সুরা হাদিদ পবিত্র কুরআনের ৫৭ তম সুরা। ২৯ আয়াতের এই সুরা মদিনায় নাজিল হয়েছিল। হাদিদ শব্দের অর্থ লোহা। এ সুরার ২৫ নম্বর আয়াতে শব্দটির উল্লেখ রয়েছে।

একত্ববাদ, মহান আল্লাহর নানা গুণ, পবিত্র কুরআনের শ্রেষ্ঠত্ব, আল্লাহর পথে দান করা ও বিশেষ করে জিহাদের জন্য দান করা, কিয়ামতের দিন বা বিচার দিবসে মু'মিন ও মুনাফিকদের অবস্থা, পূর্ববর্তী জাতিগুলোর ইতিহাস ও দুনিয়ার জীবনের প্রকৃতি- এই সুরার কয়েকটি আলোচ্য বিষয়। বেহেশতের বিশাল পরিসর, নবি-রাসুলদের আগমনের উদ্দেশ্য ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, লোহার ব্যবহার ও উপকারিতা, সন্ন্যাসব্রত বা বৈরাগ্যবাদের নিন্দা এবং সামাজিক দিক থেকে একঘরে হওয়া বা করা –ইত্যাদি সম্পর্কেও বক্তব্য রয়েছে সুরা হাদিদে।

সুরা হাদিদের প্রথম আয়াতেই মহান আল্লাহর কয়েকটি বৈশিষ্ট্য তুলে ধরে বলা হয়েছে:

নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলে যা কিছু আছে, সবাই আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা করে। তিনি শক্তিধর; প্রজ্ঞাময়।

 

মহান আল্লাহর তাসবিহ বা প্রশংসার মূল কথা হল তাঁকে সব ধরনের ত্রুটি, দুর্বলতা, অপূর্ণতা ও দোষ থেকে মুক্ত বলে মনে করা এবং তা ঘোষণা করা। বিশ্বের সব অস্তিত্বই মহান আল্লাহর প্রশংসা করে এবং তাঁর সত্তা যে সব ধরনের ত্রুটি, দুর্বলতা, অপূর্ণতা ও দোষ থেকে পবিত্র সেই সাক্ষ্য দেয়।

সুরা হাদিদের দ্বিতীয় আয়াতেও মহান আল্লাহর কয়েকটি গুণ তুলে ধরা হয়েছে। এ আয়াতে বলা হয়েছে:

নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের রাজত্ব তাঁরই। তিনি জীবন দান করেন ও মৃত্যু ঘটান। তিনি সবকিছু করতে সক্ষম।

-অর্থাৎ মহান আল্লাহ বিশ্ব-জগত ও অস্তিত্ব জগতের সব কিছুর ওপর কর্তৃত্ব রাখেন। তাই একমাত্র তিনিই জীবন দেয়ার ও মৃত্যু ঘটানোর ক্ষমতা রাখেন।

সুরা হাদিদের তিন নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহর আরও কয়েকটি বৈশিষ্ট তুলে ধরে বলা হয়েছে: 'তিনিই প্রথম, তিনিই সর্বশেষ, তিনিই প্রকাশমান ও অপ্রকাশমান এবং তিনি সব বিষয়ে সম্যক পরিজ্ঞাত।'

-অর্থাৎ মহান আল্লাহ আদি এই অর্থে যে যখন সৃষ্ট কোনো কিছুরই অস্তিত্ব ছিল না তখনও তিনি ছিলেন। আবার তিনি অনন্ত তথা কখনও যদি এমন সময় আসে যখন কেউ থাকবে না তখনও আল্লাহ থাকবেন। মহান আল্লাহ অনিবার্য অস্তিত্ব তথা ওয়াজিবুল ওয়াজুদ। আল্লাহর অস্তিত্ব তাঁরই জাতগত বা সত্তাগত এবং তা বাইরের থেকে আসা কিছু নয়। তাই তাঁর সমাপ্তি ও শুরু বলে কিছু নেই।  মহান আল্লাহ অস্তিত্ব জগতের সূচনাকারী ও স্রষ্টা। সব কিছু ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পরও তিনি থাকবেন। আল্লাহর অপ্রকাশমানতা ও প্রকাশমানতা বলতে সব কিছুর ওপর তাঁর কর্তৃত্ব থাকার কথা বোঝায়। সব কিছুর মধ্যেই মহান আল্লাহর মহিমা দেখা যায় বলে সেসবই মহান আল্লাহর প্রকাশমানতার নিদর্শন। অন্যদিকে মহান আল্লাহ অপ্রকাশমান। কারণ,মহান আল্লাহর মূল সত্তাগত পরিচিতি সবার কাছেই গোপন।  

