গত পর্বের আলোচনায় আমরা সব অবস্থায় ও সব স্থানে মহান আল্লাহর স্মরণের গুরুত্ব সম্পর্কে কথা বলেছি। সুখে ও দুখে, বিপদে-আপদে ও শয়তানের প্রলোভন বা লোভের ফাঁদের মুখেও স্মরণ করতে হবে আল্লাহকে।

 আত্মশুদ্ধি, আধ্যাত্মিক উন্নতি ও উন্নত নৈতিক চরিত্র গঠনের জন্য বেশি বেশি মহান আল্লাহকে স্মরণ করা জরুরি।  কুরআন অধ্যয়ন ও নানা ধরনের দোয়া পাঠও মনকে আল্লাহমুখী করে এবং নানা ধরনের বিচ্যুতি ও উদাসীনতা থেকে হৃদয়কে রক্ষা করে। আমরা যত বেশিই আল্লাহকে স্মরণ করি না কেন তাকে যথেষ্ট ও পর্যাপ্ত মনে করা ঠিক হবে না। আল্লাহর স্মরণকে সদা-জাগ্রত রাখার জন্য সচেষ্ট থাকতে হবে। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে: একমাত্র আল্লাহর স্মরণের মধ্যেই রয়েছে প্রশান্তি। 

ধৈর্য বা প্রতিরোধ নামাজ ও রোজার অন্যতম বড় শিক্ষা। মহান আল্লাহ নিজে ধৈর্যশীল এবং তিনি ধৈর্যশীলদের ভালবাসেন। পাপী ও অবিশ্বাসীদের বৈশিষ্ট্য হল ধৈর্যহীনতা ও অস্থিরতা। তাই তারা শেষ পর্যন্ত মু'মিনদের ধৈর্য্যের কাজে পরাস্ত হয়। নামাজ ও রোজা আমাদেরকে নানা পাপ, অশালীনতা ও অশ্লীলতা থেকে রক্ষা করে। এক্ষেত্রে ধৈর্য্যের ভূমিকা রয়েছে। ধৈর্য বলতে কি বোঝায়? বলা হয় আল্লাহর আনুগত্য ও ইবাদত করার ক্ষেত্রে এবং পাপের প্ররোচনা বা প্রলোভনের ক্ষেত্রে ধৈর্য ধরতে হবে। 

আল্লাহর আনুগত ও ইবাদতের ক্ষেত্রে ধৈর্য ধরা হল: এক্ষেত্রে ক্লান্ত না হওয়া। দীর্ঘ সময়ের দোয়া, কুরআন তিলাওয়াত ও অধ্যয়ন এবং দীর্ঘ সময়ের নামাজ-রোজা বা বিশেষ আমল ও জিকরে মশগুল হতে গিয়ে আমরা যেন ক্লান্ত না হই ও উৎসাহ-উদ্দীপনা হারিয়ে না ফেলি। ইবাদত ও আনুগত্যের ক্ষেত্রে আনন্দ উপভোগ করার জন্য এবং ধৈর্য ধরার জন্য মহান আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইতে হবে।   

আর পাপের ক্ষেত্রে ধৈর্য ধরার অর্থ হল: পাপের প্রলোভন ও প্ররোচনাগুলোর কাছে নতি স্বীকার না করা এবং এ ব্যাপারে সদা-সতর্ক ও সচেতন থাকা। পাপের পথগুলো সিড়ির মত ও পর্যায়ক্রমিক। কেউ খ্যাতির পাগল। কেউবা অর্থ ও সম্পদের কাতর। আবার কেউবা যৌন বিষয়ে অসংযমী। উদাসীনতা মানুষকে পাপের সিড়ির দিকে টেনে নেয়। ধরুন একটি শিশু একটি মিষ্টির বাক্স দেখে প্রলুব্ধ হল। এই বাক্স বা প্যাকেট পাওয়ার জন্য সে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ছুটতে থাকে। পথে কাঁচের নানা গ্লাস বা জগ তার পায়ের ধাক্কায় ভেঙ্গে যায়। সুন্দর ফুলদানি বা চীনা মাটির পাত্র ভেঙ্গে যায়। কিন্তু সে এসব বিষয়ে উদাসীন এবং এসব দামী জিনিষ যে ভেঙ্গে যাচ্ছে সে তা উপলব্ধিও করছে না। ঠিক একইভাবে শয়তান কোনো বড় ধরনের লোভের দিকে মানুষকে টেনে নেয়ার সময় তাকে নানা ধরনের পাপে মশগুল করে। মানুষ যদি সচেতন না হয় তাহলে সে এভাবেই পাপের পথে নানা ধ্বংসাত্মক তৎপরতা তথা অনেকগুলো পাপে জড়িয়ে পড়ে। তাই এসব বিষয়ে চোখ-কান সব সময় খোলা রাখতে হবে। 

পবিত্র রমজানের ফজিলত সম্পর্কে বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ জনাব মুনির হুসাইন খান বলেছেন, 
রোযা ও দোযখের আগুণ থেকে রক্ষাকবচঃ

মহানবী ( সাঃ ) বলেছেনঃ রোযা হচ্ছে দোযখের আগুণ থেকে (রক্ষাকারী) ঢাল স্বরূপ (অর্থাৎ মানুষ রোযা রাখার মাধ্যমে দোযখের আগুণ ও আযাব থেকে নিরাপদ হবে ও নাজাত পাবে) ।

