কাঁচশিল্প বেশ প্রাচীন একটি শিল্প-ঐতিহ্য। বিশেষ করে ইরানে এই শিল্পের চর্চা বহু আগে থেকেই চলে আসছে।

ইরান হস্তশিল্প সামগ্রীর জন্য খুবই সমৃদ্ধ। বিচিত্র হস্তশিল্প সামগ্রীর একটি হলো কাঁচশিল্প। কাঁচ শিল্পের আবার বিচিত্র দিক রয়েছে। যেমন কাঁচের বিভিন্ন সামগ্রী তৈরি করা একটা দিক। এই ক্ষেত্রে যেসব শিল্পী কাজ করেন তারা কাঁচের গলিত উপাদান দিয়ে বিভিন্ন ডিজাইনের বিচিত্র জিনিসপত্র তৈরি করেন। কাঁচের শো-পিসসহ বিভিন্ন নকশার তৈজস এ পর্যায়ের অন্তর্ভুক্ত। আবার অন্যদিকে তৈরি করা কাঁচপাত্রে রঙের কারুকাজ করাটাও আরেকটি শিল্প। ফুলদানী বা এ জাতীয় বিভিন্ন তৈজসের ওপর অসাধারণ সব রঙীন নকশা কারুকাজ করা এই শ্রেণীর শিল্পীদের কাজ। উভয় শ্রেণীর শিল্পের জন্যই ইরান অত্যন্ত সমৃদ্ধ একটি দেশ।

বলাবাহুল্য বিশ্ববাজারে ইরানের যেসব পণ্য রপ্তানী করা হয় সেসবের মধ্যে এই হস্তশিল্প অন্যতম। বলতে গেলে হস্তশিল্প মানুষের তৈরি শিল্পসামগ্রীর মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী। মানব সভ্যতা কিংবা বলা ভালো এই পৃথিবীতে মানুষের জন্মের সাথে সাথে যে শিল্পটি প্রথম গড়ে উঠেছে তা হস্তশিল্প। শিল্প মানে প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী শিল্প মানুষের উন্নত ও সুউচ্চ আত্মার মহিমাই প্রকাশ করে। মানুষের সাংস্কৃতিক ও সৃজনশীল চিন্তার অবয়ব বা মূর্তিমান রূপ গঠনের আয়না বলা যায় এই শিল্পকে। এই শিল্পের আয়নায় দেখতে পাওয়া যাবে ইতিহাসের ছবি বা চিত্রময় ইতিহাস। এদিক থেকে যে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে তা হলো প্রাচীনকাল থেকে আজ পর্যন্ত হস্তশিল্প মৌলিক ও চলমান একটি শিল্পের মর্যাদায় অভিষিক্ত। আজও তার সেই প্রাচীন ঐশ্বর্য অম্লান রয়েছে। তারই সূত্র ধরে চলমান রয়েছে মানব সংস্কৃতিও।

হস্তশিল্পের স্থান এতো উর্ধ্বে যে তাকে বলা যেতে পারে একটি জাতি ও গোত্রের ঐতিহ্য ও বিশ্বাসের প্রতীক। কারণ হলো একটি শিল্প যখন গড়ে ওঠে তখন তার মাঝে শিল্পীর ব্যক্তিবিশ্বাসের পাশাপাশি সে সময়কার প্রাকৃতিক, সামাজিক, পরিবেশ ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের চিত্রও ফুটে ওঠে। অন্যভাবে বলা যায় যে-কোনো ভৌগোলিক এলাকার হস্তশিল্পের মধ্যেই সেখানকার ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা, মেজাজ, জীবনদৃষ্টি, ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভাবনা এমনকি ওই এলাকার রাজনৈতিক ইতিহাসও ফুটে ওঠে। আজকাল তো হস্তশিল্প সামগ্রী ছাড়া সংস্কৃতি ও জাতীয় পরিচিতি এবং বিভিন্ন গোত্র ও জনগোষ্ঠীর বিশ্বাস ও মূল্যবোধগুলোকে পুনর্নির্মাণ করাই অসম্ভব একটা ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গ্রামীণ ছোট্ট পরিসরে গড়ে ওঠা কিংবা ঘরের ভেতরে তৈরি হওয়া বিশ্বের চারটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্পের একটি হলো হস্তশিল্প। এই শিল্পের জন্য খুব উন্নত প্রযুক্তির প্রয়োজন পড়ে না। এ কারণে খুব বেশি আর্থিক বিনিয়োগেরও দরকার নেই। আর শিল্পীরাও স্থানীয়। তারা সাধারণত উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া এই শিল্পের অভিজ্ঞতা তাদের পরবর্তী প্রজন্মের কাছে বিতরণ করে যান। এভাবেই এই শিল্পের চর্চা হয়ে এসেছে। হস্তশিল্পের উৎস হিসেবে গ্রামের কথা বলেছি। সুতরাং শিল্পের মূল উপাদানগুলোও গ্রামে পাওয়া। যেখানে যে উপাদান সুলভ সেখানে সেই উপাদানকেন্দ্রিক শিল্পই গড়ে ওঠে। সেইসাথে এই শিল্পগুলোর পুরোটা কিংবা কখনো কখনো বেশিরভাগ মৌলিক কাজই হাতের সাহায্যে করা হয়েছে। ওই হাতের কাজে শিল্পীদের নিজস্ব মেধা ও শিল্পনৈপুণ্য ফুটে উঠেছে। আর এই নৈপুণ্যই কল-কারখানায় তৈরি শিল্প সামগ্রী থেকে হস্তশিল্পকে আলাদা মর্যাদা দিয়েছে।

