রাসূলুল্লাহ (সা.) এর উন্নত চারিত্রিক মাধুর্য নিয়ে ঐতিহাসিক ও গবেষকরা বহু লেখালেখি করেছেন। তাঁর জীবনী নিয়ে গত ১৪শ’ বছরে অসংখ্য গ্রন্থ রচিত হয়েছে।

এসব বইয়ের লেখকরা এই মহামানবের জীবনী ও ব্যক্তিত্বের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয়গুলো তুলে এনে একথা বোঝার চেষ্টা করেছেন, তাঁর মধ্যে কি এমন অসাধারণ গুণ ছিল যা দিয়ে তিনি প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থাকে পুরোপুরি পাল্টে দিয়ে বিশাল মুসলিম সভ্যতার গোড়াপত্তন করতে পেরেছিলেন।

সবাই একবাক্যে একথা স্বীকার করেছেন যে, দিকে দিকে ইসলাম ছড়িয়ে পড়ার অন্যতম প্রধান কারণ ছিল বিশ্বনবী (সা.)-এর উন্নত চারিত্রিক গুণাবলী এবং মানুষের সঙ্গে তাঁর সদয় আচরণ। মানুষের প্রতি আল্লাহর রাসূলের দয়া ও ভালোবাসার কোনো তুলনা ছিল না। মহান আল্লাহ এ সম্পর্কে সূরা আলে ইমরানের ১৫৯ নম্বর আয়াতে বলেছেন: “হে রাসূল! আল্লাহর রহমতেই আপনি তাদের জন্য কোমল হৃদয় হয়েছেন, পক্ষান্তরে আপনি যদি ক্রুদ্ধ ও কঠিন হৃদয় হতেন তাহলে তারা আপনার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতো। কাজেই আপনি তাদের ক্ষমা করে দিন এবং তাদের জন্য মাগফেরাত কামনা করুন এবং কাজে কর্মে তাদের সঙ্গে পরামর্শ করুন।”

মানবীয় সমস্ত গুণের আধার হিসেবে মদীনায় নবগঠিত ইসলামি সমাজে মানবীয় মূল্যবোধগুলোর বিকাশ ঘটিয়েছিলেন আল্লাহর রাসূল। মানুষের সঙ্গে কথা বলার সময় তাঁর মুখে সব সময় হাসি লেগে থাকত। বর্ণনায় এসেছে, নবম হিজরিতে মুসলিম বাহিনীর হামলায় একটি কাফের গোত্র পরাজিত হয়। গোত্র প্রধান উদাই বিন হাতাম সিরিয়ায় পালিয়ে গেলেও তার বোন ‘সাফানা’ মুসলিম বাহিনীর হাতে বন্দি হয়। অন্যান্য বন্দির সঙ্গে সাফানাকে মসজিদে নববীর কাছে একটি ঘরে আটক রাখা হয়। রাসূলুল্লাহ (সা.) বন্দিদের পরিদর্শন করতে গেলে সাফানা কথা বলে ওঠে।  সে বলে: ‘ইয়া মুহাম্মাদ আমার পিতা হাতাম মৃত্যুবরণ করেছেন এবং আমার ভাই উদাই সিরিয়ায় পালিয়ে গেছেন। এখন আমাকে দেখাশুনা করার কেউ এখানে নেই। তাই আমার আবেদন- আমাকে মুক্তি দিন। সেইসঙ্গে আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আমার পিতা হাতাম ক্রীতদাসদের মুক্তি দিতেন, প্রতিবেশীদের খোঁজখবর রাখতেন, দরিদ্রদের অন্নদান করতেন, মানুষকে সালাম দিতেন এবং যেকোনো বিপদে আপদে দুঃস্থদের পাশে দাঁড়াতেন।

এসব উন্নত গুণাবলীর কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন: “তুমি তোমার পিতার যেসব গুণের কথা বললে সেগুলো একজন প্রকৃত মুমিনের গুণ। তোমার পিতা যদি মুসলমান হতেন তাহলে আমি তার পরকালীন মুক্তির জন্য দোয়া করতাম।” এরপর তিনি দায়িত্বশীলদের বললেন: এই মেয়ের পিতা উন্নত মানবীয় গুণাবলীর অধিকারী ছিলেন বলে তাকে মুক্তি দিয়ে দাও। রাসূলের নির্দেশে সাফানাকে মুক্তি দিয়ে বিশ্বস্ত ব্যক্তিদের তত্ত্বাবধানে সিরিয়ায় তার ভাইয়ের কাছে পৌঁছে দেয়া হয়। উদাই বিন হাতাম নিজ বোনের মুখে এ ঘটনা শোনার পর মদীনায় রাসূলের কাছে এসে মুসলমান হয়ে যায়।

