নাসের খসরুর লেখা নানা বই সম্পর্কে আমরা আলোচনা করছিলাম গত কয়েক পর্বে।

‘জামেউল হিকমাতাইন’ নাসের খসরুর লেখা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বই। বইটির একটি মুদ্রিত সংস্করণ প্রকাশ করা হয়েছে ফার্সি ১৩৩৩ সনে তেহরান থেকে। ডক্টর মুহাম্মাদ মঈন ও হেনরি কোরবিনের লেখা ফার্সি ও ফরাসি ভাষায় ভূমিকাও রয়েছে এই সংস্করণে।  বইটি মূলত খাজা আবুল হিইসাম আহমাদ ইবনে হাসান জুরজানির লেখা দার্শনিক ভাবধারা-সমৃদ্ধ একটি কাসিদার ব্যাখ্যা। নাসের খসরু এ বইটি লিখেছিলেন হিজরি ৪৬৩ সনে বদাখশানের শাসক শামসউদ্দিন আবুল মাআলি আলি ইবনে আসাদের অনুরোধে। খাজা আবুল হিইসাম ৮২ লাইন বা পংক্তির ওই কাসিদায় কিছু প্রশ্নের অবতারণা করেছিলেন। আর বদাখশানের আমির শামসউদ্দিন আবুল মাআলি ওইসব প্রশ্নের উত্তর দিতে নাসের খসরুকে অনুরোধ জানান। আবুল মাআলি ও নাসের খসরু-উভয়ই ছিলেন ইসমাইলি মতাদর্শে বিশ্বাসী। সে সময়ে বদাখশানের ইয়ামগানে বসবাস করতেন নাসের খসরু। তিনি বদাখশানের আমিরের অনুরোধে সাড়া দিয়ে চিন্তা-উদ্দীপক এই বইটি লেখেন।

 

নাসের খসরুর ‘জামেউল হিকমাতাইন’ বইটিতে গ্রিক দর্শন ও ইসমাইলি আকিদা-বিশ্বাসের মূল নীতিমালা তুলে ধরা হয়েছে। ফার্সি ভাষায় দর্শন ও কালাম শাস্ত্রের নানা পরিভাষা, শব্দ ও যৌগিক শব্দের ব্যবহার এ বইয়ের গুরুত্ব বিশেষভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে।

 

নাসের খসরুর আরও দু’টি গুরুত্বপূর্ণ বই হল- ‘খ’ন ইখওয়ান’ এবং ‘গোশায়েশ ওয়া রহায়েশ’। ‘খন ইখওয়ান’ বইটির হাতে-লেখা একটি কপি দেখা যায় ইস্তাম্বুলের আয়াসুফিয়া লাইব্রেরিতে।  এ বইটির একটি সংস্করণ ছাপানো হয় কায়রোতে ১৯৪০ সালে ইয়াহিয়া আলখাশশাবের উদ্যোগে। আর ‘গোশায়েশ ওয়া রহায়েশ’ বইটির একটি সংস্করণ প্রকাশ করা হয় বোম্বাই শহরে ১৯৫০ সালে। বইটি সম্পাদনা করেছেন সায়িদ নাফিসি। ধর্মীয় নানা বিষয় এ দুই বইয়ের আলোচ্য বিষয়।

 

গোশায়েশ ওয়া রহায়েশ বইটিতে উল্লেখ করা হয়েছে কোনো এক ব্যক্তির ত্রিশটি প্রশ্নের সহজ-সরল এবং যুক্তি-ভিত্তিক জবাব। এইসব প্রশ্নের উত্তরকে মু’মিন বা পবিত্র হৃদয়ের অধিকারী ব্যক্তির আত্মিক মুক্তি এবং নানা সংকট বা জটিলতা থেকে পরিত্রাণের পথ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। গবেষকদের মতে এ বইটি তৎকালীন ইসমাইলি সম্প্রদায়ের পথ-প্রদর্শক হিসেবে নাসের খসরুর ভূমিকা তুলে ধরে।

নাসের খসরুর লেখা অনেক বইই এখন আর পাওয়া যায় না। তার লেখা পদ্য সাহিত্য-কর্মগুলোর মধ্যে ‘দিওয়ান’ হচ্ছে শীর্ষস্থানীয়। এই কাব্যের ছাপানো  সংস্করণ বের হয়েছে কয়েকবার। তার দুটি মাসনাভী বা দ্বিপদী কাব্যও আছে। এর একটির নাম ‘রৌশনায়িনামেহ’ ; অন্যটির নাম ‘সাআদাতনামেহ’। প্রথমটিতে রয়েছে উপদেশ ও প্রবাদতুল্য নিজস্ব বাণী। দ্বিতীয়টিও একই ধরনের কাব্য। এ দু’টি কাব্যেরও ছাপানো  সংস্করণ বের হয়েছে কয়েকবার।

