গত আসরে আমরা মুসলমানদের ধর্মীয় চেতনা সমুন্নত রাখার ক্ষেত্রে মসজিদের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করেছিলাম। আজকের আসরের প্রথম অংশে আমরা মুসলমানদের জীবনে মসজিদের ভূমিকা দুর্বল করে ফেলার প্রচেষ্টা সম্পর্কে আলোচনা করব। আর দ্বিতীয় অংশে থাকবে তুরস্কের ‘আয়া সোফিয়া’ মসজিদ পরিচিতি।

গত আসরে আমরা বলেছিলাম, স্বৈরাচারী ও জালেম শাসকদের বিরুদ্ধে ভূমিকা রাখার কারণে যুগে যুগে বহু মসজিদ শাসকের রোষাণলে পড়ে ধ্বংস হয়ে গেছে। মুসলিম নামধারী অনেক খোদাদ্রোহী শাসক অনেক মসজিদ ধ্বংস করেছেন আবার কখনো মসজিদে নামাজ আদায় বন্ধ করে দিয়ে এর ভবনকে ভিন্ন কোনো কাজে ব্যবহার করেছেন। কিন্তু প্রায় সাড়ে ১৪০০ বছর ধরে মুসলমানদের ধর্মীয় জীবনের সঙ্গে মসজিদ ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে যাওয়ায় মুসলিম সমাজ থেকে মসজিদকে আলাদা করে ফেলা সম্ভব হয়নি। হযরত আলী (আ.)’র শাহাদাতের মাধ্যমে খোলাফায়ে রাশেদিনের শাসনকাল শেষ হয়ে যাওয়ার পর শাসকের সঙ্গে জনগণের সরাসরি সম্পর্ক স্থাপনের প্রধান কেন্দ্র মসজিদকে বনি উমাইয়া শাসকরা তাদের রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করার কাজে ব্যবহার করেছেন।

তুরস্কের ‘আয়া সোফিয়া’ মসজিদ

বনি উমাইয়াদের প্রথম শাসক মুয়াবিয়া বিন আবু সুফিয়ান নিজেকে রাসূলুল্লাহ (সা.)’র খলিফা ঘোষণা করেন। এই ঘোষণার মাধ্যমে তিনি নিজেকে মুসলিম সাম্রাজ্যের প্রধান জামায়াত ও জুমার নামাজের ইমামতি করার যোগ্যতম ব্যক্তিতে পরিণত করেন। মুয়াবিয়া মসজিদের মিম্বারে উঠে বক্তৃতা দিতেন এবং ইসলামি শিক্ষার ভুল ব্যাখ্যা করে জনগণের ওপর জুলুম ও নির্যাতনকে সিদ্ধ করে নিতেন। পরবর্তী সময়ে যুগে যুগে স্বঘোষিত খলিফা, সুলতান, রাজা-বাদশাহরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে একই পদ্ধতিতে শাসনক্ষমতা টিকিয়ে রাখার কাজে মসজিদকে ব্যবহার করেছেন।

আজও অনেক মুসলিম দেশের শাসকরা নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার কাজে মসজিদকে ব্যবহার করছেন। অন্যদিকে সেক্যুলার বা ইসলাম বিদ্বেষী শাসকরা চেষ্টা করছেন মানুষের সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবন থেকে মসজিদকে পুরোপুরি আলাদা করে ফেলতে। কিন্তু মুসলমানরা ধর্মপরায়ণ হওয়ার কারণে ইসলাম বিদ্বেষী শাসকরা এ কাজে তেমন একটা সফল হননি। তারপরও এসব সরকার দ্বীন প্রচারের প্রধান কেন্দ্র মসজিদকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করছেন। এসব দেশের মসজিদ এখন শুধুমাত্র নামাজ আদায় করার স্থানে পরিণত হয়েছে, সেখানে অন্য সব তৎপরতা নিষিদ্ধ। রাজনৈতিক, সামাজিক বা সাংস্কৃতিক কাজ এখন আর মসজিদে করা সম্ভব নয়। উদাহরণ হিসেবে শতকরা ৯৮ ভাগ মুসলমানের দেশ তাজিকিস্তানের কথা উল্লেখ করা যায়। দেশটির সেক্যুলার সরকার সেখানে রাজনীতি থেকে ধর্মকে পুরোপুরি আলাদা করে ফেলার চেষ্টা করছে। তাজিকিস্তান সরকার নিবন্ধন না থাকার অজুহাতে এ পর্যন্ত বহু মসজিদ বন্ধ করে দিয়েছে।  

