রমজান মাসে দোয়া চর্চার গুরুত্ব সম্পর্কে আমরা কথা বলছিলাম। নবী-রাসুল, বড় বড় মনীষী ও ইমামদের দোয়ার মধ্যে দেখা যায় খোদা-পরিচিতি ও খোদা-প্রেমের নানা জ্ঞান।

সহিফায়ে সাজ্জাদিয়ায় উল্লেখিত নানা দোয়া, দোয়া কুমাইল, মুনাজাতে শাবানিয়া, দোয়ায়ে আরাফা, দোয়ায়ে জওশান কবির, দোয়ায়ে আবু হামজা সুমালি- এসব দোয়া কেবল রমজানের সময় নয় বরং সারা বছরেই পড়া উচিত। এসব দোয়ার অনুবাদ পড়ার পাশাপাশি গভীর অর্থও ভেবে দেখা উচিত। এসব দোয়া খোদাপ্রেম বাড়াতে খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

এসব দোয়া ছাড়াও নিজের মনের নানা আকুতি ও প্রার্থণা আল্লাহর দরবারে নিজ ভাষাতেও জানানো যায়। কারণ মহান আল্লাহ সবার মনের আকুতি ও ভাষা বোঝেন। একজন দাস তার মনিবের কাছে আধ্যাত্মিক বিষয়গুলো ছাড়াও বস্তুগত সব কিছুই চাইতে পারেন এবং তাতে লজ্জারও কিছু নেই। তবে ইমামদের রেখে-যাওয়া দোয়াগুলো সবচেয়ে  সমৃদ্ধ ভাব ও বিষয়বস্তু এবং সুন্দরতম শব্দে সুবিন্যস্ত রয়েছে বলে এসব দোয়ার চর্চা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

বিখ্যাত দোয়া মুনাজাতে শাবানিয়্যা'র একাংশে বলা হয়েছে:

হে আমার ইলাহ্! আপনি যদি আমাকে আমার অপরাধের জন্য পাকড়াও করেন তাহলে আমি আপনার ক্ষমাকে আঁকড়ে ধরব। আপনি যদি আমাকে আমার পাপের কারণে পাকড়াও করেন তাহলে আমি আপনার ক্ষমার উসিলায় আপনাকে আঁকড়ে ধরব। আর আপনি যদি আমাকে জাহান্নামে প্রবেশ করান তাহলে আমি জাহান্নামের অধিবাসীদের কাছে ঘোষণা করছি যে,নিশ্চয়ই আমি আপনাকেই ভালোবাসি।... হে আমার ইলাহ্! আপনার আনুগত্যের ক্ষেত্রে আমার আমল যদি ক্ষুদ্র হয় তাহলে আপনাকে পাওয়ার ক্ষেত্রে আমার আশা বড় হবে। হে আমার ইলাহ্! কিভাবে আমি আপনার কাছে বঞ্চিত হব অথচ দয়া ও মুক্তিপ্রাপ্ত হওয়ার ক্ষেত্রে আপনার মহানুভবতা সম্বন্ধে আমার সুধারণা জন্মেছে?

পবিত্র রমজানের প্রাণ বা হৃদয় হলো শবে কদর। আরবিতে 'কাদর'শব্দটির অর্থ হচ্ছে পরিমাপ। এই রাতে কি পরিমাপ করা হয়? এর উত্তর হল: কতটা সৌভাগ্য বা বরকত বণ্টন করা হবে সারা বছরের জন্য- তাই পরিমাপ করা হয় সৌভাগ্যের এই রাতে। কতটা সৌভাগ্য বা বরকত বরাদ্দ করা হয়? এর উত্তর হল: আপনি যতটা চান ততটাই বরাদ্দ করা হয়। কারণ,এই রাতে যিনি দান করেন তিনি হলেন অফুরন্ত কল্যাণ ও বরকতের অধিকারী অসীম দয়ালু ও দাতা মহান আল্লাহ। কেউ যদি কম চায় তাহলে তো কেউই তাকে বেশি দেয় না। মহান আল্লাহর কাছে কেউ যদি কম চায় তাহলে তা আল্লাহর জন্য এক ধরণের অবমাননাকর বিষয়। ধরুন একজন মহারাজা এক বিশেষ দিনে বলছেন,আজ যে যা চাইবে তাকে তা-ই দেয়া হবে। শত শত বা হাজার হাজার স্বর্ণমুদ্রা ও হীরা-জহরত দেয়া হবে চাওয়া মাত্রই। এ অবস্থায় কেউ যদি বলেন আমাকে কয়টা রূপার মুদ্রা দেন। রাজা তাকে অপমান করা হচ্ছে ভেবে তাড়িয়ে দিতে পারেন প্রাসাদ থেকে অনেক দূরে।

