আজ অফুরন্ত রহমত, বরকত ও মাগফিরাতের মাস রমজানের ২৯ তম দিন। হয়ত এটাই এ মাসের শেষ দিন।

হতে পারে এটাই আমাদের কারো কারো জীবনের শেষ রমজান। যে রমজানে ঘুমও হচ্ছে ইবাদত, শ্বাস-প্রশ্বাস জিকরের সমতুল্য এবং যার দিন-রাত আর ঘণ্টা ও মুহূর্তগুলো বছরের অন্য যে কোনো সময়ের মধ্যে শ্রেষ্ঠ সেই রমজান তথা মহান আল্লাহর অশেষ রহমতের ভোজসভা থেকে কতটা পাথেয় নিতে পেরেছি? হে আল্লাহ! এ রমজানই যেন আমাদের জীবনের শেষ রমজান না হয়। এ রমজানে আমাদের ইবাদত ও দোয়াগুলো কবুল করুন! আমাদের ত্রুটি-বিচ্যুতি ও গোনাহগুলো ক্ষমা করুন। যদি আমাদের ওপর সন্তুষ্ট হয়ে থাকেন তাহলে আরও সন্তুষ্ট হন। আর যদি সন্তুষ্ট না হয়ে থাকেন এখন থেকে সন্তুষ্ট হন। অমাদের অজ্ঞতা ও নানা ত্রুটি আর অপরাধ-প্রবণতা থেকে উদ্ভুত পাপগুলো যেন তোমার রহমত থেকে আমাদের দূরে সরিয়ে না দেয়। হে আল্লাহ আমাদের বাদ-বাকী জীবন যেন সুখময় হয় এবং আমাদের পার্থিব ও পরকালীন সব বিষয়কে যেন মৃত্যুর আগেই সংশোধন করতে পারি সে সুযোগ আমাদের দিন। আমরা পার্থিব ধন-সম্পদে সবচেয়ে ধনী হলেও যদি আত্মিক প্রশান্তি না পাই তাহলে এসবই তো বৃথা। তাই আমাদের দান করুন প্রকৃত সুখ। 

পার্থিব সব কিছুর অধিকারী হওয়ার পরও প্রকৃত সুখের পথে বাধা হতে পারে দাম্পত্য-কলহ, বখাটে হয়ে পড়া সন্তান কিংবা অন্য কোনো কোনো দুঃসংবাদ। অন্যদিকে ধার্মিক কোনো ব্যক্তি সামান্য কুড়ে ঘরে বাস করেও হতে পারে সম্পদশালী লোকদের তুলনায় বেশি সুখ বা পরিপূর্ণ মধুময় সুখ আর সৌভাগ্যের অধিকারী। মহান আল্লাহ আমাদের দান করুন প্রকৃত সুখ ও সৌভাগ্য। দীর্ঘ-জীবন হবে তখনই প্রকৃত অর্থে সুখময় যখন তাতে আমাদের চরিত্রে থাকবে সবগুলো ভালো ও মহৎ গুণ এবং থাকবে সকল সৎকাজ করার সুযোগ ও সব পাপ পরিত্যাগ করার সৌভাগ্য। আসল সুখ তো আসবে তখনই যখন আমাদের অন্তর  হরহামেশা প্রেমার্ত থাকবে মহান আল্লাহর মুগ্ধতায় ও জিহবা মশগুল থাকবে মহান আল্লাহর প্রশংসা ধ্বনিতে। অথচ পার্থিব সুখ-সম্পদ অর্জনের নামে কিংবা বাড়ি-গাড়ি আর প্রভাব-প্রতিপত্তি অর্জনের নেশায় মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের কথা জীবনের কর্মসূচি থেকে আমরা বাদ দিয়েছি অনেকেই। ধর্মকর্ম ও সৎকর্ম করলেও তাতে যুক্ত হচ্ছে অহংকার এবং লোক-দেখানোর ও প্রচার করার প্রবণতা যা বরবাদ করে দেয় এসবের মূল্যকে। আবার কখনও ধার্মিকতার নামে হয়ে পড়ছি সমাজ ও সংসার থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন। 

