আজকের আসরে আমরা দশম হিজরিতে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর বিদায় হজ্ব এবং এই মহামানবের ওফাতের ঘটনা সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করব।

দশম হিজরির জিলকদ মাসে বিশ্বনবী (সা.) মুয়াজ্জিনদের একথা ঘোষণা করার নির্দেশ দেন যে, তিনি এ বছর হজ করতে যাবেন। ২৫ অথবা ২৬ জিলকদ রাসূলুল্লাহর নেতৃত্বে মদীনা থেকে বিশাল হজের কাফেলা বের হয়। কারো কারো বর্ণনা মতে, এই কাফেলায় এক লাখ হজযাত্রী ছিল। কাফেলার লোকজন মদীনার অদূরে শাজারা মসজিদে ইহরামের পোশাক পরেন এবং মুখে লাব্বাইক ধ্বনি উচ্চারণ করেন।

এ সফরে আল্লাহর রাসূল জনগণের সঙ্গে বেশি বেশি কথা বলেন এবং তাদেরকে আল্লাহর আদেশ-নিষেধগুলো বুঝিয়ে দেন। তিনি আরাফা দিবসে সাহাবীদের উদ্দেশে একটি গুরুত্বপূর্ণ খুতবা দেন যাতে তিনি বলেন: “হে লোকসকল!আমার কথা মনযোগ দিয়ে শোনো। হয়ত চলতি বছরের পর আর তোমাদের সঙ্গে আমার দেখা হবে না। তোমাদের একজনের জান-মাল অপরজনের জন্য হারাম ঘোষণা করা হলো; ঠিক যেরকম আজ, এই মাস ও দিন হারাম। তোমরা যেদিন আল্লাহ তায়ালার সামনে উপস্থিত হবে সেদিন তোমাদের আমল সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। কারো হাতে অপরের আমানত থেকে থাকলে তা মালিককে ঠিকমতো ফিরিয়ে দেবে। হে জনগণ!এই দেশে আর কোনোদিন শয়তানের পূজা করা হবে না। কিন্তু তোমাদের ধর্মের ব্যাপারে শয়তানের কুমন্ত্রণা সম্পর্কে সতর্ক থাকবে। স্ত্রীদের প্রতি সদয় আচরণ করবে, তারা আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে আমানত। হে উপস্থিত জনতা! সব মুসলমান পরস্পরের ভাই। এক মুসলমান যতক্ষণ খুশিমনে অপর মুসলমানকে কোনো কিছু না দিচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত তা ভোগ করার কোনো অধিকার কারো নেই।”

বিদায় হজের এ সফরে রাসূলুল্লাহ (সা.) তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দেন যার প্রতিটিতে তিনি মুসলমানদের মধ্যে ঐক্য ও সংহতি প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান। মুসলমানদের ভবিষ্যত এবং তাদের জন্য যেসব কঠিন দিন অপেক্ষা করছে তা আল্লাহর রাসূলকে ভাবিয়ে তুলত। কারণ, তিনি মুনাফিকদের ষড়যন্ত্র ও দুষ্কর্ম নিজের চোখে দেখেছিলেন। সেইসঙ্গে ভণ্ড নবীদের উত্থানের ফলে আবর উপত্যকায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল।

 

আল্লাহর নবীর পক্ষ থেকে দেয়া দ্বীনি শিক্ষা গ্রহণ করতে করতে মুসলমানরা হজ সমাপ্ত করেন। ১০ বছরের বিচ্ছিন্নতার পর রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজ শহর মক্কায় ফিরেছিলেন। এ কারণে অনেকে ধারণা করেছিল, হজ শেষে তিনি জন্মভূমিতে স্থায়ীভাবে থেকে যাবেন। কিন্তু হজ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি বেলাল হাবাশিকে নির্দেশ দেন জনগণকে একথা জানিয়ে দেয়ার জন্য যে, তারা যেন মদীনার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে। এ সময় হজ করতে আসা প্রায় সবাই আল্লাহর রাসূলের সঙ্গে যাত্রা করে। এমনকি ইয়েমেন থেকে আসা কিছু হাজি যাদের গন্তব্য ছিল উত্তর দিকে তারাও রাসূলের সঙ্গে মদীনার পথে যাত্রা করেন। কুররা আলগামিম এলাকায় যার কাছেই ছিল গাদিরে খোম নামক স্থান সেখানে পৌঁছার পর বিশ্বনবী (সা.) সবাইকে থামতে বলেন। তিনি জনতার উদ্দেশ্যে ভাষণ দেয়ার মনস্থির করে যা থেকে বোঝা যাচ্ছিল তিনি অতি গুরুত্বপূর্ণ কিছু বলতে যাচ্ছেন। মহান আল্লাহ সূরা মায়েদার ৬৭ নম্বর আয়াতে এ সম্পর্কে বলেন: “হে রাসূল,আপনার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে আপনার প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে তা পুরোপুরি পৌঁছে দিন।  আর যদি আপনি তা না করেন,তবে আপনি আপনার রেসালাতের দায়িত্বই পালন করলেন না। আল্লাহ আপনাকে মানুষের (বিপদ) থেকে রক্ষা করবেন।”

