গত আসরগুলোতে আমরা যেমনটি বলেছি, মসজিদকে মুসলমানদের মধ্যে ঐক্য ও সংহতির কেন্দ্রবিন্দু বলা যায়। বর্ণ, গোত্র নির্বিশেষে ধনী-গরীব সবার জন্য মসজিদের দরজা উন্মুক্ত। আজকের আসরের পুরোটা অংশ জুড়ে আমরা জার্মানির হামবুর্গ শহরে অবস্থিত ইমাম আলী (আ.) মসজিদ নিয়ে আলোচনা করব।

মসজিদ হচ্ছে আল্লাহর ঘর। এখানে সমাজের নানা শ্রেণি ও পেশার মানুষ যখন পরস্পরের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এক কাতারবন্দি হয়ে নামাজে দাঁড়িয়ে যান তখন এক অপূর্ব পরিবেশ তৈরি হয়। এ ছাড়া, অমুসলিম দেশে অবস্থিত মসজিদগুলোকে অমুসলিমদের সামনে ইসলামের শান্তিকামী শিক্ষা ও সংস্কৃতি তুলে ধরার কাজেও ব্যবহার করা যায়।  অমুসলিম দেশগুলোতে অবস্থিত যেসব মসজিদ বর্তমানে ইসলামের শান্তির বার্তা পৌঁছে দেয়ার সুমহান কাজটি করে যাচ্ছে সেগুলোর একটি হচ্ছে জার্মানীর হামবুর্গ শহরে অবস্থিত ইমাম আলী (আ.) মসজিদ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আগত মুসলমানরা এখানে নামাজ আদায় করেন এবং এই মসজিদকে কেন্দ্র করে এতগুলো দেশের মানুষের মধ্যে ঐক্যের বন্ধন গড়ে উঠেছে।  জার্মানিতে বছরের দু’টি নির্দিষ্ট দিনকে ‘খোলা উপাসনালয় দিবস’ হিসেবে নামকরণ করা হয়েছে। এর একদিন গির্জার জন্য এবং আরেক দিন মসজিদের জন্য নির্ধারিত। এরমধ্যে ৩ অক্টোবর হচ্ছে খোলা মসজিদ দিবস। জার্মানির ‘মুসলিম সমন্বয় পরিষদ’ এই দিবসটি উদযাপনের দায়িত্ব পালন করে।

এই দিনে এই পরিষদ অমুসলিম দর্শনার্থীদের নানা প্রশ্নের উত্তর দেয়ার পাশাপাশি প্রতি বছর আলাদাভাবে একটি নির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে আলোচনা করে। গত কয়েক বছরে যেসব বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে সেগুলোর কয়েকটি হচ্ছে- পরিবেশ রক্ষা, সামাজিক দায়িত্ব পালন, ইসলামি শিল্প এবং অভিভাসন।  ২০১৭ সালের ৩ অক্টোবর খোলা মসজিদ দিবসের শ্লোগান ছিল  ‘ভালো প্রতিবেশী; উন্নত সমাজ’।  এই দিবস উপলক্ষে প্রকাশিত লিফলেটে লেখা ছিল, ইসলামে প্রতিবেশীর সঙ্গে ভালো ব্যবহারের যে তাগিদ দেয়া হয়েছে মানুষ তা ভুলে যেতে বসেছে বলে চলতি বছর আলোচনার জন্য এ বিষয়টি বেছে নেয়া হয়েছে।

হামবুর্গের ইমাম আলী (আ.) মসজিদের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো এর পাঠাগার। এই পাঠাগারে ধর্মীয়, ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও সাহিত্য বিষয়ক পাঁচ হাজারেরও বেশি বই রয়েছে।  আরবি, ফার্সি, জার্মান ও ইংরেজি ভাষায় লিখিত এসব বই পাঠকরা পাঠাগারে বসে পড়তে পারেন আবার কিছুদিনের জন্য বাড়িতেও নিয়ে যেতে পারেন। ইউরোপীয় সমাজে ইসলামকে সঠিকভাবে উপস্থাপনের জন্য এই পাঠাগারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন ভাষায় নতুন নতুন বই প্রকাশের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

