রংধনু আসরের কাছের ও দূরের শিশু-কিশোর বন্ধুরা, তোমরা নিশ্চই জানো যে, ইসলাম ধর্মে অন্ধ অনুকরণ করতে নিষেধ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, যে কাজই করো না কেন, তা আল্লাহ সন্তুষ্টির জন্য করো। কাজটি করার আগে ভেবে-চিন্তে দেখতে হবে যে, এ কাজটি আল্লাহপাক পছন্দ করবে কিনা? তবে যদি দেখা যায়, তুমি যে পরিবেশে বসবাস করছ সেখানকার সবাই আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কাজ করছে তাহলে সবার সাথে তাল মিলিয়ে কাজ করতে অসুবিধা নেই।  

এ বিষয়ে হযরত লোকমান (আ.) তার পুত্রকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, মানুষকে খুশী করার জন্য কোনো কাজ করো না বা তাদের প্রশংসা শুনে বেশী খুশী হয়ো না। কারণ তাদের জন্য যত বেশী কর না কেন, তারা আসলে খুশী হবে না। হযরত লোকমান (আ.) তার এ প্রসঙ্গে তাঁর ছেলেকে একটি মজার গল্পও শোনান।

রংধনুর আজকের আসরে আমরা সেই গল্পটিসহ অন্ধ অনুকরণ সম্পর্কে দুটি গল্প শোনাবো। সেইসঙ্গে থাকবে একটি গান। আমাদের আজকের অনুষ্ঠানটিও তৈরি করেছেন আশরাফুর রহমান। 

বাপ-বেটা ও গাধা

একবার এক চাষী তার গাধাটা বিক্রি করার জন্য তার ছেলেকে নিয়ে বাজারে যাচ্ছিল। কিছুদূর যাবার পর তারা দেখতে পেল কতগুলো ছেলে রাস্তার পাশে খেলাধুলা করছে। বাপ-বেটাকে দেখে ছেলেদের একজন বলল : আরে আরে দেখেছিস- ওরা কি বোকা! এদের কেউ না কেউ অনায়াসে গাধায় চড়ে যেতে পারে, তা না করে দুইজনই গাধার সঙ্গে হেঁটে যাচ্ছে। এমন আজব লোক জীবনেও দেখি নাই।

ছেলেটির এই ব্যঙ্গোক্তি শুনে কৃষক ছেলেকে গাধার পিঠে চড়িয়ে নিজে তাদের পিছে হেঁটে যেতে লাগলেন। কিছুদূর যাবার পর দেখা গেল কয়েকজন বৃদ্ধ পথের ধারে বসে গল্প করছে। তাদের একজন কৃষক ও তার ছেলেকে দেখিয়ে অন্য বৃদ্ধদের বলল: দেখেছিস, দেখেছিস তোরা ছোকরার কাণ্ড! বাপ যাচ্ছে পায়ে হেঁটে আর ছেলে যাচ্ছে গাধায় চড়ে। এ যুগের ছেলেরা তারা গুরুজনদের কবে সম্মান দিতে শিখবে- কে জানে?

বৃদ্ধদের এসব কথা শুনে ছেলেটি বিষম লজ্জা পেয়ে গাধা থেকে নিচে নেমে এল এবং পিতাকে অনুরোধ করল গাধার ওপর চড়তে। এরপর কৃষক গাধার পিঠে এবং তার পুত্র গাধার পেছনে পেছনে চলতে লাগল। কিছুদূর যাবার পর সামনে পড়ল কয়েকজন স্ত্রীলোক। গাধার উপর পিতা এবং পেছনে পুত্রকে হেঁটে আসতে দেখে তাদের একজন বলে উঠল:  দেখেছিস, মিনসের কি আক্কেল, নিজে আরামে গাধার পিঠে চড়ে যাচ্ছে আর ছেলেটাকে নিয়ে যাচ্ছে হাঁটিয়ে। লোকটা দয়ামায়া কিছুই নাই নাকি!

মহিলাদের কথা শুনে কৃষক খুবই লজ্জা পেল। নিজেকে সে অপরাধী মনে করল। লোকদের কোন কথা আর যেন শুনতে না হয় সেজন্য সে নিজ পুত্রকেও গাধার পিঠে বসাল। বাপ-বেটা দুজনেই গাধার পিঠে চড়ে কিছুদূর যাবার পর তাদের সামনে পড়ল আরও কিছু লোক। তাদের একজন কৃষককে লক্ষ্য করে বলল :

লোক : এই যে ভাই, এই গাধাটা কি তোমার?

কৃষক : কেন? এটা তো আমারই গাধা।

লোক : দেখে তো মনে হয় না যে, এটা তোমার গাধা।

কৃষক : কেন, কি হয়েছে?

