গত আসরে আমরা বলেছি, ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা দিন দিন বাড়লেও অনেকেই এর ভালো-মন্দ দিক সম্পর্কে সচেতন নন। অভিভাবকরা এসব বিষয়ে যথেষ্ট অভিজ্ঞ ও সচেতন না হওয়ার কারণে সন্তানদের সঠিক পন্থায় দিকনির্দেশনা দিতে পারছেন না।

বর্তমানে স্মার্ট মোবাইলের মাধ্যমে ইন্টারনেটের ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। তরুণ সমাজের অনেকের হাতেই রয়েছে স্মার্ট মোবাইল। এর ফলে যেখানে সেখানে যখন তখন ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারছে তরুণ-তরুণীরা। ঘরে বসেই ইন্টারনেট ব্যবহার করতে হবে এমন পরিস্থিতি এখন আর নেই। অনেক সময়ই দেখা যায়, শিশু-কিশোররা ঘরের বাইরে গিয়ে ইচ্ছেমতো বিভিন্ন সাইট ভিজিট করছে। এ অবস্থায় সাময়িক সমাধান হলো, কম বয়সী সন্তানদেরকে স্মার্ট মোবাইল দেওয়া যাবে না। কিন্তু সমস্যা হলো, নিজের না থাকলেও অনেকেই বন্ধু বা সহপাঠীদের কাছ থেকে মোবাইল ধার নিয়ে ইন্টারনেট ব্যবহার করে। এ অবস্থায় সন্তানদেরকে ইন্টারনেটের খারাপ দিক সম্পর্কে সচেতন করে তোলা ছাড়া ভিন্ন কোনো উপায় নেই। বড়দের তত্ত্বাবধান ছাড়া ইন্টারনেট ব্যবহার করলে যে বড় ধরণের ক্ষতি হয়ে যেতে পারে তা সন্তানদের বুঝাতে হবে।

বাস্তবতা হলো, অনিয়ন্ত্রিতভাবে ইন্টারনেট ব্যবহারের কারণে আজকের শিশু-কিশোররা বিভিন্ন ধরনের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম যেমন ফেসবুক, টুইটার, হোয়াটসঅ্যাপ,ভাইবার, ইমো, ইনস্টোগ্রাম ইত্যাদিতে আসক্ত হয়ে পড়ছে। তাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব হচ্ছে নতুন নতুন মানুষের। এভাবে কেউ কেউ তাদের খুব কাছের মানুষ হয়ে উঠছে। কিন্তু ইন্টারনেটের ক্রমবর্ধমান ব্যবহারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সাইবার অপরাধের ঘটনা। একটু অসচেতনতার কারণে ঘটে যেতে পারে বড় ধরণের বিপদ। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যাচ্ছে,সারা বিশ্বেই বিশেষকরে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের একটা বড় অংশই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সাইবার অপরাধের শিকার হচ্ছে। ছদ্মবেশে বখাটেপনা ও উত্ত্যক্ত করা থেকে শুরু করে সামাজিক মাধ্যমে অহরহই হচ্ছে হ্যাকিং,ঘটছে ব্ল্যাকমেইলের মতো নানা ঘটনা। বাংলাদেশ ও ভারতে এ ধরণের ঘটনা বাড়ছে উদ্বেগজনক হারে। অনেক সরলমনা বাবা-মা তাদের সন্তানদেরকে আরও বেশি আধুনিক করতে অল্প বয়স থেকেই ইন্টারনেটে অভ্যস্ত করে তুলছেন। কিন্তু ইন্টারনেটের অবাধ ব্যবহার যে সন্তানের জন্য বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে তা একবারও খেয়াল করছেন না।

ইন্টারনেটের মাধ্যমে নানা অপরাধে উসকানি দেওয়া বা অপরাধে জড়িয়ে ফেলার মতো ঘটনা এখন অহরহই ঘটছে।  অনেকে এখন শখের বশেই ইন্টারনেটে নিজের বয়স গোপন করে। সম্প্রতি বাংলাদেশের গণমাধ্যমে প্রকাশিত এ সংক্রান্ত একটি ঘটনা তুলে ধরছি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকে বাংলাদেশের রাজবাড়ী জেলার তরুণী মনীষার সঙ্গে পরিচয় ঘটে তরুণ বাহারুলের। এরপর এই পরিচয়ের ভিত্তিতেই তারা সিদ্ধান্ত নেয় বিয়ে করার। তরুণের বাড়ির ঠিকানা নিয়ে সেখানে চলে যান ওই তরুণী। সেখানে গিয়ে তিনি জানতে পারেন তরুণ তার চেয়ে বয়সে সাত বছরের ছোট। কিন্তু ইন্টারনেটে তরুণ তার বয়স বেশি উল্লেখ করে মেয়েটির সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলেছিল। তরুণী মনীষা প্রতারণার বিষয়টি উপলব্ধি করার পর গণমাধ্যমকে বলেন, বাহারুলের বয়স যে এতো কম তা জানা থাকলে আমি তার সঙ্গে সম্পর্ক গড়তাম না এবং তার বাড়িতেও যেতাম না।

বয়স গোপন করে প্রতারণা ক্রমেই বাড়ছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর একটি বড় অংশেরই বয়স ১৮ বছরের নিচে। এদের বেশিরভাগই মোবাইল ফোনে ইন্টারনেট ব্যবহার করে। সাইবার ক্রাইম সংক্রান্ত অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখলেই এ ধরনের নানা ঘটনা চোখে পড়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া আইডেনটিটি তৈরি করেও অংসখ্য প্রতারণার ঘটনা ঘটছে। বিশেষ করে নারীরা অনেকেই এই বিষয়ে ভুক্তভোগী। ইউটিউবসহ অনেক প্রাপ্তবয়স্কদের সাইটে গোপনে ধারণকৃত ভিডিও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। এমন ঘটনা প্রায় সব দেশেই ঘটছে।

এ অবস্থায় ইন্টারনেটের অপব্যবহার রোধ করা জরুরি। এ জন্য ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদেরকেও সর্তক হতে হবে। পরিবার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকেও সতর্কতা ও সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। সরকারের পক্ষ থেকে গণসচেতনতা কর্মসূচি হাতে নিতে হবে। নিরাপদ ইন্টারনেটের ব্যবহারবিধি পাঠ্যপুস্তকে সংযোজন করতে হবে। ইন্টারনেটের নিরাপদ ব্যবহারকে সংস্কৃতিতে পরিণত করতে হবে। সন্তানদের সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়তে যে কোনো মূল্যে শিশুর নিরাপদ শৈশব নিশ্চিত করতে হবে। ভার্চুয়াল জগতে প্রতারণার শিকার হলে তা গোপন না রেখে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতা নিতে হবে। অপরাধীরা ধরা পড়লে এবং শাস্তির সম্মুখীন হলে প্রতারণার মাত্রা কমে আসবে।# 

পার্সটুডে/সোহেল আহম্মেদ/মো: আবুসাঈদ/  ৪

২০১৮-০৭-০৪ ১৫:২৮ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য