জার্মানির ইমাম আলী (আ.) মসজিদের লাইব্রেরি

সেইসঙ্গে জার্মান ভাষায় ইসলামের পরিচিতিমূলক পুস্তিকা প্রকাশ করে তা মসজিদে আগত ব্যক্তিদের মধ্যে বিনামূল্যে বিতরণ করা হচ্ছে। এ ছাড়া, হামবুর্গ ইসলামিক সেন্টার ‘আল-ফাজর’ নামক একটি ম্যাগাজিনও প্রকাশ করছে। ১৯৮২ সাল থেকে শুরু করে প্রতি দুই মাস অন্তর নিয়মিত এই ম্যাগাজিনটি প্রকাশিত হচ্ছে।

হামবুর্গের ইমাম আলী (আ.) মসজিদে নিয়মিত জুমার নামাজ অনুষ্ঠিত হয় যেখানে প্রচুর মুসল্লির সমাগম ঘটে। এখানে আরবি, জার্মান ও ফার্সি- এই তিন ভাষায় খুতবা দেয়া হয়। এ ছাড়া, প্রতি বছর এই মসজিদে অত্যন্ত উৎসাহ উদ্দীপনার সঙ্গে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। এসব নামাজে অংশগ্রহণকারী মুসলমানদের মধ্যে এক গভীর ঈমানী বন্ধন তৈরি হয়।

ইমাম আলী (আ.) মসজিদে সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে নিয়মিত পবিত্র কুরআনের তাফসির অনুষ্ঠিত হয়। প্রতি বৃহস্পতিবার রাতে মসজিদের মূল চত্বরে ফার্সি ভাষায় তাফসিরে কুরআন মাহফিল বসে। আর জার্মান ভাষায় কুরআনের তাফসির হয় প্রতি শনিবার রাতে মসজিদের পাঠাগারে। এ ছাড়া, এই মসজিদে প্রতি মাসের প্রথম শনিবার আরবি ভাষায় কুরআনের তাফসির করা হয়। বিশ্বের বিভিন্ন আরব দেশ থেকে আগত মুসলমানরা এই মাহফিলে যোগ দেন। এই মাহফিলে সাধারণত বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক এবং একজন আলেমে দ্বীন বক্তব্য রাখেন।

জার্মানির ইমাম আলী (আ.) মসজিদে এতেকাফ

মুসলমানদের মধ্যে ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিষয়ে মত বিনিময়ের জন্য হামবুর্গের ইসলামিক সেন্টার ও ইমাম আলী (আ.) মসজিদ কিছুদিন পরপর বিভিন্ন বিষয়ে সেমিনারের আয়োজন করে। এসব সেমিনারে মুসলিম বিশ্বের চলমান ঘটনাবলীর পাশাপাশি, মুসলিম ঐক্য, হজ্ব ও ইসলামি চিন্তাবিদদের জীবন ও কর্ম সম্পর্কে আলোচনা হয়।

জার্মানির ইমাম আলী (আ.) মসজিদ

এই মসজিদে সব বয়সের মুসলমানদের জন্য কুরআন শিক্ষার আসর বসে। সেইসঙ্গে শিশু-কিশোরদের নামাজসহ অন্যান্য ধর্মীয় শিক্ষা দেয়ার জন্য নিয়মিত ক্লাস অনুষ্ঠিত হয়। মজার ব্যাপার হচ্ছে, জার্মানির বিভিন্ন স্কুল থেকে মাঝেমধ্যে মসজিদ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা ইমাম আলী (আ.) মসজিদ পরিদর্শনে আসে। হামবুর্গ ইসলামিক সেন্টারের পক্ষ থেকে এ সময় অমুসলিম শিক্ষার্থীদের সামনে ইসলামের নানা পরিচিতিমূলক দিক ও শিক্ষা তুলে ধরা হয়। সেইসঙ্গে ইসলাম সম্পর্কে জার্মান শিক্ষার্থীদের নানা প্রশ্নের উত্তর দেয়া হয়। এ ছাড়াও বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন ইসলাম সম্পর্কে জানার জন্য এই মসজিদে আসে।

কাজেই দেখা যাচ্ছে, জার্মানিতে বছরের একটি নির্দিষ্ট দিনকে ‘খোলা মসজিদ দিবস’ হিসেবে উদযাপন করা হলেও ইমাম আলী (আ.) মসজিদের দরজা বছরের ৩৬৫ দিনই সবার জন্য উন্মুক্ত থাকে। অমুসলিমদের জন্য বিশেষভাবে প্রতি শনি ও রোববার সকাল নয়টা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত মসজিদ খুলে রাখা হয়। এই মসজিদে যেসব ধর্মীয় অনুষ্ঠান উদযাপিত হয় সেগুলোর মধ্যে নও মুসলিমদের ইসলাম গ্রহণের অনুষ্ঠান অন্যতম। এই অনুষ্ঠানে একজন অমুসলমান যখন কালিমায়ে শাহাদাৎ পাঠ করার মাধ্যমে মুসলমান হয়ে যান তখন তার একটি ইসলামি নাম রাখা হয় এবং মসজিদে সংরক্ষিত একটি বইতে মুসলমান হিসেবে তার নাম রেজিস্ট্রি করা হয়।

