ভার্চুয়াল জগত: সম্ভাবনা ও শঙ্কা শীর্ষক ধারাবাহিকের আজকের আসরে আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি। বর্তমানে শিশুদের মধ্যেও ইন্টারনেটের ব্যবহার ব্যাপকভাবে বেড়ে যাচ্ছে।

ছয়-সাত বছরের শিশুরাও এখন ইন্টারনেট তথা ভার্চুয়াল জগতে বিচরণ করতে শিখে গেছে। তারা সেখানে নতুন নতুন বন্ধুর খোঁজ করছে। এসব শিশু ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে পারদর্শিতায় বড়দের চেয়ে কোনো দিক দিয়েই পিছিয়ে নেই।

বর্তমানে অভিভাবকদের ভয়ের একটি বড় অংশজুড়ে রয়েছে শিশুদের ইন্টারনেট-প্রীতি। অতীতে বাবা-মা সন্তানের হাতে খেলনা তুলে দিয়ে নিশ্চিন্তে থাকতেন,কিন্তু এখন ইন্টারনেট খেলনার মতো ব্যবহার হলেও পরিস্থিতি পাল্টে গেছে। সন্তানকে ইন্টারনেট ব্যবহারের অনুমতি দিয়ে অভিভাবকদেরকে সব সময় চিন্তায় থাকতে হয়। কারণ ইন্টারনেটের প্রভাবে একটি শিশু ভালো-মন্দ দুই পথেই অগ্রসর হতে পারে। তবে বিভিন্ন পরিসংখ্যান বলছে, আজকের যুগে শিশুদের ইন্টারনেট প্রীতি বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ক্ষতির কারণ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। ইন্টারনেট প্রীতির কারণে বাবা-মায়ের সঙ্গে শিশুদের দূরত্ব বাড়ছে। তারা অনেক ক্ষেত্রে এমন সব বন্ধুর সঙ্গে মিশছে যারা ভুল পথে পরিচালিত হতে উৎসাহ যোগাচ্ছে। ভালো-মন্দ বিবেচনার শক্তি বিকশিত হওয়ার আগেই অনেক শিশু বিপথগামী হচ্ছে।

বর্তমানে প্রতিনিয়ত মানুষের ব্যস্ততা বাড়ছে। অনেক পরিবারে বাবা-মা দু'জনই চাকরি করেন। চাকরির প্রয়োজনে প্রায় সারাদিনই বাইরে থাকছেন। বাইরে থেকে আসার পর সাংসারিক ঝামেলার কারণে অনেকেই সন্তানদের যথেষ্ট সময় দিতে পারেন না। এ সময় অনেক বাবা-মাই শিশুকে ব্যস্ত রাখতে হাতে মোবাইল অথবা কম্পিউটার তুলে দেন। শিশুরাও এ ধরনের ডিভাইস হাতে পেয়ে বিভিন্ন সাইটে ঢুকতে থাকে। এর ফলে অনেক সময়ই তারা এমন সব সাইটে প্রবেশ করে যেগুলো মোটেই শিশুদের জন্য উপযোগী নয়। তবে ইন্টারনেটের ভালো-মন্দ দু'টি দিকই রয়েছে। স্কুলের প্রজেক্ট তৈরি থেকে শুরু করে নিজের পছন্দের কোনো গেম বা সিনেমা ডাউনলোডের জন্যও শিশুরা ইন্টারনেট ব্যবহার করছে। তারা অনেক কিছুই জানতে পারছে। কিন্তু এ কথাও ঠিক যে,জানারও বয়স রয়েছে। অনেক কিছুই রয়েছে যা শিশুকে জানানো কোনোভাবেই ঠিক নয়। যেমন যৌনতা বিষয়ক তথ্য যদি একটি শিশুকে জানতে দেওয়া হয়,তাহলে তা ওই শিশুর জন্য ধ্বংস ডেকে আনতে পারে। কাজেই একটি শিশু যখন নিয়ন্ত্রণহীনভাবে ইন্টারনেট নিয়ে কাজ করে, তখন শুধু এক ক্লিকেই তার সামনে হাজির হয়ে যেতে পারে এমন অনেক ধ্বংসাত্মক তথ্য ও ছবি।

আর এ কারণেই বর্তমানে শিশুদের লালন-পালনের ক্ষেত্রে বাবা-মায়ের চিন্তার ঝুলিতে যুক্ত হয়েছে নতুন বিষয় ইন্টারনেট। সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য,পরিবারের ভালোর জন্য এবং সর্বোপরি দেশের উন্নতির জন্য শিশুর মধ্যে ভালো-খারাপের পার্থক্য করার যোগ্যতার বিকাশ ঘটাতে হবে। বাবা-মাকে প্রথমেই মোবাইলে বা কম্পিউটারে ইন্টারনেট সিকিউরিটি সিস্টেমটি ব্যবহার করতে হবে। শিশু যাতে তার উপযোগী সাইটগুলো পরিদর্শনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারে সে ব্যবস্থা করতে হবে। শিশু চাইলেও যাতে খারাপ কোনো সাইটে যেতে না পারে সেরকম সিকিউরিটি সিস্টেম ব্যবহার করা অত্যন্ত জরুরি। এরপরও যদি শিশু কোনোভাবে অন্যায় কিছু দেখেই ফেলে তবে সেক্ষেত্রে খেয়াল রাখতে হবে, সেটার কোনো প্রয়োগ সে তার জীবনে করছে কি না। বাবা-মাকে অবশ্যই তা পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

