সুরা হাদিদের ৭ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রতি ঈমান আনার আহ্বান জানানো হয়েছে এবং মহান আল্লাহ মানুষকে যা দিয়েছেন তা থেকে দান করতে বলা হয়েছে।

দান কেবল আর্থিক বা বস্তুগত নয়। দান জ্ঞানগত ও আধ্যাত্মিকও হতে পারে। ইসলাম মুসলিম উম্মাহকে বাঁচিয়ে রাখা, মানুষের দারিদ্র দূর করা ও সমাজের উন্নয়নের জন্য দানশীলতাকে জরুরি বলে মনে করে।

সুরা হাদিদের ১০ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলছেন:

'তোমাদেরকে আল্লাহর পথে ব্যয় করতে কিসে বাধা দেয়,যখন নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের উত্তরাধিকার হল আল্লাহ'র পক্ষ থেকেই? তোমাদের মধ্যে যে মক্কা বিজয়ের আগে ব্যয় করেছে ও জেহাদ করেছে,সে সমান নয়। এরূপ লোকদের মর্যদা বড় তাদের চেয়ে,যার পরে ব্যয় করেছে ও জেহাদ করেছে। তবে আল্লাহ উভয়কে কল্যাণের ওয়াদা দিয়েছেন। তোমরা যা কর,আল্লাহ সে সম্পর্কে সম্যক জ্ঞাত।'

প্রত্যেক মানুষই যা অর্জন করে তা ফেলে রেখে এই দুনিয়া থেকে বিদায় নেয়। তাই তাদের উচিত দানের সুযোগগুলোকে কাজে লাগানো। অবশ্য নানা পরিবেশ ও প্রেক্ষাপটে দানের গুরুত্ব বা মূল্য সমান নয়।  মক্কা বিজয়ের আগে যারা জিহাদ ও দান করেছেন তাদের জিহাদ আর দান সংকটপূর্ণ ও কঠিন অবস্থায় করা হয়েছিল বলে সেসবের মূল্য পরবর্তীকালের শান্ত অবস্থার জিহাদ ও দানের চেয়ে অনেক বেশি। অবশ্য শান্তি ও সুখ-সমৃদ্ধির সময়ে করা দান এবং ইসলামী তৎপরতারও মূল্য রয়েছে। তাই মহান আল্লাহ এই উভয় গ্রুপকে প্রতিদান বা পুরস্কার দেবেন বলে ওয়াদা দিয়েছেন। কিন্তু এটা স্পষ্ট যে সংকটপূর্ণ সময়ের দান ও জিহাদ বেশি পুরস্কার পাবার যোগ্য।

সুরা হাদিদের ১১ নম্বর আয়াতে মানুষের দানশীলতাকে উৎসাহ দেয়ার জন্য মহান আল্লাহ বলছেন:

'কে সেই ব্যক্তি,যে আল্লাহকে উত্তম ধার দিবে,এরপর তিনি তার জন্যে তা বহুগুণে বাড়িয়ে দেবেন এবং তার জন্যে রয়েছে গৌরবময় পুরস্কার?' 

মহান আল্লাহকে উত্তম ধার দেয়া বলতে আল্লাহর পথে যে কোনো ধরনের ধার দেয়াকে বোঝানো হয়েছে। দানশীল মানুষকে কিয়ামত বা পুনরুত্থানে দিনে গৌরবময় পুরস্কার দেয়া হবে বলে মহান আল্লাহ ওয়াদা দিয়েছেন। সেদিন ঈমানদার নারী ও পুরুষের নুর তাদের সামনে এবং ডানদিকে দ্রুত গতিতে অগ্রসর হবে।  কিয়ামত বা বিচার-দিবসে মানুষের বিশ্বাস ও তৎপরতা উজ্জ্বল নূর হয়ে প্রকাশ পাবে এবং কুফরি তৎপরতা চরম অন্ধকার হয়ে দেখা দেবে। এ সময় মু'মিন বা বিশ্বাসীদেরকে বেহেশতি বাগানের অধিকারি হওয়ার সুসংবাদ দেবেন ফেরেশতারা। এইসব বাগানে প্রবাহমান থাকবে ঝর্ণা। আর এটা খুবই বড় সাফল্য।

কিন্তু অজ্ঞতা ও কপটতার মধ্যে ডুবে-থাকা মুনাফিকরা একটু আলো পাওয়ার জন্য মু'মিনদের কাছে আকুল আবেদন জানাতে থাকবে। জবাবে তাদের বলা হবে: নিজের অতীতের দিকে ফিরে তাকাও এবং সেখান থেকে তথা দুনিয়া থেকে আলো অন্বেষণ করা উচিত ছিল তোমাদের। অর্থাৎ পরকাল নুর অর্জনের জায়গা নয়। নুর দুনিয়াতেই অর্জন করতে হয় ঈমান ও  সৎকাজের মাধ্যমে। কিন্তু এখন দেরি হয়ে গেছে।

