রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সবচেয়ে বড় মুজিযা ছিল মহাগ্রন্থ আল-কুরআন যার আয়াতগুলো মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহী আকারে হযরত জিব্রাইল তাঁর কাছে পৌঁছে দিতেন।

আল্লাহর রাসূল ততক্ষণ পর্যন্ত কোনো কথা বলতেন না যতক্ষণ পর্যন্ত না ওহীর ফেরেশতা তার কাছে নাজিল হতো। আজকের আসরে আমরা এ মুজিযার মাধ্যমে আল্লাহর রাসূল কীভাবে একটি কুফরি সমাজকে একত্ববাদী সমাজে পরিণত করেন সে সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করার চেষ্টা করব।

 

ইতিহাসে এসেছে, আল্লাহর রাসূলের নবুওয়াতপ্রাপ্তির সময় গোটা বিশ্ব বিশেষ করে আরব উপত্যকা হত্যা, ধর্ষণ, রাহাজানি, লুটতরাজ, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গোত্রে গোত্রে প্রতিশোধ পরায়ণতাসহ নানা ধরনের অন্যায়, অত্যাচার ও অবিচারে পরিপূর্ণ ছিল। পবিত্র কুরআনে সে যুগকে আইয়ামে জাহিলিয়াত বা অন্ধকারের যুগ বলে অভিহিত করা হয়েছে।মানুষ তখন এতটা মূর্খ ছিল যে, কোনো কোনো গোত্রের লোকজন দারিদ্রের ভয়ে নিজ সন্তানদের হত্যা করত। কন্যা সন্তান পরিবারের অর্থনৈতিক কার্যক্রমে তেমন কোনো ভূমিকা রাখত না বলে মূলত কন্যা সন্তানকে জীবন্ত মাটিতে পুতে ফেলা হতো। পবিত্র কুরআনের সূরা বনি ইসরাইলের ৩১ নম্বর আয়াতে এ সম্পর্কে বলা হয়েছে- “তোমরা দারিদ্রের ভয়ে নিজের সন্তানদের হত্যা করো না...।”

ইসলাম আসার আগে আরবে অর্থ উপার্জন ও সম্পদ আহরণের অন্যতম প্রচলিত উপায় ছিল হত্যা ও লুণ্ঠন।  কথায় কথায় তরবারি বের করে মানুষ হত্যা করা আরব বেদুঈনদের জীবনের প্রধান অনুষঙ্গে পরিণত হয়েছিল।

শান্তির ধর্ম ইসলাম এরকম একটি অন্ধকার সমাজ থেকে জাহিলিয়াতের যুগের এসব অন্যায়, অত্যাচার ও অনাচার দূর করে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। আল্লাহ তায়ালার অশেষ মেহেরবানি এবং সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব হযরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় সেই বর্বর আরব সমাজের মানুষগুলো সভ্য হয়ে ওঠে এবং একটি অসুস্থ ও ঘুনে ধরা সমাজের বর্বর লোকেরা আল্লাহর একত্ববাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে মানবীয় মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষে পরিণত হয়।

অসভ্য আরব সমাজের সভ্য হয়ে ওঠার দিনগুলোতে আমিরুল মুমেনিন আলী (আ.) ছিলেন বিশ্বনবী (সা.)-এর বিশ্বস্ত সঙ্গী ও সহচর। সেই দিনগুলো সম্পর্কে হযরত আলী (আ.) বলেন, “আল্লাহ তায়ালা রাসূলে খোদা (সা.)কে নবুওয়াত দিয়ে ধুলির ধরায় প্রেরণ করার আগে যুগ যুগ ধরে পৃথিবীতে কোনো নবী-রাসূল আসেননি। এই দীর্ঘ সময়ে জাতিগুলো ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা থেকে  অনেক দূরে সরে গিয়েছিল। সমাজে কোনো চেইন-অব-কমান্ড ছিল না; যুদ্ধ এবং পেশিশক্তি ছিল কথা বলার ও পারস্পরিক সম্পর্কের প্রধান হাতিয়ার। পাপাচারে পরিপূর্ণ সমাজে গুনাহ করাকে অন্যায় বলেই ধরা হতো না। মানুষে মানুষে প্রতারণা করা ছিল অতি স্বাভাবিক ব্যাপার। মানবীয় মূল্যবোধগুলো একে একে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে এসে পৌঁছেছিল এবং তাদেরকে সঠিক পথ দেখানোর মতো কেউ অবশিষ্ট ছিল না।  এ ধরনের সমাজে সারাক্ষণ বিশৃঙ্খলা, গন্ডগোল, গোলযোগ ও যুদ্ধবিগ্রহ লেগে থাকবে- এটাই স্বাভাবিক। রক্তপিপাসু তলোয়ারই শেষ কথা বলত বলে সমাজের বেশিরভাগ মানুষ সারাক্ষণ জীবন ও সম্পদ রক্ষার চিন্তায় আতঙ্কিত থাকত।”