তো বন্ধুরা, এতক্ষণ হামবুর্গের ইমাম আলী (আ.) মসজিদের বিভিন্ন তৎপরতা সম্পর্কে শুনছিলেন। এবারে আমরা এই মসজিদ নির্মাণের ইতিহাস ও নির্মাণশৈলি সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করব। জার্মানিতে বসবাসরত বিভিন্ন জাতি ও বর্ণের মুসলমানদের নামাজ আদায়ের এই মসজিদটি ইরানের বিশিষ্ট আলেম আয়াতুল্লাহিল উজমা বোরুজেরদি (রহ.)’র উদ্যোগে নির্মিত হয়। মসজিদের মূল ভবনটি দু’টি আলাদা ভাগে বিভক্ত। এর মূল অংশ গোলাকৃতির যার উপরে রয়েছে ১৩.৫ মিটার ব্যাসবিশিষ্ট ১৮ মিটার উঁচু গম্বুজ। সবুজ রঙের এই গম্বুজটি মসজিদের সৌন্দর্য বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে। মসজিদের ভেতরের দেয়ালে স্থাপিত শিলালিপিতে পূর্ণাঙ্গ সূরা জুমআ এবং সূরা বনি-ইসরাইলের কয়েকটি আয়াত জার্মান অনুবাদসহ লিপিবদ্ধ রয়েছে। মসজিদের ভেতরে চমৎকার টাইলসের কারুকাজ হয়েছে প্রখ্যাত ইরানি স্থাপত্যশিল্পী অধ্যাপক আবুল হোসেইন মেশকাতের দিক-নির্দেশনায়। মসজিদের দৃষ্টিনন্দন মিহরাবটি তৈরি হয়েছে ইট ও টাইলসের সমন্বয়ে।  মিহরাবের ঠিক উপরের দেয়ালে সূরা আনআমের ১৬২ নম্বর আয়াত লেখা রয়েছে যার অর্থ হচ্ছে- “বলুন:  আমার নামাজ, আমার কুরবানি, আমার জীবন ও মরণ সবই আল্লাহর জন্য যিনি বিশ্বজগতের প্রতিপালক।”

জার্মানির ইমাম আলী (আ.) মসজিদ

মসজিদের মূল হলরুমে দৈনিক পাঞ্জেগানা নামাজ, জুমার নামাজ এবং দুই ঈদের নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। ইমাম আলী (আ.) মসজিদের গম্বুজের দুই পাশে রয়েছে দু’টি মিনার যা ইসলামের প্রথম মুয়াজ্জিন হযরত বেলালের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। মিনার দু’টি কংক্রিটের তৈরি হলেও এর উপরিভাগে রয়েছে খয়েরি রঙের সিরামিক খণ্ডের আবরণ।  মসজিদের মূল প্রবেশ পথ এর পশ্চিম দিকে অবস্থিত এবং এটি মসজিদের মেঝের তুলনায় উঁচুতে স্থাপিত। মুসল্লিদেরকে দরজা দিয়ে প্রবেশ করার পর সিঁড়ি বেয়ে নীচে নেমে আসতে হয়। মসজিদের মূল ভবনের অন্য অংশে রয়েছে একটি অডিটরিয়াম, একটি লাইব্রেরি, প্রশাসনিক দপ্তর, ওজুখানা, ওয়াশরুম এবং কিচেন। অডিটরিয়ামটিতে একসঙ্গে ২০০ মানুষের বসার ব্যবস্থা রয়েছে। আমরা আগেই বলেছি, হামবুর্গের ইসলামিক সেন্টার ইসলাম প্রচারের কাজে এই অডিটরিয়ামটি ব্যবহার করে।

তো বন্ধুরা, এরইসঙ্গে শেষ করছি ধরণীর বেহেশত মসজিদ শীর্ষক আলোচনা। যারা সঙ্গ দিলেন তাদের সবাইকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।#

পার্সটুডে/মুজাহিদুল ইসলাম/ মো: আবু সাঈদ/ ২

২০১৮-০৭-০২ ২০:১৪ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য