এক্ষেত্রে উদাহরণ হিসেবে তুরস্কের নামও উল্লেখ করা যায়। দেশটির সেক্যুলার শাসকরা প্রায় ১০০ বছর যাবত তুরস্ক থেকে ইসলামের নাম-নিশানা মুছে ফেলার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু বর্তমানে দেশটির বৃহত্তম শহর ইস্তাম্বুলে পাঁচ ওয়াক্ত আজানের ধ্বনি শোনা যায় এবং মুসলমানরা দলে দলে শহরের মসজিদগুলোতে নামাজ আদায়ের জন্য সমবেত হন। ইথিওপিয়ার মতো আফ্রিকার অনুন্নত দেশেও এক সময় সেক্যুলার শাসকরা একই রকম প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। কিন্তু বর্তমানে সেদেশের মুসলমানদের ধর্মীয় চেতনা এতটা শক্তিশালী যে আজান হলে নামাজ আদায়ের জন্য মসজিদগুলোতে তিল ধারণের জায়গা থাকে না। অনেক মসজিদে এক ওয়াক্ত নামাজে তিন থেকে চারবার পর্যন্ত জামায়াত অনুষ্ঠিত হয়।

মসজিদ ধ্বংস বা সমাজে মসজিদের ভূমিকা দুর্বল করে ফেলার সব রকম প্রচেষ্টা সত্ত্বেও আজও মসজিদ মুসলমানদের মধ্যে ঐক্য ও সংহতি রক্ষার প্রতীক হয়ে রয়েছে। কাতারবন্দি হয়ে গায়ে গায়ে লেগে নামাজ আদায় করে মুসলমানরা নিজেদের মধ্যকার গভীর সম্পর্কের এক অপূর্ব নিদর্শন স্থাপন ধরেন। এখানে এক একজন মুসল্লি এক এক ফোঁটা পানির মতো পরস্পরের সঙ্গে মিলিত হয়ে বিশাল সমুদ্রে পরিণত হন। তারা সবাই ক্বিবলামুখী হয়ে এক আল্লাহর প্রশংসায় সানা ও হামদ পাঠ করতে করতে তাঁর ইবাদতে মশগুল হয়ে যান।

তো বন্ধুরা! শুরুতেই যেমনটি বলেছি, আসরের এ পর্যায়ে আমরা তুরস্কের ‘আয়া সুফিয়া’ মসজিদের সঙ্গে আপনাদের পরিচয় করিয়ে দেব। খ্রিস্টিয় চতুর্থ শতকে খ্রিস্টান সম্রাট দ্বিতীয় কনস্টান্টিন প্রথম এই মসজিদের স্থাপনাটি নির্মাণ করেন। ৩৬০ খ্রিস্টাব্দের ১‌৫ ফেব্রুয়ারি ‘হাজিয়া সোফিয়া’ গির্জা নামে এই স্থাপনা খ্রিস্টানদের উপাসনার জন্য খুলে দেয়া হয়। ৪০৪ খ্রিস্টাব্দে কনস্টান্টিনোপলে সৃষ্ট দাঙ্গায় এই গির্জার একাংশ ভস্মীভূত হয়। পরবর্তীতে খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীতে এটিকে পুনর্নির্মাণ করা হয়। এরপর দীর্ঘ প্রায় এক হাজার বছর এটি খ্রিস্টানদের উপাসনালয় হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। খ্রিস্টীয় পঞ্চদশ শতাব্দীতে তৎকালীন বাইজান্টাইন সম্রাটের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়ী হয়ে কনস্টান্টিনোপলের নিয়ন্ত্রণ নেন দ্বিতীয় মুহাম্মাদ খ্যাত ওসমানীয় শাসক সুলতান মোহাম্মাদ ফাতেহ। তিনি কনস্টান্টিনোপলের নাম পরিবর্তন করে ইস্তাম্বুল রাখেন এবং ‘হাজিয়া সোফিয়া’ গির্জাকে ‘আয়া সোফিয়া’ মসজিদে রূপান্তর করেন।

আয়া সোফিয়া মসজিদের অবস্থা তখন খুব খারাপ; এমনকি এর দরজাগুলিও ভেঙে নীচে পড়েছিল। সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মাদ এটির মেরামতের নির্দেশ দেন এবং স্থাপনাটিতে চারটি মিনার সংযুক্ত করেন। পরবর্তীতে ষোড়শ শতাব্দীতে দ্বিতীয় সুলতান সেলিমের শাসনামলে আয়া সোফিয়া মসজিদের বহিরাবরণকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করার উদ্যোগ নেয়া হয়। এই কাজের দায়িত্ব পান তৎকালীন ওসমানীয় সাম্রাজ্যের বিখ্যাত স্থাপত্যশিল্পী ‘মিমার সিনান’। ইতিহাসে সিনান ছিলেন প্রথম স্থাপত্যশিল্পী যিনি তার নির্মিত স্থাপনাগুলোকে ভূমিকম্প প্রতিরোধক্ষম করে তৈরি করেছিলেন।  আয়া সোফিয়া মসজিদকেও একই বৈশিষ্ট্য দেয়ার পর তিনি মসজিদের পশ্চিম পার্শ্বে আরো দু’টি মিনার সংযোজন করেন। পরবর্তীতে দ্বিতীয় সুলতান সেলিম ইন্তেকাল করলে ১৫৭৭ খ্রিস্টাব্দে মসজিদের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে সুলতানের সমাধি স্থাপন করা হয়।