সুরা হাদিদের চার নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহর আরও কিছু বৈশিষ্ট তুলে ধরে বলা হয়েছে: 'তিনি নভোমন্ডল ও ভূ-মন্ডল সৃষ্টি করেছেন ছয়দিনে তথা ছয় যুগে, এরপর আরশের উপর সমাসীন হয়েছেন। তিনি জানেন যা ভূমিতে প্রবেশ করে ও যা ভূমি থেকে নির্গত হয় এবং যা আকাশ থেকে বর্ষিত হয় ও যা আকাশে উত্থিত হয়। তিনি তোমাদের সাথে আছেন তোমরা যেখানেই থাক। তোমরা যা কর, আল্লাহ তা দেখেন।'

 

-এ আয়াতে বলা হচ্ছে যে মহান আল্লাহ বিশ্ব-জগত সৃষ্টির পর আরশে আসীন হন এবং বিশ্বকে শাসন ও পরিচালনার কাজ শুরু করেন। এখানে আরশ শব্দটিকে রূপক বা উপমা হিসেবে ধরে নিতে হবে। আরশের অর্থ হল মহান আল্লাহর কর্তৃত্ব ও ব্যবস্থাপনা। মহান আল্লাহ যে অশেষ জ্ঞানের অধিকারী তাও এই আয়াতে স্পষ্ট করা হয়েছে।

 

বৃষ্টির প্রতিটি ফোটা, উদ্ভিদের প্রতিটি শস্য, ভূমির নানা অংশের তথা মাটির ওপরের ও ভেতরের সব পোকা-মাকড়,ভূমি থেকে গজিয়ে ওঠা গাছের চারা, পানি ও পাথরের ভেতরে থাকা ঝর্ণা এবং মাটি থেকে বের হওয়া নানা ধরনের গ্যাস- এসব কিছু সম্পর্কেই মহান আল্লাহ অবহিত।

 

আল্লাহ আকাশ থেকে নাজিল-হওয়া সব বিষয়েও জানেন। যেমন, বৃষ্টির ফোটা থেকে শুরু করে প্রাণ-সঞ্চারী  সূর্যের আলো। যা কিছু আকাশের দিকে ওঠে তাও জানেন মহান আল্লাহ। যেমন, মানুষের দোয়া, মেঘামালা, বাতাস ইত্যাদি সবই মহান আল্লাহর কাছে স্পষ্ট। মোট কথা মহান আল্লাহর জ্ঞানের পরিধি সর্বব্যাপী ও অন্তহীন। এরপর একই আয়াতে বলা হয়েছে, তোমরা যেখানেই থাকো না কেন মহান আল্লাহ তোমাদের সাথেই রয়েছেন। তোমরা যা-ই কর মহান আল্লাহ তা দেখছেন।

 

সুরা হাদিদের ৫ ও ৬ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে:

'নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের রাজত্ব তাঁরই। সবকিছু তাঁরই দিকে ফিরে যাবে। তিনি রাত্রিকে দিবসে ঢুকিয়ে দেন এবং দিবসকে ঢুকিয়ে দেন রাত্রিতে। তিনি অন্তরের বিষয়াদি সম্পর্কেও সম্যক জ্ঞাত।

-এখানে বলা হচ্ছে যে আমাদের সবাইকে মহান আল্লাহর দিকেই ফিরে যেতে হবে। আমরা সবাই তাঁর কাছ থেকে এসেছি এবং আমরা তাঁরই দিকে ফিরে যাব।  মহান আল্লাহই হলেন সব কিছুর সূচনা ও সমাপ্তির নিয়ন্ত্রক। সব কিছু আল্লাহকে ঘিরেই আবর্তিত হচ্ছে। রাত ও দিনের আবর্তন তিনিই ঘটান।  তিনিই ধীরে ধীরে দিনের মাত্রা ছোট করেন ও রাতকে দীর্ঘ করতে থাকেন তিনিই।  আল্লাহই ঠিক করে দেন রাত ও দিনের দৈর্ঘ। এক্ষেত্রে পরিবর্তনের প্রভাব দেখি আমরা চার ঋতুতে। আর চার বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে আরো বেশি ঋতুর ব্যাপক কল্যাণকর প্রভাব আমরা দেখতে পাই মানুষসহ সৃষ্টিকূলের নানা প্রজাতির মধ্যে।#

পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/মো: আবু সাঈদ/  ২৬

২০১৮-০৬-২৬ ১৯:১১ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য