যেসব কাজ বা পাপ আমাদেরকে ভুলিয়ে দেয় কিয়ামতের কথা, কবরের একাকিত্বের কথা, আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়ার কথা এবং যেসব কাজ আমাদের মনকে হেদায়াত বা সুপথের মোকাবেলায় পাথরের মত কঠিন করে তোলে সেইসব মন্দ কাজ হতে মহান আল্লাহর আশ্রয় চাইছি। বলা হয় আল্লাহ যাকে ভালবাসেন তাকে বিপদ-আপদ ও কষ্ট দিয়ে পরীক্ষা করেন। তার ধৈর্য, দোয়া ও কাকুতি-মিনতি আল্লাহকে করে সন্তুষ্ট। অন্যদিকে মহান আল্লাহ কারো কারো ওপর এতই বিতৃষ্ণ হন যে তারা তওবা করার এমনকি আল্লাহর দরবারে দোয়া করারই সুযোগ পায় না! আল্লাহ এদেরকে পার্থিব ধন-সম্পদ দিলেও দেন না মানসিক ও আত্মিক প্রশান্তি। যখন মনে হবে যে নামাজ-রোজায় কিংবা অন্য কোনো ইবাদতে প্রশান্তি বা আনন্দ আসছে না, কিংবা হয়ে পড়ছি খুবই হতাশ ও ধৈর্যহীন তখন মনে করতে হবে যে সর্বনাশ হয়ে যাচ্ছে। এ অবস্থায় ব্যাপক কাকুতি-মিনতি সহ আল্লাহর সহায়তা চাইতে হবে। এ ধরনের অবস্থা লক্ষ্য করেই বলা হয়েছে দোয়ায়ে কুমাইলে: হে আল্লাহ আমার ওইসব পাপ ক্ষমা করে দাও যা দোয়া কবুলের পথে বাধা হয়, যা ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে দেয় ও আশাহীন করে দেয়, যা দুর্ভাগ্য বা কষ্ট ডেকে আনে ও যা নেয়ামতকে গজবে পরিণত করে দেয়!

ভাইবোনেরা, আলোচনার এ পর্যায়ে আমরা পবিত্র রমজানের ফজিলত সম্পর্কে শুনব বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ জনাব মুনির হুসাইন খানের কিছু বক্তব্য। তিনি বলেছেন, রোজা ও ধৈর্য:
ইমাজ জাফর সাদিক (আ) বলেছেন, তোমরা নামাজ ও ধৈর্যের মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য চাও -বলে পবিত্র কুরআনে যে আয়াত রয়েছে তাতে ধৈর্য বলতে রোজাকে বোঝানো হয়েছে।  

রমজানে আমাদের আত্মশুদ্ধির ওপর জোর দেয়া হয়েছে। তা কি সম্ভব হয়েছে? পঞ্চ-ইন্দ্রিয়কে কতটা নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছি? গীবত, কৃপণতা, লোভ, পরচর্চা, হিংসা, আত্মপ্রীতি- এসব কি দূর হয়েছে? এসবকে দূর করার মাধ্যমে পাপমুক্ত থাকাটাই হচ্ছে প্রকৃত রোজা। আমার চোখ কি কেবল অন্যের দোষ-ত্রুটিই দেখছে? নিজের দোষ-ত্রুটিগুলো কি বুঝতে পারছি? নিজের দোষ সহজেই চোখে পড়ে না। কিন্তু তবুও বার বার নিজের হিসেব নিজেই নিয়ে দেখুন। অবশ্যই অনেক দোষ-ত্রুটি বের হবে। আর এসব সংশোধনের জন্য মহান আল্লাহর সাহায্য চাইতে হবে। দেরি না করে আজই সংশোধনের উপায় নিয়ে ভাবতে থাকুন। তা নাহলে কিয়ামতের দিন বলা হবে-তোমাকে অনেক বছর আয়ু দেয়া হয়েছিল কিন্তু তুমি নিজেকে সংশোধনের চেষ্টাও করনি। সেদিন যেন জবাবহীন হতে না হয়!

