আমরা গত আসরে কর্মস্পৃহা ও কর্মতৎপরতার ইতিবাচকতা নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করেছি। কাজ করার মাধ্যমে মানুষ শারীরিকভাবে শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

মানসিক সুস্থতা এবং প্রশান্ত জীবনযাপনের শক্তিও জোগায় কাজ। মানুষের জীবনের বিচিত্র সংকট মোকাবেলায় যথার্থ সিদ্ধান্ত নেয়ার শক্তি জোগায় কাজ।

কর্মস্পৃহা ও কর্মতৎপরতা মানুষকে বহু ধরনের রোগ-ব্যাধি থেকে এমনকি মানসিক ও নৈতিক রোগ থেকেও রক্ষা করে। এ কারণে যারা শারীরিক সুস্থতা প্রত্যাশা করে তাদের জন্য প্রধান প্রেসক্রিফশনই হলো কাজ অর্থাৎ দৈহিক শ্রম ও কর্মতৎপরতা। আলি (আ) বলেছেন: যে কাজ করে তার শক্তিও বৃদ্ধি পায়। আর যে কাজ করা থেকে নিজেকে দূরে রাখে তার আলসেমি বেড়ে যায়। পবিত্র কুরআনের বক্তব্য অনুযায়ী মানুষের ব্যক্তিত্ব ও সক্ষমতা নিশ্চিত করে কাজ। আর ব্যক্তি যে চেষ্টা প্রচেষ্টা চালায় তার ফলও ভোগ করে।

গত আসরে আমরা কুরআনের একটি আয়াতের উদ্ধৃতি দিয়ে পরিসমাপ্তি টেনেছিলাম আলোচনার। পবিত্র কুরআনের সূরা আন-নাজমের ৩৮ ও ৪০ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে: “মানুষ যে চেষ্টা সাধনা করে তা ছাড়া তার আর কিছুই প্রাপ্য নেই। তার চেষ্টা-সাধনা অচিরেই মূল্যায়ণ করা হবে"। কাজ করার ইতিবাচকতার মধ্যে স্বাধীনতা ও স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন। স্বাধীনচেতা মানুষ নিজের প্রকৃত সম্পদের কথা জানান দেয় এবং তার যে যোগ্যতা ও সামর্থ্য রয়েছে কিংবা যেসব সুযোগ সুবিধা রয়েছে সেগুলোর সঙ্গে অন্যদের পরিচয় করিয়ে দেয়। কর্মপ্রিয় মানুষ অক্লান্ত পরিশ্রমী হয় অর্থাৎ কাজ বা শ্রম তাকে ক্লান্ত করে না। সে সৃজনশীল এবং উদ্ভাবনী শক্তির অধিকারী হয়ে ওঠে। কাজকে সে একটা চমৎকার আঙ্গিকে আঞ্জাম দেয়।

এইসব অনন্য সাধারণ অর্জন আত্মবিশ্বাস সৃষ্টিতে, মূল্যবান অনুভূতি তৈরিতে সর্বোপরি মানবীয় পূর্ণতায় পৌঁছার ক্ষেত্রে যে অসামান্য প্রভাব ফেলে তা এক কথায় অনস্বীকার্য। এ কারণেই সম্ভবত আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পবিত্র কুরআনে এই পৃথিবীকে কৃষিক্ষেতের সঙ্গে তুলনা করেছেন। কৃষিক্ষেত মানে হলো মেধা খাটিয়ে চাষাবাদ করে ফলন, উৎপাদন করা। কুরআনে বলা হয়েছে: 'তিনিই তোমাদের যমীন থেকে পয়দা করেছেন এবং তোমাদের কাছে তাঁর প্রত্যাশা হলো এই যমিনে তোমরা যেন আবাদ করো'।

সূরা কেসাসে বলা হয়েছে: 'আল্লাহ পাক তোমাদের যা কিছু দিয়েছেন তা দিয়ে তোমরা তোমাদের আখেরাতের ঘর নিশ্চিত করো এবং অবশ্যই তোমাদের পার্থিব জগতের অংশকে বিস্মৃত হয়ো না'।

প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন কাজ এবং ইবাদাতের মাঝে এক ধরনের ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করেছেন। সেইসঙ্গে এই দুইয়ের মধ্যে সম্পর্ক সৃষ্টির মাধ্যমে উভয়কেই গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করতে চেয়েছেন। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় পবিত্র কুরআনের সূরা জুমায় জুমার দিনে নামাজের সময় মুমিনদেরকে ব্যবসা-বাণিজ্যে বিরতি দেয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, তারা যেন আল্লাহর দরবারে উপস্থিত হবার ক্ষেত্রে অলসতা না দেখায়। এ কথা বলার পরপরই বলা হয়েছে: তারপর যখন নামায শেষ হয়ে যায় তখন ভূ-পৃষ্ঠে ছড়িয়ে পড় এবং আল্লাহর অনুগ্রহ সন্ধান করো!

