কুরআনের আলো অনুষ্ঠানের আজকের পর্বে সূরা আল আহযাবের ২২ থেকে ২৫ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যা তুলে ধরা হবে। এই সূরার ২২ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন,

وَلَمَّا رَأَى الْمُؤْمِنُونَ الْأَحْزَابَ قَالُوا هَذَا مَا وَعَدَنَا اللَّهُ وَرَسُولُهُ وَصَدَقَ اللَّهُ وَرَسُولُهُ وَمَا زَادَهُمْ إِلَّا إِيمَانًا وَتَسْلِيمًا (22)

“এবং যখন মুমিনরা শক্রবাহিনীকে দেখল, তখন বলল, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল এরই ওয়াদা আমাদেরকে দিয়েছিলেন এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সত্য বলেছেন। এতে তাদের ঈমান ও আত্নসমর্পণই বৃদ্ধি পেল।” (৩৩:২২)

গত কয়েকটি আসরে আমরা আহযাবের যুদ্ধে মুনাফিকদের আচরণ সম্পর্কে আলোচনা করেছি। আজকের এই আয়াতে মুমিনদের আচরণের প্রতি ইঙ্গিত করে বলা হয়ছে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল এবং তাঁদের প্রতি বিশ্বাস স্থাপনকারী প্রকৃত মুমিন ব্যক্তিরা যখন শত্রুবাহিনীর মুখোমুখি হন তখন বলে ওঠেন: আগেই মহান আল্লাহ কুরআনের আয়াতের মাধ্যমে আমাদেরকে এ খবর জানিয়েছিলেন যে, অতীত জাতিগুলোর মতো তোমরাও কঠিন পরিস্থিতি এবং শত্রুদের আক্রমণের সম্মুখীন হবে। রাসূলে খোদাও আগেই আমাদের বলেছিলেন, আরবদের বিভিন্ন গোত্র এবং শত্রুরা তোমাদের ধ্বংস করার জন্য ঐক্যবদ্ধ হবে। এ কারণে তারা যখন শত্রুবাহিনীর সম্মুখীন হন তখন মুনাফিকদের মতো পালিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে দৃঢ় পায়ে শত্রু সেনার মোকাবিলা করেন এবং প্রমাণ করে দেন যে, তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশের সামনে আত্মসমর্পণ করেছেন।

এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. মুমিন ব্যক্তি জানেন যে, অত্যাচারী শত্রু  তাকে কখনোই রেহাই দেবে না। এ কারণে তিনি সব সময় শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য প্রস্তুত থাকেন।

২. কাফেরদের মধ্যে হাজারো মতভেদ থাকলেও ইসলাম ও মুসলমানদের মোকাবিলায় তারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে যায়। মুসলমানদের ধ্বংস করার জন্য তারা তাদের সব শক্তি সমবেত করতেও কুণ্ঠিত হয় না।

৩. শত্রুবাহিনীর সৈন্য সংখ্যা অনেক বেশি দেখা সত্ত্বেও সংখ্যায় কম মুমিন ব্যক্তিরা কখনো যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে যান না। তারা আল্লাহর নির্দেশের সামনে আত্মসমর্পণ করেন, শত্রুদের কাছে নয়।

সূরা আহযাবের ২৩ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

مِنَ الْمُؤْمِنِينَ رِجَالٌ صَدَقُوا مَا عَاهَدُوا اللَّهَ عَلَيْهِ فَمِنْهُمْ مَنْ قَضَى نَحْبَهُ وَمِنْهُمْ مَنْ يَنْتَظِرُ وَمَا بَدَّلُوا تَبْدِيلًا (23)

“মুমিনদের মধ্যে কিছু পুরুষ আল্লাহর সাথে কৃত ওয়াদা পূর্ণ করেছে। তাদের কেউ কেউ শাহাদাৎবরণ করেছে এবং কেউ কেউ (শাহাদাতের) প্রতীক্ষা করছে। তারা কোনো অবস্থাতেই তাদের সংকল্প পরিবর্তন করেনি।” (৩৩:২৩)