ওই সময়ে মসজিদটিতে আরো যেসব স্থান সংযোজন করা হয় সেগুলোর মধ্যে রয়েছে সুলতানের বসার জায়গা, মরমর পাথরে তৈরি মিম্বার এবং মুয়াজ্জিনের জন্য একটি ছাদযুক্ত বারান্দা। ১৭৩৯ খ্রিস্টাব্দে তৎকালীন সুলতান প্রথম মাহমুদ আবার এই মসজিদ পুনর্নির্মাণের নির্দেশ দেন। এই সময়ে আয়া সোফিয়া মসজিদে একটি মাদ্রাসা সংযোজন করা হয় যেটি বর্তমানে লাইব্রেরিতে রূপ নিয়েছে। এই লাইব্রেরিতে রয়েছে তিন লাখেরও বেশি বই। সেইসঙ্গে এ সময়ে দরিদ্র মানুষদের তৈরি করা খাবার পরিবেশনের জন্য একটি বড় রান্নাঘর স্থাপন করা হয়। এই মসজিদে সবচেয়ে ব্যাপকভিত্তিক মেরামত ও পুনর্নির্মাণ কাজ হয় ১৮৪৮ ও ১৮৪৯ খ্রিস্টাব্দে। সে সময় এই কাজে ৮০০ শ্রমিক নিয়োগ করা হয়। এবার মসজিদের পিলারগুলোতে বিশাল বিশাল গোলাকৃতি ফলক ঝুলিয়ে দেয়া হয়। এসব ফলকে শোভা পায় আল্লাহ তায়ালার গুণবাচক নামগুলো। পাশাপাশি বিশ্বনবী (সা.), আবুবকর, ওমর, ওসমান, আলী, হাসান ও হোসেইনের নামও এসব ফলকে স্থাপন পায়।

আয়া সোফিয়া মসজিদের আয়তন প্রায় ছয় হাজার বর্গমিটার। চারটি বিশাল স্তম্ভের উপর মসজিদের মূল গম্বুজ স্থাপন করা হয়েছে। এ ছাড়া, মসজিদে রয়েছে মোট ১০৭টি স্তম্ভ ও নয়টি দরজা। মূল গম্বুজের নীচ দিয়ে মসজিদের ভেতরে সূর্যের আলো পৌঁছানোর জন্য স্থাপন করা হয়েছে ৪০টি জানালা। এসব জানালা দিয়ে মসজিদের সোনালী মোজাইকের উপর যখন সূর্যের আলো নিক্ষিপ্ত হয় তখন চমৎকার এক আধ্যাত্মিক পরিবেশ ও দৃশ্যের অবতারণা হয় যা দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে।

এত সুদীর্ঘকালের ইতিহাস সমৃদ্ধ এই মসজিদটিকে ১৯৩৫ সালে তৎকালীন তুর্কি প্রেসিডেন্ট কামাল আতাতুর্ক যাদুঘরে রূপান্তর করেন। প্রেসিডেন্টের নির্দেশে আল্লাহ, রাসূলুল্লাহ (সা.), খোলাফায়ে রাশেদিন এবং ইমাম হাসান ও ইমাম হোসেইন আলাইহিমুস সালামের নাম সম্বলিত ফলকগুলো নামিয়ে ফেলা হয়। অন্য কোনো মসজিদে স্থাপনের জন্য ফলকগুলোকে মসজিদ থেকে বের করতে গিয়ে দেখা দেয় বিপত্তি। এসব ফলকের আকার আয়া সোফিয়া মসজিদের দরজাগুলোর চেয়ে বড় হওয়ায় সেগুলো বের করা সম্ভব হয়নি। এ কারণে ফলকগুলোকে মসজিদের এক কোণে ফেলে রাখা হয়। অবশ্য  এর একযুগেরও বেশি সময় পর ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দে ফলকগুলোকে আগের মতো স্তম্ভের সঙ্গে ঝুলিয়ে দেয়া হয়।

১৯৩৫ সালে মসজিদটিকে যাদুঘরে রূপ্তান্তর করার পর থেকে এখানে নামাজ আদায় করা নিষিদ্ধ ছিল। ২০০৬ সালে তুর্কি সরকার মুসলমানদের নামাজ আদায় এবং খ্রিস্টানদের উপাসনার জন্য যাদুঘরের একটি অংশ বরাদ্দ দেন। ২০১৩ সালে মসজিদের মিনার থেকে প্রতিদিন দুই ওয়াক্ত নামাজের আজান প্রচার শুরু হয়।#

পার্সটুডে/মুজাহিদুল ইসলাম/ মো: আবু সাঈদ/  ১৮

ট্যাগ

২০১৮-০৬-১৮ ১৯:২৯ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য