শিশুদেরকে তাদের ভুলগুলো সম্পর্কে বোঝাতে হবে। শিশু যাতে নিঃসঙ্গতা বা একাকীত্ব অনুভব না করে সেদিকেও নজর রাখতে হবে। অনেক ক্ষেত্রেই শিশুর একাকীত্ব ঘোচাতে বাবা-মা ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ দেন। কিন্তু এর ফল উল্টোও হতে পারে। একাকীত্ব থেকে মুক্তি পেতে গিয়ে আরও বেশি একা হয়ে পড়তে পারে শিশু। বাস্তব জগতের সঙ্গে তার সম্পর্ক দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। অনেক শিশুই ইন্টারনেট ব্যবহার করে অথবা ভিডিও গেমস খেলতে গিয়ে যন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল হতে থাকে। মনোবিজ্ঞানীদের মতে,যন্ত্রের ওপর বেশি নির্ভরশীলতার অর্থই হলো আশেপাশের মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক দুর্বল হয়ে পড়া। এ কারণে একাকীত্ব ঘোচানোর জন্য ইন্টারনেট ব্যবহার উপযুক্ত পন্থা নয়। উপযুক্ত পন্থা হলো,বাবা-মায়ের পক্ষ থেকে শিশুকে সময় দেওয়া। বাবা-মাকে শিশুদের সঙ্গে মিশতে হবে।  তাদের সঙ্গে কথা বলতে হবে,খেলতে হবে।

শিশুদেরকে বই কিনে দিতে হবে। বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুদের সঙ্গে মিশতে দিতে হবে। তবে মা-বাবার অনুপস্থিতিতে শিশু কার তত্ত্বাবধানে থাকে, কার সঙ্গে মেশে-সেটাও একটা জরুরি বিষয়। শিশুকে অবশ্যই নির্ভরযোগ্য কারো কাছে রাখতে হবে এবং তার বন্ধু নির্বাচনেও সচেতন হতে হবে। বাবা-মাকে শিশুর জায়গায় নেমে এসে,সন্তানের বন্ধু হয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো বোঝাতে হবে। পরিবার ও ধর্মসহ জীবনের জরুরি বিষয়গুলোর গুরুত্ব তুলে ধরতে হবে। পাশাপাশি এটাও বোঝাতে হবে যে, জীবনে চলার পথে অনেক প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হওয়ার আশঙ্কা থাকে। সমাজে যেমন ভালো-মন্দ দুই ধরণের মানুষ রয়েছে তেমনি ভার্চুয়াল জগতেও ভালো-খারাপের উপস্থিতি রয়েছে।

সন্তানের জন্য ইন্টারনেটের ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়া যাবে না,তা সম্ভবও নয়। তবে শিশুকে তার উপযোগী বিষয়গুলো সম্পর্কে ধারণা দিতে হবে। শিশুদের জন্য যেসব ভালো ও শিক্ষণীয় সাইট বা ব্লগ আছে সেসবের সাথে তাকে পরিচয় করিয়ে দিতে হবে। শিশুদের সাথে জড়িত প্রত্যেকটি বিষয়ই সামাল দিতে হবে খুব সতর্কতার সঙ্গে। একটু অসাবধানতা শিশুদের মানসিক বিকাশের পথে ভয়ঙ্কর বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। মনে রাখতে হবে শিশুর যেকোনো পছন্দের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়টি কিছুটা স্পর্শকাতর। এ কারণে এসব ক্ষেত্রে কৌশলী হতে হবে। শিশুরা ইন্টারনেটে কী করছে বা কী দেখছে তা জানার জন্য অভিভাবকদের সারাক্ষণ তাদের পাশে বসে থাকার প্রয়োজন পড়ে না। মোবাইল বা কম্পিউটারে সিকিউরিটি সিস্টেম বসিয়ে দিলেই সমস্যার সমাধান হবে। এর ফলে শিশু চাইলেও খারাপ কোনো সাইটে যেতে পারবে না। তবে নিয়মিত নজর রাখতে হবে, সিকিউরিটি সিস্টেম সত্যিই কাজ করছে কিনা। #

পার্সটুডে/সোহেল আহম্মেদ/মো: আবুসাঈদ/  ১০

২০১৮-০৬-১০ ১৮:০০ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য