রাসূলুল্লাহ (সা.) মনে করতেন মানুষের সঙ্গে উত্তম আচরণের জন্য নির্দিষ্ট স্থান বা কালের প্রয়োজন নেই বরং যেকোনো পরিস্থিতিতে মানুষের সঙ্গে ভালো ব্যবহার ও মানুষকে সাহায্য করা যায়। তিনি উন্নত চারিত্রিক গুণাবলীর মধ্যে সত্যবাদিতা ও আমানতদারির প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিতেন।

একটি সমাজে যখন উন্নত চারিত্রিক গুণাবলীর বিকাশ ঘটে তখন সে সমাজে প্রচলিত খারাপ আচরণগুলো দূরিভুত হয়ে যায়। তৎকালীন সমাজে আত্মঅহংকার, ভোগ-বিলাস ও আরাম-আয়েশ এবং অর্থ ও ক্ষমতার দাপট দেখানোর যে প্রচলন ছিল আল্লাহর রাসূল তা সমাজ থেকে নির্মূল করেন। একটি সমাজের কিছু লোকের মধ্যে যখন ভোগ-বিলাসে মত্ত হয়ে ওঠার প্রবণতা দেখা দেয় তখন তা ক্ষতিকর ভাইরাসের মতো গোটা সমাজকে গ্রাস করে। রাসূলুল্লাহ (সা.) এই ক্ষতিকর সংস্কৃতির বিরুদ্ধে লড়াই করে সমাজে সাদামাটা জীবনযাপনের প্রচলন করেন। তিনি ঘোষণা করেন, ইসলাম ধন-সম্পদের বিরোধী নয় কিন্তু সম্পদের পাহাড় গড়ে ভোগবিলাসে মত্ত হয়ে ওঠার বিরোধী। সম্পদ দিয়ে সমাজে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে বেকারত্ব দূর করতে হবে এবং গরীব ও দুঃস্থ মানুষকে তাদের অংশ দিয়ে দিতে হবে। রাসূলুল্লাহ (সা.) এতটা সাধারণ জীবনযাপন করতেন যে, তিনি যখন সাহাবীদের সঙ্গে এক স্থানে বসে থাকতেন তখন কোনো আগন্তুক সেখানে এলে রাসূলকে আলাদা করে চিনতে পারত না। তাকে প্রশ্ন করে জেনে নিতে হতো তাদের মধ্যে কে আল্লাহর রাসূল।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী এ সম্পর্কে বলেছেন: “রাসূলুল্লাহ (সা.) সাধারণ মানুষের সঙ্গে অত্যন্ত ভালো ব্যবহার করতেন। তিনি সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর পোশাক-পরিচ্ছদ ছিল সাধারণ মানুষের মতো এবং তিনি সবার সঙ্গে নির্দিধায় মিশে যেতেন। ক্রীতদাস এবং অতি দরিদ্র মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্বে তাঁর জুড়ি ছিল না। তাদের সঙ্গে ওঠাবসা করতেন, খাবার খেতেন এবং যেকোনো প্রয়োজনে তাদের পাশে থাকতেন। শিশুকাল থেকেই এগুলো ছিল তাঁর চারিত্রিক গুণাবলী এবং মুসলিম সমাজের  নেতা হওয়ার পরও সেই আচরণে বিন্দুমাত্র পরিবর্তন আসেনি। ক্ষমতা কিংবা সম্পদ তাঁকে পরিবর্তন করতে পারেনি। কষ্ট এবং সুখের দিনে তাঁর আচরণ ছিল একই রকম। সব অবস্থায় তাঁর অবস্থান ছিল সাধারণ মানুষের মধ্যে। খন্দকের যুদ্ধে মুসলমানরা যখন চারদিক দিয়ে শত্রু পরিবেষ্টিত হয়ে পড়েন তখন বাইরের জগতের সঙ্গে মদীনার সংযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ফলে মুসলমানদেরকে অবরুদ্ধ অবস্থায় খাবারের জন্য অনেক কষ্ট করতে হয়। কখনো দু’তিনদিন পর্যন্ত একজন মুসলমানকে অভুক্ত থাকতে হয়েছে। সেই কঠিন দিনে রাসূলুল্লাহ (সা.) খন্দকের মধ্যে মুসলিম যোদ্ধাদের মাঝে অবস্থান করেন এবং তাদের মতোই উপোষ থাকেন। মুসলিম বাহিনীর প্রধান হিসেবে নিজে বিশেষ কোনো সুবিধা নেয়ার কথা তিনি চিন্তাও করেননি।”

একদিন আল্লাহর রাসূল  মাটিতে বসে দুঃস্থ মানুষদের সঙ্গে খাবার খাচ্ছিলেন। এ সময় একজন বেদুঈন নারী এ দৃশ্য দেখে অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করে: “ইয়া রাসূলুল্লাহ, আপনি ক্রীতদাসদের মতো খাবার খাচ্ছেন? এ প্রশ্ন শুনে তিনি জবাব দেন: “আমার মতো ক্রীতদাস তুমি আর কোথায় খুঁজে পাবে?”

