারা হয়ে থাকেন। তাঁদের অবস্থা এমন যেন তাঁরা সব সময় নামাজের মধ্যেই থাকেন!  

সাধারণ মুসলমান ওই পর্যায়ে পৌঁছতে না পারলেও তাদের জন্যও আল্লাহর স্মরণের মধ্যে রয়েছে বিস্ময়কর সুফল। সাধারণ মানুষের অন্তরে সব সময় বস্তুগত স্বার্থ-চিন্তা, নানা লোভ-লালসা, পাপমুখি ও বিভ্রান্তকারী চিন্তা ঘুরপাক খায়। তাই হৃদয়ের এই ঘরকে কেবল আল্লাহর জন্য খালি করে দিতে হলে ও পবিত্র রাখতে হলে বেশি বেশি আল্লাহকেই স্মরণ করতে হবে। মহান আল্লাহর স্মরণ নানা ধরনের ক্ষতি, প্রলোভনের ফাঁদ ও শয়তানের হামলার মোকাবেলায় হৃদয়ে যোগায় প্রতিরোধের প্রবল শক্তি। আর যে আল্লাহকে স্মরণ করে না সে সহজেই এইসব ক্ষতি, ফাঁদ ও হামলার মুখে নতজানু হয়ে পড়ে। সব ধরনের যুদ্ধেই মুমিন মুসলমানকে বেশি বেশি আল্লাহর স্মরণের আশ্রয়ে থাকতে হবে। 

বাইরের ও ভেতরের জিহাদ ছাড়াও অর্থনৈতিক জিহাদে, সাংস্কৃতিক জিহাদে, প্রচারের ও মানসিক বা মনস্তাত্ত্বিক জিহাদেও আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ করা জরুরি যাতে খোদাপ্রেমের সঠিক পথে অবিচল থাকা যায়। 

পবিত্র রমজানের ফজিলত সম্পর্কে বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ জনাব মুনির হুসাইন খান বলেছেন, 

হযরত আলী ( আঃ ) বলেছেন: রোযা হচ্ছে বান্দা এবং তার স্রষ্টার মাঝে ইবাদত , একমাত্র মহান আল্লাহ ব্যতীত আর কেউ এই ইবাদতের প্রতিদান ( রোযার সওয়াব ) দিতে সক্ষম নয়।

বাস্তবতার ময়দানে আল্লাহর স্মরণের স্বরূপটা কেমন?  প্রথমত আমার প্রতিদ্বন্দ্বী বা প্রতিপক্ষও যদি সত্যের পথে থাকে বা কোনো কিছু পাওয়ার যোগ্য হয় তাহলে তা তাকে দেয়া তথা ইনসাফের ওপর অবিচল থাকা তাতে যদি নিজের ক্ষতিও হয়। সত্যকে তুলে ধরার কারণে নিজেকে খাটো করা বা অপদস্থ করা কঠিন হলেও তা-ই গুরুত্বপূর্ণ বা জরুরি। দ্বিতীয়ত মুমিন ভাইকে সবক্ষেত্রে সহায়তা করা। কখনও অর্থ দিয়ে বা কখনও বুদ্ধি দিয়ে এবং অন্য সব ধরনের সহায়তা দিয়ে মুমিন ভাইয়ের স্বার্থ ও সম্মান রক্ষা করা। তৃতীয়ত: সব সময় আল্লাহকে মনে রাখা। যে কোনা পাপের সময়ও আল্লাহর কথা মনে হলে তা পাপকে রুখে দেয়।  মহান আল্লাহর আমাদের সবাইকে তার প্রকৃত জিক্‌র্‌কারী বা স্মরণকারী হওয়ার তৌফিক দিন।     

মহান আল্লাহ পবিত্র মে'রাজে তাঁর প্রিয়তম বন্ধু বিশ্বনবী (সা)-কে বলেছেন, হে আহমাদ! আমার মর্যাদা ও মহত্ত্বের শপথ! আমার কোনো বান্দা বা দাস যদি আমার জন্য চারটি বৈশিষ্ট্য অর্জন করে সুনিশ্চিতভাবে তাহলে আমি তাকে বেহেশতে প্রবেশ করাব। এই চারটি বৈশিষ্ট্য হল: জিহ্বাকে সংযত রাখবে ও নিজের জন্য কল্যাণকর কোনো কথা ছাড়া অন্য কোনো কথা সে বলবে না, অন্তরকে নানা ধরনের শয়তানি প্রলোভন থেকে মুক্ত রাখবে, সব সময় এটা মনে রাখবে যে আমি তার সম্পর্কে সচেতন ও তার কাজগুলো দেখছি এবং সে ক্ষুধার্ত থাকাকে পছন্দ করবে। 


আজ ২৩ রমজানের রাত শুরু হচ্ছে। অনেকের মতে এ রাত শবে ক্বদর। তাই এ রাতের বিশেষ আমলগুলো বিশেষ করে পবিত্র কুরআন অধ্যয়ন ও দোয়াগুলো পাঠের কথা এবং মুসলিম বিশ্বসহ মানবজাতির সার্বিক সমৃদ্ধির জন্য দোয়া করতে ভুলবেন না। মৃত সব প্রিয়জন, প্রতিবেশী, বন্ধু-বান্ধব ও বিশ্বের মজলুম জাতিগুলোর জন্যও বিশেষভাবে দোয়া করা উচিত এমন পবিত্র রাতে। 

পার্সটুডে/এমএএইচ/৭

ট্যাগ

২০১৮-০৬-০৭ ১৭:০৭ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য