মদীনায় ইসলামের প্রথম মসজিদ তখন নির্মিত হয়েছিল যখন মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) মুশরিকদের সঙ্গে জিহাদ করছিলেন।

সুতরাং সহজেই অনুমান করা যায়, এই মসজিদে বসেই কাফির-মুশরিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের পরিকল্পনা ও শলাপরামর্শ করা হতো। তারপর থেকে ইসলামের ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে মসজিদকে কমবেশি একই ভূমিকা পালন করতে দেখা যায়। উদাহরণ হিসেবে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী, জালিম ও চুক্তি ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে ইমাম আলী (আ.)-এর জিহাদের কথা উল্লেখ করা যায়। তিনি কুফার মসজিদ থেকে ওই জিহাদ শুরু করেছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত কুফা মসজিদের মধ্যেই তিনি শাহাদাৎবরণ করেন।

 

কারবালার কালজয়ী বিপ্লবের পর হযরত জয়নাব সালামুল্লাহি আলাইহা তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণটি দিয়েছিলেন কুফা মসজিদে। এরপর পাপিষ্ঠ এজিদের উপস্থিতিতে ইমাম সাজ্জাদ (আ.) জনগণের সামনে কারবালার সঠিক ঘটনা তুলে ধরার খুতবাটিও দিয়েছিলেন তৎকালীন শামের মসজিদে। এই দু’টি ভাষণ ছিল কারবালা বিপ্লবেরই অব্যাহত অংশ। এ ছাড়া, হিজরি অষ্টম শতকে উত্তর ইরানে তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ‘সারবেদারান’দের বিপ্লব শুরু হয়েছিল মসজিদে বসে। বিংশ শতাব্দির মাঝামাঝি সময়ে ইরানের তৎকালীন শাসক রেজা খান দেশে নারীদের হিজাব নিষিদ্ধ করে যে ফরমান জারি করেছিলেন তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু হয়েছিল মাশহাদ নগরীর গওহরশাদ মসজিদ থেকে।

ইসলামি ইরানের স্থপতি ইমাম খোমেনী (রহ.) আমেরিকার সমর্থনপুষ্ট রেজা শাহ সরকারের বিরুদ্ধে ইসলামি বিপ্লবের ডাক দিয়েছিলেন কোমের আজম মসজিদ থেকে। ফরাসি উপনিবেশবাদীদের বিরুদ্ধে আলজেরিয়ার জনগণের এবং ব্রিটিশ উপনিবেশবাদীদের বিরুদ্ধে ইরাকি জনগণের স্বাধীনতাকামী আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল মসজিদ থেকেই। এসব উল্লেখযোগ্য ঘটনা থেকে মসজিদের রাজনৈতিক ও সামরিক ভূমিকার সামান্য কিছু অংশ সম্পর্কে অনুমান করা যায়। ইরানের ইসলামি বিপ্লবের দীর্ঘ পরিক্রমায়, বিশেষ করে ইরাকের চাপিয়ে আট বছরের পবিত্র প্রতিরক্ষা যুদ্ধের সময় মসজিদ ছিল জনগণকে উজ্জ্বীবিত রাখার প্রধান ঘাঁটি।  চলতি দশকের গোড়ার দিকে মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার দেশগুলোতে যে ইসলামি জাগরণ সংঘটিত হয় তারও উৎস ছিল মসজিদ।

মসজিদ থেকে শাসকগোষ্ঠী ও কায়েমি স্বার্থবাদীদের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সূত্রপাত হওয়ার কারণে যুগে যুগে শাসকদের রোষাণলে পড়ে বহু মসজিদ ধ্বংস হয়েছে। অনেক মসজিদের স্থাপনা অক্ষুণ্ন রেখে সেগুলোকে ভিন্ন কাজে ব্যবহার করা হয়েছে। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নে কমিউনিস্টদের ৭০ বছরের শাসনামলে এই ঘটনা ঘটেছে অসংখ্যবার। কমিউনিস্ট শাসনামলে জনগণের জীবন থেকে ধর্মকে বিদায় করার রাষ্ট্রীয় প্রচেষ্টা সত্ত্বেও সোভিয়েত ইউনিয়নের বিভিন্ন প্রজাতন্ত্রের মুসলমানরা তাদের ধর্মীয় চেতনা সমুন্নত রেখেছিলেন। ধর্ম পালনের জন্য এসব মুসলমান নিয়মিত মসজিদে যাতায়াত করতেন বলে কমিউনিস্ট শাসকরা বহু মসজিদ ধ্বংস করে। এর ফলে মুসলমানদের অপূরণীয় ক্ষতি হয়। কমিউনিস্টরা ইসলামি স্থাপনা ধ্বংসের পাশাপাশি হাজার হাজার মুসলিম নেতা ও ঈমানদার ব্যক্তিকে হত্যা করে। কিন্তু তারপরও মানুষের মন থেকে ধর্মের আলো নিভিয়ে ফেলা যায়নি। কমিউনিজমের পতনের মাধ্যমে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর মধ্য এশিয়ায় স্বাধীনতা লাভকারী মুসলিম অধ্যুষিত দেশগুলোর মানুষের ধর্মীয় চেতনা দেখে এই সত্য উপলব্ধি করা যায়।

