সুরা মুজাদিলাহ'র নয় নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ মুমিনদের পরামর্শ দিয়ে বলছেন: যখন তারা কানাঘুষা করেন তখন তা যেন করা হয় ভালো কাজ ও খোদাভীরুতার স্বার্থে। পাপাচারের জন্য বা আল্লাহ ও রাসুলের বিরোধিতার কাজে যেন তা তারা না করেন।

সুরা মুজাদিলাহ'র দশ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ মুনাফিকদের কানাঘুষাকে শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে উৎসারিত বলে উল্লেখ করেছেন।

শয়তান মুনাফিকদের কানাঘুষায় জড়িত করে যাতে ঈমানদাররা ব্যথিত হন ও তাদের হৃদয় যেন পেরেশান হয়ে পড়ে। কিন্তু মুমিনদের জানা উচিত যে অস্তিত্বের জগতে ঘটনা-প্রবাহের মূল নিয়ন্ত্রক ও কার্যকারক হলেন মহান আল্লাহ। আল্লাহ না চাইলে কেউই মানুষের কোনো ক্ষতি করতে পারে না। তাই মুমিনদের উচিত কেবল আল্লাহর ওপর ভরসা করা এবং আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো কিছুকেই ভয় না করা। তারা মহান আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে সব সংকটকেই মোকাবেলা করতে সক্ষম। অর্থাৎ মুমিনরা সর্বশক্তিমানের ওপর আস্থা রেখে শয়তানের অনুসারীদের ভয়াবহ সব ষড়যন্ত্রকেও বানচাল করতে পারেন।

 

ঐতিহাসিক বর্ণনায় জানা যায় একবার মহানবী (সা) মসজিদের পাশে এক বড় চত্বরে বসেছিলেন। তাঁর পাশে বসেছিলেন একদল সাহাবি। তারা রাসুলকে ঘিরে এমনভাবে বসেছিলেন যে নতুন কেউ ওই মজলিসে আসলে তাকে জায়গা দেয়ার জন্য অন্য কাউকে সরে বসতে হবে। বিশ্বনবী (সা) বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সাহাবিদেরকে খুবই শ্রদ্ধা করতেন। সেদিনের ওই মজলিসেও হাজির হয়েছিলেন বদর যুদ্ধের একদল মুজাহিদ। ওই মুজাহিদরা মজলিসের সবার উদ্দেশ্যে সালাম দিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন এবং বসার জায়গা পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন। কিন্তু কেউই সরে বসে তাদেরকে জায়গা দিলেন না! এ ঘটনায় মহানবী (স) খুবই বিব্রত ও লজ্জিত হলেন। খুব বেশি ভিড় হয়ে যাওয়ার কারণে তিনি তাঁর আশপাশের একদল ব্যক্তিকে উঠে দাঁড়াতে বললেন যাতে ওই মুজাহিদরা মজলিসে বসতে পারেনজিহাদ ও ঈমানে অগ্রবর্তী মুসলমানদের প্রতি শ্রদ্ধা দেখানো এবং আদব-কায়দা শেখানোর জন্যই মহানবী ওই আদেশ দিয়েছিলেন।

কিন্তু ওই ঘটনায় যে কয়েকজন সাহাবি জায়গা থেকে সরে দাঁড়ান তাদের কাছে এ বিষয়টি পছন্দ হয়নি। ফলে নাজিল হয় সুরা মুজাদিলার ১১ নম্বর আয়াত। এ আয়াতে বলা হয়েছে:

হে মুমিনগণ,যখন তোমাদেরকে বলা হয়ঃ মজলিসে (অন্যদের জায়গা দিতে) স্থান প্রশস্ত করে দাও,তখন তোমরা স্থান প্রশস্ত করে দিও যাতে আল্লাহ তোমাদের জন্য প্রশস্ততা দান করেন। যখন বলা হয়ঃ উঠে যাও,তখন উঠে যেয়ো। তোমাদের মধ্যে যারা ঈমানদার এবং যারা জ্ঞানপ্রাপ্ত,আল্লাহ তাদের মর্যাদা উচ্চ করে দিবেন। আল্লাহ খবর রাখেন যা কিছু তোমরা কর।

