পবিত্র রমজানে দোয়ার গুরুত্ব সম্পর্কে আমরা কথা বলেছি গত কয়েক পর্বে। দোয়া মানে মহান আল্লাহর সামনে নিজেকে অতি তুচ্ছ, হীন ও দুর্বল তথা ম্রিয়মান দাসানুদাস হিসেবে তুলে ধরা।

দোয়া মহান আল্লাহর মোকাবেলায় ইবাদত তথা দাসত্বের চেতনাকে প্রখর করে। আর এভাবে নিজের অহংবোধকে তথা আমিত্বকে দমন করা রোজার অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য। বিশ্বে যত অশান্তি, যুদ্ধ-বিগ্রহ ও অন্যের অধিকার ক্ষুন্ন করা-এসবের কারণ হচ্ছে নিজেকে বড় করে দেখা তথা আমিত্বের উদ্ধত প্রকাশ। ফেরাউন, নমরুদ, ইয়াজিদ ও সিমার-এরা হচ্ছে তাগুতি শক্তি তথা খোদাদ্রোহী শক্তির বড় ধরনের প্রকাশ যার উৎস হল আমিত্ব বা নিজেকে বড় করে দেখা।
 কিন্তু সাধারণ মানুষ বা সাধারণ মুসলমানের মধ্যেও বিরাজ করতে পারে ছোট ছোট ফেরাউন, ক্ষুদ্র নমরুদ, ক্ষুদ্র ইয়াজিদ বা ক্ষুদে সীমারদের আমিত্ববোধের আত্মা বা ছোট ছোট প্রভুত্বের দাবীদার মূর্তি। এইসব ক্ষুদে ফেরাউন অন্যদের অধিকার ক্ষুন্ন করছে কিংবা ক্ষতি করছে আশপাশের ব্যক্তি বা প্রাকৃতিক পরিবেশের। আল্লাহর দরবারে নিয়মিত দোয়া করা ও নিজেকে বিনম্র করা এইসব ক্ষুদে আমিত্ব ও ক্ষুদে প্রভুত্বকে দমনের জন্য সহায়ক।  

কুফার মসজিদে উচ্চারিত হযরত আলীর দোয়া আল্লাহর প্রতি বিনম্র দোয়ার দৃষ্টান্ত। তিনি বলছেন:  ‘হে আল্লাহ্! আমি আপনার কাছে ঐ দিনের নিরাপত্তা চাচ্ছি যেদিন ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি কোন কাজে আসবে না, তবে যে ব্যক্তি বিশুদ্ধচিত্তে আল্লাহর দিকে এসেছে তার ক্ষেত্র ছাড়া। ঐ দিনের নিরাপত্তা চাচ্ছি যেদিন জালেম তার দুই হাত কামড়িয়ে বলতে থাকবে। হায়! যদি আমি রাসূল (সা.)-এর পথ অবলম্বন করতাম। ঐ দিনের নিরাপত্তা চাচ্ছি যেদিন অপরাধীরা শনাক্ত হবে তাদের চেহারার মাধ্যমে। অতঃপর তাদের পা এবং মাথার চুল মুঠি করে ধরে পাকড়াও করা হবে। ঐ দিনের নিরাপত্তা চাচ্ছি যেদিন পিতা তার সন্তানকে কোন প্রতিদান দেবে না এবং কোন সন্তানও পিতাকে কোন প্রতিদান দেবে না। নিশ্চয়ই আল্লাহর ওয়াদা সত্য। আমি আপনার কাছে ঐ দিনের নিরাপত্তা চাচ্ছি যেদিন জালেমদের অজুহাত তাদের কোন কাজে আসবে না- তাদের জন্য অভিশাপ এবং রয়েছে নিকৃষ্ট আবাসস্থল। ঐ দিনের নিরাপত্তা চাচ্ছি যেদিন কোন সত্তাই অপর কোন সত্তার কোন কিছুরই অধিকারী হবে না। সেদিন সব বিষয় কেবল মহান আল্লাহর। আমি আপনার কাছে ঐ দিনের নিরাপত্তা চাচ্ছি যেদিন মানুষ তার ভাই, মা, বাবা, স্ত্রী এবং সন্তানদের থেকে পালিয়ে বেড়াবে। ...