আগের আয়াতে শত্রুর মোকাবিলায় প্রকৃত মুমিনদের শক্ত হাতে প্রতিরোধের কথা উল্লেখ করার পর এই আয়াতে বলা হচ্ছে: ঈমানদার ব্যক্তিরা মহান আল্লাহর সঙ্গে এই ওয়াদা করেছিলেন যে, ধর্মকে সহযোগিতা করতে তারা যেকোনো ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত থাকবে; এমনকি মৃত্যু আসলেও তারা পিছপা হবেন না। এভাবে তাদের কেউ কেউ বদর ও ওহুদের যুদ্ধে শহীদ হয়ে গিয়েছিলেন। তাদের আরেকটি দল উপযুক্ত সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন যাতে তারাও আল্লাহর রাস্তায় নিজেদের জীবন বিলিয়ে দিতে পারেন। কাজেই আল্লাহকে দেয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে তাদের মধ্যে কোনো ধরনের কার্পন্য দুর্বলতা দেখা দেয়নি। অন্যদিকে দুর্বল ঈমানের অধিকারী ব্যক্তিরা যুদ্ধের ময়দান পর্যন্ত আসার পরও যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে গিয়ে আত্মতৃপ্তি লাভ করেছে। এরপর নতুন করে কোনো যুদ্ধ এলে তাতে অংশগ্রহণ করার মতো মানসিকতাও এদের ছিল না।

এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. ঈমানের দিক দিয়ে সব মুসলমানের অবস্থান সমান নয়। তাদের একেক জনের ঈমানি শক্তি একেক রকম। কেউ কেউ শান্তিপূর্ণ ও বিলাসিতায় ভরা জীবন পছন্দ করে এবং কেউ কেউ আল্লাহর রাস্তায় শহীদ হওয়ার জন্য সারাক্ষণ প্রস্তুত থাকে।

২. জীবন দিয়ে হলেও ধর্ম রক্ষার জন্য প্রস্তুত থাকা হচ্ছে ঈমানের ব্যাপারে সত্যবাদী থাকা এবং আল্লাহর সঙ্গে কৃত প্রতিশ্রুতি পালনের লক্ষণ।

৩. প্রকৃত মুমিন ব্যক্তি তার নিকটজন ও বন্ধু-বান্ধবকে শহীদ হতে দেখে ভয় পেয়ে যান না। তারা যুদ্ধক্ষেত্র পশ্চাদপসরণ বা পালিয়েও যান না; বরং নিজেরাও শাহাদাতের অমীয় সুধা পান করার জন্য প্রস্তুতি নেন।

এই সূরার ২৪ ও ২৫ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

  لِيَجْزِيَ اللَّهُ الصَّادِقِينَ بِصِدْقِهِمْ وَيُعَذِّبَ الْمُنَافِقِينَ إِنْ شَاءَ أَوْ يَتُوبَ عَلَيْهِمْ إِنَّ اللَّهَ كَانَ غَفُورًا رَحِيمًا (24) وَرَدَّ اللَّهُ الَّذِينَ كَفَرُوا بِغَيْظِهِمْ لَمْ يَنَالُوا خَيْرًا وَكَفَى اللَّهُ الْمُؤْمِنِينَ الْقِتَالَ وَكَانَ اللَّهُ قَوِيًّا عَزِيزًا (25)

“এটা এজন্য যাতে আল্লাহ সত্যবাদীদেরকে তাদের সত্যবাদিতার কারণে প্রতিদান দেন এবং ইচ্ছা করলে মুনাফেকদেরকে শাস্তি দেন অথবা (তওবা করলে) ক্ষমা করে দেন। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” (৩৩:২৪) 

“এবং আল্লাহ কাফেরদেরকে ক্রুদ্ধাবস্থায় ফিরিয়ে দিলেন। তারা কোন কল্যাণ পায়নি। যুদ্ধ করার জন্য আল্লাহ মুমিনদের জন্যে যথেষ্ট হয়ে গেছেন (অর্থাৎ তাদেরকে যুদ্ধে জয়ী করেছেন)।  এবং আল্লাহ শক্তিধর, মহা পরাক্রমশালী।” (৩৩:২৫)

