জীবনযাপনের ইসলামি পদ্ধতি ও দিক নির্দেশনা বিষয়ক ধারাবাহিক অনুষ্ঠান “আদর্শ জীবনযাপনের" আজকের আসরে আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি।

আমরা গত আসরে কথা রাখা বা অঙ্গীকার রক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি মানবিক গুণ নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করেছি। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন সূরা আলে-ইমরানের ছিয়াত্তর নম্বর আয়াতে অঙ্গীকার রক্ষা করাকে মোত্তাকিনদের পর্যায়ে পৌঁছার উপায় বলে উল্লেখ করেছেন। যারা অঙ্গীকার রক্ষা করার মাধ্যমে ঐশি তাকওয়ার অধিকারী হয়েছে তাদের প্রতি আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ ও ভালোবাসার কথাও ঘোষণা করা হয়েছে। আমরা যেন আল্লাহর এই অনুগ্রহ ধন্য হতে পারি-সেই দোয়া হোক পরস্পরের জন্য।

বন্ধুরা!আজকের আসরে আমরা আরেকটি বিষয় নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করবো। বিষয়টি হলো 'কাজ'। কাজ মানুষের বিচিত্র সমস্যা সমাধানের গুরুত্বপূর্ণ একটি উপায় ও নেপথ্য উপাদান। কাজ করার মাধ্যমে মানুষ শারীরিকভাবে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। মানসিক সুস্থতা এবং শক্তিরও নেপথ্য উপাদান হলো কাজ। মানুষকে শান্তিপূর্ণ ও প্রশান্ত জীবনযাপনের শক্তিও জোগায় কাজ। মানুষের জীবনে বিচিত্র সংকট দেখা দেয়-এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সংকটপূর্ণ অবস্থায় যথার্থ সিদ্ধান্ত নেয়ার শক্তি জোগায় কাজ। এই কাজ বা কর্মস্পৃহাই প্রতিকূল অবস্থার সমূহ চাপ ও বৈরিতা মোকাবেলা করার মানসিক দৃঢ়তা ও শক্তি জোগায়। আজকের আসরে আমরা গুরুত্বপূর্ণ এই বিষয়টি নিয়েই আলোচনা করার চেষ্টা করবো ইনশাআল্লাহ।

জীবন নৈপুণ্য এমন একটি অভিজ্ঞতা যার মাধ্যমে ব্যক্তির আত্মিক ও সামাজিক সক্ষমতা ও শক্তি বেড়ে যায়। ব্যক্তিকে জীবন জটিলতা ও সার্বিক সমস্যা এবং প্রতিকূলতাকে মোকাবেলা করারও শক্তি সামর্থ্য জোগায়। জীবন অভিজ্ঞতা ও ণৈপুণ্য যত বেশি হবে সে তত বেশি এবং ভালোভাবে মানসিক সুস্থতা ও নিজস্ব আচরণকে সুসংহত করতে পারবে। কার্যকর এবং যৌক্তিকভাবে সামনে আসা সমস‍্যাগুলো সমাধান করতে পারবে এবং সামগ্রিকভাবে একটা সন্তোষজনক ও সুখ-শান্তিময় জীবনযাপন করতে পারবে। জীবন অভিজ্ঞতা ও নৈপুণ্য ব্যক্তির সঙ্গতি বা সামঞ্জস্যের শক্তি বৃদ্ধি করে। অভিজ্ঞ যিনি তিনি ব্যক্তিগত এবং সামাজিক জীবনের দায়িত্বগুলো কাঁধে তুলে নিতে দ্বিধা করেন না, সহজেই মেনে নেন। শক্তি সামর্থ্যকে অভিজ্ঞতার আলোকে বাড়াতে পারেন। সেইসঙ্গে সমস্যা সমাধানে অক্ষমতা বা ব্যর্থতা থেকে সৃষ্ট সকল প্রকার ক্ষয়ক্ষতি থেকে মুক্ত থাকতে পারেন।

জীবন নৈপুণ্য ও দক্ষতা সম্পর্কে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা হু'র পক্ষ থেকে যে দশটি বিষয়ের অবতারণা করা হয়েছে সেসবের মধ্যে একটি হলো সমস্যা সমাধানের দক্ষতা। সমস্যা সমাধানের দক্ষতা আমাদেরকে এই সামর্থ্য দেয় যে আমরা আমাদের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও মানসিক ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে নিজস্ব সমস্যাগুলো সমাধানের পদক্ষেপ নিতে পারবো এবং একটা ইতিবাচক ও অনুকূল ফলাফল অর্জন করতে পারবো। প্রকৃতপক্ষে আমাদের জীবনে সাফল্যের পরিমাণ নির্ভর করে আমাদের জীবন অভিজ্ঞতার ওপর। যত বেশি জীবন অভিজ্ঞতা অর্জন করা যাবে তত বেশি সমস্যা সমাধানে সক্ষম হবো আমরা। সুতরাং এই জীবন অভিজ্ঞতা ও নৈপুণ্য দিয়ে আমরা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সমস্যাগুলো সমাধানে সচেষ্ট হতে পারবো।