-কোনো বিশেষ বা গোপন সামরিক বৈঠক ছাড়া সাধারণ কোনো মজলিসে নবাগত বা অন্যদের স্থান করে দেয়া ইসলামী নৈতিক শিক্ষার অংশ। সাধারণ মজলিসে নবাগত কেউ আসা মাত্রই তার জন্য জায়গা করে দেয়া স্বাভাবিক ভদ্রতা ও শিষ্টাচারেরও দাবি। তাই পরে উপস্থিত ব্যক্তিকে বিনা কারণে বসতে দিতে দেরি করাটা আগে উপস্থিত ব্যক্তিদের জন্য কলঙ্কজনক অভদ্রতা হিসেবে বিবেচিত হয়।

-মহান আল্লাহ ওই আয়াতে এটাও স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন যে কেউ যদি অন্যদের কাজে সুবিধা করে দেয় তাহলে আল্লাহও তার জন্য নানা ক্ষেত্রে সুবিধাজনক অবস্থা সৃষ্টি করবেন। অবশ্য কোনো কোনো সময় মজলিসে অস্বাভাবিক মাত্রায় ভিড় দেখা দেয়। আর এক্ষেত্রে কারো কারো উচিত বসার স্থান থেকে উঠে দাঁড়িয়ে যাওয়া যাতে মজলিসে পরে আসা মেহমান বা অপেক্ষাকৃত বেশি সম্মানিত ব্যক্তিরা বসতে পারেন। কারণ এমনও হতে পারে যে পরে আসা সম্মানিত ব্যক্তিরা অনেক দূর থেকে হেঁটে আসার কারণে বা দীর্ঘ ভ্রমণের কারণে কিংবা বয়স্ক হওয়াসহ অন্য কোনো কারণে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। তাই তাদের জন্য বসে পড়ে বিশ্রাম নেয়াটা অন্যদের চেয়ে বেশি জরুরি। কেউ যদি সম্মানিত ব্যক্তিদের সম্মান দেখিয়ে তাদেরকে মজলিসে বসতে দেয়ার জন্য নিজের বসার জায়গাকে তাদের জন্য ছেড়ে দেন তাহলে আল্লাহ তাকে বড় পুরস্কার দেয়ার ঘোষণা দিয়ে বলেছেন:

'তোমাদের মধ্যে যারা ঈমানদার এবং যারা জ্ঞানপ্রাপ্ত,আল্লাহ তাদের মর্যাদা উচ্চ করে দিবেন। ' সুরা মুজাদিলার শেষ আয়াতে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলা হয়েছে যে একজন মুমিনের হৃদয়ে কখনও একই সময়ে আল্লাহর প্রতি ভালবাসা ও আল্লাহর শত্রুদের প্রতিও ভালবাসা থাকতে পারে না। আল্লাহর শত্রু যদি মুমিনের ভাই-বোন বা পিতা-মাতার মত ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিও হয়ে থাকেন তাহলেও মুমিন তাদেরকে বর্জন করবেন এবং তাদেরকে নিজের শত্রু বলে মনে করবেন। আর এই বড় ত্যাগ বা ধৈর্যের পুরস্কার প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলছেন: 

'যারা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে,তাদেরকে আপনি আল্লাহ ও তাঁর রসূলের শত্রুদের সাথে বন্ধুত্ব করতে দেখবেন না,যদিও তারা তাদের পিতা,পুত্র,ভাই অথবা জ্ঞাতি-গোষ্ঠীও হয়। তাদের অন্তরে আল্লাহ ঈমান লিখে দিয়েছেন এবং তাদেরকে শক্তিশালী করেছেন তাঁর অদৃশ্য শক্তি দিয়ে। তিনি তাদেরকে জান্নাতে দাখিল করবেন,যার তলদেশে নদী প্রবাহিত। তারা তথায় চিরকাল থাকবে। আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারা আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট। তারাই আল্লাহর দল। জেনে রাখ,আল্লাহর দলই সফলকাম হবে।'  #

 

পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/মো: আবু সাঈদ/  ১৬

২০১৮-০৭-১৬ ২০:২৫ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য