আপনারা জানেন যে, ইরানের জলে-স্থলে, ক্ষেত-খামারে, বাগ-বাগিচায়, কল-কারখানায় উৎপাদিত হয় বিচিত্র সামগ্রী।

 

এর পাশাপাশি খনি থেকে উৎপন্ন  বিভিন্ন সামগ্রী এবং ইরানি নরনারীদের মেধা ও মনন খাটিয়ে তৈরি করা হয় বিভিন্ন শিল্পপণ্য। তো এগুলোর সঙ্গে আপনাদের পরিচয় করিয়ে দেয়ার জন্য " ইরানি পণ্য সামগ্রী" শীর্ষক সাপ্তাহিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছি আমরা। গত আসরে আমরা ইরানের গুরুত্বপূর্ণ শিল্পপণ্য "খাদ্য শিল্প" নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করেছি। 

 

আসলে খাদ্য শিল্প এবং খাদ্যপণ্য সম্পর্কিত অন্যান্য শিল্পপণ্য এখন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্যিক পণ্য হিসেবে পরিগণিত। বিশ্ব ব্যাংকের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো ভবিষ্যদ্বাণী করেছে যে ২০৫০ সালে বিশ্বের জনসংখ্যা দাঁড়াতে পারে ৯০০ কোটিতে। এতো বিশাল জনসংখ্যার দৈনন্দিন খাদ্যের জোগান দেওয়াটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। তাই নতুন নতুন খাদ্য তৈরি নিয়ে চলছে ব্যাপক গবেষণা। আবার রূপান্তরিত খাদ্য সামগ্রীও এখন বিশ্বব্যাপী পেয়েছে ব্যাপক সমাদৃতি। ইরানেও এই রূপান্তরিত খাদ্যশিল্পের ক্ষেত্রে চলছে ব্যাপক তৎপরতা। ইরানি এইসব শিল্প এখন দেশের ভেতরে বিভিন্ন প্রান্তে যেমন সরবরাহ করা হয় তেমনি রপ্তানি করা হয় দেশের বাইরেও। ইরানে এখন এ ধরনের রূপান্তরিত খাদ্য শিল্পের কল কারখানা ব্যাপকভাবে গড়ে উঠেছে।

খাদ্য শিল্পটা কৃষি এবং শিল্প-দুয়ের সঙ্গেই সম্পৃক্ত। দেশের শিল্প পণ্যের শতকরা আঠারো ভাগেরও বেশি হলো খাদ্যপণ্য। ইরানের তেলশিল্পের বাইরে রপ্তানিযোগ্য পণ্য হলো এই খাদ্য শিল্প। এই খাদ্যশিল্পের পরিধি ব্যাপক বিস্তৃত। মিনারেল ওয়াটার থেকে শুরু করে বিচিত্র রকমের তেল, শিশু খাদ্য, দুগ্ধজাত বিভিন্ন খাবার, সয়া, চা, চাউল এবং প্রোটিন জাতীয় খাদ্য সামগ্রী। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় কৃষিপণ্য নিয়ে গবেষণা চালিয়ে গবেষকগণ সক্ষম হয়েছেন নতুন নতুন পণ্যসামগ্রী তৈরি করতে। ফলের বীচি থেকে তেল তৈরি, পাতা কিংবা খড় দিয়ে কাগজ তৈরি, ফল থেকে মিষ্টি, আচার, জেলি, জ্যাম ইত্যাদি তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। আবার ওইসব ফলফসলের খড়কুঁড়া দিয়ে তৈরি হয়েছে গৃহপালিত পশুপাখির খাদ্যও। তৈরি হয়েছে পাস্তুরিত ক্যানে ভর্তি বহু রকমের তৈরি-খাবারও।

বিশ্বের শতকরা প্রায় ১৫ ভাগ প্রোটিন চাহিদা পূরণ করা হয়ে থাকে সামুদ্রিক মাছ কিংবা জলে বসবাসকারী অন্যান্য প্রাণী থেকে। মাছ ও মাছ জাতীয় খাদ্য পণ্যকে বিভিন্নভাবে প্রক্রিয়াজাত করে বাজারজাত করার প্রবণতা এখন তুঙ্গে। খাদ্যগুণ এবং স্বাদের দিক থেকে অসম্ভব মজার বলেই এগুলোর চাহিদা বিশ্বব্যাপী বেড়েই চলেছে। ইরানের কাস্পিয়ান সাগরের ৬০০ কিলোমিটার উপকূল রয়েছে। আঠারো শ কিলোমিটারের বেশি সৈকত রয়েছে পারস্য উপসাগর এবং ওমান সাগরের। এতো বিশাল এলাকাজুড়ে বিস্তৃত সৈকতের কারণে সামুদ্রিক প্রোটিন জাতীয় খাদ্যপণ্য উৎপাদনে ইরানের রয়েছে প্রচুর সুযোগ সুবিধা। ইরান তাই প্রক্রিয়াজাত সামুদ্রিক প্রোটিন জাতীয় পণ্য রপ্তানির জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি দেশ। যেসব পণ্য প্রক্রিয়াজাত করা হয় সেগুলোর মধ্যে রয়েছে ক্যানে ভর্তি বিভিন্ন মাছ যেমন কিলকা, টুনাসহ অন্যান্য মাছ। বিচিত্র সসেস, ফিশ বার্গার, ফিশ ফিঙ্গার, রেডিমেড স্যুপ,ড্রাই ফিশ ইত্যাদি। আমরা এ নিয়ে আরও কথা বলবো খানিক মিউজিক বিরতির পর।

