• রমজান: খোদাপ্রেমের বসন্ত (পর্ব-২৫)

পবিত্র কুরআনের সুরা বাকারার ১৫৩ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন, হে মুমিনরা, তোমরা ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য চাও। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্য্যশীলদের সাথে রয়েছেন।

রোজার অন্যতম উদ্দেশ্য হল এই ধৈর্য। এ প্রসঙ্গে আমরা কথা বলে আসছি গত কয়েক পর্ব ধরে।

ব্যক্তিগত বা পারিবারিক ক্ষেত্রে ধৈর্যহীনতার ফলে পাপ করা বা দায়িত্ব এড়ানোর ক্ষতির চেয়েও সামাজিক ও বৃহত্তর ক্ষেত্রে পাপের কুফল অনেক বেশি মারাত্মক। একজন মন্ত্রী বা প্রধানমন্ত্রী বা একজন সংসদ সদস্যের ধৈর্যহীনতা বা পাপের কারণে গোটা দেশ ও জাতির মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। সমাজের প্রত্যেক পেশাজীবিকে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে হতে হবে ধৈর্যশীল। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, সাংবাদিক, সরকারি বড় কর্মকর্তা বা ব্যবসায়ী কোনো পেশাজীবি সমিতি বা ইউনিয়নের প্রধান ও রাজনৈতিক নেতা হতে শুরু করে সব শ্রেণীর ব্যক্তিকে এটা মনে রাখতে হবে তার পেশাগত ক্ষেত্রের দায়িত্ব পালনও এক ধরনের ইবাদত যদি তার উদ্দেশ্য হয় আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন ও মহান আল্লাহর সৃষ্টির সেবা তথা দেশ-সেবা বা জনসেবা করা। দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তাদের কখনও ক্লান্ত হওয়া উচিত নয়। একজন বড় কূটনীতিক বা সরকারি কর্মকর্তার লোভ, অথবা অন্যায্য বক্তব্য বা ধৈর্যহীনতা কিংবা অসহিষ্ণু কোনো পদক্ষেপ গোটা দেশ বা সমাজের বিপুল সংখ্যক মানুষের জন্য মারাত্মক ক্ষতি বয়ে আনতে পারে। তাই এসব ক্ষেত্রে ধৈর্য ধারণ অনেক বেশি জরুরি। সামাজিক বিষয়ের বড় কর্মকর্তা, সাংস্কৃতিক নেতৃবৃন্দ, অর্থনৈতিক বিষয়ের নেতৃবৃন্দ ও বড় সামরিক কর্মকর্তা বা পুলিশ-প্রধান ও বড় রাজনীতিবিদদের জন্য ধৈর্যের গুরুত্ব ও পরিধি অত্যন্ত ব্যাপক।

বড় বড় ব্যক্তিত্বদের কোনো কোনো পাপ গোটা বিশ্বকে বা বিশ্বের এক বিশাল অংশকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। কোনো কোনো ধর্মীয় নেতার লোভ বা ভুলের কারণে শত শত বা হাজার হাজার বছর ধরে কিংবা কিয়ামত পর্যন্ত ওই ধর্মের অনুসারীদের প্রজন্মের পর প্রজন্ম কিংবা হাজার হাজার কোটি মানুষ বিভ্রান্তির শিকার হতে পারে। ইহুদি ও খ্রিস্ট ধর্মের বিচ্যুতিই এর বড় দৃষ্টান্ত। তাই এসব ক্ষেত্রে পাপ-বর্জন তথা ধৈর্য ধারণের গুরুত্ব অনেক বেশি জরুরি। অতীতে মুসলিম নেতাদের লোভ আর ধৈর্যহীনতার মত ভুলের কারণে সৃষ্ট মুসলমানদের অনৈক্যের খেসারত হিসেবে বেশিরভাগ মুসলিম দেশ পশ্চিমাদের উপনিবেশে পরিণত হয়েছিল। সেইসব ভুলের খেসারত আজও দিয়ে যাচ্ছে মজলুম মুসলিম উম্মাহ। ফিলিস্তিন, মধ্যপ্রাচ্য, কাশ্মির ও মিয়ানমারে আজও যে রক্তক্ষরণ হচ্ছে তার জন্য মুসলিম নেতাদের ভুল নীতি বা উদাসীনতাও কম দায়ি নয়। আর এসবেরই মূল হল ধৈর্যহীনতা থেকে সৃষ্ট নানা পাপ। শিক্ষা ও জ্ঞান-বিজ্ঞানে মুসলমানদের পিছিয়ে থাকার কারণও ছিল অতীতের মুসলিম নেতৃবৃন্দের দায়িত্ব পালনে অবহেলা, ক্লান্তি ও ধৈর্যহীনতা। মুসলিম বিশ্বের হাতে সবচেয়ে বেশি সম্পদ থাকা সত্ত্বেও তারা জ্বালানী তেলের মত বিশেষ জরুরি আন্তর্জাতিক পণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না এবং মুসলিম বিশ্বের নানা সম্পদ ব্যয় করা হচ্ছে মুসলমানদেরকেই হত্যার কাজে। সৌদি তেলের অর্থ দিয়ে হত্যা করা হচ্ছে বেসামরিক ও নিরপরাধ ইয়েমেনিদেরকে এবং পেট্রো-ডলার দিয়েই পোষা হয়েছে দায়েশ বা আইএসএল ও আলকায়দার মত সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোকে। এই গোষ্ঠীগুলোর কাজ হল মুসলিম দেশগুলোতে নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টি করা যাতে মুসলমানদের প্রথম কিবলার দখলদার ইসরাইল নিরাপদ থাকে!

