সুরা মুজাদিলাহ পবিত্র কুরআনের ৫৮ নম্বর সুরা। এতে রয়েছে ২২ আয়াত।

জাহেলি জামানার 'জিহার' নামক এক ধরনের বিশেষ তালাককে নিষিদ্ধ করা, তর্ক না করার বিধানসহ অন্যদের সঙ্গে ব্যবহার বা আচার-আচরণের আদব-কায়দা, জলসা বা বৈঠকে সদ্য-প্রবেশ-করা ব্যক্তিকে জায়গা করে দেয়ার বিধান, মুনাফিকদের সম্পর্কে বৈধ আলোচনা এবং শয়তান ও আল্লাহর দল সংক্রান্ত বক্তব্য ইত্যাদি- এই সুরার কয়েকটি আলোচ্য বিষয়।

 

সুরা মুজাদিলাহ'র এক নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলছেন: 'যে নারী তার স্বামীর বিষয়ে আপনার সাথে বাদানুবাদ করছে এবং অভিযোগ পেশ করছে আল্লাহর দরবারে,আল্লাহ তার কথা শুনেছেন। আল্লাহ আপনাদের উভয়ের কথাবার্তা শুনেন। নিশ্চয় আল্লাহ সবকিছু শুনেন,সবকিছু দেখেন।'

 

-মদিনার আনসারদের এক নারী তার স্বামীর বিষয়ে ক্রুদ্ধ হয়েছিলেন। কারণ তার স্বামী তাকে তালাক দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে বলেছিলেন: তুমি আমার কাছে আমার মায়ের মত। ইসলাম-পূর্ব জাহেলি যুগে অনেকেই এ জাতীয় কথা বলে স্ত্রীকে তালাক দিত। কিন্তু কথিত ওই তালাকপ্রাপ্ত নারী স্বাধীন নারীর মত কাউকে বিয়ে করার অধিকারও পেত না। অন্যদিকে স্বামী অনুতপ্ত হলেও জাহেলি রীতি অনুযায়ী স্ত্রীকে ফিরিয়ে আনতে পারত না। আর এ কারণেই এমনই এক ঘটনায় খাওলা নামের ওই আনসার নারী মহানবী (সা)’র কাছে এসে এ বিষয়ে খোদায়ী বিধান জানতে চান।

 

খাওলা মহানবীকে (সা) বলেন যে,'হে রাসুলে খোদা! আমার স্বামী আমাকে যে সময় বিয়ে করেছিলেন সে সময় আমি ছিলাম সুন্দরী যুবতী ও সম্পদের অধিকারী। বিয়ের পর আমার স্বামী আমার সম্পদ দখল করেছেন। কিন্তু এখন আমি বয়স্ক হওয়ার পর আমাকে 'জিহার' করেছেন তথা মায়ের সমতুল্য বলে ঘোষণা দিয়েছেন। অবশ্য এখন তিনি অনুতপ্ত। এ অবস্থায় আমরা কি আবারও স্বামী-স্ত্রী হিসেবে আগের জীবনে ফিরে যেতে পারব?

বিশ্বনবী (সা) ওই আনসার নারী খাওলাকে বললেন: 'তুমি তোমার স্বামীর জন্য হারাম বা অবৈধ হয়ে গেছ।' কিন্তু আনসার ওই নারীর কয়েকটি শিশু সন্তান থাকায় তিনি বার বার এ বিষয়ে মহানবীর ওপর চাপ দিতে থাকেন। অবশেষে ওই নারী মহান আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ করে বললেন: 'আমার অসহায় ও কঠিন অবস্থা এবং চাহিদার বিষয়ে আপনার কাছে ফরিয়াদ করছি! হে আল্লাহ! আপনার নবীর ওপর কোনো নির্দেশ নাজিল করুন এবং এই সমস্যার সুরাহা করুন।'

 

খাওলার ওই ফরিয়াদের কিছুক্ষণ পরই এ সুরার তথা সুরা মুজাদিলার প্রথম দিকের কয়েক আয়াত নাজিল হয় মহানবীর (সা) ওপর। আয়াতে এ নির্দেশ দেয়া হয় যে যারাই জিহার করবে তাদেরকে কাফফারা দিতে হবে এবং জিহারের কারণে তথা স্ত্রীকে মায়ের সমতুল্য বলে ঘোষণা করার কারণে তালাক হয়নি। ফলে খাওলার স্বামী মহানবী (সা)’র সহায়তায় কাফফারা দিয়ে আবারও ওই স্ত্রীর সঙ্গে দাম্পত্য-জীবন শুরু করেন। এভাবে ইসলাম জাহেলি যুগের ওই কুপ্রথাকে নিষিদ্ধ ও বাতিল বা অকার্যকর বলে ঘোষণা করে।

