গত পর্বে আমরা নাসের খসরুর বিখ্যাত বই সফরনামা বা ভ্রমণকাহিনী সম্পর্কে আলোচনা করছিলাম।

মক্কা-মদিনা তথা হিজাজ ও মিশরসহ বেশ কয়েকটি দেশে তার সফরের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার বর্ণনা-ভিত্তিক এই বইটি এইসব অঞ্চলের পঞ্চম হিজরির ভূগোল, ইতিহাস ও সমাজ এবং সংস্কৃতিসহ নানা বিষয়ে মূল্যবান তথ্যের প্রমাণ্য উৎস হয়ে আছে। যেমন, সে যুগের কৃষিকাজ ও কৃষি-ব্যবস্থাপনা, ফসলাদি, সেচ-ব্যবস্থা, শিল্প, জ্ঞানী-গুণী, অবকাঠামো, বাণিজ্য, শহর-পরিচালনার পদ্ধতি, বিচার-বিভাগ, নানা প্রথা ও রীতি, বিশ্বাস, ঐতিহাসিক বহু ঘটনা এবং সে যুগের নানা মুসলিম রাষ্ট্র ও জনগণের  বৈশিষ্ট্য জানা যায় এই অমূল্য বই থেকে।

সে যুগের মুসলিম শহরগুলোর নানা অবস্থা, উন্নত সুযোগ-সুবিধা ও সমৃদ্ধি সম্পর্কে জানার জন্য নাসের খসরুর এই বইয়ের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। এমনকি সে সময়কার মুসলিম শহরগুলোতে প্রচলতি কেনা-বেচা বা লেনদেনে চেক ব্যবহারের পদ্ধতি তথা ব্যাংকিং ব্যবস্থা সম্পর্কেও বর্ণনা রয়েছে তার এই সফরনামায়।

নাসের খসরু তার সফরনামায় মিশরের নানা শহরের বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি এই দেশের নানা অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ খাল, পানির বিশেষ ধরনের সংরক্ষণাগার ও বহুতল ভবনের বর্ণনা দিয়েছেন। নাসের খসরু এক পর্যায়ে মিশরের একটি শহরের সাত তলা একটি ভবনের ছাদের ওপর বিচিত্রময় ফুল আর ফলের বাগানসহ পশুচারণ ক্ষেত্র ও কৃষি খামার গড়ে তোলার দুর্লভ সাফল্য সম্পর্কেও বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন।

 

নাসের খসরুর সফরনামার দু’টি হাতে-লেখা সংস্করণ এখনও টিকে আছে। এ দুই সংস্করণই রয়েছে ফ্রান্সে।  ফরাসি প্রাচ্যবিদ শেফার প্রথমবারের মত এই সফরনামা ফরাসি ভাষায় অনুবাদ করেন এবং তা হিজরি ১২৯৮ সনে প্রকাশ করা হয়। এরপর এ বইটির লিথোগ্রাফিক প্রিন্ট প্রকাশ করা হয় ভারতের মুম্বাই শহরে। বইটি জাইনুল আবেদিন আশশারিফ আসসাফাভি’র প্রচেষ্টায় তৃতীয় বারের মত প্রকাশ করা হয় তেহরান থেকে ১৩১২ হিজরিতে। এতে নাসের খসরুর কাব্যও যোগ করা হয়েছিল। একই বছরে তিনি সফরনামার আরও একটি সংস্করণ প্রকাশ করেন। নাসের খসরুর সফরনামার পঞ্চম সংস্করণ প্রকাশ করা হয় ১৩৪০ হিজরিতে। ফার্সি ১৩৩৫ সনে সফরনামা বইটি প্রকাশ করেন ডক্টর মুহাম্মাদ দাবিরসিয়াক্বি। সফরনামার এই সংস্করণটিই সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়।

 

নাসের খসরুর কবিতা ও গদ্য সাহিত্য-কর্ম থেকেই যুক্তিবিদ্যা ও দর্শনসহ জ্ঞানের বহু শাখায় তার অগাধ পাণ্ডিত্যের পরিচয় ফুটে উঠেছে। তিনি বিপুল সংখ্যক বই লিখেছিলেন যা তার নিজের কবিতায়ও তিনি উল্লেখ করেছেন। কিন্তু সেসবের মধ্যে কেবল নয়টি বই টিকে আছে।

নাসের খসরুর লেখা কয়েকটি গদ্য বই হল: সফরনামা বা ভ্রমণ-বৃত্তান্ত, ‘খ’ন ইখওয়ান’, ‘গোশায়েশ ওয়া রহায়েশ’, ‘জামেউল হিকমাতাইন’, ‘জাদুল মুসাফেরিন’ এবং ‘ওয়াজহে দ্বিন’। ‘সফরনামা’ ছাড়া খসরুর অন্য সব গদ্য বইই মূলত ইসমাইলি বিশ্বাস বা চিন্তাধারা বিষয়ক বই। এসব বই লেখা হয়েছে দর্শন ও যুক্তিবিদ্যার ভিত্তিতে নানা ধরনের ধর্মীয় বিশ্বাস সম্পর্কিত প্রশ্নের ব্যাখ্যা হিসেবে। তাই দর্শন ও যুক্তিবিদ্যা সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা না থাকলে সাধারণ পাঠকের পক্ষে এসব বইয়ের মর্মার্থ বোঝা সম্ভব নয়। খসরুর এসব বই দর্শন ও যুক্তিবিদ্যা সংক্রান্ত দুর্লভ ফার্সি পরিভাষাগুলোর সবচেয়ে প্রাচীন উৎস হিসেবেও বিশেষ গুরুত্ব রাখে।

