ইরানের জলে-স্থলে, ক্ষেত-খামারে, বাগ-বাগিচায়, কল-কারখানায় উৎপাদিত বিচিত্র সামগ্রীর পাশাপাশি খনি থেকে উৎপন্ন বিভিন্ন সামগ্রী এবং ইরানি নরনারীদের মেধা ও মনন খাটিয়ে তৈরি করা বিভিন্ন শিল্পের সঙ্গে আপনাদের পরিচয় করিয়ে দেয়ার জন্য আমাদের সাপ্তাহিক আয়োজন "ইরানের পণ্য সামগ্রী" শীর্ষক আসরের আজকের পর্বে আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি।

 

গত আসরে আমরা ইরানের ঐতিহ্যবাহী ও গুরুত্বপূর্ণ শিল্প-চামড়াশিল্প নিয়ে কথা বলেছি। আজকের আসরে আমরা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করবো।  

গুরুত্বপূর্ণ জিনিসটি হলো খাবার বা খাদ্যপণ্য। বর্তমানে খাদ্যপণ্য একটি কৌশলগত পণ্য হিসেবে পরিচিত। খাদ্য শিল্প এবং খাদ্যপণ্য সম্পর্কিত অন্যান্য শিল্পপণ্য এখন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্য পণ্য হিসেবে পরিগণিত। বিশ্ব ব্যাংকের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো ভবিষ্যদ্বাণী করেছে যে ২০৫০ সালে বিশ্বের জনসংখ্যা দাঁড়াতে পারে ৯০০ কোটিতে। এতো বিশাল জনসংখ্যার দৈনন্দিন খাদ্যের জোগান দেওয়াটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। আজকের আসরে আমরা এ সংক্রান্ত বিষয় আশয় নিয়ে আলোচনা করার চেষ্টা করবো ইনশাআল্লাহ।

বিশ্বের এই যে বিশাল জনসংখ্যার কথা বলা হলো তাদের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ন্যূনতম মান সম্মত জীবনযাপন নিশ্চিত করার প্রয়োজনে বিশেষ করে শতকরা অন্তত ৫০ ভাগ খাবার বেশি উৎপাদন করতে হয়। অথচ এখন বিশ্বের কৃষিভূমি, জীব বৈচিত্র্য, সমুদ্রগুলো, বনাঞ্চলসহ সকল প্রাকৃতিক উৎসই এখন ব্যাপকভাবে ক্ষয়ে যাচ্ছে, নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। বৈশ্বিক আবহাওয়া পরিবর্তনের ফলে কৃষিপণ্য উৎপাদনের পরিমাণ এখন পর্যন্ত কমপক্ষে শতকরা পঁচিশ ভাগ কমে গেছে। জাতিসংঘের ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী ২০৫০ সালে জনসংখ্যা বৃদ্ধির পরিমাণ যদি ঠিক থাকে তাহলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শতকরা একান্ন ভাগ লোককেই তাদের খাবারের চাহিদা নিশ্চিত করার জন্য খাদ্য সামগ্রী আমদানি করতে হবে।

কিন্তু খাদ্য সামগ্রী উৎপাদনের উৎস কমার সময় জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার যেভাবে বাড়ছে, যেভাবে সামগ্রিক খাদ্য চাহিদার পরিমাণ বাড়ছে, তার ফলে বিশ্বের সরকারগুলো, গবেষকগণ এবং বিজ্ঞানীদের মনোযোগ বিষয়টির প্রতি ভীষণভাবে আকৃষ্ট হয়েছে। সুতরাং খাদ্যের যে মজুদ রয়েছে সেটুকুর যথার্থ ব্যবহার করা, রক্ষণাবেক্ষণের সঠিক পদ্ধতি ও ব্যবস্থাপনা, কৃষিপণ্যের অনাকাঙ্ক্ষিত পচন রোধ করা, খাদ্যপণ্যের নতুন নতুন উৎস নিশ্চিত কিংবা উদ্ভাবন করা, পণ্যের গুণগত মান উন্নয়ন কিংবা যথাযথভাবে সংরক্ষণ করার লক্ষ্যে উপযুক্ত প্যাকেজিং ইত্যাদিকে খাদ্য নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ব্যাপক গুরুত্বপূর্ণ নীতিমালা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এ নিয়ে আমরা আরও কথা বলবো ইনশাআল্লাহ। এবারে চলুন বিরতির অবসরে একটু মিউজিক শোনা যাক।