অবশ্য মধ্য এশিয়া ও ককেশীয় অঞ্চলের কোনো কোনো দেশের শাসকদের মধ্যে এখনো ইসলাম বিদ্বেষী চেতনা রয়ে গেছে। উদাহরণ হিসেবে কিছুদিন আগে মুসলিম অধ্যুষিত দেশ আজারবাইজানে মসজিদের মাইকে আজান প্রচার নিষিদ্ধ করার কথা উল্লেখ করা যায়। ওই নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি দেশটির সরকার তরুণ ও যুবকদের মসজিদে নামাজ আদায়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এমনকি আজারবাইজান সরকার সাবেক সোভিয়েত শাসকদের অনুসরণ করে বহু মসজিদও ধ্বংস করে ফেলেছে। বাকু সরকার যেসব বিখ্যাত মসজিদ ধ্বংস করেছে সেগুলোর দু’টি হচ্ছে দেশটির ‘ইয়াসামাল’ এলাকার হযরত মুহাম্মাদ (সা.) মসজিদ এবং ‘গোনশেলি’ এলাকায় অবস্থিত ফাতেমা জাহরা সালামুল্লাহি আলাইহা মসজিদ। এছাড়া, আজারবাইজান সরকার সেদেশের ‘নাখজাওয়ান’ এলাকার অন্যতম বিশাল মসজিদ-  হযরত ফাতেমা জাহরা (সা.) মসজিদটি বন্ধ করে দিয়েছে।

আজারবাইজানের মসজিদের ইতিহাসের সূত্র ধরে আজ আমরা ওই দেশটির একটি মসজিদের সঙ্গে আপনাদের পরিচয় করিয়ে দেব। আজারবাইজানের রাজধানী বাকু থেকে প্রায় ছয় কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে একটি বিশাল জিয়ারতগাহ’র ভেতরে বিবি হেইবাত মসজিদ অবস্থিত। এই জিয়ারতগাহ’র মধ্যেই রয়েছে বিবি হেইবাতের মাজার। ককেশাস অঞ্চলের বেশিরভাগ জিয়ারতের স্থানকে পীর বলা হয়। সেজন্য স্থানীয় লোকজন বিবি হেইবাত মাজারকে ‘পীর বিবি হেইবাত মাজার’ নামে অভিহিত করে। খ্রীস্টিয় ১৩ শতকে তৎকালীন স্থানীয় শাসক শিরওয়ান শাহ এই মসজিদ নির্মাণ করেন। কাস্পিয়ান সাগর তীরবর্তী একটি টিলার উত্তর পাদদেশে মসজিদটির অবস্থান। এই টিলাটি জুড়ে রয়েছে শিয়া মুসলমানদের অসংখ্য পুরনো কবর এবং আজো এসব কবরের উপর স্থাপিত ফলকে ফার্সি, আরবি ও তুর্কি ভাষায় মৃতদের নাম-পরিচয় দেখতে পাওয়া যায়।

যুগে যুগে বিবি হেইবাত মাজার জিয়ারতের জন্য দূরদূরান্ত থেকে সাধারণ মানুষ ছুটে আসতেন এই জিয়ারতগাহে। এমনকি তৎকালীন শাসকরাও এই মাজারকে সম্মান জানাতেন। আজারবাইজান এক সময় ছিল ইরান ভূখণ্ডের অন্তর্গত। ইরানের তৎকালীন সাফাভি শাসকরা বিবি হেইবাত মাজারে প্রচুর দান খয়রাত করেছেন বলে ঐতিহাসিক দলিল থেকে জানা যায়। ইতিহাসে এসেছে, বিবি হেইবাতের অপর নাম ছিল ফাতেমা সোগরা সালামুল্লাহি আলাইহা। তিনি ছিলেন ইমাম রেজা (আ.)’র বোন। তাঁর অপর বোন হযরত মাসুমা সালামুল্লাহি আলাইহার সঙ্গে মদীনা থেকে ইরানের খোরাসান যাওয়ার পথে তাদের কাফেলায় হামলা হয়। হামলায় হযরত মাসুমার চার ভাই নিহত হন। এ অবস্থায় বিবি হেইবাত প্রথমে ইরানের রাশত শহরে এবং সেখান থেকে বর্তমান আজারবাইজানের রাজধানী বাকুর কাছাকাছি ‘শেইখোভ’ গ্রামে চলে যান। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি সেখানেই জীবনযাপন করেন এবং মৃত্যুর পর তাঁর কবরকে কেন্দ্র করে বিবি হেইবাত মাজার, মসজিদ ও জিয়ারতগাহ স্থাপিত হয়। প্রথমদিকে গ্রামের লোকজন বিবি’র কবরের উপর সামিয়ানা টানিয়ে দেয় এবং পরবর্তীতে আস্তে আস্তে মাজারের দান-সদকার অর্থে এখানে বিশাল মাজার কমপ্লেক্স গড়ে ওঠে।