এ সময় মু'মিন ও মুনাফিকদের মধ্যে দেয়াল তোলা হবে। দেয়ালে থাকবে এমন এক দরজা যার ভেতরের দিকে রহমত আর বাইরে থাকবে শাস্তি। মুনাফিকরা মু'মিনদের চিৎকার করে বলবে: আমরা কি তোমাদের সঙ্গে ছিলাম না? আমরা তোমাদের সঙ্গে এক জায়গাতেই তো পাশাপাশি থাকতাম।  কেন আমাদের থেকে আলাদা হয়ে গেলে? তোমরা আলাদা হয়ে যাওয়ায় খোদায়ি রহমত তোমাদেরকে ঘিরে ফেলেছে অজস্র ধারায়। অথচ আমাদেরকে শাস্তির মধ্যে ছেড়ে দিলে? তখন বেহেশতি মু'মিনরা বলবেন: হ্যাঁ, আমরা একসঙ্গেই ছিলাম। কিন্তু ধর্ম, বিশ্বাস ও আমলের দিক থেকে আমাদের মধ্যে ছিল বহু যোজন ব্যবধান। তোমাদের কাছে সত্যের কোনো মূল্য বা কদরই ছিল না।

বেহেশতি মু'মিনরা মুনাফিকদের আরও বলবেন: তোমরা ধোঁকা দিয়েছ নিজেদেরকেই। তোমরা সব সময়ই ইসলামের মহান নবী (সা)'র মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করতে এবং অপেক্ষায় ছিলে যে কখন ইসলামের দফা-রফা হয়ে ধর্মটির বিলুপ্তি ঘটবে। তোমরা পরকাল ও মহানবীর দাওয়াতের সত্যতায় সন্দিহান ছিলে এবং সব সময়ই অসম্ভব কল্পনার বিচরণ করতে। এ অবস্থায় হঠাৎ মৃত্যুর শিকার হয়েছ তোমরা। শয়তানও আল্লাহর ব্যাপারে তোমাদেরকে ধোঁকা দিয়েছে। আর এসব বিষয়ই তোমাদের পথকে আমাদের পথ থেকে আলাদা করেছে এবং তোমাদের সর্বনাশ করেছে।

সুরা হাদিদের ২৫ নম্বর আয়াতে নবী-রাসুলদের মিশনের উদ্দেশ্য তুলে ধরে বলা হয়েছে:

'আমি আমার রসূলদের সুস্পষ্ট নিদর্শনসহ পাঠিয়েছি এবং তাঁদের সাথে নাজেল করেছি কিতাব ও ন্যায়ের মানদণ্ড,যাতে মানুষ ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করে। আর আমি নাযিল করেছি লোহা,যাতে আছে প্রচন্ড শক্তি এবং মানুষের জন্য নানা ধরনের উপকার। এটা এজন্যে যে,আল্লাহ জেনে নিবেন কে না দেখে তাঁকে ও তাঁর রসূলদের সাহায্য করে। আল্লাহ শক্তিধর,পরাক্রমশালী।'

 

-এখানে কিতাব বলতে আসমানি ধর্মগ্রন্থের কথা বলা হয়েছে। আর ন্যায়ের মানদণ্ড হল মিজান তথা খোদায়ি বিধি-বিধান যা দিয়ে মানুষের তৎপরতা বিচার এবং ভালো ও মন্দের পার্থক্য করা যায়। নবী-রাসুলদের পাঠানোর উদ্দেশ্য হল মানুষের মধ্যে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ও মানুষকে ন্যায়নীতিতে অভ্যস্ত করা। অন্য কথায় নবী-রাসুলদের মিশনের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল এটা যে তাঁদের প্রশিক্ষণ পেয়ে মানুষ নিজেই ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করবে ও স্বেচ্ছায় ন্যায়ের পথে চলবে।

 

ইতিহাসে দেখা গেছে, একটি সমাজ বিশ্বাস ও নৈতিকতার দিক থেকে উন্নত হওয়া সত্ত্বেও সে সমাজে এমন অনেক লোক দেখা যায় যারা আল্লাহর আদেশ মানে না এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায়ও বাধা দেয়। আর তাই এদের দমনের জন্য শক্তি প্রয়োগের দরকার হয়। তাই এক্ষেত্রে মহান আল্লাহর অন্যতম নেয়ামত লোহাও খুব কাজে লাগে। শান্তি-রক্ষা, যুদ্ধ ও প্রতিরোধের হাতিয়ার তথা অস্ত্র নির্মাণ ছাড়াও লোহার অন্য অনেক ব্যবহার রয়েছে। কিন্তু অনেক সময় অস্ত্রই হয়ে পড়ে ন্যায়-বিচার প্রতিষ্ঠার মাধ্যম। লোহা না থাকলে মানুষের জীবন সত্যিই কঠিন হয়ে পড়ত। আর তাই এমন একটি উপকারী ধাতু মানুষের জন্য ব্যাপক মাত্রায় সৃষ্টি করেছেন মহান আল্লাহ এবং মানুষও তা সহজেই সংগ্রহ করতে পারে।#

পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/মো: আবু সাঈদ/  ১

২০১৮-০৭-০১ ১৭:০৮ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য