লোক : কি হয়েছে জানো না? নিজের গাধা হলে তুমি কি পারতে এর উপর তোমরা দুজন লোক চড়ে যেতে? শোন মিয়া, তুমি এই অবলা প্রাণীটিকে যে কষ্ট দিয়েছো, তাতে তোমাদের উচিত এখন একে কাঁধে করে নিয়ে যাওয়া।

লোকটার কথা শুনে বাপ-বেটা দুজনই গাধা থেকে নিচে নেমে আসল। তারপর একটা দড়ি নিয়ে গাধার পা বেঁধে পায়ের ভিতর বাঁশ ঢুকিয়ে গাধাকে কাঁধে করে নিয়ে চলল। বাজারের কাছে ছিল একটা খাল। খালের উপর ছিল একটা পুল। বাপ-বেটা গাধা কাঁধে নিয়ে ওই পুলের উপর উঠার পর বাজারের বহু লোক এই কাণ্ড দেখে হাসি-ঠাট্টা আর হৈ হট্টগোল শুরু করে দিল। লোকজনের শোরগোল শুনে গাধাটা ভয় পেয়ে পা ছুড়তে লাগল। এক সময় পায়ের দড়ি ছিড়ে গাধাটা পানিতে পড়ে গেল।  গাধা খালে পড়ে যাওয়ায় কৃষক কিছুক্ষণ বোবার মত দাঁড়িয়ে থাকল। নিজেকে সামলে নেবার পর সে তার ছেলেকে উদ্দেশ্য করে বলল : যে যা বলেছে তাই শুনে আমি তাকে সন্তুষ্ট করেতে গেছি। কিন্তু কাউকে তো সন্তুষ্ট করতে পারলামই না, মাঝখান থেকে আমার গাধাটা গেল।

গল্পটি থেকে আমরা একটি বিষয়ে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি আর তা হলো সব মানুষের মন জয় করা কিংবা তাদেরকে খুশী রাখা সত্যিই অসম্ভব। হযরত লোকমান হাকীম তার ছেলেকে গল্পটির মাধ্যমে একথাই বুঝাতে চেয়েছেন। মোট কথা আমরা কাউকেই অন্ধভাবে অনুকরণ করব না। আল্লাহ যেসব কাজ করতে বলেছেন এবং নিষেধ করেছেন সেগুলো মেনে চলব। তাহলেই আমাদের জীবন হবে সুন্দর।  

অন্ধ অনুকরণের পরিণতি

এক দেশে ছিল এক সাদাসিধে ও ভবঘুরে ফকির। তার সহায়-সম্বলের মধ্যে ছিল কেবল একটি গাধা। গাধায় চড়ে তিনি গ্রামে-গঞ্জে ও শহর-বন্দরে ঘুরে বেড়াতেন। সারাদিন পথ চলতেন আর রাত কাটাতেন কোন খানকায় বা পীর-ফকিরের দরগায়। এরকম কোন স্থান পাওয়া না গেলে এই ভবঘুরে ফকির কোন মসজিদ-মাদ্রাসায় রাত কাটাতেন। 

একদিন এই ফকির গাধায় চড়ে ক্লান্ত এক গ্রামে এসে পৌঁছলেন। গ্রামে পৌঁছার পর তিনি লোকজনের কাছে জানতে পারলেন যে, কাছেই একটি জঙ্গলের ভেতর ফকিরদের একটি আস্তানা আছে। সংসারত্যাগী ফকির সেখানে গিয়ে দেখলেন, একদল ফকির দরবেশ আসর জমিয়ে বসে আছে। ফকির তার গাধাটি নিয়ে গিয়ে খোয়াড়ে বাধলেন এবং খানকার একজন খাদেমকে গাধাটি দেখাশোনা করার অনুরোধ জানিয়ে প্রবেশ করলেন ফকিরদের দরবারে।

ফকিরকে দেখে আস্তানার দরবেশরা তাকে স্বাগত জানালেন। দরবেশদের ব্যবহারে ফকির তার পথের ক্লান্তি ভুলে গেলেন এবং তাদের সাথে কথাবার্তায় মশগুল হয়ে পড়লেন।

এদিকে আস্তানায় উপস্থিত গ্রাম্য মস্তানরা ফকিরের গাধাটি দেখে মতলব আঁটতে লাগল। তাদের কয়েকজন এই ফকিরকে অন্য দরবেশদের চেয়েও বেশী সম্মান দিতে লাগল এবং তার সাথে গল্প-গুজবে মেতে উঠল। আর বাকীরা চুপি চুপি আস্তানা থেকে বাইরে বেরিয়ে গেল। তারা খোয়াড় থেকে গাধাটি বের করে গ্রামের ভেতর এক পথিকের কাছে বিক্রি করল। তারপর ওই টাকা দিয়ে বাজার থেকে যাবতীয় খানাপিনা কিনে নিয়ে ফিরে এল দরবেশের আস্তানায়। 

মজার মজার খাবার আর তোষামোদিতে গাধার মালিক ফকিরটি একেবারে আত্মহারা হয়ে গেলেন। খাওয়া-দাওয়ার পর শুরু হলো গানের আসর। গাধার ঘটনার সাথে মিল রেখে তারা যে গজল বানালো তার প্রথম লাইন এরকম :