কাজ মানুষের বিচিত্র সমস্যা সমাধানের গুরুত্বপূর্ণ একটি উপায় ও নেপথ্য উপাদান। কাজ করার মাধ্যমে মানুষ শারীরিকভাবে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। মানসিক সুস্থতা এবং শক্তিরও নেপথ্য উপাদান হলো কাজ। এই কাজ আমাদের জীবনের বিচিত্র চাপ মোকাবেলা করার শক্তি জোগায়। গবেষকরা বলছেন যে বেকারত্বের ব্যাপক কুপ্রভাব মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর পড়ে। মানসিক সুস্থতা বিনষ্টেরও কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে বেকারত্ব। জীবনে দু:খ দারিদ্র্য দূর করে সামাজিক সম্পর্ক ও যোগাযোগ প্রতিষ্ঠায় সহযোগিতা করে কাজ। এছাড়াও কাজ সামাজিক, অর্থনৈতিক বিকাশ ও উন্নয়নেরও কারণ। কাজ করার মাধ্যমে ব্যক্তি নিজেকে সমাজের একটা অংশ বলে অনুভব করতে শেখে এবং অন্যেরও দৃষ্টি আকৃষ্ট হয় কর্মশীল মানুষের ওপর। দায়িত্ব গ্রহণ করা এবং জীবনে শৃঙ্ক্ষলা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা মানসিক চাপ কমানো এবং নিয়ন্ত্রণ করার একটি কার্যকর উপাদান।

ফরাসি গবেষক বিল ডুরান্ট বলেছেন: শারীরিক সুস্থতা নির্ভর করে কাজ করার ওপর। কাজ যুবককে দয়া এবং যোগ্যতা দান করে। সুতরাং দয়া ও যোগ্যতার রহস্য লুকিয়ে আছে কাজের মধ্যে। তাই পেশা বা কাজে যোগ দেওয়াটা মানসিক তুষ্টি ও আনন্দের অর্ধেক।

ইসলামি সংস্কৃতিতে কাজ হলো ইবাদাত। যে বা যারা রুটিরুজির জন্য চেষ্টা করে, শ্রম দেয়, ইসলামে সে বা তারা একজন বেকার আবেদের চেয়ে অনেক বেশি উচ্চ মর্যাদার অধিকারী। অলসতা এবং বেকারত্বকে ক্ষতি ও হীনতার প্রতীক বলে মনে করা হয়। অলসতা, কাজের ব্যাপারে অমনোযোগ, চেষ্টা প্রচেষ্টা করার ক্ষেত্রে নিস্পৃহ মনোভাব ইত্যাদি মানবীয় পূর্ণতায় পৌঁছার পথের প্রতিবন্ধক।

কর্মস্পৃহা ও কর্মতৎপরতা নিয়ে কথা বলছিলাম আমরা। কাজের বিচিত্র গুণাগুণ রয়েছে। কর্মতৎপরতা মানুষকে বহু ধরনের রোগ-ব্যাধি থেকে এমনকি মানসিক ও নৈতিক রোগ থেকেও রক্ষা করে। এ কারণে যারা শারীরিক সুস্থতা প্রত্যাশা করে তাদের জন্য প্রধান প্রেসক্রিফশনই হলো কাজ অর্থাৎ দৈহিক শ্রম ও কর্মতৎপরতা। আলি (আ) বলেছেন: যে কাজ করে তার শক্তিও বৃদ্ধি পায়। আর যে কাজ করা থেকে নিজেকে দূরে রাখে তার আলসেমি বেড়ে যায়। পবিত্র কুরআনের বক্তব্য অনুযায়ী মানুষের ব্যক্তিত্ব ও সক্ষমতা নিশ্চিত করে কাজ। আর ব্যক্তি যে চেষ্টা প্রচেষ্টা চালায় তার ফলও ভোগ করে।

কুরআনের একটি আয়াতের উদ্ধৃতি দিয়ে পরিসমাপ্তি টানবো আজকের আসরের। পবিত্র কুরআনের সূরা আন-নাজমের ৩৮ ও ৪০ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে: “মানুষ যে চেষ্টা সাধনা করে তা ছাড়া তার আর কিছুই প্রাপ্য নেই। তার চেষ্টা-সাধনা অচিরেই মূল্যায়ণ করা হবে"।#

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/মো:আবুসাঈদ/  ১২

ট্যাগ

২০১৮-০৬-১২ ১৬:৪২ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য