খাদ্য সামগ্রির ক্ষেত্রে প্যাকেজিংয়ের আলাদা একটা গুরুত্ব রয়েছে। কোন খাবারটি কীভাবে প্যাক, ক্যান বা মোড়কজাত করা প্রয়োজন সেটা এখন বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। ক্রেতা সাধারণকে আকৃষ্ট করা এবং মার্কেটিংয়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে এই প্যাকিংয়ের। প্যাকিংয়ের আরেকটি গুরুত্ব রয়েছে সরবরাহের খরচ কমানো এবং নষ্ট হওয়ার হাত থেকে পণ্যকে রক্ষা করার ক্ষেত্রেও। সেইসাথে দীর্ঘমেয়াদে পণ্য সংরক্ষণের জন্যও প্যাকিংয়ের গুরুত্ব অপরিসীম। প্যাকিংয়ের মাধ্যমে খাদ্যকে সুস্থ ও সুরক্ষিত রাখার প্রতি কাস্টমারদের দৃষ্টি আকৃষ্ট হবার কারণে এই শিল্পের গুরুত্ব অনেক বেড়ে গেছে। সুষ্ঠু সংরক্ষণ ভাবনা থেকে খাদ্য শিল্পে ন্যানো টেকনোলজির উন্নয়ন ঘটেছে ব্যাপক। মানব জীবনের স্ট্যান্ডার্ড এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে একবিংশ শতাব্দির গুরুত্বপূর্ণ একটি নয়া প্রযুক্তি হলো ন্যানো। এই প্রযুক্তি খাদ্য সামগ্রিকে যথাযথভাবে সংরক্ষণের ক্ষেত্রে ব্যাপক ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে খাবারকে দূষিত বা নষ্ট হবার হাত রক্ষা করার ক্ষেত্রে ন্যানো টেকনোলজির কার্যকর ভূমিকা রয়েছে।

খাবারকে রোগমুক্ত, দূষণমুক্ত ও নিরাপদ রাখার জন্য প্যাকিং সিস্টেম একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ন্যানো টেকনোলজিকে কাজে লাগিয়ে এই প্যাকিং সিস্টেমকে আরও বেশি নিরাপদ এবং গুণগত দিক থেকে আরও বেশি উন্নত করা যায়। ইরানে অন্তত ২৬০ টি বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষক ও বিজ্ঞানীরা এই ন্যানো প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। ন্যানো বিজ্ঞান নিয়ে গবেষণাকারী বিশ্বের মাত্র দশটি দেশের মধ্যে ষষ্ঠ স্থানে রয়েছে ইরানের নাম। ন্যানো প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে ইরান এখন খাদ্য সামগ্রিকে দীর্ঘ মেয়াদে সংরক্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে। ইরানি গবেষকরা ন্যানো টেকনোলজি নিয়ে ব্যাপক গবেষণা করে ন্যানো-ক্লে এবং আয়রন-অক্সাইডকে কাজে লাগিয়ে ব্যাপক সফলতা অর্জন করেছে।

 

বর্তমানে ইরানে অসংখ্য কোম্পানি এই ন্যানো প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। তিন শ'রও বেশি পণ্য উৎপাদন করছে এই কোম্পানিগুলো। নির্মাণ সামগ্রি, স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা সংক্রান্ত সরঞ্জাম, গৃহ সামগ্রি নির্মাণ, ঔষধ ও চিকিৎসা বিষয়ক পণ্য, পোশাক ও টেক্সটাইল সামগ্রি, পরিবহণ সরঞ্জাম, রঙ, তেল, জ্বালানিসহ এ সংক্রান্ত অন্যান্য শিল্প, পানি ও পরিবেশ এবং কৃষি ও খাদ্য পণ্য ক্ষেত্রে এই কোম্পানিগুলো কাজ করে যাচ্ছে।

 

তো যাই হোক বন্ধুরা! আমাদের হাতে আজ আর সময় নেই। খাদ্যপণ্য উৎপাদন ও সংরক্ষণ ব্যবস্থাসহ রপ্তানি ক্ষেত্রে ইরানের যে কতোটা অগ্রগতি হয়েছে আমাদের আজকের আলোচনা থেকে আশা করি কিছুটা ধারণা পেয়েছেন।#

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/ মো:আবু সাঈদ/  ১৭

ট্যাগ

২০১৮-০৭-১৭ ১৯:০৫ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য