কুরআনের আলো অনুষ্ঠানের আজকের পর্বে সূরা আল আহযাবের ১৮ থেকে ২১ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যা তুলে ধরা হবে। এই সূরার ১৮ ও ১৯ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন,

 قَدْ يَعْلَمُ اللَّهُ الْمُعَوِّقِينَ مِنْكُمْ وَالْقَائِلِينَ لِإِخْوَانِهِمْ هَلُمَّ إِلَيْنَا وَلَا يَأْتُونَ الْبَأْسَ إِلَّا قَلِيلًا (18) أَشِحَّةً عَلَيْكُمْ فَإِذَا جَاءَ الْخَوْفُ رَأَيْتَهُمْ يَنْظُرُونَ إِلَيْكَ تَدُورُ أَعْيُنُهُمْ كَالَّذِي يُغْشَى عَلَيْهِ مِنَ الْمَوْتِ فَإِذَا ذَهَبَ الْخَوْفُ سَلَقُوكُمْ بِأَلْسِنَةٍ حِدَادٍ أَشِحَّةً عَلَى الْخَيْرِ أُولَئِكَ لَمْ يُؤْمِنُوا فَأَحْبَطَ اللَّهُ أَعْمَالَهُمْ وَكَانَ ذَلِكَ عَلَى اللَّهِ يَسِيرًا (19)

“আল্লাহ ভালো করে জানেন তোমাদের মধ্যে কারা মানুষকে (যুদ্ধ করতে) বাধা দেয় এবং কারা তাদের ভাইদেরকে বলে, আমাদের কাছে এস (এবং যুদ্ধ করো না)। তারা কমই যুদ্ধ করে।” (৩৩:১৮)

“তারা তোমাদের প্রতি কৃপণতা করে। যখন (যুদ্ধের) বিপদ আসে, তখন আপনি দেখবেন মৃত্যুভয়ে অচেতন ব্যক্তির মত চোখ উল্টিয়ে তারা আপনার প্রতি তাকায়। অতঃপর যখন (যুদ্ধের) বিপদ কেটে যায় তখন তারা ধন-সম্পদ (ও যুদ্ধলব্ধ গণিমত) লাভের আশায় তোমাদের সাথে বাকচাতুরীতে অবতীর্ণ হয়। তারা মুমিন নয়। তাই আল্লাহ তাদের (আমল ও) কর্মসমূহ নিস্ফল (ও ধ্বংস) করে দিয়েছেন। এটা আল্লাহর জন্যে সহজ।” (৩৩:১৯)

গত আসরে আমরা আহযাব যুদ্ধে মুসলমানদের মনোবল নষ্ট করে দেয়ার জন্য মদীনার মুনাফিকদের প্রচেষ্টা সম্পর্কে আলোচনা করেছি। সে ঘটনার ধারাবাহিকতায় আজকের এই দুই আয়াতে বলা হচ্ছে: মুনাফিকদের একটি দল শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা থেকে জনগণকে বিরত রাখার চেষ্টা করেছিল। তারা বলেছিল, আমরা যেভাবে যুদ্ধ বন্ধ করে দিয়েছি তোমরাও তেমনি যুদ্ধক্ষেত্রে থেকে সরে এসে আমাদের সঙ্গে যোগ দাও। তারা শুধু নিজেরাই জীবনের ভয়ে পালিয়ে যায়নি বরং অন্যদেরকেও পালিয়ে যেতে উস্কানি দিয়েছে। তারা আল্লাহর রাস্তায় জীবন ও সম্পদ খরচ করতে কার্পন্য করেছে।

তারা ঈমানের দিক দিয়ে এতটাই দুর্বল ছিল যে, তাদের আতঙ্কগ্রস্ত চেহারা দেখলে মনে হতো শত্রুরা তাদের প্রাণ হরণ করার আগেই ভয়ে তাদের প্রাণপাখি দেহ থেকে বেরিয়ে যাবে। কিন্তু তাদের অনুপস্থিতিতেই যখন মুসলমানরা যুদ্ধে  জয়ী হয় তখন এসব ব্যক্তি মুসলমানদের সঙ্গে যোগ দিয়ে দাবি করে, এ জয়ে আমাদেরও অবদান আছে। কাজেই গনিমতের সম্পদে আমাদেরও অংশ রয়েছে। এ সময় তারা পাওনাদারের মতো কর্কশ ভাষায় কথা বলে এবং যেকোনো মূল্যে যুদ্ধলব্ধ গনিমতের মালের ভাগ দাবি করে।

