গত পর্বের আলোচনায় আমরা নাসের খসরুর জীবনের নানা ঘটনা সম্পর্কে আলোচনা করেছি। আমরা জেনেছি যে সত্য ও বাস্তবতার স্বরূপ-সন্ধানী নাসের খসরু স্বপ্ন দেখে হজ করতে যান। তিনি তিন বার হজ করেন ও মিশরে ৩ বছর ধরে থাকেন এবং সেখানে ইসমাইলি মতবাদে দীক্ষিত হন।

 খসরু সাত বছরের দীর্ঘ সফর শেষে ইরানে ফিরে এসে আর রাজকীয় চাকরিতে যোগ দেননি। তিনি এ সময় ইসমাইলি মতবাদ প্রচার করতে গিয়ে নানা মহলের ব্যাপক বিরোধিতার শিকার হন  এবং  নির্বাসনে যেতে বাধ্য হন। নির্বাসিত অবস্থায় বদাখশানের ইয়ামগানেই তার বেশিরভাগ বইয়ের লেখা সম্পন্ন হয়। পার্বত্য এ অঞ্চলেই কাটে নাসের খসরুর জীবনের শেষ ১৫ বছর।

তার লেখা একটি অমূল্য ও অমর বই হল ‘সফরনামা বা ভ্রমণ-কাহিনী’।

নাসের খসরুর ‘সফরনামা বা ভ্রমণ-কাহিনী’ হিজরি পঞ্চম শতকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও আকর্ষণীয় বইগুলোর অন্যতম। তার দীর্ঘ সাত বছরের সফরগুলোর অভিজ্ঞতা উঠে এসেছে এ বইয়ে। তিনি মানুষের মুখের কথা বা তথ্যের ভিত্তিতে নানা অঞ্চলের বিভিন্ন দিকের বর্ণনা তুলে ধরেননি, বরং প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই সে যুগের সমাজ, অর্থনীতি ও সংস্কৃতি এবং ভৌগলিক নানা বিষয়ের তথ্য তুলে ধরেছেন। তবে সে যুগের সব বাস্তবতাই তুলে ধরার মত সুযোগ নাসের খসরুর হয়তো ছিল না। বিশেষ করে সালজুক তুর্কি শাসনামলের অস্থির সামাজিক ও চিন্তাগত পরিস্থিতি তুলে ধরা খসরুর জন্য সহজ ছিল না। তাই দেখা যায় এসব বিষয়ে তিনি কেবল কিছু ইঙ্গিতপূর্ণ কথা বলেই খুব দ্রুত বিষয়গুলো এড়িয়ে গেছেন। যেমন, তিনি মার্ভ শহরের বর্ণনা দিতে গিয়ে খুব দ্রুত অন্য প্রসঙ্গে চলে গেছেন। এ থেকেই বোঝা যায় মার্ভের সামাজিক পরিস্থিতির বর্ণনা দিতে আগ্রহী ছিলেন না নাসের খসরু। অথচ তিনি দেইলামিস্তান ও এর শাসকের বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন। কারণ এখানকার শাসক ছিলেন বিশ্বনবী (সা)’র পবিত্র আহলে বাইতের সমর্থক।

কায়রো ও মিশরের বিস্তারিত বর্ণনাও উঠে এসেছে নাসের খসরুর ‘সফরনামা’য়। আর এর পেছনেও তার বিশেষ কোনো উদ্দেশ্য বা পছন্দের দিক সক্রিয় ছিল। এখানকার অনেক বিষয়কে তিনি খুব সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করেছেন।

ভ্রমণকাহিনীতে শহর ও স্থানগুলোর যে বর্ণনা তিনি দিয়েছেন তার এই বইয়ে ভৌগলিক গুরুত্বের দিক থেকে তার গুরুত্ব নজিরবিহীন। খসরুর যুগ থেকে হাজার বছর আগে নির্মিত নানা শহর ও সেখানকার নানা নিদর্শনের চিত্রময় বর্ণনা তিনি এমন বিস্তারিতভাবে দিয়েছেন যে ওই শহরগুলোর পুরো নক্সা বা চিত্র আজও তৈরি করা সম্ভব। বিশেষ করে কায়রো, বাহরাইন বা লাহসা, জমজম কুয়া, সাফা ও মারওয়া পাহাড়, পবিত্র মক্কা ও বায়তুল মুকাদ্দাসের এমনই বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন নাসের খসরু।

