জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী করে সেখানে মার্কিন দূতাবাস স্থানান্তর করার তেমন কোনো প্রতিবাদ মুসলিম উম্মাহর পক্ষ থেকে করা হয় নি এটি অত্যন্ত দুঃখজনক। এটা আমাদের মুসলমানদের অনেক বড় ব্যর্থতা। বিশ্ব কুদস দিবস উপলক্ষে রেডিও তেহরানকে দেয়া সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেছেন কুদস কমিটি বাংলাদেশের সভাপতি অধ্যাপক ড.শাহ কাউসার মুস্তাফা আবুল উলায়ী।

তিনি বলেন, সৌদি আরবের নীরবতা অত্যন্ত দুঃখজনক। মুসলমানদের ব্যাপারে সৌদি আরবের অবস্থান কী তা দেশটির স্পষ্ট করা উচিত।

  • ওআইসির দুদফা সম্মেলনে তেমন কোনো প্রভাব না পড়লেও এ ফোরামের প্রয়োজন আছে।
  • সৌদি আরব নীরব থেকে অনেক বড় ভুল করেছে।
  • ইসরাইল সব সময় মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির চেষ্টা করছে আমাদের ব্যর্থতা হচ্ছে এটি আমরা বুঝতে পারছি না।
  • ইসরাইল কখনও মুসলমানদের বন্ধু নয়।
  • আল কুদসকে প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করে মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।

পুরো সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরা হলো। এটি গ্রহণ ও উপস্থাপনা করেছেন গাজী আবদুর রশীদ।

রেডিও তেহরান:  জনাব অধ্যাপক ড. শাহ কাউসার মুস্তাফা আবুল উলায়ী, ইরানের ইসলামি বিপ্লবের নেতা মরহুম ইমাম খোমেনী (র) রজমান মাসের শেষ শুক্রবারকে আন্তর্জাতিক কুদস দিবস হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন। আজকের প্রেক্ষাপটে কুদস দিবস পালনের যৌক্তিকতা কতটা? 

মসজিদুল আকসা

অধ্যাপক আবুল উলায়ী: আজকের প্রেক্ষাপটে কুদস দিবস পালন অত্যন্ত যুক্তিসঙ্গত বলে মনে করি। ইরানের ইসলামি বিপ্লবের রুপকার মরহুম ইমাম খোমেনী (র) পবিত্র রমজানের শেষ শুক্রবারকে বিশ্ব কুদস দিবস পালনের যে ঘোষণা দিয়েছিলেন তাঁর লক্ষ্য ছিল সমস্ত মুসলিম উম্মাহকে ঐক্যবদ্ধ করা। তাঁর সেই ঘোষণা ছিল অত্যন্ত যৌক্তিক এবং বর্তমানে সেই প্রেক্ষাপটে তাআরো বেশি যুক্তিসঙ্গত হয়েছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী ঘোষণা করে এবং সেখানে তাদের দূতাবাস স্থানান্তর করে মুসলমানদের মূল জায়গায় আঘাত করেছে। আর সেই প্রেক্ষাপটে আল কুদস ঘোষণা মুসলিম উম্মাহর ঐক্যবদ্ধ হওয়ার জন্য অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত। আমি বলব বর্তমান প্রেক্ষাপটে আল কুদসের গুরুত্ব একটুও কমেনি বরং আরো বেড়েছে।

রেডিও তেহরান: কুদস দিবস যেমন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ছড়িয়ে পড়েছে ব্যাপকভাবে তেমনি ইহুদিবাদী ইসরাইলও কুদস দখল প্রক্রিয়া জোরদার করেছে। বোঝাই যাচ্ছে ইসরাইলের মোকাবেলায় মুসলিম দেশগুলো অনেকটা পিছিয়ে। কীভাবে বিশ্লেষণ করবেন বিষয়টিকে?

