কুরআনের আলো অনুষ্ঠানের আজকের পর্বে সূরা আল আহযাবের ৩২ থেকে ৩৪ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যা তুলে ধরা হবে। এই সূরার ৩২ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন,

يَا نِسَاءَ النَّبِيِّ لَسْتُنَّ كَأَحَدٍ مِنَ النِّسَاءِ إِنِ اتَّقَيْتُنَّ فَلَا تَخْضَعْنَ بِالْقَوْلِ فَيَطْمَعَ الَّذِي فِي قَلْبِهِ مَرَضٌ وَقُلْنَ قَوْلًا مَعْرُوفًا (32)

“হে নবী পত্নীগণ! তোমরা অন্য নারীদের মত নও; যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, তবে পরপুরুষের সাথে কোমল ও আকর্ষণীয় ভঙ্গিতে কথা বলো না, এতে করে সেই ব্যক্তি কুবাসনা করে, যার অন্তরে ব্যাধি রয়েছে; তোমরা সঙ্গত কথাবার্তা বলবে।” (৩৩:৩২)

আগের আসরে বলা হয়েছে, সাধারণ মানুষের ওপর রাসূলুল্লাহ (সা.)’র স্ত্রীগণের আচরণ যথেষ্ট প্রভাব ফেলে। এই আয়াতে সে বিষয়টির প্রতি ইঙ্গিত করে আরো বলা হয়েছে: আল্লাহর রাসূলের স্ত্রী হওয়ার কারণে তাদের কাঁধে অনেক বড় দায়িত্ব রয়েছে। তারা যেন অন্য নারীদের মতো আচরণ না করেন। কারণ, তারা চান বা না চান সাধারণ নারীরা তাদেরকে অনুসরণ করে। এরপর নারীদের একটি সামাজিক আচরণের উদাহরণ তুলে ধরে বলা হয়েছে, তাকওয়ার একটি জরুরি শর্ত হলো গায়রে মাহরাম পুরুষদের সঙ্গে কথা বলার ক্ষেত্রে কণ্ঠস্বর যেন এমন আকর্ষণীয় হয়ে না যায় যাতে অপবিত্র অন্তরের অধিকারী পুরুষরা আকৃষ্ট হয়ে পড়ে।  বরং এমনভাবে তাদের সঙ্গে কথা বলতে হবে যা একজন সম্ভ্রান্ত ও পুতপবিত্র নারীর বলা উচিত।

এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. সমাজের প্রতিটি মানুষের অবস্থান অনুযায়ী আচরণ করা উচিত। পরিবার ও সমাজের নেতৃস্থানীয় মানুষের উচিত তাদের কথা ও আচরণে সাধারণ মানুষের তুলনায় বেশি সংযত ও সাবধান হওয়া।

২. ইসলামে পর্দা রক্ষার ক্ষেত্রে পোশাকের পাশাপাশি কথা বলার ক্ষেত্রেও যথেষ্ট সাবধানতা অবলম্বন করতে বলা হয়েছে।

৩. প্রতিটি সমাজেই দুশ্চরিত্র আত্মার কিছু পুরুষ থাকে। এ ধরনের মানুষের সঙ্গে কথা বলা ও সামাজিক লেনদেনের সময় নারীদেরকে অতিরিক্ত সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে।

সূরা আহযাবের ৩৩ ও ৩৪ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

وَقَرْنَ فِي بُيُوتِكُنَّ وَلَا تَبَرَّجْنَ تَبَرُّجَ الْجَاهِلِيَّةِ الْأُولَى وَأَقِمْنَ الصَّلَاةَ وَآَتِينَ الزَّكَاةَ وَأَطِعْنَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ إِنَّمَا يُرِيدُ اللَّهُ لِيُذْهِبَ عَنْكُمُ الرِّجْسَ أَهْلَ الْبَيْتِ وَيُطَهِّرَكُمْ تَطْهِيرًا (33) وَاذْكُرْنَ مَا يُتْلَى فِي بُيُوتِكُنَّ مِنْ آَيَاتِ اللَّهِ وَالْحِكْمَةِ إِنَّ اللَّهَ كَانَ لَطِيفًا خَبِيرًا (34)