নাসের খসরু তার ভ্রমণ কাহিনীতে যখন কোনো শহর বা অঞ্চলের বর্ণনা দিতেন তখন প্রথমেই তার ভৌগলিক নানা দিকের তথ্য দিতেন। যেমন, ওই শহর বা অঞ্চলটির আবহাওয়া, পাহাড়-পর্বত,  সমতল প্রান্তর, নদ-নদী, ঝর্ণা এবং এরপর ওইসব শহর ও গ্রামগুলোর একটি থেকে অন্যটির দূরত্বও তুলে ধরেছেন। এরপর তিনি শহর বা গ্রামগুলোর নানা স্থাপনার বর্ণনা দিয়েছে সফরনামা বইয়ে।

এ ছাড়াও নাসের খসরু কোনো শহর বা গ্রামের বর্ণনা দেয়ার সময় সেখানকার মসজিদ ও বড় বড় ব্যক্তিত্বদের কবর এবং বাজারগুলোর বর্ণনা তুলে ধরেছেন। কোন্ অঞ্চলগুলো জনবহুল বা সমৃদ্ধ, কিংবা উর্বর বা অনুর্বর অথবা কোন্ অঞ্চলগুলো দুর্ভিক্ষের শিকার সেসবের বর্ণনাও উঠে এসেছে নাসের খসরুর সফরনামায়। এইসব অঞ্চলের কৃষিকাজ ও কৃষি-ব্যবস্থা এবং ভূমিকম্পসহ প্রাকৃতিক নানা দুর্যোগের তথ্যও দেখা যায় তার এই বইয়ে।

নাসের খসরু তার সাত বছরের দীর্ঘ সফর শুরু করেছিলেন হিজরি ৪৩৭ সনের ৬ জমাদিউস সানি। তার সফর শুরু হয়েছিল মার্ভ থেকে। ৪৪৪ হিজরির দোসরা জমাদিউস সানিতে শেষ হয় তার ওই সফর। নাসের খসরু তার এই ভ্রমণে প্রায় ১৯ হাজার কিলোমিটার পথ অতিক্রম করেছিলেন। সরাসরি দেখা ও শোনার সুবাদে এই ভ্রমণ তার অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার ও চিন্তা-চেতনাকে সমৃদ্ধ করেছিল। নাসের খসরুর লেখা বেশ স্পষ্ট ও যথাযথ। কোথাও তিনি অতিরঞ্জিত কোনো মন্তব্য বা বক্তব্য রাখেননি।

হিজরি পঞ্চম শতকের প্রথমার্ধের ইসলামী দুনিয়া সম্পর্কে জানার জন্য নাসের খসরুর এই বই খুবই সহায়ক। সে যুগের মুসলমানদের রীতি-নীতি, প্রথা, সংস্কৃতি এবং তাদের শহরগুলোর সমৃদ্ধির মাত্রা সম্পর্কে জানা সম্ভব হয় এই বই পড়ে। নাসের খসরু যেসব অঞ্চল সফর করেছিলেন তার একটা বড় অংশ ছিল সালজুক তুর্কিদের শাসনাধীন। আর কিছু অঞ্চলে ছিল স্থানীয় শাসক। আর সে যুগে মিশর, সিরিয়া ও হেজাজ বা আরব উপদ্বীপ ছিল ইসমাইলি শিয়া মাজহাবে বিশ্বাসী ফাতেমীয় খলিফাদের শাসনাধীন।