কুদস দিবসে ইসরাইলি ও মার্কিন পতাকায় আগুন

অধ্যাপক আবুল উলায়ী: দেখুন, মরহুম ইমাম খোমেনী (র) আল কুদস ঘোষণা দিয়েছিলেন, তিনি চেয়েছিলেন এরমাধ্যমে মুসলমানরা ঐক্যবদ্ধ হোক কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা ঐক্যবদ্ধ হতে পারি নি। আমরা যেতে পারি নি সেই জায়গায় বরং আরো পিছিয়ে গেছি। এটা আমাদের মুসলমানদের বড় ব্যর্থতা। বলা চলে কিছু মুসলিম দেশ, নেতৃবৃন্দ এবং সংগঠনগুলোর সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গীর কারণে এমনটি হচ্ছে। তবে এমনটি হতে পারে; তবে তারমধ্যে দিয়ে আমাদের আবার ঐক্যবদ্ধ হতে হবে এবং এগিয়ে যেতে হবে। কিভাবে ঐক্যবদ্ধ হওয়া যায় সে চেষ্টা করতে হবে। আমি ব্যক্তিগতভাবে বিভক্তি পছন্দ করি না। বিভক্তি, সৃষ্টি করে বিভক্তি। ফলে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার জন্য আন্তরিক প্রয়াস চালিয়ে যেতে হবে। মুসলমানদের মধ্যে অনৈক্য সৃষ্টির সর্বাত্মক চেষ্টা ইহুদিবাদী ইসরাইল সবসময় চালিয়ে যাবে। ইহুদিবাদীদের ষড়যন্ত্র হচ্ছে বিভক্তির মাধ্যমে সারা বিশ্বকে শাসন করতে চায়। ফলে মুসলিম উম্মাহকে বিভক্ত করার চেষ্টা ও গবেষণা তাদের সবসময় থাকবে। আমাদের মুসলমানদের এ বিষয়টি বুঝতে হবে। মুসলিম দেশ এবং বিশ্ব মুসলিম নেতৃবৃন্দের এ বিষয়টি উপলব্ধি করা একান্ত প্রয়োজন। মুসলমানদেরকে সংকীর্ণ স্বার্থের উর্ধ্বে উঠে উম্মাহর স্বার্থ দেখতে হবে। আর মুসলিম জাতির স্বার্থসংরক্ষণের জন্য ঐক্যবদ্ধ হওয়া একান্ত দরকার।

ইহুদিবাদীরা ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে মুসলমানদের দুর্বল করার চেষ্টা করছে এবং তারা সেই চেষ্টায় সফল। মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে মুসলিম উম্মাহকে অনেকটা দুর্বল করে ফেলেছে। তাদের সেই ষড়যন্ত্র থেকে মুসলমানদের বেরিয়ে আসতে হবে। সেক্ষেত্রে আল কুদস একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা। আল কুদসের আলোকে- এটিকে প্রতীক হিসেবে নিয়ে ইহুদিদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়ে তাদের ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করতে হবে।

রেডিও তেহরান: গত ৬ ডিসেম্বর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বায়তুল মুকাদ্দাস শহরকে ইহুদিবাদী ইসরাইলের রাজধানী ঘোষণা করার পর মুসলিম বিশ্বের পক্ষ থেকে যেসব ভূমিকা নেয়া দরকার ছিল তা কী নেয়া হয়েছে বলে আপনার মনে হয়?

অধ্যাপক আবুল উলায়ী: না, মোটেই নেয়া হয় নি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষণার পর মুসলিম বিশ্বের পক্ষ থেকে কোনো ভূমিকা গ্রহণ করা হয় নি। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার রাজনৈতিক অবস্থান থেকে কাজ করছেন কিন্তু এর প্রতিক্রিয়ায় মুসলিম উম্মাহ যে কিছু করতে পারে নি সেটা আমাদের দুর্ভাগ্য। আমি মনে করি এটা মুসলিম উম্মাহর চিন্তার ব্যর্থতা এবং সর্বোপরি ঈমানী ব্যর্থতা। তাছাড়া মানবিক যে অন্যায়গুলো ইহুদিবাদী ইসরাইল ও আমেরিকা করছে তার বিরুদ্ধে শক্তিশালী কোনো প্রতিরোধ মুসলমানরা গড়ে তুলতে পারে নি। এটা আমাদের জন্য খুবই দুর্ভাগ্যজনক বিষয়। আমার আহ্বান থাকবে যে ভুল হবার তা হয়েছে এখনও শোধরানোর সময় আছে সবার জন্য। ফলে এখনও এই কুদসকে প্রতীক হিসেবে নিয়ে আমরা ভুলগুলো শোধরানোর চেষ্টা করি এবং ভবিষ্যতে যাতে এধরনের ভুল আর না হয় সেদিকে দৃষ্টি দেয়া উচিত।

রেডিও তেহরান: বায়তুল মুকাদ্দাস শহরকে ইসরাইলের রাজধানী ঘোষণা করা এবং সেখানে মার্কিন দূতাবাস সরিয়ে নেয়ার ঘটনায় ওআইসি দুদফা শীর্ষ সম্মেলন করেছে। এই সম্মেলনের কোনো প্রভাব পড়েছে বলে আপনার মনে হয়? যদি না পড়ে তাহলে এই সংস্থার কার্যকারিতা বা প্রয়োজনীয়তা কী?

