মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনের সুরা বাকারার ১৮৬ নম্বর আয়াতে বলেছেন: আর আমার বান্দারা যখন তোমার কাছে জিজ্ঞেস করে আমার ব্যাপারে তখন তাদের বলুন: সুনিশ্চিতভাবেই আমি তো তাদের কাছে রয়েছি।

যারা প্রার্থনা করে, তাদের প্রার্থনা কবুল করে নেই, যখন আমার কাছে প্রার্থনা করে। কাজেই আমার ডাকে সাড়া দেয়া বা হুকুম মান্য করা এবং আমার প্রতি নিঃসংশয়ে বিশ্বাস করা তাদের একান্ত কর্তব্য। যাতে তারা সৎপথে আসতে পারে। -পবিত্র কুরআনের এ আয়াত মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করা ও সাহায্য চাওয়ার গুরুত্ব তুলে ধরছে। মহান আল্লাহ আমাদের এমন কোনো চাহিদা নেই যার কথা তিনি জানেন না। আমাদের সব সমস্যা সম্পর্কে তিনি জানেন। তবুও তিনি বান্দাহ'র প্রার্থনা শুনতে ভালবাসেন। মানুষ প্রতিটি পদে পদে নানা চাহিদা ও সংকটের শিকার হতে পারে। যে কোনো সময় আমরা যে কোনো কঠিন বিপদ বা সমস্যার শিকার হতে পারি। হঠাৎ শরীরের কোনো অঙ্গের একটি রগ অকার্যকর হয়ে পড়লে গোটা শরীর বা ওই অঙ্গটি অচল হয়ে পড়তে পারে। মহান আল্লাহ যে আমাদের  চোখ, কান, হাত ও পা-এসব সুস্থ রেখেছেন সে জন্য সব সময় কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা উচিত এবং আমাদের শরীরসহ সব কিছুই সুস্থ রাখার জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করা জরুরি।
 

সামাজিক, সাংস্কৃতিক, আত্মিক, ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক ইত্যাদি যে কোনো বিষয়ে প্রার্থনা বা দোয়া হতে হবে হৃদয়ের গভীর থেকে উত্থিত। গভীর আকুতি প্রকাশ বা মহান আল্লাহর দরবারে কাকুতি-মিনতি না করে এবং মনকে অন্যদিকে নিবিষ্ট করে কোনো কিছু চাইলে তা মহান আল্লাহ'র কাছে গ্রহণযোগ্য হয় না। 

ইসলামী বর্ণনায় এসেছে: দোয়া হল শ্রেষ্ঠ ইবাদত। মুমিনের অস্ত্র হল দোয়া। দিন রাত মহান আল্লাহর কাছে বেশি বেশি চাওয়া বা দোয়া করার পরামর্শ দেয়া হয়েছে বিশ্বনবী (সা)কে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে। আমরা যেসব বিপদের শিকার হই ও যেসব বিপদ ভবিষ্যতে আসতে পারে তা দূর করা যায় দোয়ার মাধ্যমে। কিন্তু দোয়া না করলে এসব বিপদের মোকাবেলা করা বা বিপদ দূর করা সম্ভব হয় না। করুণাময় আল্লাহ বলেছেন, তোমরা আমার কাছে চাও, আমি তোমাদের প্রার্থনার জবাব দেব। কিন্তু দোয়া হতে হবে যৌক্তিক বা বাস্তবায়নযোগ্য। যদি আমরা এমন দোয়া করি যে হে আল্লাহ আমি যেন বিশ্বের কারো কাছেই কোনো ব্যাপারে মুখাপেক্ষী না থাকি- এমন দোয়া বাস্তবায়নযোগ্য নয়। এ ধরনের দাবি বা দোয়া মহান আল্লাহর সুন্নাত ও কার্যকারণ  বিধির খেলাপ। বরং এই বলে দোয়া করা উচিত যে, হে আল্লাহ! আমাকে মন্দ লোকদের মুখাপেক্ষী করবেন না।
 
দোয়ার মানে ঘরে বসে সব কিছু আল্লাহর ওপর ছেড়ে দেয়া নয়। যেমন, বিয়ে না করেই সন্তান চাওয়া অর্থহীন। অনুরূপভাবে বস্তুগত কিছু পেতে চাইলে তার উপায়-উপকরণ সংগ্রহের জন্য সচেষ্ট হতে হবে দোয়ার পাশাপাশি। এখানে দোয়ার অর্থ হল মহান আল্লাহ যেন আমার এই বাসনা পূরণের পথে যা যা দরকার তা পাওয়া সহজ করে দেন। আপনি কারো কাছে টাকা ধার দিয়ে বিপদে পড়েছেন। এক্ষেত্রে দোয়া করলে আল্লাহ দেনাদারের মনে পাওনাদারের কাছে টাকা ফেরত দেয়ার দায়িত্ববোধ বা সচেতনতা সৃষ্টি করবেন। অবশ্য কখনও কখনও দোয়ার মাধ্যমে অলৌকিক কিছু ঘটানোও সম্ভব। তবে তা খুবই ব্যতিক্রমী বিষয়। সাধারণত দোয়ার মাধ্যমে কোনো চাহিদা বা সমস্যা সমাধানের উপায়গুলো সংগ্রহের পথ আল্লাহর পক্ষ থেকে সহজ করা হয়। কোনো চেষ্টা-প্রচেষ্টায় অংশ না নিয়ে কেবল আল্লাহর কাছে দোয়ার মাধ্যমে ওমুক সংকট বা সমস্যা সমাধানের আশা করা যৌক্তিক নয়। কারণ এভাবে কোনো আশা পূরণ করা মহান আল্লাহর সাধারণ রীতি বা বিধানের খেলাপ। অর্থাৎ দোয়ার পাশাপাশি চেষ্টাও চালাতে হবে। দোয়া মানুষের চেষ্টাকে সাফল্যের তীরে পৌঁছে দেয়। দোয়াবিহীন প্রচেষ্টা প্রায়ই সফল হয় না। 

