আজকের আসরের প্রথম অংশে আমরা মসজিদের ভূমিকা দুর্বল হয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে আরো কিছু আলোচনা করব। আর শেষাংশে থাকবে তুরস্কের সুলাইমানিয়া মসজিদ পরিচিতি।

 আল আকসা মসজিদ

গত আসরগুলোতে আমরা বলেছি, ধর্মীয়, রাজনৈতিক, শিক্ষা, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক দিকসহ সব ক্ষেত্রে মুসলমানদের জীবনে মসজিদ দিক-নির্দেশনামূলক ভূমিকা পালন করে। সেইসঙ্গে আমরা একথাও বলেছি, ইতিহাসের দীর্ঘ পরিক্রমায় মসজিদ কখনোই শুধুমাত্র নামাজ আদায় করার কাজে ব্যবহৃত হয়নি। কারণ, ইসলামে ইবাদত শুধুমাত্র নামাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য যেসব কাজ করা হয় তার প্রতিটিই ইবাদত হিসেবে গণ্য। কাজেই আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি অর্জনের অন্যান্য অনেক কাজও মসজিদে বসে আঞ্জাম দেয়া যায়। এসব কাজের মধ্যে মুসলমানদেরকে রাজনৈতিক দিক দিয়ে সচেতন করে তোলা হচ্ছে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ। কিন্তু বিভিন্ন দেশের স্বৈরাচারী শাসকদের পাশাপাশি তাকফিরি-ওহাবি গোষ্ঠীগুলো মসজিদের এই ভূমিকাকে অস্বীকার করে আসছে।

তাকফিরি গোষ্ঠীগুলোর  নাশকতামূলক তৎপরতার অংশ হল মসজিদ ধ্বংস করা

ইহুদিবাদী ও সাম্রাজ্যবাদীদের মদদপুষ্ট তাকফিরি গোষ্ঠীগুলো সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে যেসব নাশকতামূলক তৎপরতা চালিয়েছে সেসবের মধ্যে মসজিদ ধ্বংস করা ছিল অন্যতম। গত সাত বছর ধরে ইসলামের বাহ্যিক বেশভুষা ধারণ করে মানবতার মুক্তির এ ধর্মের চরম ক্ষতি করেছে এসব জঙ্গি গোষ্ঠী। তাকফিরি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী দায়েশ গত কয়েক বছরে শুধু ইরাক ও সিরিয়ার কয়েকশ’ মসজিদ ধ্বংস করেছে।

 তুরস্কের সুলাইমানিয়া মসজিদ

এদিকে ইসলাম বিদ্বেষী শক্তিগুলো মসজিদের অবকাঠামো অক্ষুণ্ন রেখে এর চেতনাকে ধ্বংস করে ফেলার চেষ্টা করছে। এক্ষেত্রে উদাহরণ হিসেবে জার্মানির রাজধানী বার্লিনের একটি মসজিদের কথা উল্লেখ করা যায় যেখানে ইসলামি শিক্ষার সম্পূর্ণ বিপরীত তৎপরতা পরিচালিত হচ্ছে। এই মসজিদের একজন মুতাওয়াল্লি এ সম্পর্কে বলেন, “এই মসজিদ সবার জন্য উন্মুক্ত একটি স্থান যেখানে সব ধরনের মানুষ প্রবেশ করতে পারেন। এখানে সব ধর্মের মানুষকে সমান অধিকার দেয়া হয়েছে। এখানে নারীরা হিজাব পরিধান করতে বাধ্য নন এবং তারা মুয়াজ্জিন এবং ইমামের ভূমিকাও পালন করতে পারেন। ” তিনি আরো বলেন, “এই মসজিদে সমকামী, সেক্যুলার, শিয়া, সুন্নি ও হিজাববিহীন নারীরা নামাজ আদায় করতে পারেন। বার্লিনের এই মসজিদটির নাম ‘ইবনে রুশদ-গ্যাটে’। মধ্যযুগের দার্শনিক আহমাদ বিন রুশদ আন্দালুসি এবং বিখ্যাত জার্মান লেখক ইয়োহান ভোলফগাং গ্যাটের নাম অনুসারে মসজিদটির এই নামকরণ করা হয়েছে। ”

 

মসজিদটির ওই মুতাওয়াল্লি এমন সময় একটি মসজিদে সমকামীদের আগমনকে স্বাগত জানালেন যখন সবগুলো ঐশী ধর্মে সমকামীতাকে অত্যন্ত ঘৃণ্য ও নিষিদ্ধ কাজ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সেক্যুলারিজম সম্পর্কেও বলতে হয়, ইসলাম হচ্ছে মানুষের জন্য পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান এবং মুসলিম জীবনের এক মুহূর্তও ধর্মের ছায়াতল থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। কাজেই মানুষের সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনের সঙ্গে ধর্মের সম্পর্ক নেই বলে যে প্রচার সেক্যুলারিজমে চালানো হয় তার কোনো ভিত্তি ইসলামে নেই। অথচ বার্লিনের মসজিদটি সেক্যুলারদের জন্য উন্মুক্ত।