নাসের খসরু তার ভ্রমণ-কাহিনীর বর্ণনায় সব জনপদ ও ধ্বংসাবশেষ সম্পর্কে ভারসাম্যপূর্ণ মন্তব্য করেছেন। যেখানেই তিনি শান্তি ও নিরাপত্তা দেখেছেন সেখানকার প্রশংসা করেছেন। আর যেখানেই নিরাপত্তাহীনতা দেখেছেন সেখানকার বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। যেমন, পারস্যের পথগুলোর অশান্তি এবং মক্কা ও মদিনার মাঝামাঝি অঞ্চলে আরবদের লুটপাটের বিষয়ে তিনি অসন্তোষের কথা জানিয়েছেন।

নাসের খসরু যা দেখেছেন তার নিখুঁত ছবি এঁকেছেন যথাযথ শব্দ ব্যবহার করেছেন। বর্ণিল শব্দের তুলিতে ভৌগলিক ও সামাজিক অবস্থার ছবি তুলে ধরার ক্ষেত্রে তিনি দেখিয়েছেন অসাধারণ পারদর্শিতা। তিনি ইরানের ইস্পাহান শহরকে সবচেয়ে সমৃদ্ধ, পূর্ণাঙ্গ ও সুন্দর শহর বলে উল্লেখ করেছেন। ইস্পাহান শহরের বর্ণনা দিতে গিয়ে নাসের খসরু তার সফরনামায় লিখেছেন: 

‘সমতল ভূমিতে গড়ে-ওঠা এই শহরের আবহাওয়া আরামদায়ক। এ শহরের যে কোনো জায়গায় দশগজ মাটি খুঁড়লেই সুপেয় ও ঠাণ্ডা পানি বেরিয়ে আসে। পুরো শহরটি দেয়ালের বেষ্টনী দিয়ে সুরক্ষিত। দুর্গময় শহরের দেয়ালের মাঝে মধ্যে রয়েছে তোরণ ও দুর্গের ওপরের দেয়ালে রয়েছে প্রতিরক্ষার ঢালময় অংশ ও পথ ( তথা কিছু অংশ ফাঁকা ও কিছু অংশ পিলার আকৃতির উঁচু স্থান যাতে সেনারা ওইসব পিলার বা দেয়ালকে ঢাল কিংবা আড়াল হিসেবে ব্যবহার করতে পারে)। এ ছাড়াও এই শহরে রয়েছে নানা নদী, উঁচু ভবন ও একটি অনিন্দ্যসুন্দর জুমা-মসজিদ। এই মসজিদটি রয়েছে শহরের কেন্দ্রস্থলে। প্রামাণ্য তথ্য অনুযায়ী শহরটির চারদিকের দেয়ালের দৈর্ঘ্য মোট সাড়ে তিন ফারসাঙ্গ বা প্রায় ১৪ মাইল। পুরো শহরটাকেই অক্ষত দেখেছি। কোথাও কোনো ধ্বংসাবশেষ দেখিনি।  

আমি এই শহরে অনেক বাজার দেখেছি। এসব বাজারের একটিতে  আমি ২০০ জন মুদ্রা ব্যবসায়ীকে কাজ করতে দেখেছি। এ ছাড়াও এসব বাজারে রয়েছে সুদৃঢ় তোরণ ও দরজা। এই বাজারের ‘কুতারাজ’ নামের একটি গলিতে রয়েছে ৫০টি পরিচ্ছন্ন হোটেল বা সরাইখানা। এর প্রত্যেকটিতে রয়েছে অনেক দোকানদার ও ক্রেতা।  আমি যে কাফেলায় ছিলাম তাতে ১ হাজার ৩০০ খরবার বা প্রায় এক লাখ ত্রিশ হাজার কেজি ওজনের মাল-সামান ছিল। এত জিনিস নিয়ে আমরা শহরে ঢোকার পরও কেউ কোনো আপত্তি করেনি। এই শহরের কোথাও আমরা জায়গার অভাব বা সংকীর্ণতা দেখিনি।’ #

পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবু সাঈদ/ ১১

২০১৮-০৬-১১ ১৮:২৮ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য