রমজানে দোয়া ও আল্লাহর কাছে কাকুতি-মিনতিকে অশেষ গুরুত্ব দেয়া উচিত। ইসলামী বর্ণনা অনুযায়ী দোয়া হচ্ছে ইবাদতের সারবস্তু। রোজাও এর ব্যতিক্রম নয়। আল্লাহর দরবারে নিজেকে অতি ক্ষুদ্র ও ম্রিয়মান দাসানুদাসের মত তুলে ধরা হচ্ছে দোয়ার অন্যতম উদ্দেশ্য। চরম দয়া, চরম করুণা, চরম সৌন্দর্য ও চরম কল্যাণের উৎসের কাছে চরম নতজানু হওয়া হচ্ছে প্রকৃত দোয়া। চরম সংকটে পড়া ভীত-বিহ্ববল দাসের কান্না হচ্ছে প্রকৃত দোয়ার মূল অলংকার। তাই বলা হয় আল্লাহর দরবারে মুমিনের বড় বা প্রধান অস্ত্র হচ্ছে কান্না। খোদার দরবারে উপস্থিত হওয়ার জন্য আগেই টেলিফোনে বা অন্য কোনো মাধ্যমে আবেদন পাঠাতে হয় না, দিতে হয় না কোনো ফি, ধরতে হয় না কোনো উকিল এবং নির্ধারণ করতে হয় না বিশেষ সাক্ষাতের জন্য বিশেষ সময়! সব সময় মহান আল্লাহর মহা-দরবার সবার জন্যই খোলা। সরাসরি তাঁর সঙ্গে কথা বলা যায় যে কোনো সময়। এমন করুণাময় আল্লাহ পছন্দ করেন যে বান্দা তাঁর কাছে বেশি বেশি প্রার্থনা করুক।  মহান আল্লাহ এতই শক্তিমান ও সর্বশ্রোতা যে কোটি কোটি মানুষ একই সময়ে বিশ্বের নানা অঞ্চল থেকে নানা আর্জি তুলে ধরা সত্ত্বেও তিনি সবার কথা ও দোয়া তা যে ভাষাতেই করা হোক না কেন শুনতে পান। সবার সমস্যা বা সংকট তিনি একই সময়ে সমাধান করে দিতে পারেন। তিনি কখনও বলেন না যে, আগে একজনের কথা শুনি, পরে তোমার কথা শুনব, আগে অমুকের সংকট সমাধান করি, পরে তোমার সমস্যার সমাধান দেব!    

আলোচনার এ পর্যায়ে আমরা পবিত্র রমজানের ফজিলত সম্পর্কে বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ জনাব মুনির হুসাইন খান বলেছেন, হযরত আমীরুল মুমিনীন আলী (আ.) বলেছেন: অন্তঃকরণের রোযা হচ্ছে জিহ্বার রোযা অপেক্ষা উত্তম এবং জিহ্বার রোযা হচ্ছে পেটের রোযা অপেক্ষা উত্তম।

আমরা কথা বলছিলাম দোয়া প্রসঙ্গে। আল্লাহর কাছে বেশি বেশি দোয়া করতে হবে। তবে দোয়া হতে হবে আন্তরিক দোয়া। দোয়া কবুল হওয়া ও না হওয়ার সঙ্গে যেন আমরা খোদা-প্রেমকে সম্পর্কিত না করি। আল্লাহ কেবল আমাদের নেক বা কল্যাণকর দোয়াগুলোই কবুল করেন। এ ছাড়াও মহান আল্লাহর কাছে চাওয়ার বিষয়ে যেমন কোনো সীমাবদ্ধতা নেই, তেমনি পাওয়ার ক্ষেত্রেও কোনো সীমাবদ্ধতা নেই। কিন্তু প্রশ্ন জাগতে পারে: তাহলে কেনো আমাদের অনেক নেক-বাসনা বা আর্জি পূরণ হয় না? এর জন্য আসলে আমাদের নানা পাপই দায়ী। আমাদের আয়-উপার্জন যদি হালাল না হয় তাহলে কিভাবে আমরা আল্লাহর দরবারে দোয়া কবুল হবে বলে আশা করতে পারি?

পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/মো.আবুসাঈদ/ ১০

২০১৮-০৬-১০ ১৮:২৪ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য