 

নাসের খসরু তার সাত বছরের দীর্ঘ সফরের বর্ণনার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন সফরনামা বা ভ্রমণ-বৃত্তান্ত শীর্ষক বইয়ে। এ বইটিসহ নাসের খসরুর সব বইয়ের ভাষাই সহজ-সরল ও প্রাঞ্জল। প্রচলিত প্রাচীন রীতির সাবলিল ফার্সি ভাষা ব্যবহৃত হয়েছে এসব বইয়ে।

 

নাসের খসরুর ধর্ম ও দর্শন বিষয়ক বইগুলোর মধ্যে ‘জাদুলমুসাফিরিন’ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ইসমাইলি দর্শন বিষয়ক বইগুলোর মধ্যে এ বইটি খুবই  বিখ্যাত। বইটি লেখা হয়েছিল হিজরি ৪৫৩ সনে। বইটিতে ২৭টি বিষয়ে আলোচনা করেছেন খসরু। এসব বিষয়ের মধ্যে রয়েছে অনুভূতি ও শরীর  এবং  এ  দুই বিষয় সম্পর্কিত নানা ধরনের জ্ঞান ও বিতর্ক। এ ছাড়াও আত্মা, স্থান, সময় ও বিশ্বজগতের সৃষ্টি এবং দেহের সঙ্গে আত্মার সংযুক্তির ধরন, পুনরুত্থান ও পরকাল, মানুষের অন্য কোনো প্রাণীতে রূপান্তর হওয়া সংক্রান্ত ধারণার অসারতা, সাওয়াব ও পরকালীন শাস্তির প্রমাণও স্থান পেয়েছে নাসের খসরুর এই বইয়ে। ফাতেমিয় শাসনামলের ইসমাইলি দর্শন, শিক্ষা ও আকিদা-বিশ্বাস সম্পর্কে জানার জন্য এ বইটি একটি আদর্শ প্রামাণ্য বই।

 

নাসের খসরুর ধর্মীয় দর্শন বিষয়ক অন্য বইগুলোর মত ‘জাদুলমুসাফিরিন’ শীর্ষক বইটির ভাষাও সামানিয় যুগের গদ্য রীতির দৃষ্টান্ত। অবশ্য সে যুগে যেসব বই লেখা হয়েছে সেসবের মধ্যে এ বইটির ভাষায় তুলনামূলকভাবে কিছুটা বেশি পুরনো রীতির  ফার্সি-গদ্যের প্রভাব দেখা যায় যদিও গজনভী যুগের নতুন ফার্সি গদ্যের ধারাও এ বইয়ে স্পষ্টভাবে বোঝা যায়।  নাসের খসরুর ‘জাদুলমুসাফিরিন’ বইটিতে এমন কিছু দুর্লভ ফার্সি শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে যেসব শব্দ অতীতের টেক্সটে দেখা যায় না বা খুব কমই দেখা গেছে। এ ছাড়াও নাসের খসরু তার এ বইয়ে দর্শন শাস্ত্রের অনেক আরবি পরিভাষার এমন কিছু সুন্দর ফার্সি প্রতিশব্দ ব্যবহার করেছেন যে সেসবের কোনো কোনোটি আর কোথাও ব্যবহৃত হয়নি। ফলে এ বইটির কোনো কোনো ফার্সি শব্দ কোনো অভিধানেই পাওয়া যায় না।

 

নাসের খসরুর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বই ‘ওয়াজহে দীন’। এতে ইসমাইলি দর্শন ও এই মাজহাবের নানা তত্ত্ব এবং বিধান নিয়ে আলোচনা রয়েছে। বইটি লেখা হয়েছে ‘জাদুলমুসাফিরিন’ বইটি লেখার পরে তথা ৪৫৩ হিজরির পরে। দীর্ঘকাল ধরে বইটির কোনো কপি দেখা যায়নি। জারুবিন নামের একজন রুশ গবেষক বদাখশানের ইসমাইলি সম্প্রদায়ের লোকদের কাছ থেকে এর দু’টি কপি আবিস্কার করেন। সাইয়্যেদ হাসান তাকি জাদেহ ফার্সি ১৩০১ সনে ওই দুই কপি থেকে একটি কপির সব পৃষ্ঠার ছবি তুলে তা বার্লিনে নিয়ে যান এবং অধ্যাপক ব্রাউনের সহায়তায় সেখানে তা ছাপান।  #

পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবু সাঈদ/  ২৮

২০১৮-০৬-২৮ ১৮:০৫ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য