কোনো বিষয়কে বাস্তবায়ন করা খুব বড় কাজ বা কঠিন মনে করে দোয়া হতে বিরত থাকা উচিত নয়। আমরা যদি বলি যে হে আল্লাহ! শুধু বাংলাদেশের মুসলমানদের দারিদ্র দূর করুন!– আল্লাহ কি সারা বিশ্বের মুসলমানদের ও সারা বিশ্বের সব মানুষের দারিদ্র দূর করতে সক্ষম নন? অবশ্য দুনিয়া-পূজার চিন্তা থেকে উদ্ভুত মনের উচ্চাভিলাষী ও উদ্ধত চিন্তা-প্রসূত আশাগুলো যেন আমরা বিসর্জন দেই – মহান আল্লাহর কাছে সে দোয়া করা উচিত।

 আবার আমরা অনেক সময় খুব ক্ষুদ্র জিনিষ আল্লাহর কাছে চাইতে লজ্জা করি। এটাও ঠিক নয়। একটা ছোট্ট বোতাম বা জুতার ফিতা সংগ্রহের জন্যও আল্লাহর কাছে দোয়া করা উচিত। ক্ষুদ্র জিনিষের ক্ষেত্রেও যেন আমাদের মধ্যে আল্লাহর মুখাপেক্ষীতার কথা মনে থাকে। তাই সেসবও চাওয়া উচিত। ক্ষুদ্র কোনো বিষয়েও যেন আমাদের মধ্যে অহংকার বা আমিত্ববোধের কোনো স্থান না থাকে।  

ভাইবোনেরা, আলোচনার এ পর্যায়ে আমরা পবিত্র রমজানের ফজিলত সম্পর্কে শুনব বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ জনাব মুনির হুসাইন খানের কিছু বক্তব্য। তিনি বলেছেন, রোজাদারের মর্যাদা। মহানবী (সা) বলেছেন, রোজাদারের দু'টি আনন্দ রয়েছে। এক. যখন সে ইফতার করে ও দুই. তখনকার আনন্দ যখন কিয়ামত দিবসে আহ্বানকারী ডেকে বলতে থাকবে: কোথায় সেই তৃষ্ণার্ত যকৃতের অধিকারীরা তথা রোজাদাররা! আমার মর্যাদার শপথ! আমি আজ তাদের পিপাসা নিবৃত্ত করব। 

এবারে শুনুন বিশ্বনবী (সা.)'র দৃষ্টিতে ৬ লাখ উপদেশ-বাণীর সারাংশ: মহানবী (সা.) আমিরুল মু’মিনিন হযরত আলী (আ.)-কে বলেছেন: হে আলী! তুমি কি ছয় লাখ ভেড়া চাও? ছয় লাখ দিনার চাও? না ছয় লাখ অমূল্য উপদেশ বাণীর বাক্য চাও? আলী (আ.) শেষোক্ত প্রস্তাবে সায় দিলেন। মহানবী (সা.) বললেন, যদি ছয় লাখ বাক্য চাও তাহলে তার সারাংশ এই ছয়টি বাক্যে পাবে: ১. যখন দেখবে যে লোকেরা নফল বা মুস্তাহাব ও নানা গুণ চর্চা নিয়ে ব্যস্ত তুমি তখন ফরজ বা ওয়াজিব কাজ বা দায়িত্বগুলোকে পরিপূর্ণ করা নিয়ে ব্যস্ত থাক।২. যখন দেখবে যে লোকেরা দুনিয়া (যেমন, বাড়িঘর, বাহন ইত্যাদি) নিয়ে ব্যস্ত, তখন তুমি পরকাল নিয়ে ব্যস্ত হবে। ৩. যখন দেখবে যে লোকেরা অন্যের দোষ-ত্রুটি নিয়ে সমালোচনায় ব্যস্ত তখন তুমি তোমার নিজের দোষ-ত্রুটি সংশোধন সম্পর্কে সক্রিয় হবে। ৪.যখন দেখবে যে লোকেরা দুনিয়াকে (বাড়িঘর,বাহন. ঘরের আসবাবপত্র ইত্যাদিকে) সুসজ্জিত করছে (অপ্রয়োজনীয় বিলাস সামগ্রী কিনছে), তখন তুমি তোমার পরকালকে সুসজ্জিত করা নিয়ে ব্যস্ত হবে। ৫. যখন দেখবে যে লোকেরা বেশি বেশি ইবাদত করছে তখন তুমি তোমার ইবাদতকে খালেস বা একনিষ্ঠ করা নিয়ে সক্রিয় হবে। ৬. যখন দেখবে যে লোকেরা সৃষ্টির আশ্রয় নিচ্ছে, তখন তুমি স্রস্টার আশ্রয় নেবে।#

 

পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/মো.আবুসাঈদ/ ১৩

২০১৮-০৬-১৩ ১৭:০৫ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য