এদিকে,  হিজাব হচ্ছে মুসলিম নারীর অবশ্যপালনীয় কর্তব্য। এটি খুলে ফেলা তাও আবার মসজিদে হিজাবিহীন অবস্থায় প্রবেশ করা বড় ধরনের গোনাহের কাজ। এ ছাড়া, ইসলামি বিধানে কোনো নারী জামায়াতের নামাজে পুরুষদের ইমামতি করতে পারে না। কাজেই দেখা যাচ্ছে, দ্বীন, ঈমান ও আধ্যাত্মিকতার প্রচার ও প্রসারের ক্ষেত্রে বার্লিনের এই মসজিদ কোনো ভূমিকা তো পালন করছেই না বরং উল্টো মানবতার মুক্তির ধর্ম ইসলামের চেতনার বিপরীত কাজ করছে। মসজিদ নামের এ ধরনের যেসব স্থাপনা বর্তমানে ইউরোপ ও আমেরিকার দেশগুলোতে দেখা যায় সেগুলোর সঙ্গে ইসলামের প্রাথমিক যুগের জেরার মসজিদের কোনো পার্থক্য নেই। বিশ্বনবী (সা.)’র নির্দেশে জেরার মসজিদ ধ্বংস করে ফেলে জায়গাটিকে মদীনার আবর্জনা ফেলার স্থান হিসেবে নির্ধারিত হয়েছিল। পবিত্র কুরআনের সূরা তওবার ১০৭ নম্বর আয়াতে জেরার মসজিদের প্রসঙ্গ এসেছে।  কুফরির প্রচার ও প্রসার এবং মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ ও মতানৈক্য ছড়িয়ে দেয়ার লক্ষ্যে মসজিদটি স্থাপন করেছিল একদল মুনাফেক। বার্লিনের আলোচ্য মসজিদটির মতো বর্তমান যুগেও মসজিদ নামের যেসব স্থাপনা দেখা যায় সেগুলিও একই লক্ষ্যে পরিচালিত হচ্ছে।  

শ্রোতাবন্ধুরা! শুরুতে যেমনটি বলেছি, আসরের এ পর্যায়ে আমরা তুরস্কের সুলাইমানিয়া মসজিদের সঙ্গে আপনাদের পরিচয় করিয়ে দেব। এটি তুরস্কের সবচেয়ে সুন্দর মসজিদগুলোর অন্যতম এবং ইস্তাম্বুল শহরের দ্বিতীয় বৃহত্তম মসজিদ। ওসমানীয় সাম্রাজ্যের শৌর্য-বীর্যের প্রতীক হিসেবে এটি নির্মাণ করা হয়েছিল। এই সাম্রাজ্যের সবচেয়ে শক্তিশালী সম্রাট, সুলতান প্রথম সুলাইমানের নির্দেশে তৎকালীন প্রখ্যাত স্থাপত্যবিদ ‘মিমার সিনান’ এটি নির্মাণ করেন।১৫৫০ খ্রিস্টাব্দে এই মসজিদের নির্মাণকাজ শুরু হয় এবং প্রায় ৩,৫০০ শ্রমিক সাত বছরের মাথায় এটির নির্মাণকাজ শেষ করেন।

গত আসরে আমরা ইস্তাম্বুলের সবচেয়ে বড় মসজিদ অর্থাৎ ‘আয়া সোফিয়া’ মসজিদ নিয়ে আলোচনা করেছি। ওই মসজিদটিরও স্থাপত্যশিল্পী ছিলেন মিমার সিনান। তবে তিনি আয়া সোফিয়া মসজিদের চেয়ে সুলাইমানিয়া মসজিদটিকে তুলনামূলক সাধাসিধা ঢংয়ে নির্মাণ করেন। এই মসজিদের সাধাসিধা ভাব সাধারণ মানুষকে বেশি আকৃষ্ট করে। তুরস্কের বুরসা প্রদেশের ইজনিক শহর থেকে আনা এক ধরনের  বিশেষ টাইলস ব্যবহারের কারণে মসজিদটিতে ভাবগম্ভীর পরিবেশ তৈরি হয়েছে। মসজিদের চারদেয়ালে স্থাপিত ২০০টি সুউচ্চ জানালা দিয়ে যখন এর ভেতরে সূর্যরশ্মিত পতিত হয় তখন মসজিদে চমৎকার আধ্যাত্মিক পরিবেশ তৈরি হয়। ওসমানীয় সম্রাটদের স্থাপিত অন্যান্য মসজিদের মতো সুলাইমানিয়া মসজিদকেও শুধুমাত্র নামাজ আদায়ের জন্য স্থাপন করা হয়নি। এই মসজিদে সন্নিবেশিত রয়েছে কুরআন শিক্ষার চারটি মাদ্রাসা, গণ-গোসলখানা, একটি হাসপাতাল, একটি মুসাফিরখানা এবং দরিদ্র মুসলমান, খ্রিস্টান ও ইহুদিদের আহার করানোর জন্য একটি বড় রান্নাঘর।