"হুজুর এল খুশী এল, দুঃখ যত মুছে গেল

বলো বলো সবাই বলো, গাধা গেল গাধা গেল।"

সবাই যখন তবলার তালে তালে ‘গাধা গেল, গাধা গেল' বলে চিৎকার করে গজল গাইছিল তখন গাধার মালিক ফকির ভাবলেন, এটা বোধহয় এই এলাকার কোনো কাহিনী দিয়ে তৈরি করা গজল। তাই তিনিও অন্য সবার সাথে কোরাসে যোগ দিলেন।

এভাবে ঘণ্টাদুয়েক গানবাজনার পর কেউ কেউ ক্লান্ত হয়ে আস্তানাতেই শুয়ে পড়ল আবার কেউ কেউ যার যার বাড়ী ঘরে ফিরে গেল। পরের দিন সকালে সবাই আস্তানা ছেড়ে যার যার কাজে চলে গেলে গাধাওয়ালা ফকির ঘুম থেকে জেগে উঠলেন। জামাকাপড় গোছগাছ করে আস্তানা থেকে বের হয়ে তিনি সোজা চলে গেলেন গাধার আস্তাবলে। কিন্তু সেখানে তার গাধাকে দেখতে পেলেন না। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর আস্তাবলের খাদেমের সঙ্গে তার দেখা হল। খাদেমকে দেখেই ফকির রেগেমেগে বললেন :

ফকির : এই বেটা! আমার গাধা কই?

খাদেম : গাধা! কোন্‌ গাধা?

ফকির : কোন্‌ গাধা আবার! আমার গাধা। কেন তোর কি মনে নেই, গতকাল আস্তানায় ঢোকার সময় এখানে তোর জিম্মায় আমার গাধাটা রেখেছিলাম।

খাদেম : তা মনে থাকবে না কেন? কিন্তু আপনার কি মনে নেই, গতরাতে যখন এত মজার মজার খানাপিনা খেলেন তা কোত্থেকে এল? যদি ভুলে গিয়ে থাকেন তাহলে শুনুন, আপনার গাধা বিক্রির টাকা দিয়েই ওসব কেনা হয়েছে।

ফকির : কি বললি! আমার গাধা বিক্রি করে ওসব কেনা হয়েছে! এই, এই বেটা, তোকে কে অনুমতি দিয়েছে আমার গাধা বিক্রি করার? বল্, বল্ শিগগির।

খাদেম : আপনি আমার উপর ক্ষেপছেন কেন? গাধা কি আমি বিক্রি করেছি নাকি? গাধা তো বিক্রি করেছে মস্তানরা।

ফকির : মস্তানরা বিক্রি করেছে? কিন্তু তুই ওদেরকে গাধাটা দিতে গেলি ক্যান?

খাদেম : আমি কি করব? আমি কি জোরে ওদের সাথে পারি? ওরা ছিল ১০ জন। সবাই এসে আমাকে ভয় দেখিয়ে বলল, গাধাটা নিয়ে যাচ্ছি, যদি কোনো কথা বলিস তোর একদিন, কি আমাদের একদিন! একথা শোনার পর আমি জানের ভয়ে চুপ করে ছিলাম।

ফকির : তা না হয় মানলাম। কিন্তু ওরা চলে খাবার-দাবার কিনে আনার পরও তো আমাকে জানাতে পারতিস। তাহলে নিশ্চয়ই ওদেরকে ধরতে পারতাম।

খাদেম : আমি তো এরকমই করতে চেয়েছিলাম। ঘটনার ঘণ্টা দুয়েক পর যখন আস্তানায় গেলাম তখন শুনতে পেলাম সবার সাথে আপনি জোরেসোরে বলে যাচ্ছেন, 'গাধা গেল, গাধা গেল'। আমি ভাবলাম, গাধা বিক্রির ঘটনাটা আপনি নিশ্চয়ই জেনেছেন। তাই কিছু না বলে ফিরে এসেছি।

খাদেমের কথা শুনে ফকিরের চেতনা ফিরে এল এবং আমতা আমতা করে বললেন:  তুই ঠিকই বলেছিস বাপু। আসলে সব দোষ আমারই। না জেনে, না বুঝে ওদের কার্যকলাপ অনুকরণ করে, ওদের তোষামোদে ফুলে গেছি আমি। যদি প্রথম থেকেই ভেবে দেখতাম, "গাধা গেল, গাধা গেল," শ্লোগানের অর্থ কি- তাহলে নিশ্চয়ই এমনটি হতো না। এখন আর কিইবা করার আছে। আমার অন্ধ অনুকরণই আমার সাথে সাথে তোকেও ধোঁকা দিয়েছে। কবি ঠিকই বলেছেন :

"সর্বনাশ করে সবার অন্ধ অনুকরণ,

ধ্বংস হোক এ নীতির, হোক চির মরণ।"

 পার্সটুডে/আশরাফুর রহমান/১১

ট্যাগ

২০১৮-০৭-১১ ২০:৫০ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য