কুরআনের ভাষ্য অনুযায়ী কাজকর্ম এবং সৎ আমলের মাধ্যমে ঈমান অর্থবহ হয়ে ওঠে। সেইসঙ্গে জ্ঞান বৃদ্ধির কারণ হয়ে ওঠে কাজ এবং মানুষও আলোকিত হয়ে ওঠে কাজের মাধ্যমে। সূরা ইউনূসের ৯ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে: 'যারা ইমান আনে অর্থাৎ যারা এ কিতাবে পেশকৃত সত্যগুলো গ্রহণ করে এবং সৎকাজ করতে থাকে,তাদেরকে তাদের রব তাদের ঈমানদের কারণে সোজা পথে চালাবেন। নিয়ামত ভরা জান্নাতে যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত হবে'।

যারা প্রাণশক্তি এবং জীবনীশক্তি খুঁজে বেড়ায় এবং এমন সব বিষয় যেগুলো উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বাড়িয়ে দেয় সেইসব সমস্যা সমাধানের পথ খুঁজে বেড়ায়, কুরআন তাদেরকে সুসংবাদ দিয়ে বলছে, তারা যেন তাদের কর্মস্পৃহা ও সক্ষমতা আরও বাড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করে।

পবিত্র কুরআনে কর্মস্পৃহা ও সক্ষমতা বাড়ানোর ব্যাপারে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সেইসঙ্গে বলা হয়েছে পেশাগত দায়িত্ব এমনভাবে পালন করতে বা নিজের ওপর অর্পিত কাজগুলোকে এমনভাবে আঞ্জাম দিতে যেন ওই কাজ করতে সে খুব পছন্দ করে। অন্যের কাছ থেকে কোনোরকম সহযোগিতা বা সাহায্য নেওয়া ছাড়াই সে যেন কাজগুলো করতে পারে-সেভাবে নিজেকে তৈরি করতে বলো হয়েছে। এরকম যোগ্যতা নিয়ে কাজ করাকে সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদাত বলে গণ্য করা হয় এবং এ পর্যায়ের কর্মতৎপরতা সীমাহীন শান্তি ও সুখের উৎসে পরিণত হয়। যে ব্যক্তি সবসময় চেষ্টা করে তার কোনো একটি মুহূর্তও যেন খামোখা নষ্ট না হয় এবং কাজের জন্য কোনো সীমারেখা তৈরি না করে,সেই লোক অবশ্যই সীমিত দায়িত্ব পালনকারীর তুলনায় জীবনে অনেক বেশি সফল। ইসলামে কাজকে পুণ্য এবং অলসতাকে পাপ বলে গণ্য করা হয়েছে।

কোরআনুল কারিমে মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন,‘নিশ্চয়ই মানুষ তাই পায়,যা সে করে। অতি শিগগিরই তার কর্ম মূল্যায়ন করা হবে। তারপর তাকে তার পূর্ণ প্রতিদান দেয়া হবে।’

আরও বলা হয়েছে,‘আর হে নবী! তাদের বলে দাও,তোমরা কাজ করতে থাকো। আল্লাহ তাঁর রাসুল ও মোমিনদের কাজের ধারা কেমন, তা দেখবেন। তারপর তোমাদের তাঁর দিকে ফিরিয়ে নেয়া হবে,যিনি প্রকাশ্যে ও গোপনে সবকিছু জানেন এবং তোমরা কী করতে তা তিনি তোমাদের বলে দেবেন।’ মহানবী (সা.) এর জীবন ছিল কর্মময়। আমাদের জীবনও যেন কর্মময় হয়-সেই তৌফিক কামনা করে শেষ করছি আজকের আসর। #

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/মো:আবুসাঈদ/  ২৮

২০১৮-০৬-২৮ ১৮:৩৪ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য