সুলাইমানিয়া মসজিদে রয়েছে একটি মূল গম্বুজ এবং এর দুই পাশে স্থাপন করা হয়েছে দুটি অর্ধগোলাকার গম্বুজ। মসজিদে বাতাস চলাচলের জন্য চমৎকার ব্যবস্থা তৈরি করেছেন মিমার সিনান। এখন থেকে প্রায় ৫০০ বছর আগে যখন বিদ্যুৎ আবিস্কৃত হয়নি তখন রাতের বেলায় সুলাইমানিয়া মসজিদকে আলোকিত রাখার জন্য ২৭৫টি মশাল জ্বালাতে হতো। এসব মশালের ধোঁয়া যাতে মসজিদের ভেতরের কারুকাজের পাশাপাশি মুসল্লিদের স্বাস্থ্যের ক্ষতি করতে না পারে সেজন্য তিনি মসজিদের মাঝখানের প্রবেশপথের উপরে একটি ছোট কক্ষ তৈরি করেন।  সেইসঙ্গে তিনি মসজিদের বিভিন্ন কোণে এমনভাবে ভেন্টিলেশন ব্যবস্থা স্থাপন করেন যাতে মশাল থেকে নির্গত সব ধোঁয়া ওই কক্ষে এসে জমা হয়। মিমার সিনান এই কক্ষকে শীতল করার একটি ব্যবস্থা তৈরি করেন যার ফলে সেখানে জমা হওয়া ধোঁয়া ফোঁটা ফোঁটা পানি আকারে জমা হয়ে তৎকালীন যুগের সেরা কালি তৈরি হয়। সুলাইমানিয়া মসজিদে ক্যালিগ্রাফিসহ অন্যান্য যেসব হস্তলিখিত ডিজাইন রয়েছে তার সবই  করা হয় এই কালি দিয়ে।

সুলাইমানিয়া মসজিদের তলদেশে বেশ কয়েকটি ক্যানেল খোঁড়া হয়েছে। এসব ক্যানেলের মাধ্যমে তৎকালীন সময়ে মসজিদ ও এর আশপাশের এলাকার পানির চাহিদা মেটানো হতো। এ ছাড়া, এই ক্যানেলগুলো থেকে মসজিদের ভেতরে এমনভাবে ভেন্টিলেশনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল যাতে সে যুগে মসজিদের ভেতরের পরিবেশ শীতকালে গরম এবং গরমকালে ঠাণ্ডা থাকে।  সুলাইমানিয়া মসজিদে রয়েছে ৪টি মিনার যেগুলোর প্রতিটি ৭২ মিটার করে উঁচু। অত্যন্ত সাদামাটা কিন্তু আকর্ষণীয় এই মিনারগুলো মসজিদের সৌন্দর্যকে বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে।  ২৫ মিটার ব্যাসবিশিষ্ট এই মসজিদের প্রধান গম্বুজের উচ্চতা ৫৩ মিটার। যেসব পিলারের উপর এই গম্বুজ স্থাপন করা হয়েছে সেগুলোকে মসজিদের প্রাচীরের ভেতরে এমনভাবে বসানো হয়েছে যা সাধারণ মানুষের চোখে পড়ে না। মূল গম্বুজটির চারপাশে রয়েছে আরো ২৪টি ছোট ছোট গম্বুজ।  মসজিদের নামাজ আদায়ের মূল চত্বরের মেঝেতে সাদা রঙের মরমর পাথর ব্যবহৃত হয়েছে। তবে মসজিদের প্রবেশপথে বসানো হয়েছে বিশালাকৃতির কালো পাথর। মুসল্লিদেরকে মসজিদে প্রবেশের সময় এই পাথর অতিক্রম করতে হয়।

অন্যান্য ঐতিহাসিক স্থাপনার মতো সুলাইমানিয়া মসজিদকেও যুগে যুগে নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করতে হয়েছে। ১৬৬০ খ্রিস্টাব্দে এক অগ্নিকাণ্ডে মসজিদটির মারাত্মক ক্ষতি হয় এবং তৎকালীন সুলতান চতুর্থ মুহাম্মাদের নির্দেশে এটির মেরামত কাজ সম্পন্ন হয়। ১৭৬৬ সালে এক শক্তিশালী ভূমিকম্পে মসজিদের প্রধান গম্বুজটি ধসে পড়ে এবং ঊনবিংশ শতাব্দির মাঝামাঝি সময়ে গম্বুজটিকে আগের আকৃতিতে তৈরি করা হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় মসজিদে সংরক্ষিত গোলাবারুদ বিস্ফোরিত হলে এটিতে আবার আগুন ধরে যায়। ১৯৫৬ সালে মসজিদটিকে আবার মেরামত করা হয় এবং সর্বশেষ ২০০৮ সালে সুলাইমানিয়া মসজিদে ব্যাপকভিত্তিক মেরামত কাজ চালানো হয়।#

পার্সটুডে/মুজাহিদুল ইসলাম/ মো: আবু সাঈদ/ ২৭

ট্যাগ

২০১৮-০৬-২৭ ১৮:৪১ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য