রাসূলুল্লাহ (সা.)’র যুগের মুনাফিকদের এই যে চরিত্র পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হয়েছে তা শুধু সে যুগের মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। যেকোনো স্থানে যেকোনো সময়ে মুসলমানদের মধ্যে এই চরিত্রের মানুষের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। তারা বিপদ দেখলে কেটে পড়ে এবং সুখের সময় সম্পদ ও ক্ষমতা দাবি করে বসে। এ ধরনের মানুষ বলে বেড়ায়, মুসলমানদের উন্নতি ও সমৃদ্ধিতে তাদের মস্তবড় অবদান রয়েছে।

এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. শত্রুর বিরুদ্ধে যেকোনো ব্যবস্থা নিতে যাওয়ার আগে নিজেদের মধ্যকার দুর্বল ঈমানের লোকদের ব্যাপারে সতর্ক হতে হবে। কারণ, এ ধরনের মানুষ বিপদ দেখলে শুধু নিজেরাই পালিয়ে যায় না সেইসঙ্গে হতাশামূলক কথা ছড়িয়ে দিয়ে প্রকৃত ঈমানদারদেরও যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ভাগিয়ে নিয়ে যায়।

২. বিপদের সময় মুনাফিকরা মুসলিম যোদ্ধাদের সাহায্য করার ক্ষেত্রে কৃপণতা করে।  পরে যুদ্ধলব্ধ সম্পদ আহরণ ও বণ্টনের সময় তাদের দেখা মেলে। এ ধরনের চরিত্রের লোককেই মুনাফিক বলা হয়।

৩. বিপদে পড়ে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে যাওয়া ছাড়া মুফাফিকদের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, শান্তির সময় মিত্র ও বন্ধুদের সঙ্গে কঠোর আচরণ করা।

সূরা আহযাবের ২০ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন,

  يَحْسَبُونَ الْأَحْزَابَ لَمْ يَذْهَبُوا وَإِنْ يَأْتِ الْأَحْزَابُ يَوَدُّوا لَوْ أَنَّهُمْ بَادُونَ فِي الْأَعْرَابِ يَسْأَلُونَ عَنْ أَنْبَائِكُمْ وَلَوْ كَانُوا فِيكُمْ مَا قَاتَلُوا إِلَّا قَلِيلًا (20)

“তারা মনে করে শক্রবাহিনী (এখনো মদীনার আশপাশ থেকে)  চলে যায়নি। যদি শক্রবাহিনী আবার এসে পড়ে, তবে তারা কামনা করবে যে, যদি তারা আরব বেদুঈনদের মধ্য থেকে তোমাদের সংবাদাদি জেনে নিত, তবেই ভাল হতো। তারা তোমাদের মধ্যে অবস্থান করলেও সামান্যই যুদ্ধ  করত।” (৩৩:২০)

এই আয়াতে মুনাফিকদের দুর্বলতা ও আতঙ্কের চূড়ান্ত রূপ প্রকাশ পেয়েছে।  বলা হচ্ছে, যুদ্ধে পরাজিত হয়ে যখন শত্রুবাহিনী দিকভ্রান্ত হয়ে পালিয়ে গেছে এবং মদীনা বিপদমুক্ত হয়েছে তখনও মুনাফিকরা ভেবেছিল, শত্রু বাহিনী এখনো আশপাশেই অবস্থান করছে। এ কারণে তাদের ভয়ের অনুভূতি দূর হয়নি। এ অবস্থায় তারা ঘোড়া বা উটের পায়ের শব্দ শুনলেই মনে করত শত্রুরা বুঝি এসে পড়েছে।

তারা এতটা আতঙ্কিত হয়ে পড়ে যে, ভাবতে থাকে মদীনার আশপাশে মরুচারী বেদুঈনদের সঙ্গে মিশে গিয়ে জীবনযাপন করলে হয়ত শত্রুপক্ষের বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে। তখন মদীনা শহরের মানুষের খোঁজখবর পথচারীদের কাছ থেকে জেনে নেবে। পরে শত্রুরা পুরোপুরি চলে গেছে বলে নিশ্চিত হলে তারা আবার শহরে ফিরে আসবে। আয়াতের পরবর্তী অংশে মুমিনদের উদ্দেশ করে বলা হচ্ছে: এ ধরনের লোক যদি পালিয়ে না গিয়ে শহরে তোমাদের সঙ্গে থেকেও যেত  তারপরও তাদের বেশিরভাগ যুদ্ধক্ষেত্রে তোমাদের সাহায্যে এগিয়ে আসত না।  তারা কখনোই শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করত না। কাজেই এ ধরনের মানুষ পালিয়ে গেলে যেমন কষ্ট পাওয়ার কিছু নেই তেমনি তোমাদের মধ্যে তাদের উপস্থিতিও আনন্দিত হওয়ার মতো কোনো বিষয় নয়।

এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো;

১. মুনাফিক ও দুর্বল চিত্তের ঈমানদাররা সব সময় শত্রুকে মুসলমানদের চেয়ে শক্তিশালী ভাবে। তারা মনে করে, যেকোনো সংঘাতে শত্রুর বিজয় ও মুসলমানদের পরাজয় অবশ্যম্ভাবী। এই ধারণার ভিত্তিতে তারা সব কাজ ও পরিকল্পনা করে।

২. আতঙ্ক ও আগে থেকে হেরে যাওয়ার এই মানসিকতা মানুষকে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে যেতে উদ্বুদ্ধ করে। অথচ ইসলামের নির্দেশ এবং বিবেকের দাবি হচ্ছে, মুসলমানদেরকে শত্রুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে এবং কখনোই নিজেদের দুর্বলতা প্রকাশ করা যাবে না।

সূরা আহযাবের ২১ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে,

لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِمَنْ كَانَ يَرْجُو اللَّهَ وَالْيَوْمَ الْآَخِرَ وَذَكَرَ اللَّهَ كَثِيرًا (21)

“যারা আল্লাহ ও শেষ দিবসের প্রতি আশা রাখে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে, নিঃসন্দেহে তাদের জন্যে রসূলুল্লাহর (জীবনীর) মধ্যে সর্বোত্তম আদর্শ রয়েছে।” (৩৩:২১)

আগের আয়াতগুলোতে মুনাফিক ও দুর্বল চিত্তের ঈমানদারদের চরিত্র বর্ণনা করার পর এই আয়াতে বলা হচ্ছে: প্রকৃত ঈমানদার ব্যক্তি মুনাফিকদের কথা ও কাজের প্রতি ভ্রুক্ষেপ ও দায়িত্বে অবহেলা করার পরিবর্তে বিশ্বনবী (সা.)’র মুখের বাণী, নির্দেশ ও আদর্শের প্রতি লক্ষ্য রাখে।  আল্লাহর রাসূলের মতোই তারা শত্রুর মোকাবিলায় ইস্পাত-কঠিন দৃঢ় হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলে এবং মদীনা শহর ও এর মুসলিম অধিবাসীদের রক্ষায় বিন্দুমাত্র পিছপা হয় না।

ঐতিহাসিক বর্ণনায় এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) মদীনা শহর রক্ষার জন্য এর আশপাশে খন্দক পা পরিখা খনন করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। অন্য সব মুসলমানের মতো তিনি নিজেও কোদাল হাতে পরিখা খননের কাজে নেমে পড়েন। সেইসঙ্গে তিনি সবাইকে আল্লাহর স্মরণ থেকে বিরত না থাকার আহ্বান জানান এবং তাদেরকে শত্রুর বিরুদ্ধে বিজয়ের ব্যাপারে আল্লাহর প্রতিশ্রুতির কথা জানিয়ে দেন।

এই আয়াতের শিক্ষণীয় বিষয়গুলো হলো:

১. রাসূলুল্লাহ (সা.) জিহাদের ময়দানে যুদ্ধের বর্ম পরিধান এবং কমান্ডারের ভূমিকা পালন করতেন। তিনি যে ইসলাম শিখিয়েছেন তাতে শাসনকাজ থেকে ধর্ম আলাদা ছিল না; এমনকি দ্বীন রক্ষার প্রয়োজনে যুদ্ধও ছিল অনিবার্য। তিনি ইহকালীন জীবনে যেমন মানুষের সুখ ও সমৃদ্ধি চাইতেন তেমনি পরকালীন জীবনেও তাদের জন্য চিরশান্তি কামনা করতেন।

২. আল্লাহর রাসূল আর দশটি মানুষের মতোই সাধাসিধে জীবনযাপন করতেন। কাজেই তিনি সব মুমিন মুসলমানের জন্য আদর্শ হতে পারেন। তিনি ছিলেন ধুলির ধরার মানুষ এবং মানবজাতির জন্য তিনি ছিলেন সর্বোত্তম আদর্শ। তিনি যুদ্ধের ময়দানেও অলৌকিক ঘটনার প্রত্যাশী না থেকে যুদ্ধের স্বাভাবিক নিয়ম-কানুন অনুসরণ করেছেন।

৩. বিশ্বের মুসলমানরা যদি রাসূলে খোদাকে নিজেদের জন্য আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করত তাহলে আজ তারা শত্রুর মোকাবিলায় এরকম দুর্বল ও মর্যাদা হানিকর অবস্থায় পড়ত না। তারা কখনোই শত্রুকে তাদের ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে দিত না।#

ট্যাগ

২০১৮-০৬-১৩ ১৯:১৯ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য