“তোমরা ঘরের ভেতরে অবস্থান করবে- প্রথম অজ্ঞতার যুগের মতো নিজেদেরকে প্রদর্শন করবে না। নামায কায়েম করবে, যাকাত প্রদান করবে এবং আল্লাহ ও তাঁর রসূলের আনুগত্য করবে। হে নবী পরিবারের সদস্যবর্গ! নিশ্চয় আল্লাহ কেবল চান তোমাদের থেকে অপবিত্রতা দূর করতে এবং তোমাদেরকে পূর্ণরূপে পূত-পবিত্র রাখতে।” (৩৩:৩৩)

“আল্লাহর আয়াত ও জ্ঞানগর্ভ কথা, যা তোমাদের গৃহে পঠিত হয় তোমরা সেগুলো স্মরণ করবে। নিশ্চয় আল্লাহ সূক্ষ্মদর্শী, সর্ববিষয়ে খবর রাখেন।” (৩৩:৩৪)

আগের আয়াতগুলোর ধারাবাহিকতায় এই আয়াতেও রাসূলের স্ত্রীগণকে উদ্দেশ করে বলা হচ্ছে: ইসলাম আবির্ভাবের পূর্বে নারীরা অসঙ্গত পোশাক পরে এবং নানারকম সাজসজ্জা করে রাস্তাঘাটে চলাফেরা করত। কিন্তু আপনারা, ঈমানদার নারীগণ জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হবেন না। যদি জরুরি প্রয়োজনে বাইরে যেতেই হয় তাহলে উপযুক্ত পোশাক পরে যেতে হবে। কোনো অবস্থাতেই অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ও সাজসজ্জা জনসমক্ষে প্রদর্শন করা যাবে না।

এই আয়াতে ইসলামপূর্ব যুগ বোঝাতে ‘প্রথম অজ্ঞতার যুগ’ পরিভাষাটি ব্যবহার করা হয়েছে। এখান থেকে ধারণা করা যায়, আল্লাহ তায়ালা পরবর্তী এমন আরো অনেক যুগের কথা এখানে উহ্য রেখেছেন যখন নারীরা সাজসজ্জা করে নিজেদের দেহসৌষ্ঠব প্রদর্শন করবে। বর্তমান যুগে আমরা সুস্পষ্টভাবে সেরকম কর্মতৎপরতা দেখতে পাই। নারীদেরকে নানা অজুহাতে আজ ঘরের বাইরে নিয়ে আসা হয়েছে এবং লাগামহীনভাবে অশ্লীলতা ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। নারীদের সাজসজ্জার জন্য উৎপাদিত কসমেটিক্স পণ্য বর্তমান যুগের ব্যবসা-বাণিজ্যের একটি বড় অংশ দখল করে আছে।

আয়াতের পরবর্তী অংশে নামাজ ও রোজার মতো ধর্মীয় ফরজ বিধানগুলোর প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে একথা বোঝানো হয়েছে যে, নারীরা যেন এ ধারণা না করে যে, পর্দার বিধান মেনে গায়রে মাহরাম পুরুষদের থেকে দূরে থাকলেই হয়তো তাদের ফরজ দায়িত্ব আদায় হয়ে যাবে।  বরং তাদেরকে নামাজ ও রোজাসহ ধর্মীয় সব বিধিবিধান সঠিকভাবে পালন করতে হবে। এ ছাড়া, সাধারণ নারীরা যেন এ ধারনা না করে যে, আগের আয়াতগুলোতে বর্ণিত নির্দেশগুলো শুধু রাসূলের স্ত্রীদের জন্য এসেছে; বাকিদের জন্য নয়।