আল্লাহর রাসূল (সা.) সমাজে প্রচলিত সব ধরনের অনাচার-অবিচারের বিরুদ্ধে লড়াই করে মানুষের মধ্যে শান্তি ও ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। ফলে মানুষে মানুষে হিংসা-হানাহানি দূর হয়ে যায়।  আল্লাহ তায়ালা সূরা আ’রাফের ১৯৯ নম্বর আয়াতে বিশ্বনবীকে ক্ষমা করার, সৎকাজের নির্দেশ দেয়ার এবং মূর্খ জাহেলদের থেকে দূরে সরে থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। প্রিয়নবী সে নির্দেশ যথাযথভাবে পালন করেছেন। তিনি যেমন মানুষে মানুষে সম্ভাব গড়ে তুলেছিলেন তেমনি প্রতিটি ঈমানদার মুসলমানের অন্তরে নিজের জন্য বিশেষ স্থান করে নিতে পেরেছিলেন।

রাসূলের সাহাবীরা তাঁকে কতটা ভালোবাসতেন এবং শ্রদ্ধা করতেন তার বর্ণনা পাওয়া যায় ইসলামের তৎকালীন এক শত্রুর মুখে। হুদায়বিয়ার সন্ধির ঘটনায় মুসলমানদের সঙ্গে আলোচনা করতে এবং তাদেরকে হুমকি দিতে কুরাইশরা উরওয়া বিন মাসুদ নামের এক নেতাকে পাঠিয়েছিল। সে কুরাইশদের কাছে ফিরে গিয়ে বলেছিল,“হে কুরাইশ বংশের লোকেরা! আমি পৃথিবীর বহু রাজাদের দেশ সফর করেছি,আমি রোম ও পারস্যের সম্রাট এমনকি নাজ্জাশির দরবারও প্রত্যক্ষ করেছি। কিন্তু আমি কোন রাজার অনুচর,অনুসারীদের মধ্যে এরকম আনুগত্য আর বাধ্যতা দেখিনি যেমন মুহাম্মাদ (সা.)- এর ক্ষেত্রে তাঁর সাহাবাদের দেখেছি। যখনই তিনি কোন কথা বলতেন,তাঁরা নীরব থাকতো যেন কোন পাখি বসে আছে তাদের সবার মাথার উপর,যখনই তিনি ওযু করতেন তারা দ্রুত ছুটে যেত সেই পানির বিন্দুগুলো তবারক হিসেবে সঞ্চয় করতে,যখনই তাঁর চুল পড়তো তারা ছুটে গিয়ে তাও লুফে নিতো।  কাজে হে কুরাইশের লোকসকল! মুহাম্মাদ তোমাদের যে প্রস্তাব দিয়েছে তা গ্রহণ করো,কারণ আমার দৃঢ় বিশ্বাস তাঁর অনুসারীরা কখনও তাঁকে সমর্পণ করবে না,ছেড়ে যাবে না।”

মুসলিম সমাজের শাসক হিসেবে রাসূলুল্লাহ (সা.) কখনো অপরকে ছোট করার কাজে নিজের ক্ষমতাকে ব্যবহার করনেনি। তিনি কখনোই নিজের বড়ত্ব প্রকাশ করতেন না। খন্দকের যুদ্ধের সময় তিনি নিজে কোদাল হাতে মাটি খনন করেছেন এবং অন্য সবার মতো ঝুড়ি মাথায় নিয়ে মাটি বহন করেছেন। কোনো বৈঠকে গেলে তিনি তাঁকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য কাউকে দাঁড়াতে দিতেন না। অবশ্য এই সাদামাটা জীবনযাপনের কারণে কখনোই তাঁর ব্যক্তিত্ব ক্ষুণ্ন হয়েছে বা এই মহামানবের আধ্যাত্মিক মর্যাদার অবনয়ন হয়েছে- এমনটি কেউ বলতে পারবে না; বরং এ ধরনের আচরণ তাঁর ব্যক্তিত্ব ও মর্যাদাকে করেছিল আরো বেশি সমুন্নত। #

পার্সটুডে/মুজাহিদুল ইসলাম/ মো: আবু সাঈদ/ ১৫

২০১৮-০৬-১৫ ১৬:৩৫ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য