ধৈর্য ধরার আরেকটি ক্ষেত্র হল নানা ধরনের বিপদ ও সংকট। মানুষের জীবনে উত্থান-পতন এবং সুখ ও দুঃখ থাকে। কখনও প্রিয়জনরা মারা যান। কখনও আর্থিক সংকট, অসুস্থতা বা দুর্ঘটনা কিংবা বিচ্ছেদ-বেদনা তিক্ততা –এসবের মুখোমুখী হয় মানুষ। আর এ জাতীয় পরিস্থিতি মানুষের ঈমানের জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে দেখা দেয়। যারা খোদা-প্রেমিক ও প্রকৃত মুমিন তারা এমনসব পরিস্থিতিতেও আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকেন এবং ধৈর্য ধারণ করেন। তারা বিপদ-আপদ ও কঠিন সংকটকে খোদায়ি পুরস্কার হিসেবে স্বাগত জানান। তাই তো আমরা দেখি কারবালার সেইসব কঠিন সংকট ও অশেষ দুঃখ আর বেদনার মাঝেও ইমাম হুসাইনের বোন হযরত জাইনাব বলছেন: সৌন্দর্য ছাড়া অন্য কিছু দেখিনি। শাহাদাতের মুহূর্ত যতই ঘনিয়ে আসছিল ততই ইমাম হুসাইন (আ)'র চেহারা হচ্ছিল প্রজ্জ্বোল ও প্রশান্ত। সব অবস্থায় মহান আল্লাহর ওপর সন্তুষ্ট থাকা প্রকৃত মুমিনের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট।

স্মরণ করা যেতে পারে হযরত আইয়ুব নবীর ধৈর্যের দৃষ্টান্ত। খোদায়ি পরীক্ষা হিসেবে একে একে তার সব সম্পদ, বাগান, খামার ও এমনকি সন্তান-সন্ততিও নিয়ে নেয়া হয়। সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হওয়ায় পাড়া-প্রতিবেশি ও আত্মীয়-স্বজনরাও তাকে ত্যাগ করেন। কেবল এক স্ত্রী-বিবি রহিমা তাঁকে ত্যাগ করেননি। আর এমন কঠিন পরিস্থিতিতেও মহান আল্লাহর ওপর সন্তুষ্ট ও অবিচল আস্থা বজায় রাখেন হযরত আইয়ুব। অন্যদিকে যারা দুর্বল ঈমানদার বা মুনাফিক তারা কেবল সুখের সময় আল্লাহর ওপর সন্তুষ্ট থাকে। আর বিপদ-আপদ দেখলেই মহান আল্লাহর প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে পড়ে।  

ধৈর্যের সুফল বা পুরস্কার হিসেবে মহান আল্লাহ আইয়ুব নবীকে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন সব সম্পদ ও জীবিত করে দেন তাঁর সব সন্তান।  এমনকি তার সব কিছু আগের চেয়ে বাড়িয়ে দেয়া হয় এবং তাঁকে ও তাঁর স্ত্রীকে ফিরিয়ে দেয়া হয় যৌবন।  একইভাবে আমরা দেখি হযরত ইউসুফ নবীর ধৈর্য ও তার মহাপুরস্কার। আর আল্লাহর পথে ধৈর্য ধরার সুফল কেবল ইহুলোকে বা পরলোকে নয় বরং দুই জগতেই রয়েছে। আর মানব জাতির জন্য ধৈর্যের সর্বশ্রেষ্ঠ আদর্শ হলেন বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা)।  তিনি বলেছেন, অন্য কোনো নবীই মহান আল্লাহর ধর্মের পথে এত কষ্ট করেননি ও ধৈর্য ধরেননি যতটা কষ্ট এবং ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার পরিচয় দিয়েছি আমি।

 ধৈর্য ও বিপদে-আপদে মানুষের যোগ্যতা হয় বিকশিত। তাই বিপদ-আপদ, দুখ-কষ্ট-এসব হল মহাপুরুষ ও মুমিনদের জন্য যোগ্যতা ও সম্মান বৃদ্ধির মাধ্যম। পরকালে পার্থিব নানা বিপদ-আপদে ধৈর্য ধরার ব্যাপক ও অকল্পনীয় পুরস্কার দেখে মুমিনরা আফসোস করে বলবেন: হায়! আমরা যদি কোনো বিপদ-আপদ এবং রোগ-শোক দূর করার জন্য দোয়া না করতাম! 

 ইসলামী বর্ণনায় বলা হয় মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয় বান্দাহদেরকে বেশি বেশি কষ্ট ও বিপদ-আপদ দিয়ে পরীক্ষা করেন এবং কষ্টি পাথর দিয়ে যাচাই-বাছাই করে ও আগুনে পুড়িয়ে খাঁটি সোনায় পরিণত করেন তাঁর প্রিয় বান্দাহদেরকে।  আর আল্লাহ যাদেরকে কম ভালবাসেন তাদেরকেই কম বিপদ-আপদ ও সংকটে রাখেন। 

 এবারে অর্থসহ ২৩তম রোজার দোয়া: 

لیوم الثّالث والعشرون : اَللّـهُمَّ اغْسِلْنی فیهِ مِنَ الذُّنُوبِ، وَطَهِّرْنی فیهِ مِنَ الْعُیُوبِ، وَامْتَحِنْ قَلْبی فیهِ بِتَقْوَى الْقُلُوبِ، یا مُقیلَ عَثَراتِ الْمُذْنِبینَ .

হে আল্লাহ ! আমার সকল গুনাহ ধুয়ে মুছে পরিস্কার করে দাও। আমাকে সব দোষ-ত্রুটি থেকে পবিত্র কর। তাকওয়া ও খোদাভীতির মাধ্যমে আমার অন্তরকে সকল পরিক্ষায় উত্তীর্ণ কর। হে অপরাধীদের ভুল-ত্রুটি মার্জনাকারী। #

পার্সটুডে/এমএএইচ/৭

   

ট্যাগ

২০১৮-০৬-০৭ ১৭:৩৫ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য