শবে কদরের রাতে কেউ যদি প্রতিজ্ঞা করে,হে আল্লাহ আমি আর মিথ্যা কথা বলবো না,আমি আর গিবত করবো না। তাহলে মহান আল্লাহ তার এই সৎ সিদ্ধান্তের আলোকে তাকে সারা বছর ধরে সম্মান ও মর্যাদা দানের ব্যবস্থা করবেন এবং তার রুটি-রুজিতেও দেবেন বরকত। কেউ যদি এ রাতে সিদ্ধান্ত নেয় যে আমি যথাসম্ভব দরিদ্র ও ইয়াতিমদের সহায়তা করবো এবং দূরে সরে যাওয়া আত্মীয়-স্বজনের খোঁজ-খবর নেব,তাহলে আল্লাহও তাকে এই সট সিদ্ধান্তের আলোকে সারা বছর ধরে নানা পুরস্কার দেবেন। মোট কথা এই রাতে যে যত বেশি ভাল কাজ করার ও পাপাচার বা বদ-অভ্যাস বর্জনের সিদ্ধান্ত নেবে আল্লাহ তাকে ততই বরকত দেবেন গোটা এক বছর ধরে। তবে এ রাতে বড় বড় সৎকর্মের বা মহত কাজের সিদ্ধান্ত নেয়ার পরও যদি কেউ হাত গুটিয়ে বসে থাকে এবং এইসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য বাস্তব কোনো পদক্ষেপ না নেয় তাহলে কাঙ্ক্ষিত পুরস্কার বা উন্নতি তার ভাগ্যে জুটবে না। শবে কদরের রাতে কেউ অতীতের পাপের জন্য ক্ষমা চাইলে আল্লাহ তা ক্ষমা করেন। কিন্তু এরপর আবার পরের দিন থেকে একই বা নতুন নতুন নানা পাপে জড়িয়ে পড়লে বাস্তবে শবে কদর থেকে সে কিছুই অর্জন করতে সক্ষম হল না।  

আলোচনার এ পর্যায়ে আমরা পবিত্র রমজানের ফজিলত সম্পর্কে শুনব বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ জনাব মুনির হুসাইন খানের কিছু বক্তব্য। তিনি শরীরের অঙ্গ – প্রত্যঙ্গের রোযা সম্পর্কে বলেছেন, হযরত ফাতিমা (আঃ) থেকে বর্ণিতঃ যে রোযাদার তার জিহ্বা,কান,চোখ এবং হাত-পাকে (পাপ থেকে) রক্ষা করে না রোযা রেখে তার হবে কী (অর্থাৎ রোযায় তার ফায়দা কী হবে) ....

কৃপণতা খুবই মন্দ স্বভাব। কৃপণতা শুধু অর্থ-সম্পদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য তা নয়। আল্লাহর প্রতি মনোযোগহীনতা ও কৃতজ্ঞতার অভাবও নিকৃষ্ট শ্রেণীর কৃপণতা। হাদিসে এসেছে,যে ব্যক্তি বিনা ওজরে নামাজকে সংক্ষিপ্ত করে সে হচ্ছে সবচেয়ে বড় কৃপণ।

ভেবে দেখুন আমরা হাসি-খেলায় ও টেলিভিশনের নানা তামাশা দেখার পেছনে কত সময় নষ্ট করছি। অথচ নামাজ পড়ার বেলায় অনেক সময় এত দ্রুত রুকু-সিজদা করি যেন এখনই আমার বাস বা ট্রেন মিস হয়ে যাবে!

মহান আল্লাহ আমাদেরকে প্রতিটি ফরজ কাজ,দায়িত্ব ও অধিকার যথাযথভাবে পালনের সুযোগ দিন এবং সেজন্য যথেষ্ট মাত্রায় জ্ঞান অর্জনের তৌফিক দিন এই হোক শবে কদরের অন্যতম প্রধান প্রার্থনা। #

পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/মো.আবুসাঈদ/ ১১

২০১৮-০৬-১১ ১৬:২৩ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য