এই আয়াত নাজিল হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর ওফাতের পর নিজের স্থলাভিষিক্ত নিযুক্ত করে যাওয়ার ঘোষণা দিতে দৃঢ়সংকল্প হন। ততক্ষণে কাফেলা গাদিরে খোম নামক স্থানে এসে পড়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) যারা আগে চলে গেছে তাদের ফিরে আসতে  এবং যারা এখনো আসেনি তাদের জন্য অপেক্ষা করার নির্দেশ দেন। তাঁর এ নির্দেশ পালন করে সব মুসলমান গাদিরে খোম এলাকায় যার যার বাহন থেকে নেমে আল্লাহর রাসূলের বক্তব্য শোনার অপেক্ষা করতে থাকেন। সাহাবীরা উটের পিঠে ভ্রাম্যমাণ মঞ্চ তৈরি করে দেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) মঞ্চে ওঠেন। এ সময় হযরত আলী (আ.) তাঁর পাশে কিছুটা নীচু স্থানে দাঁড়িয়ে ছিলেন। বিশ্বনবী সংক্ষিপ্ত ভূমিকা বর্ণনা করার পর বলেন: “আমি যার হাতে ধরে উঠাচ্ছি সে ছাড়া আর কেউ পবিত্র কুরআনের রহস্য বর্ণনা করতে ও ব্যাখ্যা দিতে পারবে না।” এরপর তিনি হযরত আলীর হাত তুলে বলেন, ‘মান কুনতু মাওলা ফাহাযা আলিউন মাওলা।’ অর্থাৎ আমি যাদের মাওলা বা অভিভাবক এই আলীও তাদের মাওলা ও অভিভাবক।

রাসূলুল্লাহ (সা.)’র এ ঘোষণা শুনে উপস্থিত জনতা এসে আলী (আ.)কে অভিনন্দন জানাতে থাকে। কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বিজয় বা পরাজয়ে আল্লাহর রাসূলের চেহারা মোবারকে খুব কমই পরিবর্তন আসত। কিন্তু গাদিরে খোমের এ ঘটনার পর তাঁর পবিত্র চেহারায় অদ্ভুত প্রশান্তি ও খুশির আমেজ লক্ষ্য করা যায়। তিনি বলেন, “তোমরা আমাকে অভিনন্দন জানাও। কারণ, আল্লাহ তায়ালা আমাকে নবুওয়াত দান করেছেন এবং আমার আহলে বাইতকে দিয়েছেন ইমামত।”

রাসূলুল্লাহ (সা.) মদীনায় ফিরে আসেন। জিলহজ মাসের বাকি দিনগুলো এবং মহররম ও সফর অতিক্রান্ত হয়ে যায়। এই মহামানবের শরীরে অসুস্থতার লক্ষণগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠতে থাকে। একদিন তিনি মসজিদে উপস্থিত জনতার কাছ থেকে নিজের রেসালাতের দায়িত্ব পালনের ব্যাপারে সাক্ষ্য গ্রহণ করেন। এরপর বলেন, তিনি নিজের অজান্তে যদি কাউকে কষ্ট দিয়ে থাকেন তাহলে সে যেন তা বলে যাতে তিনি তার কাছে ক্ষমা চেয়ে নিতে পারেন। এ সময় এক ব্যক্তি রাসূলের কাছে এসে বলে- আপনি একদিন আপনার উটের পিঠে চাবুক মেরেছিলেন যা ভুলে এসে আমার গায়ে লেগেছিল। একথা শুনে আল্লাহর রাসূল ভীষণ কষ্ট পান। এরপর হাক্কুন নাস বা মানুষের অধিকার লঙ্ঘনের শাস্তির গুরুত্ব তুলে ধরার জন্য তিনি নিজের গায়ের জামা তুলে ধরে ওই ব্যক্তিকে বললেন- নাও সেই চাবুকের বদলে এখন আমাকে চাবুক মারো। এ সময় ওই ব্যক্তি কাছে এসে চাবুকের পরিবর্তে রাসূলে আকরামের পিঠে চুমু খায়।

শেষ পর্যন্ত বিদায়ের সেই কঠিন দিনটি ঘনিয়ে আসে। ভীষণ অসুস্থ রাসূলুল্লাহ (সা.) কখনো চোখ খোলেন আবার বেহুঁশ হয়ে যান। এ সময় আলী (আ.) তাঁর পাশে ছিলেন। শিশু হাসান ও হোসেন অশ্রুসজল নয়নে নানার শরীরের সঙ্গে লেপ্টে ছিলেন। আলী (আ.) নিজের দুই সন্তানকে অসুস্থ নানার কাছ থেকে দূরে সরানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু আল্লাহর রাসূল তাঁকে বাধা দিয়ে বললেন: “প্রিয় আলী আমাকে ওদের শরীরের এবং ওদেরকেও আমার শরীরের ঘ্রাণ নিতে দাও।” এরপর তাঁর শারীরিক অবস্থা আরো শোচনীয় হয়ে ওঠে এবং বেশিরভাগ ঐতিহাসিকের মতে ১১ হিজরির ২৮ সফর বিশ্ব মানবতার মুক্তির দূত আল্লাহ তায়ালার ডাকে সাড়া দিয়ে এই ক্ষণস্থায়ী জীবনের মায়া ত্যাগ করে পরপারে চলে যান।