 ইরানি খাদ্যপণ্য

সামাজিক এবং বিজ্ঞান ও কারিগরি ক্ষেত্রে এই উন্নয়ন ও অগ্রগতির ফলে খাদ্য সামগ্রীর ক্ষেত্রেও ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। নতুন নতুন বহু খাবারের উদ্ভাবন হয়েছে এবং প্রতিনিয়ত তা বেড়েই যাচ্ছে। মানুষের শরীরের সঙ্গে কোন ধরনের খাদ্য উপাদান উপযোগী সেইসব গবেষণা করে খাদ্য বিশেষজ্ঞ এবং পুষ্টিবিজ্ঞানীরা নতুন নতুন খাবার তৈরি করছেন। স্বাস্থ্যকর খাবারের প্রতি তাই বিভিন্ন দেশের বিশেষজ্ঞমহল বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে এবং খাদ্য এখন একটি শিল্প হয়ে উঠেছে। কৃষিক্ষেত থেকে কৃষিপণ্য তুলে নিয়ে কিংবা বাগান থেকে ফলমূল এনে কিংবা পশুপাখি জবাই করে সেগুলোকে স্বাস্থ্যসম্মত প্রক্রিয়ায় রক্ষণাবেক্ষণ করা, প্যাকিং বা মোড়কে বাঁধা ইত্যাদি সবকিছুই করা হয়ে থাকে বৈজ্ঞানিক উপায়ে। এইসব কাজ এখন খাদ্য শিল্পের অন্তর্ভুক্ত। বিশ্বজুড়ে এখন খাদ্য শিল্পে বহু কোম্পানি কাজ করে যাচ্ছে। বলা হয়ে থাকে যে এইসব শিল্পের মূল্যমান আট হাজার বিলিয়ন ডলারের উপরে।

ইরান বিশাল বিস্তৃত একটি দেশ,তবে তুলনামূলকভাবে শুকনো। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এবং আবহাওয়াগত বৈচিত্র্যের কারণে, উর্বর কৃষিভূমি থাকার কারণে এবং কৃষিক্ষেত্রে গবেষক ও বিশেষজ্ঞদের উপস্থিতির কারণে সেইসঙ্গে পশুপালন ও মাছের ব্যাপক চাষ হওয়ায় দেশের খাদ্য শিল্পের প্রয়োজনীয় চাহিদা মিটিয়ে বাইরেও রপ্তানি করতে সক্ষম হচ্ছে। ইরানের আবহাওয়ায় বারো রকমের বৈচিত্র্য আছে। এখানকার মাটিও যথেষ্ট উর্বর। সুতরাং নাতিশীতোষ্ণ কিংবা আধা নাতিশীতোষ্ণ এলাকার কৃষিপণ্য উৎপাদনের জন্য ইরান যথেষ্ট উপযোগী একটি দেশ। ইরানের কৃষিপণ্যের গুণগত মানও খুব ভালো। এ নিয়ে আমরা আরও কথা বলবো একটু পরেই খানিক মিউজিক বিরতির পর।

ইরানের কৃষিপণ্য বিশ্বব্যাপী সুপরিচিত বিশেষ করে উন্নত খাদ্য সামগ্রীর দিক থেকে। অন্তত ২০ টি কৃষিপণ্য ইরানে উৎপাদিত হয় যেমন পেস্তা, খোরমা, আনার, আঙুর, টমেটো, বিভিন্ন জাতের লেবু ইত্যাদি। এসব উৎপাদনের দিক থেকে বিশ্বে ইরান পাঁচটি দেশের একটি। ইরানের বাগ-বাগিচায় উৎপন্ন পণ্য সামগ্রী রঙ ও স্বাদের দিক থেকে খুবই উন্নত মানের। বাগিচা থেকে উৎপন্ন এবং কৃষিপণ্য ইরানের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে ব্যাপকভাবে বিদেশে রপ্তানি হয়। ফলফলাদি কিংবা কৃষিপণ্য থেকে উৎপন্ন সামগ্রী থেকে বিভিন্ন খাদ্যপণ্যও তৈরি করা হয়। যেমন ফল থেকে ফলের জুস তৈরি, মোরব্বা তৈরি, জেলি তৈরি, অ্যাসেন্স তৈরি ইত্যাদি। রূপান্তরিত খাদ্য সামগ্রী এবং পরিপূরক এইসব শিল্পও দেশের ভেতরে বিভিন্ন প্রান্তে যেমন সরবরাহ করা হয় তেমনি রপ্তানি করা হয় দেশের বাইরেও। ইরানে এখন এ ধরনের রূপান্তরিত খাদ্য শিল্পের কল কারখানা ব্যাপকভাবে গড়ে উঠেছে।#

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/ মো:আবু সাঈদ/  ০৫

২০১৮-০৭-০৫ ২০:৩০ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য