শৈল্পিক এবং ব্যবহারিক-দুদিক থেকে আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্যের কারণে হস্তশিল্পগুলোকে দুটি ভাগে ভাগ করা যায়। একটা হলো হস্তশিল্প যা গড়ে উঠেছে শিল্পীর একান্ত নিজস্ব মেধা ও নৈপুণ্যের প্রয়োগে। অপরটি হলো সেই মেধার সাহায্যে সৃষ্ট শিল্পের বাণিজ্যিক ব্যাপ্তি যা সম্ভব হয়েছে প্রযুক্তির ব্যবহারের সাহায্যে। মেধা ও মনন ভিত্তিক হস্তশিল্প সামগ্রীতে তাই শিল্পীর ব্যক্তি-বিশ্বাস,চিন্তা-চেতনা,মেধা,সংস্কৃতি ইত্যাদির প্রভাব সহজলক্ষ্য। এ কারণে হস্তশিল্পকে প্রায়োগিক শিল্প বলে মনে করা হয়।

 

ইরান একটি সমৃদ্ধ ও প্রাচীন সভ্যতার দেশ। কয়েক হাজার বছরের সভ্যতার ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যাবে ইরান সৃজনশীল শিল্পচর্চার একটি সূতিকাগার। বিশেষ করে সন্দেহাতীতভাবে বলা যায় এ অঞ্চলের হস্তশিল্প ইরানে তো বটেই বিশ্বব্যাপী প্রচলিত শিল্পগুলোর মাঝে খুবই জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা লাভ করেছে। হস্তশিল্প যে ইরানের কত প্রাচীন ঐতিহ্য বহন করছে তা বোঝা যায় বিভিন্ন খননকার্যে উদ্ধারকৃত প্রাচীন হস্তশিল্প। ইরানের বিভিন্ন এলাকায় পুরাতত্ত্ব গবেষকদের খনন কাজের মাধ্যমে যেসব বিরল প্রাচীন হস্তশিল্প সামগ্রী উঠে এসেছে সেগুলো পর্যালোচনা করলেই প্রমাণ হয়ে যায় ইরানের হস্তশিল্প কত প্রাচীনকাল থেকেই সমৃদ্ধ ছিল।

আজারবাইজানের হাসানলুইয়ের টিলা এবং কাশানের সিয়ালক টিলা,শুশ, দমাগনের হেসর টিলা, রেই শহরের চেশমে আলি নামের ফোয়ারা,পোড়া শহর যাবুল ইত্যাদি শহরে কারুকাজ খচিত চমৎকার মৃৎ পাত্রের আবিষ্কার,চমৎকার সিল্কের কাপড় খুঁজে পাওয়া,বিচিত্র রঙের কাঁচের পাত্র এবং তামার তৈজস, চমৎকার সব টাইলস ইত্যাদি প্রাচীনকাল থেকেই শিল্প-সমৃদ্ধির কথা প্রমাণ করে। এসবের বহু নিদর্শন এখন ইরানসহ বিশ্বের বিভিন্ন যাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। এগুলো ইরানের প্রাচীন সভ্যতা ও সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধির কথা নির্বিঘ্নে বলে যায়। #

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/ মো:আবু সাঈদ/  ১০

ট্যাগ

২০১৮-০৬-১০ ১৭:১৮ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য