ওআইসি সম্মেলন (ফাইল ফটো)

অধ্যাপক আবুল উলায়ী: ওআইসির দুদফা শীর্ষ সম্মেলনের প্রভাব একেবারে পড়ে নি এমনটি আমি মনে করি না। আমি বলব ওআইসি তো দুদফা সম্মেলনে বসেছে। একটা সংস্থা থাকায় তারা বিষয়টি নিয়ে বসতে পেরেছে। সেটাকে আমি একদমই গুরুত্বহীন মনে করি না। মুসলমানদের মূল সমস্যাগুলো নিয়ে ওআইসি তেমন কোনো কাজ করতে পারে নি সে দোষ সংস্থার না। মূল দোষী আমাদের নেতাদের। আমাদের নেতৃবৃন্দের আন্তরিকতা কম। মূল কথা ঈমানী দায়িত্ব কম। নেতারা ঈমানী দায়িত্ব পালন করলে সংস্থা অবশ্যই কার্যকর হবে। তবে হ্যাঁ যতোটা প্রভাব পড়ার কথা ছিল সেভাবে পড়ে নি। আমাদের নেতৃবৃন্দের অপারগতা এর জন্য দায়ী। ওআইসি যথাযথভাবে ভূমিকা না রাখতে পারলেও এ সংস্থার কার্যকারীতা ফুরিয়ে যায় নি। কিভাবে এ সংস্থাকে আরো বেশি শক্তিশালী করা যায় সে ব্যাপারে মুসলিম রাষ্ট্র ও নেতাদের আরো বেশি উদ্যোগী হতে হবে। কূটনৈতিকভাবে ওআইসির উদ্যোগ বাড়াতে হবে। মুসলমানদের জন্য কোনো কিছু করতে হলে ওআইসির মাধ্যমেই নিতে হবে এটি ছাড়া আমাদের আর কোনো ফোরাম নেই।

রেডিও তেহরান:  বায়তুল মুকাদ্দাস শহরকে ইসরাইলের রাজধানী ঘোষণা করা এবং সেখানে মার্কিন দূতাবাস সরিয়ে নেয়ার ঘটনায় ফিলিস্তিনের জনগণ ঠিকই প্রতিবাদ করছেন এবং ইসরাইলের নির্বিচার হত্যাকাণ্ডে বহু মানুষ শহীদ হয়েছেন। কিন্তু আরব বিশ্বের পক্ষ থেকে তেমন কোনো প্রতিবাদ নেই বিশেষ করে সৌদি আরব একেবারেই চুপ। বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখছেন? 

অধ্যাপক আবুল উলায়ী: সৌদি আরবের চুপ থাকার বিষয়টি অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। যেখানে সৌদি বাদশা দাবি করেন তিনি খাদেমুল হারামাইন। ফলে তার তো অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে মুসলমানদের ব্যাপারে। ফিলিস্তিনের বিষয়ে  বিশেষ করে সম্প্রতি জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী ঘোষণা করা, মার্কিন দূতাবাস সেখানে সরিয়ে নেয়া এবং এর প্রতিবাদ করায় ফিলিস্তিনিদের নির্বিচারে হত্যা করার জোরালো এবং সুস্পষ্ট প্রতিবাদ  জানানো উচিত ছিল সৌদি। সেটি সৌদি আরব করে নি। আমি এটাকে অত্যন্ত দুঃখজনক বলব।

তারপরও আমাদের করার কী আছে। আমরা যদি পরস্পরকে ঘৃণা করি তাহলে আরো দুর্বল হয়ে যাব। ফলে সৌদি আরবসহ অন্যান্য দেশের প্রতি আমার আহ্বান থাকবে যারা মার্কিন সিদ্ধান্ত ও ইসরাইলিদের বর্বরোচিত নির্যাতন ও অত্যাচারের প্রতিবাদ করেন নি তাদের এ বিষয়টি উপলব্ধি করা যে ইসরাইল কখনও কোনো মুসলিম দেশের বন্ধু নয়। তারা মুসলিম উম্মাহকে ধ্বংস করতে চায়। ফলে সৌদি আরবসহ যারা মুসলমানদের জন্য ভূমিকা পালন করছেন না তাদের উচিত অবস্থানকে স্পষ্ট করা। মুসলিম উম্মাহর মধ্যে অভ্যন্তরীণ কোনো সমস্যা থাকলে সেটি ভিন্ন বিষয় কিন্তু মুসলমানদের ওপর সরাসরি কোনো আক্রমণ আসে সেসব ব্যাপারে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিরোধ করা। আমি বলব সৌদি আরবসহ কিছু মুসলিম দেশ অনেক বড় ভুল করেছে। সেই ভুল থেকে বেরিয়ে এসে তাদের অবস্থান এখনও সুস্পষ্ট করা উচিত।#

পার্সটুডে/গাজী আবদুর রশীদ/১০
 

ট্যাগ

২০১৮-০৬-১০ ১৯:৪৬ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য