সুরা ওয়াক্বিয়া পবিত্র কুরআনের ৫৬ নম্বর সুরা। ৯৬ আয়াতের এ সুরায় সবচেয়ে বেশি বক্তব্য এসেছে কিয়ামত বা পুনরুত্থানের নানা ঘটনা ও দিক সম্পর্কে।

মক্কায় অবতীর্ণ এই সুরার আলোচ্য বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে: কিয়ামত বা পুনরুত্থান শুরু হওয়াসহ কিয়ামতের নানা ঘটনা, কিয়ামতের দিন মানুষের তিনভাগে বিভক্ত হওয়া তথা ডান ও বামের দল এবং নৈকট্য-প্রাপ্তদের দল, নৈকট্য-প্রাপ্তদের ও ডান দিকের দলভুক্তদের মর্যাদা। বেহেশতের নানা নেয়ামত ও পুরস্কার, বাম বা উত্তর দিকের দলভুক্তদের অবস্থা ও দোযখে তাদের মারাত্মক যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি এবং পরকালের নানা যুক্তি ও প্রমাণ বা নিদর্শনও এ সুরার অন্যতম আলোচ্য বিষয়। এ ছাড়াও বীর্য থেকে মানুষের সৃষ্টি হওয়া, জীবনের প্রকাশ হিসেবে গাছপালার অস্তিত্ব, বৃষ্টি বর্ষণ, আগুন জ্বালানোর জ্বালানী হিসেবে গাছপালার ব্যবহার, মৃত্যুর বাস্তবতা ও এক জগত তথা ইহজগত থেকে পরলোকে যাওয়া এবং মু’মিন বা বিশ্বাসী ও কাফিরদের পরিণতি সম্পর্কেও বক্তব্য রয়েছে এই সুরায়।

সুরা ওয়াক্বিয়ার প্রথম ৬ আয়াতে মহান আল্লাহ বলছেন: 'যখন মহাপ্রলয় তথা পুনরুত্থান বা কিয়ামতের ঘটনা ঘটবে,যার বাস্তবতায় কোন সংশয় বা মিথ্যা নেই কখনও। এটা কাউকে নীচু করে দেবে,কাউকে সমুন্নত করে দেবে। যখন প্রবলভাবে প্রকম্পিত হবে পৃথিবী। এবং পর্বতমালা ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যাবে। এরপর তা হয়ে যাবে উৎক্ষিপ্ত তথা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে-পড়া ধূলিকণা।'

কিয়ামত যখন ঘটবে তখন তা এতই প্রকাশ্য ও স্পষ্ট হবে যে কেউই সেদিন তা অস্বীকার করতে পারবে না। কারণ এই মহাপ্রলয় শুরুর প্রাক্কালে এতসব বড়, ভয়ানক ও প্রবল নানা ঘটনা ঘটবে যে তার প্রভাব বিশ্বজগতের সব কিছুতেই স্পষ্ট হবে। সে সময় ঘটবে অত্যন্ত অকল্পনীয় বড় মাত্রার ভূমিকম্প। সেই ভূমিকম্পে পাহাড়গুলো তুলা বা ধুলাবালুর রূপ নেবে। অন্য কথায় কিয়ামত যে কেবল বিশ্বজগতকে পুরোপুরি লন্ডভন্ড করবে তা নয় একইসঙ্গে মানুষও পুরোপুরি বদলে যাবে। তাদের কেউ যাবে নিচে ও কেউ উঠবে ওপরে তথা কারো সম্মানহানি হবে ও কেউবা সম্মানের অধিকারী হবে। সেদিন দাম্ভিক ও জালিমদের পতন ঘটবে এবং দরিদ্র-বঞ্চিত বিশ্বাসী ও সৎকর্মশীলরা সর্বোচ্চ সম্মানের অধিকারী হবেন। একদল পতিত হবে জাহান্নামের গর্তে এবং অন্য দল যাবে বেহেশতের অতি উচ্চ আসনে।

এরপর সুরা ওয়াক্বিয়ার ৭ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলছেন: 'এবং সেদিন তোমরা তথা মানুষেরা তিনভাবে বিভক্ত হয়ে পড়বে।'

প্রথম দলটি হচ্ছে ডানদিকের দল। কারণ এদের আমলনামা ডান হাতে দেয়া হবে। এই ডান হাতে আমলনামা পাওয়ার মানেই হল সৌভাগ্যের নিদর্শন। অর্থাৎ সৎকর্মশীলতা ও ঈমানের রেকর্ডে ভরপুর আমলনামার কারণে তারা বেহেশতবাসী হবে। অন্য কথায় সেদিন আসহাবে ইয়ামিন তথা ডানদিকের লোকেরা হবে সৌভাগ্যবান ও বিজয়ী। এই ব্যক্তিদের আমলনামা দেয়া হবে তাদের ডানহাতে। তারা কতই না সৌভাগ্যবান! তাদের সৌভাগ্য কত যে বেশি তা কল্পনাও করা সম্ভব নয়! এ জন্যই সুরা ওয়াক্বিয়ার ৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে:  যারা ডান দিকে,কত ভাগ্যবান তারা।