আরব উপত্যকার এই অন্ধকারাচ্ছন্ন সমাজে ইসলাম নিয়ে আসে এক যুগান্তকারী বিপ্লব। সে বিপ্লবের প্রভাবে পাপাচারে পরিপূর্ণ সমাজ খাঁটি সোনায় পরিণত হয়। আরবদের সেই যুদ্ধ করার শক্তি ও মানসিকতাকে ইসলামের মানবীয় মূল্যবোধ ও মর্যাদাকে রক্ষার হাতিয়ারে পরিণত করা হয়। ইসলাম রক্ষার সে যুদ্ধের নাম দেয়া হয় জিহাদে ফি সাবিলিল্লাহ। শুধু ইসলামের মূল্যবোধ ও উৎসভূমি রক্ষার কাজেই জিহাদকে কাজে লাগানো হয়নি বরং এর মাধ্যমে আরব উপত্যকার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলিও অচিরেই মুসলিম সাম্রাজ্যের অন্তর্গত হয়।

আমরা আগের কোনো এক আসরে বলেছি, মক্কার কাফেরদের অত্যাচার থেকে মুসলমানদের রক্ষা করার উদ্দেশ্যে তাদের একদলকে রাসূলুল্লাহ (সা.) আফ্রিকার দেশ হাবাশায় পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। হাবাশার খ্রিস্টান বাদশাহ নাজ্জাশি যাতে এসব মুসলমানকে আশ্রয় না দেন সেজন্য কাফেরদের পক্ষ থেকে একদল প্রতিনিধিকে সেখানে পাঠানো হয়। তারা নাজ্জাশির দরবারে গিয়ে ইসলামের নবী ও মুসলমানদের সম্পর্কে নানা ধরনের কুৎসা রটনা করে। এ সময় নাজ্জাশি মুসলিম প্রতিনিধিদলের কাছে এসব অভিযোগ সম্পর্কে ব্যাখ্যা জানতে চান। তখন প্রতিনিধিদলের নেতা জাফর ইবনে আবি তালেব বলতে শুরু করেন। তিনি অন্ধকার যুগে নিজেদের পাপাচারপূর্ণ জীবনের কথা স্মরণ করে বলেন: “জি, আমাদের জীবন যখন এরকম ছিল ঠিক তখন আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে সঠিক পথ প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে আমাদের মধ্য থেকেই একজন নবী পাঠান। তাঁর সত্যবাদিতার প্রতি আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস রয়েছে। বহু বছর ধরে মক্কার প্রতিটি মানুষ তাঁর আমানতদারির সাক্ষী। পাপে ভরা সমাজে তিনি পবিত্রতম জীবন যাপন করে এসেছেন।”

মুসলিম প্রতিনিধিদলের প্রধান আরো বলেন, “আল্লাহর রাসূল আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন আমরা যেন সত্যবাদী হই এবং আমানতকে তার মালিকের হাতে হস্তান্তর করি। তিনি আমাদেরকে আত্মীয়তার বন্ধন শক্তিশালী করার আহ্বান জানানোর পাশাপাশি হারাম কাজ ও রক্তপাত বন্ধ করতে বলেছেন। আল্লাহর রাসূল আমাদেরকে অশ্লীলতা ও লাগামহীন আচরণ পরিহার করার আদেশ দিয়েছেন। তিনি আমাদেরকে মিথ্যা কথা ও কপট আচরণ না করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, আমরা যেন ইয়াতিমের সম্পদ গ্রাস করা থেকে বিরত থাকি।  আল্লাহর রাসূল (সা.) বলেছেন, পরস্পরের ব্যাপারে ভালো ধারণা পোষণ করবে এবং অপরের সম্পর্কে কুৎসা রটনা করবে না। তিনি আমাদেরকে এক আল্লাহর ইবাদত করার ও তার বান্দা বা দাস হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন এবং আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে ইবাদতের যোগ্য মনে করতেও নিষেধ করেছেন। ”

ইসলাম সব মানুষকে মানবীয় মর্যাদা দান করেছে। সেই সৃষ্টির শুরুতে মহান আল্লাহ মাটির তৈরি নিস্প্রাণ কাঠামোয় নিজের রুহ ফুঁকে দেয়ার মাধ্যমে সেটিকে সৃষ্টির সেরা জীবে পরিণত করেন। এই মানুষ যাতে নিজের নফ্‌স কিংবা শয়তানের ধোঁকায় পড়ে বিপথগামী না হয় সেজন্য দয়ালু আল্লাহ যুগে যুগে অসংখ্য নবী-রাসূল ও আসমানি কিতাব পাঠিয়ে মানুষকে সঠিক পথে পরিচালিত করেছেন। সেইসঙ্গে প্রত্যেক মানুষের অন্তরে আক্‌ল বা বিবেক-বুদ্ধি দান করেছেন যা দিয়ে সে সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য করতে পারে। এই আক্‌লের দিক-নির্দেশনা সঠিক সময়ে সঠিকভাবে পালন করলে যেকোনো মানুষ আল্লাহ তায়ালার প্রিয়পাত্রে পরিণত হতে পারে। ইসলাম মানুষকে দায়িত্বশীল সৃষ্টি হিসেবে প্রতি মুহূর্তে আল্লাহর দেয়া বিধিবিধান মেনে চলার আহ্বান জানায়। #

পার্সটুডে/মুজাহিদুল ইসলাম/ মো: আবু সাঈদ/ ২৫

২০১৮-০৬-২৫ ১৫:২৩ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য