আমার বা আপনার চিন্তাধারা ইসলামের দৃষ্টিতে সঠিক কিনা কিংবা ধর্ম-বিশ্বাসের নামে প্রচলিত নানা বিশ্বাস কতটা সঠিক সেগুলো নিয়ে কি ভেবেছি বা গবেষণা করেছি? মহান আল্লাহ আমাদেরকে বিবেক দিয়েছেন যেসব কাজে ব্যয় করতে সেসব কাজে কি তা ব্যয় করছি? কারা প্রকৃত ইসলামের অনুসারী এবং কারা ইসলামের শত্রু –এসব বোঝার পাশাপাশি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং শোষণ ও জুলুম প্রতিরোধের যেসব দায়িত্ব সব মানুষের ওপর বর্তায় আমরা কি সেই দায়িত্ব পালন করছি? 
       
হে আল্লাহ যেসব কাজ আমাদেরকে পরকালের কথা, মৃত্যুর আগেই প্রস্তুতি নেয়ার কথা এবং আল্লাহ, নবী-রাসুল, ইমাম, ফেরেশতা, পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন, সন্তান-সন্ততি ও মানুষের অধিকারসহ সব অধিকারগুলো যথাযথভাবে পালনের কথা ভুলিয়ে দেয় সেসব কাজ হতে আমাদের দূরে থাকার তৌফিক দিন। যেসব কাজ প্রকৃত ধার্মিক ও আল্লাহর প্রিয় ব্যক্তিদের সাহচর্য থেকে আমাদের দূরে সরিয়ে নেয়-সেসব থেকে আমাদের দূরে থাকার সুযোগ দিন। 

আমরা যেন আত্মসংশোধনের পাশাপাশি সন্তানদেরকে প্রকৃত শিক্ষায় সুশিক্ষিত করে দেশ ও জাতির প্রকৃত সেবায় নিয়োজিত হতে পারি এবং মানুষের আসল বৈশিষ্ট তথা ফিতরাত অর্জনের চেষ্টায় সফল হই ও এভাবে প্রকৃত অর্থেই যেন ঈদুল ফিতরকে মানবীয় প্রকৃতির উৎসবে পরিণত করতে পারি সে সুযোগ চাইছি সর্বশক্তিমান ও পরম করুণাময় আল্লাহর কাছে। সবাইকে জানাচ্ছি অগ্রিম ঈদ মুবারক। 
উল্লেখ্য, পবিত্র ঈদের জামাআতে শরিক হওয়ার আগেই ঈদের ফিতরা পরিশোধ করা উত্তম। আপনার প্রধান খাদ্যগুলোর প্রায় তিন বা সাড়ে তিন কেজি'র আর্থিক মূল্যই হচ্ছে একজনের জন্য প্রদেয় সর্বনিম্ন ফিতরা। 
ইসলামী ঐক্য প্রতিষ্ঠা ও সাম্রাজ্যবাদীদের জুলুমের বিরুদ্ধে সংগ্রাম রমজানের আরেকটি বড় শিক্ষা। পবিত্র ঈদের জামাত এই ইসলামী ঐক্যের একটি মাধ্যম। তাই বলা হয়েছে, যতটা সম্ভব মুসলিম নারীরাও যেন ঈদের জামাতে শরিক হয় যাতে ইসলামের শত্রুরা মুসলমানদের আধিক্য দেখে তাদের সমীহ করে। #

পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/মো.আবুসাঈদ/ ১৪

ট্যাগ

২০১৮-০৬-১৪ ১৫:৫১ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য