মাজার কমপ্লেক্স ও মসজিদ- এই দু’টি স্থাপনাই চমৎকার ইসলামি স্থাপত্যশৈলিতে নির্মিত হয় যা সে সময়কার যেকোনো জিয়ারতকারীকে মুগ্ধ করত।  কিন্তু দুঃখজনকভাবে কমিউনিস্টরা শাসনক্ষমতা হাতে পাওয়ার পর অন্যান্য ধর্মীয় স্থাপনার মতো বিবি হেইবাত মাজার কমপ্লেক্সও সমাজতন্ত্রীদের রোষাণলে পড়ে। ১৯৩৬ সালে সোভিয়েত স্বৈরশাসক স্টালিনের নির্দেশে এই কমপ্লেক্স ডিনামাইটের বিস্ফোরণ ঘটিয়ে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেয়া হয়। সেইসঙ্গে ধ্বংস করা হয় এখানকার বিশিষ্ট আলেম, ধর্মীয় শিক্ষক এবং মাজারের খাদেমদের কবরগুলিও। এখানে ধ্বংসপ্রাপ্ত যেসব কবরে মরমর পাথরের মতো দামী পাথর স্থাপন করা হয়েছিল ধ্বংস করে দেয়ার পরও সেগুলোর কিছু অংশ অবশিষ্ট ছিল। বর্তমানে বাকুর আর্কিওলজি যাদুঘরে সেই ধ্বংসাবশেষের একাংশ সংরক্ষিত রয়েছে।

স্টালিনের নির্দেশে বিবি হেইবাত মাজার ধ্বংস করে দিয়ে তার উপর যান চলাচলের জন্য সড়ক নির্মাণ করা হয়। কিন্তু রাসূলে খোদা (সা.)’র আহলে বেইতের ভক্ত স্থানীয় লোকজন কখানো ওই সড়ক দিয়ে যাতায়াত করেননি বরং তারা মাজারের স্থানটি চিহ্নিত করে রেখেছেন। ১৯৯০’র দশকের গোড়ার দিকে কমিউনিজমের পতনের পর আহলে বেইত আলাইহিমুস সালামের অনুসারী মুসলমানরা আবার বিবি হেইবাতের মাজার নির্মাণ করেন। সেইসঙ্গে পুনর্নির্মিত হয় বিবি হেইবাত মসজিদ। বর্তমান মসজিদটিতে তিনটি গম্বুজ ও দু’টি সুউচ্চ মিনার রয়েছে। সার্বিকভাবে মসজিদটি তৈরিতে ইরানি নির্মাণশৈলি কাজে লাগানো হলেও আজারবাইজান সরকারের নির্দেশে মিনার দু’টি নির্মিত হয় স্থানীয় প্রকৌশলবিদ্যা অনুযায়ী।

মসজিদের তিনটি গম্বুজেরই ভেতরের অংশে সবুজ ও ফিরোজা রঙের উপর স্বর্ণাক্ষরে কুরআনে কারিমের বিভিন্ন আয়াত লেখা রয়েছে। মসজিদের দক্ষিণ অংশে পুরুষরা নামাজ আদায় করেন এবং এর উত্তর অংশ নির্ধারিত রয়েছে নারীদের নামাজ আদায়ের জন্য। আজারবাইজানের বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রতিদিন এই মাজার জিয়ারত করতে এসে বিবি হেইবাত মসজিদে নামাজ আদায় করেন হাজার হাজার মুসল্লি। সেইসঙ্গে এই ঐতিহাসিক জিয়ারতগাহ সফর করতে মধ্য এশিয়া ও ককেশাস অঞ্চলের বহু মানুষ আজারবাইজান সফর করেন। স্থানীয় লোকজন মসজিদটিকে হযরত ফাতেমা জাহরা মসজিদ নামেও অভিহিত করেন বলে জানা যায়।#

পার্সটুডে/মুজাহিদুল ইসলাম/ মো: আবু সাঈদ/  ১১

ট্যাগ

২০১৮-০৬-১১ ১৭:৪৫ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য