আলী (আ) তাঁর কান্নাসিক্ত ওই দোয়ায় আরও বলছেন,  হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে ঐ দিনের নিরাপত্তা চাচ্ছি যেদিন অপরাধী তার নিজ সন্তান-সন্ততি, ভাই এবং তাকে আশ্রয়দানকারী গোত্র ও পৃথিবীর সব অধিবাসীর বিনিময়ে জাহান্নামের শাস্তি থেকে বাঁচতে এবং নিজেকে উদ্ধার করতে চাইবে। কখনোই নয়। নিশ্চয়ই এটা জাহান্নামের আগুন। এটা এমন এক প্রজ্বলিত আগুন যা মাংসকে পোড়ানোর জন্য ধাবিত হয়। প্রভু! হে প্রভু! আপনি প্রভু, আমি দাস। দাসের উপর প্রভু ছাড়া আর কে দয়া করবে? প্রভু! হে প্রভু! আপনি অধিপতি, আমি অধীন। অধীনের উপর অধিপতি ছাড়া আর কে দয়া করবে? প্রভু! হে প্রভু! আপনি পরাক্রমশালী, আমি হীন-নীচ। হীন-নীচের উপর পরাক্রমশালী ছাড়া আর কে দয়া করবে? অনুরূপ প্রভু! হে প্রভু! সৃষ্টের উপর স্রষ্টা ছাড়া আর কে দয়া করবে? অপাঙ্ক্তেয়, মূল্যহীনের উপর মহান ছাড়া আর কে দয়া করবে? দুর্বলের উপর সবল ছাড়া আর কে দয়া করবে? দরিদ্রের উপর ধনী ছাড়া আর কে দয়া করবে? 

এ মুনাজাতে আলী (আ.) আরও বলছেন: প্রভু! হে প্রভু! আপনি দাতা, আমি প্রার্থনাকারী। প্রার্থনাকারীর উপর দাতা ছাড়া আর কে দয়া করবে? অনুরূপ...মৃতের উপর চিরঞ্জীব ছাড়া আর কে দয়া করবে? ক্ষণস্থায়ীর উপর চিরস্থায়ী ছাড়া আর কে দয়া করবে? রিজিকগ্রহীতার উপর রিজিকদাতা ছাড়া আর কে দয়া করবে? কৃপণের উপর দানশীল ছাড়া আর কে দয়া করবে? 
রোগগ্রস্তের উপর আরোগ্যদানকারী ছাড়া আর কে দয়া করবে? ক্ষুদ্রের উপর বৃহৎ ছাড়া আর কে দয়া করবে? পথভ্রষ্টের উপর সুপথ প্রদর্শনকারী ছাড়া আর কে দয়া করবে? দয়াপ্রাপ্তের উপর দয়ালু ছাড়া আর কে দয়া করবে?

.....' প্রভু! হে প্রভু! আপনি গৌরবান্বিত, আমি নতজানু। নতজানুর উপর গৌরবান্বিত ছাড়া আর কে দয়া করবে? প্রভু! হে প্রভু! আপনার রহমতের মাধ্যমে এবং আপনার দান, মহানুভবতা এবং কৃপার মাধ্যমে আমার উপর দয়া করুন। আমার উপর সন্তুষ্ট হোন, হে দাতা, দয়ালু এবং অবারিত দানশীল ও অনুগ্রহকারী সত্তা! আপনার রহমতের মাধ্যমে, হে সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু!' 

ভাইবোনেরা, আলোচনার এ পর্যায়ে আমরা পবিত্র রমজানের ফজিলত সম্পর্কে শুনব বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ জনাব মুনির হুসাইন খানের কিছু বক্তব্য। তিনি বলেছেন, অপূর্ণাঙ্গ ও অসম্পূর্ণ রোযাঃ ইমাম বাকির (আঃ) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি ইমাম (আঃ) কে অমান্য করে তার রোযা হবে না, মনিবের কাছে ফিরে না আসা পর্যন্ত পলাতক দাসের রোযা হবে না, তওবা না করা পর্যন্ত স্বামীর অবাধ্য স্ত্রীর রোযা হবে না, পিতা-মাতার প্রতি বাধ্য না হওয়া পর্যন্ত অবাধ্য সন্তানের রোযা হবে না।

বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) বলেছেন,: সেই ব্যক্তি অভিশপ্ত যে নিজের রুজির ভার অন্যের ওপর ন্যস্ত করেছে।
তিনি আরও   বলেছেন : ইবাদতের সাতটি অঙ্গ। তন্মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ হলো হালাল রুজি অর্জন করা। 

পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/মো.আবুসাঈদ/ ১২

২০১৮-০৬-১২ ১৮:১৩ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য