গত আসরে আমরা ইরানের ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্প নিয়ে কথা বলেছি। হস্তশিল্পের গুরুত্বপূর্ণ একটি শাখা হলো কাঁচশিল্প। ইরানের বেশ প্রাচীন একটি শিল্প-ঐতিহ্য এটি।

বিশেষ করে ইরানে এই শিল্পের চর্চা বহু আগে থেকেই চলে আসছে। ফুলদানী বা এ জাতীয় বিভিন্ন তৈজসের ওপর অসাধারণ সব রঙীন নকশা কারুকাজ করা এই শ্রেণীর শিল্পীদের কাজ। উভয় শ্রেণীর শিল্পের জন্যই ইরান অত্যন্ত সমৃদ্ধ একটি দেশ। ইরানের বিভিন্ন এলাকায় পুরাতত্ত্ব গবেষকদের খনন কাজের মাধ্যমে যেসব বিরল প্রাচীন হস্তশিল্প সামগ্রী উঠে এসেছে সেগুলো পর্যালোচনা করলেই প্রমাণ হয়ে যায় ইরানের হস্তশিল্প কত প্রাচীনকাল থেকেই সমৃদ্ধ ছিল। গবেষণামূলক খননকাজ থেকে আবিষ্কৃত নিদর্শনগুলোই প্রাচীনকাল থেকে ইরানের শিল্প-সমৃদ্ধির কথা প্রমাণ করে। এসবের বহু নিদর্শন এখন ইরানসহ বিশ্বের বিভিন্ন যাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। যাই হোক হস্তশিল্প নিয়ে আজও কিছু কথা বলার চেষ্টা করবো।

ইরানের বিভিন্ন প্রান্তে,আনাচে কানাচে এমন বিভিন্ন গোষ্ঠি ও গোত্র বসবাস করে যারা উত্তরাধিকার সূত্রে হস্তশিল্পের ঐতিহ্য বহন করে এসেছে। তাদের পূর্বপ্রজন্মের কাছ তারা শিখেছে। তারাই আবার তাদের উত্তর প্রজন্মকে সেই শিল্পের সবক দিয়ে হাতে কলমে শিখিয়ে গেছে। পৃথিবীতে হস্তশিল্প সামগ্রী উৎপাদনের বৈচিত্র্যের দিক থেকে ইরানের অবস্থান তৃতীয় পর্যায়ে রয়েছে। বাইশ লাখেরও বেশি ইরানি শিল্পী এই হস্তশিল্পের জগতে তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। তাঁত, হাতে বোণা বস্ত্র, পোশাক, মৃৎ শিল্প, ঐতিহ্যবাহী সিরামিক,মাদুর ও কাঠের হস্তশিল্প,ইস্পাত শিল্প, চামড়া দিয়ে তৈরি হস্তশিল্প, সামুদ্রিক শিল্প, কাঁচশিল্প ইত্যাদিসহ আরও অজস্র শিল্পের প্রাচুর্যের কারণে শিল্পীরা এবং এই শিল্পের তত্ত্বাবধায়করা ইরানের এইসব হস্তশিল্পকে অন্তত ১৫টি বিভাগে কমপক্ষে ৩৬০ টি বিষয়ে বিন্যস্ত করেছেন।

হস্তশিল্পের আরেকটি বিভাগ হলো আর্ট গ্লাস বা কাঁচশিল্প। কাঁচকে বিভিন্ন ডিজাইনে আঙ্গিক দেয়ার নামই কাঁচশিল্প। হাতে তৈরি কাঁচশিল্পের প্রাচীন ঐতিহ্য হলো ফুঁ দিয়ে বিভিন্ন ডিজাইনে বিন্যাস করা। অন্তত ৪ হাজার বছর আগে থেকে ইরানে এই শ্রেণীর কাঁচশিল্পের চর্চা হয়ে আসছে। প্রথমে আগ্নেয় ধাতব খনিজ পদার্থ সিলিকা, গ্লাস বার ইত্যাদিকে তাপ দিয়ে গলানো হয়। এরপর তার ভেতরে বিশেষ ধরনের পাইপ দিয়ে বাতাস  করে অন্যান্য সরঞ্জাম ব্যবহারের মাধ্যমে শো-পিস কিংবা প্রয়োজনীয় পাত্র তৈরি করা হয়। কাঁচশিল্পের কাজটি যৌথ বা সমন্বিত ও সুনিপুণ একটি কাজ। একাকি এ কাজ করা দুরূহ। কাঁচের তৈরি একটি শিল্পে বেশ কয়েকজন অংশ নিয়ে থাকেন।

 