রাসূলের ওফাতের পর মুহূর্তের অনুভূতি বর্ণনা করতে গিয়ে হযরত আলী (আ.) বলেন: “রাসূলে আকরাম (সা.)’র রেহলাত আমার কাঁধে এত বড় বোঝা চাপিয়ে দেয় যে, মনে হচ্ছিল সে বোঝা পাহাড়ের উপর চাপিয়ে দিলে পাহাড়ও তা বহন করতে পারবে না।” আলী (আ.) অত্যন্ত ব্যথিত মন ও অশ্রুসিক্ত চোখে আল্লাহর রাসূলের দেহ মোবারককে গোসল দেন। তারপর তার পবিত্র চেহারার দিকে তাকিয়ে বলেন, “আপনার ওফাতের সঙ্গে সঙ্গে নবুওয়াত ও রেসালাতের সিলসিলা বন্ধ হয়ে গেল। এর আগে কোনো নবীর মৃত্যুতে এই ধারাবাহিকতা বন্ধ হয়ে যায়নি। আপনি নিজের মানবীয় গুণের বিকাশ ঘটিয়ে এতটা সুউচ্চ মর্যাদা অর্জন করেছেন যে, আল্লাহ তায়ালা স্বয়ং আপনাকে সালাম জানাচ্ছেন। আপনি এতটা মহৎ হৃদয়ের অধিকারী ছিলেন যে, দুনিয়ার সব মানুষকে সমান চোখে দেখতেন। আমার বাবা-মা আপনার জন্য উৎসর্গিত হোক! আপনার আল্লাহর কাছে আমার কথা স্মরণ করবেন এবং আমাকে আপনার বিশেষ দয়া ও ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত করবেন না।”

আলী (আ.) নাহাজুল বালাগায় বলেছেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) আমার বুকে মাথা রাখা অবস্থায় ইন্তেকাল করেন এবং আমার হাতের উপরেই তার জান কবজ হয়। আমার সেই হাত দিয়েই তাঁকে গোসল করাই এবং এ কাজে ফেরেশতাদের সাহায্য পাই। ফেরেশতাদের কান্নার শব্দ যেন আমি শুনতে পাচ্ছিলাম। ফেরেশতাদের একদল জমিনে নেমে আসছিল এবং একদল আসমানে উঠে যাচ্ছিল। রাসূলুল্লাহর দেহ মোবারককে সামনে রেখে ফেরেশতাদের জানাজার নামাজ পড়ার শব্দও আমি শুনতে পাচ্ছিলাম।” হযরত আলী (আ.) রাসূলের পবিত্র দেহ কবরে রাখার সময় অশ্রসজল নয়নে বলছিলেন: “ধৈর্য ধরা সওয়াবের কাজ, কিন্তু আপনার বিরহে আমার ধৈর্য ধরা দুঃসাধ্য হয়ে উঠেছে। অস্থিরতা অপছন্দীয় কাজ, কিন্তু আপনার বিচ্ছেদের অস্থিরতা আমি কিভাবে লুকিয়ে রাখব। আপনি চলে যাওয়ায় অন্তরে যে ব্যথা অনুভব করছি তা প্রশমিত হওয়ার নয়।”

রাসূলুল্লাহ (সা.) মহান আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়েছেন ঠিকই কিন্তু তাঁর অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসল ইসলাম ধর্ম মানব ইতিহাসের মুক্তির সনদ হিসেবে পৃথিবীতে বহাল রয়েছে এবং তা সমহিমায় উজ্জ্বলতা ছড়াবে কাল কিয়ামত পর্যন্ত।  আল্লাহর রাসূলের মহান আন্দোলন অজ্ঞতা ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন একটি সমাজে রহমতের বারিধারা রূপে বর্ষিত হয়েছিল এবং সে সমাজকে পৌঁছে দিয়েছিল উন্নত মানবীয় গুণাবলীর শীর্ষ চূড়ায়। তিনি মানুষকে শিখিয়ে গেছেন কিভাবে তাদের কথা ও আচরণের মাধ্যমে গোত্রীয় ও বর্ণবাদী সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত হয়ে এক আল্লাহর দিকে ধাবিত হতে হয়। প্রিয়নবী (সা.) এমন এক বিশ্বজনীন ধর্ম উপহার দিয়ে গেছেন যা স্থান-কাল-পাত্রভেদে সব যুগের জন্য সমান কার্যকর ও উপযোগী।

তো বন্ধুরা! আজকের আসরের সময় ফুরিয়ে এসেছে। এবার বিদায় নেব। আগামী আসরেও আপনাদের সঙ্গ পাওয়ার আশা রাখছি।#

পার্সটুডে/মুজাহিদুল ইসলাম/ মো: আবু সাঈদ/ ৯

২০১৮-০৬-০৯ ১৬:৫১ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য