এই দুই আয়াতে আহযাবের যুদ্ধের ফলাফল এভাবে বর্ণনা করা হয়েছে: সত্যবাদী যেসব মুমিন শত্রুবাহিনীকে মোকাবিলা করার জন্য বর্ম পরিধান করেছে এবং আল্লাহর রাস্তায় জীবন দেয়ার জন্য রাসূলুল্লাহ (সা.)’র পাশে এসে দাঁড়িয়েছে তারা আল্লাহ তায়ালার কাছ থেকে মহা পুরস্কার লাভ করবে। যদিও আহযাবের যুদ্ধে দুই পক্ষের মধ্যে কোনো সংঘর্ষ হয়নি এবং তাদের কেউ শহীদও হয়নি।  অন্যদিকে মুনাফিকদের মনোবল ছিল দুর্বল এবং তারা অন্যদের মনোবলও দুর্বল করে দিয়েছিল। ফলে তারা আল্লাহ তায়ালার শাস্তি পাওয়ার যোগ্য হয়ে গিয়েছিল। তবে তাদের মধ্যে যারা তওবা করে মুমিনদের মধ্যে ফিরে এসেছিল তাদেরকে আল্লাহ ক্ষমা করে দিয়েছিলেন।

অন্যদিকে যেসব কাফির ও মুশরিক ভেবেছিল, তারা সম্মিলিতভাবে আক্রমণ করে ইসলামের শেকড় উৎপাটন করবে এবং আল্লাহর রাসূল ও তাঁর অনুসারীদের ধ্বংস করে দেবে তারা কোনো ধরনের গনীমাতের মাল ছাড়াই ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছিল।

এই ঘটনার মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা মুসলমানদের এই শিক্ষা দেন যে, তারা যেন কোনো অবস্থাতেই ইসলামের শত্রুকে ভয় না করে।  অন্যদিকে শত্রুর সামনেও এ বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে, মহান আল্লাহর পরিকল্পনার সামনে তাদের ষড়যন্ত্র কোনো কাজেই আসবে না। তারা আল্লাহর ক্ষমতার ওপর কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করতে পারে না।  এ কারণে, মুসলমানদের সমূলে উপড়ে ফেলার লক্ষ্যে যেসব শত্রু  ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল তারা অত্যন্ত দুঃখ ভারাক্রান্ত মনে এবং ক্ষুব্ধ হয়ে নিজেদের জনপদে ফিরে যায়।  মুসলমানদের ধ্বংস করার ব্যাপারে তাদের মনবাসনা অপূর্ণই থেকে যায়।

এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. সত্যবাদিতা শুধু কথায় প্রমাণিত হয় না। কাজেও আল্লাহর সঙ্গে করা প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন ঘটাতে হয়। আমরা যেন ধর্মের সহযোগিতা করতে গিয়ে কোনো ধরনের অবহেলা  বা উদাসিনতা না দেখাই।

২. মহান আল্লাহর দয়া থেকে কেউ দূরে নয়। এমনকি প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকারী মুনাফিকরাও অনুতপ্ত হয়ে তওবা করার মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালার ক্ষমা লাভের যোগ্য হতে পারে।  এ ছাড়া, আল্লাহ তায়ালা তাঁর প্রজ্ঞা অনুযায়ী যাকে খুশি তাকে এমনিতেই ক্ষমা করে দিতে পারেন।

৩. পার্থিব জীবনে চলার পথে বিভিন্ন পরিকল্পনা করার সময় শুধুমাত্র বস্তুগত সুযোগ সুবিধা ও অবস্থা বিবেচনা করলে হবে না। বস্তুগত জগতের ঊর্ধ্বে আল্লাহ তায়ালার গায়েবি মদদের কথাও আমাদেরকে সব সময় মনে রাখতে হবে। #

 

২০১৮-০৬-১৭ ১৭:৩৭ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য