কাঁচশিল্প প্রাচীনতম শিল্পগুলোর একটি যে পেশায় মানুষ নিজেকে নিয়োজিত করেছে। অবশ্য ঠিক কোথায় সর্বপ্রথম এই শিল্পের চর্চা শুরু হয়েছিল সে ব্যাপারে মতানৈক্য রয়েছে। তবে মনে করা হয় যে হযরত সোলায়মান (আ) এর শাসনকালেই কাঁচশিল্পের সূচনা হয়। সে সময় সোলায়মান (আ) এর আদেশে দৈত্যদের মাধ্যমে একটি প্রাসাদ নির্মাণ করা হয়েছিল। ওই প্রাসাদের বিভিন্ন অংশ সাজানোর প্রয়োজনে কাঁচের বিভিন্ন সামগ্রী নির্মাণ করার উদ্দেশে বহু চুল্লি তৈরি করা হয়েছিল। কাঁচশিল্পের ইতিহাসের বর্ণনায় এই শিল্পের উৎসস্থল হিসেবে প্রাচীন মিশর, সিরিয়া এবং ইরানের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। উত্তর পশ্চিমাঞ্চলীয় ইরানের বিভিন্ন এলাকাসহ লোরেস্তান ও শুশ এলাকাসহ শিরাজের তাখতে জামশিদ বা পার্সপোলিসে কাঁচশিল্পের যেসব নিদর্শন পাওয়া গেছে সেগুলো কয়েক হাজার বছরের পুরনো বলে ঐতিহাসিকগণ মত দিয়েছেন। সুতরাং এই শিল্প যে ইরানে বেশ প্রাচীনকাল থেকেই চর্চিত হয়েছে তা প্রমাণিত সত্য।

কাঁচের হস্তশিল্পের সবচেয়ে প্রাচীন নিদর্শনটি খ্রিষ্টপূর্বকালের। এই শিল্পের সর্বোৎকৃষ্ট নমুনা আনুমানিক ইলামি শাসনামলের অর্থাৎ খ্রিষ্টপূর্ব ৬৪০ থেকে ৩ হাজার ২ শ বছর আগেকার। এই নিদর্শনগুলো পাওয়া গেছে খুজিস্তানের চোগাজাম্বিল প্রার্থনালয়ে। ওটা ছিল ইলামিদের সবচেয়ে বড় উপাসনালয়। হাতে তৈরি বড় বড় কাঁচের বোতলসহ কিছু পাত্র পাওয়া গেছে সেখানে। ইরানের উত্তর পশ্চিমাঞ্চলে নীল রঙের কাঁচের দানা দিয়ে তৈরি একটি গলার মালা পাওয়া গেছে। ওই মালাটিকে খ্রিষ্টপূর্ব ২ শ বছর আগের বলে মনে করা হয়। কাঁচের আতরদানি, বাটি, প্লেট ইত্যাদিও পাওয়া গেছে। এগুলোকে সাসানি শাসনামলের বলে মনে করা হয়। তার মানে অনেক আগে থেকেই যে কাঁচশিল্পের চর্চা হয়ে এসেছে ইরানে, এইসব নিদর্শন তারই প্রমাণ বহন করে। "অবগিনে" এবং "ইরান বস্তন" যাদুঘর দুটিতে এসব নিদর্শন এখনও দেখতে পাওয়া যাবে।

ইসলামি সভ্যতার স্বর্ণযুগে খনিজবিদ্যা, চিকিৎসা বিজ্ঞান ইত্যাদির উন্নয়নের ফলে ইরানিরাসহ মুসলিম কাঁচশিল্পের শিল্পীরা বিজ্ঞানের উৎকর্ষকে কাজে লাগিয়ে এই শিল্পে পরিবর্তন আনার সুযোগ পেয়েছেন। কাঁচ কেটে নকশা করা কিংবা কাঁচের পাত্রে লেখালেখি করা এ সময়কার অবদান। বিশেষ পাথর দিয়ে কাঁচ কেটে নকশা করা বা লেখার কাজ করা হতো। পাথরের পাশাপাশি তামা, লোহা, মেঙ্গানিজ, সালফার ইত্যাদিও এই নকশার কাজে ব্যবহার করা হত। বলা চলে যে-কোনোভাবেই হোক, নকশা বা কারুকাজ করা কাঁচশিল্প সামগ্রী এই সাসানি শাসনামলেরই নিদর্শন। তবে সালজুক এবং সাফাভি শাসনামল হলো ইরানি কাঁচশিল্পের স্বর্ণযুগ। কাঁচশিল্পের বহু কারখানা ইস্ফাহান, শিরাজ এবং কাশানের মতো বেশ কিছু শহরে গড়ে উঠেছিল।

তেলের বাইরে এই হস্তশিল্প সামগ্রী এখন ইরানের রপ্তানীযোগ্য গুরুত্বপূর্ণ একটি পণ্য। এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপ এবং আমেরিকায় সাম্প্রতিক কয়েক বছরে এক শ কোটি ডলারের বেশি মূল্যের হস্তশিল্প সামগ্রী রপ্তানী করেছে ইরান। যতই দিন যাচ্ছে ততই উন্নত হচ্ছে এইসব হস্তশিল্প। সুতরাং বিশ্বব্যাপী গ্রহণযোগ্যতাও বেড়েছে হস্তশিল্পের। #

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/ মো:আবু সাঈদ/  ১৫

ট্যাগ

২০১৮-০৬-১৫ ১৬:০৪ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য