এরপর সুরা ওয়াক্বিয়ায় বিচার দিবসের দ্বিতীয় দলটি সম্পর্কে বলা হচ্ছে: তারা হচ্ছে উত্তর বা বাম দিকের দল তথা আসহাবে শিমাল। -এরা হচ্ছে হতভাগ্য ও কুলাঙ্গার শ্রেণী! এরা সেদিন তাদের বাম হাতে তাদের কাজকর্মের রিপোর্ট তথা আমলনামা পাবে। বাম দিকে আমলনামা পাওয়া মানেই হচ্ছে পাপী ও অপরাধী হওয়ার কারণে জাহান্নামি হওয়ার নিদর্শন। এদের সম্পর্কেই সুরা ওয়াক্বিয়ার ৯ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে: এবং যারা বামদিকে,কত হতভাগা তারা।

সুরা ওয়াক্বিয়ার ১১ থেকে ১৪ নম্বর আয়াতে বিচার-দিবসের তৃতীয় দলটির কথা বলা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলছেন: 'অগ্রবর্তীরা তো অগ্রবর্তীই। তারাই নৈকট্যশীল আল্লাহর কাছে, তারা থাকবে নেয়ামতে ভরপুর উদ্যানগুলোয়,তাদের একদল পূর্ববর্তীদের মধ্য থেকে। এবং অল্পসংখ্যক পরবর্তীদের মধ্যে থেকে।'

-অর্থাৎ অগ্রবর্তী দলভুক্তরা যে কেবল ইমানের দিক থেকেই অগ্রগামী তা নয়, তারা নানা ধরনের সৎকাজ, ভালো গুণ ও ভালো নীতি অনুসরণের ক্ষেত্রেও অন্যদের চেয়ে বেশি অগ্রসর। এরাই হচ্ছেন অন্যান্য মানুষের জন্য আদর্শ। তাই তাঁরা স্বাভাবিকভাবেই আল্লাহর দরবারে নৈকট্য পাবেন। আর তাঁরা বেহেশতের উদ্যানগুলোতে অফুরণ্ত বস্তুগত ও আধ্যাত্মিক নেয়ামতের অধিকারী হবেন।

সুরা ওয়াক্বিয়ার ১৫ থেকে ২৬ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহর নৈকট্যপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের জন্য নির্ধারিত বেহেশতি সুখ ও সমৃদ্ধির কিছু চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এ সুরার ১৫ ও ১৬ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলছেন: 'হীরা-জহরত ও স্বর্ণ খচিত সিংহাসন। তারা তাতে হেলান দিয়ে বসবে পরস্পর মুখোমুখি হয়ে।'

-অর্থাৎ আল্লাহর নৈকট্যপ্রাপ্ত মু’মিনরা বেহেশতে থাকবেন অপার সুখ ও প্রেমানন্দের মধ্যে। তাদের প্রেমময় মজলিসের আসনগুলো হবে হীরা-জহরত ও স্বর্ণ খচিত সিংহাসনের। তাদের অপার আনন্দ ও উদ্দীপনার যথাযোগ্য বর্ণনা আসলে কোনো ভাষাতেই প্রকাশ করা সম্ভব নয়। মোট কথা বেহেশতিদের পরস্পরের মুখোমুখি হয়ে বসা ও তাদের দলবদ্ধ সমাবেশ বেহেশতের অন্যতম বড় আনন্দ বা বিনোদনের মাধ্যম।

নৈকট্যপ্রাপ্ত বেহেশতিদের সেবার জন্য তাদের চার পাশে সব সময় উপস্থিত থাকবে চির-কিশোর সুশ্রী গিলমানরা। তাতে থাকবে নানা ধরনের সুদৃশ্য পানপাত্র। পবিত্র ও সুস্বাদু শরাব পরিবেশন করবে তারা। কিন্তু এইসব শরাব কখনও মানুষকে দুনিয়ার মদের মত মাতাল ও বেহুশ করবে না। এইসব শরাব পানের পর তাদের মাথা ব্যথা হওয়া কিংবা মাথা ঘোরা ও উদভ্রান্ত হওয়ার মতো কোনো ধরনের নেতিবাচক প্রভাব বিন্দুমাত্রও ঘটবে না।

এরপর সুরা ওয়াক্বিয়ায় বলা হয়েছে বেহেশতি ফল ও পাখির গোশতের তৈরি খাবারের কথা। মহান আল্লাহ বলছেন: আর (ওইসব কিশোর সেবকরা বেহেশতিদের কাছে পরিবেশনের জন্য ঘুরবে)  তাদের পছন্দমত ফল-মুল নিয়ে,এবং রুচিমাফিক পাখীর মাংস নিয়ে।

এরপর বলা হয়েছে পবিত্র ও সুশ্রী স্ত্রীদের কথা। সুরা ওয়াক্বিয়ার ২২ ও ২৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে:  বেহেশতিদের জন্য তথায় থাকবে আনতনয়না হুরগণ, যারা হল আবরণে রক্ষিত মোতির মত।#

পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/মো: আবু সাঈদ/   ৯

২০১৮-০৬-০৯ ১৮:০৩ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য