 

সুরা মুজাদিলাহ'র সাত নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

'আপনি কি ভেবে দেখেননি যে,নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলে যা কিছু আছে,আল্লাহ তা জানেন। তিন ব্যক্তির এমন কোন পরামর্শ হয় না যাতে তিনি চতুর্থ থাকেন না এবং পাঁচ জনেরও কোন পরামর্শ হয় না,যাতে তিনি ষষ্ঠ থাকেন না, এরচেয়ে কম হোক বা বেশী হোক তারা যেখানেই থাকুক না কেন তিনি তাদের সাথে আছেন,তারা যা করে, তিনি কেয়ামতের দিন তা তাদেরকে জানিয়ে দিবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব বিষয়ে সম্যক জ্ঞাত।'  

 

-কানে কানে বা গোপনে কিংবা অন্যদের পাশ কাটিয়ে কারো সঙ্গে যেসব কথা বলা হয় তথা কানাঘুষা করা হয় অন্যরা তার কিছুই শুনতে বা বুঝতে পারেন না। তাই অন্যদের সামনে এ জাতীয় কথা বলা অনৈতিক ও নিন্দনীয়। কারণ এ অবস্থায় অন্যরা মনে করেন যে তাদেরকে পর বা অবিশ্বস্ত ভাবা হচ্ছে। ফলে এ ধরনের আলাপ নানা ভুল ধারণা বা সন্দেহ জন্ম দেয়।  সবারই এটা জানা উচিত যে মহান আল্লাহ অন্যদের গোপন আলাপ বা তর্ক-বিতর্কের আগাগোড়া সবই জানেন। কারণ বিশ্বজগতে যা কিছু গোপন ও প্রকাশ্য তার সবই আল্লাহ জানেন।

সুরা মুজাদিলাহ'র ৮ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলছেন:

 

'আপনি কি ভেবে দেখেননি,যাদেরকে কানাঘুষা করতে নিষেধ করা হয়েছিল অতঃপর তারা নিষিদ্ধ কাজেরই পুনরাবৃত্তি করে এবং পাপাচার,সীমালংঘন এবং রসূলের অবাধ্যতার বিষয়েই কানাঘুষা করে। তারা যখন আপনার কাছে আসে,তখন আপনাকে এমন ভাষায় সালাম করে, যেভাবে আল্লাহ আপনাকে প্রশংসা বা সালাম করেননি। তারা মনে মনে বলেঃ আমরা যা বলি, সেজন্য আল্লাহ আমাদেরকে শাস্তি দেন না কেন? জাহান্নামই তাদের জন্যে যথেষ্ট। তারা তাতে প্রবেশ করবে। কতই না নিকৃষ্ট সেই জায়গা।'

 

-একবার একদল ইহুদি ও মুনাফিক নিজেদের মধ্যে কানাঘুষা করছিল এবং মাঝে-মধ্যে মু'মিনদের দিকে আপত্তিজনক ইশারা-ইঙ্গিত করছিল। ফলে মু'মিন মুসলমানরা বেদনাহত হয়েছিলেন। এই আয়াত থেকে এটা বোঝা যায় যে এ বিষয়ে ইহুদি ও মুনাফিকদের আগেই সতর্ক করা হয়েছিল যে তাদের এ জাতীয় আচরণে অন্যরা উদ্বিগ্ন হবেন ও তাতে তাদের মধ্যে জন্ম নেবে  নানা সন্দেহ। মুসলমানদের সামনে এ ধরনের কানাঘুষা না করতে তাদেরকে অনুরোধ করেছিলেন মহানবী (সা)। কিন্তু তারা মহানবীর আহ্বানে সাড়া না দিয়ে কানাঘুষার মধ্যেও এমন কিছু পাপ করছিল যা ছিল মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের নির্দেশের পরিপন্থি। আসলে এভাবে তারা মুমিনদের অসন্তুষ্ট করতে চেয়েছিল। #

পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/মো: আবু সাঈদ/ ৭

২০১৮-০৭-০৭ ১৯:৫১ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য