সূরা আহযাবের ৩৪ নম্বর আয়াতে নারীদের উদ্দেশ করে আরো বলা হচ্ছে, ঘরে অবস্থান যেন নারীর ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক উৎকর্ষের পথে অন্তরায় না হয়। তাদেরকে কুরআন তেলাওয়াত এবং এই ঐশী গ্রন্থের উন্নত শিক্ষা গ্রহণের জন্য যথেষ্ট সময় দিতে হবে এবং কুরআনের প্রতি উদাসীন হওয়া যাবে না।

কিন্তু প্রথমে রাসূলের স্ত্রীগণ এবং এরপর সব নারীর প্রতি নির্দেশিত এই হুকুম-আহকামের ভেতরে আল্লাহ তায়ালা এমন একটি বাক্য ব্যবহার করেছেন যার সর্বনাম হচ্ছে পুরুষ। আরবি ভাষার গঠনপ্রণালী অনুযায়ী এই পুরুষবাচক সম্মোধনের মাধ্যমে এই বাক্যটিকে এর আগের ও পরের আলোচনা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করে ফেলা হয়েছে। এই বাক্যটি শুরু হয়েছে ‘ইন্নামা’ শব্দ দিয়ে যা থেকে প্রতীয়মান হয় মহান আল্লাহ দৃঢ় সংকল্প করেছেন যে, রাসূলের আহলে বাইত পুতপবিত্র থাকবেন। সব ধরনের অপবিত্রতা ও কলুষতা থেকে তাদেরকে মুক্ত করা হয়েছে যাতে তারা সব মুমিনের জন্য আদর্শ হতে পারেন।

এই পবিত্রতা কোনো বাধ্যতামূলক বিষয় নয় যে, আহলে বাইতের কাছে থেকে গুনাহ করার ক্ষমতা কেড়ে নেয়া হয়েছে। বরং আর দশজন মানুষের মতো তারাও গুনাহ করার ক্ষমতা রাখেন। কিন্তু তাদেরকে আল্লাহ তায়ালা এতটা আনুকূল্য প্রদর্শন করেছেন যে, সব ধরনের গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার যোগ্যতা তারা অর্জন করেছেন।

অবশ্য এখানে আহলে বাইত বলতে ঠিক কাদেরকে বোঝানো হয়েছে তা নিয়ে মুফাসসিরদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। কেউ কেউ আহলে বাইত বলতে রাসূলের স্ত্রীগণকে বুঝিয়েছেন। অন্যদিকে রাসূলুল্লাহ (সা.)’র বর্ণিত বহু হাদিস উদ্ধৃত করে কেউ কেউ মনে করেন, এই আয়াতে বর্ণিত পবিত্র পাঁচ ব্যক্তি হলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.), তাঁর কন্যা ফাতিমা, তাঁর জামাতা আলী ইবনে আবু তালেব এবং তাঁর দুই দৌহিত্র হাসান ও হোসেইন।

এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় কয়েকটি বিষয় হচ্ছে:

১. সাজসজ্জা করে নারীর দেহসৌষ্ঠব প্রদর্শন সভ্যতার নিদর্শন নয় বরং পবিত্র কুরআনে একে অজ্ঞতা ও মূর্খতা বলে অভিহিত করা হয়েছে।

২. দরিদ্র ও কপর্দকহীন মানুষকে দান করা ও যাকাত দেয়া শুধু পুরুষের দায়িত্ব নয় বরং সম্পদশালী নারীকেও এই মহৎ কাজটি করতে হবে।

৩. ধর্মীয় নেতা ও তার পরিবারকে সব ধরনের অপবিত্রতা ও কলুষতা থেকে মুক্ত থাকতে হবে।

৪. যেসব নারী গৃহিনী এবং বেশিরভাগ সময় ঘরে অবস্থান করেন তাদেরকে ধর্মীয় জ্ঞান অর্জন থেকে দূরে থাকলে চলবে না বরং তাদেরকেও উন্নত নৈতিক গুণাবলী অর্জন ও উত্তমরূপে ধর্মীয় বিধিবিধান পালন করার শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে।#

 

ট্যাগ

২০১৮-০৬-২৮ ১৭:৩৬ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য