 

নাসের খসরুর প্রধান কাব্য দিওয়ানে রয়েছে ১১ হাজারেরও বেশি পংক্তি। তবে এই কাব্যের শতভাগ বা সব পংক্তিই খসরুর লেখা নয়, বরং নানা সূত্রে পাওয়া কিছু কিছু পংক্তিও তাতে যুক্ত হয়েছে। আর ওই সূত্রগুলো নানা অনুমানের ভিত্তিতে সেসব পংক্তিকেও খসরুর লেখা বলে উল্লেখ করেছে। নাসের খসরুর ‘দিওয়ান’ কাব্যটি তার আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব ও আত্মিক পরিচয়েরই প্রতিচ্ছবি।  তার বেশির ভাগ গীতি-কবিতাই স্থান পেয়েছে এই কাব্যে। বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা)’র আহলে বাইতের সদস্য হযরত আলী (আ) ও তাঁর বংশধরদের প্রশংসা এ কাব্যের অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয়। এতে প্রশংসা রয়েছে তৎকালীন শাসক আল মুস্তানসিরের। তিনি ছিলেন ফাতেমিয় খলিফাদের মধ্যে অষ্টম।

 

অন্যদিকে নাসের খসরুর কাব্য দিওয়ানে খোরাসানের শাসকদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও নিন্দা দেখা যায় যারা তাকে তাড়িয়ে দিয়েছিল মাতৃভূমি থেকে। অবশ্য নির্বাসিত জীবনে বদাখশানের ইয়ামগানের নির্জনতা তাকে ব্যাপক ও গভীর প্রশান্তি দিয়েছে বলেও নাসের খসরু উল্লেখ করেছেন তার এই কাব্যে। আবার কখনও কখনও ব্যক্তিগত হতাশা ও কখনও কখনও আশার গভীর ছায়াপাত দেখা যায় নাসের খসরুর এই কাব্যে।   

 

খসরুর মাসনাভি রৌশনায়িনামেহ ৫৯২ পংক্তির একটি কাব্য। অন্যদিকে সাআদাতনামেহ’র পংক্তি সংখ্যা ৩০০। অবশ্য মালেকুশশোয়ারা নামে পরিচিতি বিশিষ্ট গবেষক ও কবি মোহাম্মাদ তাকি বাহারের মতে সাআদাতনামেহ’র লেখক নাসের খসরু কাব’দিয়’নি  নন, বরং নাসের খসরুশরিফ ইস্ফাহানি নামের এক ব্যক্তি। কিন্তু অন্যান্য গবেষকরা মনে করেন এটি নাসের খসরু কাব’দিয়’নিরই লেখা কাব্য। এ কাব্যটি ১৮৮০ সালে ফরাসি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। অনুবাদ করেছেন ফাগনান। এটি ছাপানো হয় জার্মানির প্রাচ্য সমিতির ম্যাগাজিনে। খসরুর মাসনাভি রৌশনায়িনামেহ ১৯৪৯ সালে লন্ডন থেকে প্রকাশ করা হয় ভ্লাদিমির আইভানোভের উদ্যোগে।

 

নাসের খসরু ফার্সি  কবিতার ক্ষেত্রে নিজস্ব রীতি ও আঙ্গিক উপহার দিয়েছেন। তার কবিতার শৈল্পিক বর্ণনা-ভঙ্গী ও বিষয়ব্স্তু দুই-ই অভিনব। প্রকৃতির শৈল্পিক বর্ণনায়ও তিনি স্বকীয়তা দেখিয়েছেন।  নাসের খসরু ছিলেন একজন অঙ্গীকারবাদী কবি। তিনি কোনো দরবারি কবি ছিলেন না। নাসের খসরুকে অনেকেই তার যুগের বিবেকের প্রতিচ্ছবি বলে মনে করেন। তার যুগে ইরানি সভ্যতায় কৃষক ও তুর্কিদের মধ্যে চলছিল সংঘাত। নাসের খসরু ফার্সি সাহিত্যে প্রতিবাদী চিন্তাধারার সবচেয়ে সাহসী প্রতিনিধি ও স্পষ্টভাষী বক্তা। ফার্সি সাহিত্যে বিজ্ঞান ও ইরফানি ধারার পথিকৃত ছিলেন তিনি। লোক-দেখানো আচার-অনুষ্ঠান এবং প্রতারণার বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন এই অসাধারণ আদর্শ কবি। অনেক গবেষক মনে করেন খসরুর কবিতার ভাষা স্টাইলের দিক থেকে সামানিয় যুগের শেষের দিকের ফার্সি কবিদের স্টাইলের কাছাকাছি। তবে তার শব্দ-রীতিতে গজনভি যুগের প্রথম দিককার কবিদের প্রভাবই বেশি। কবিতায় উপদেশ ও প্রবাদতুল্য বাণী ব্যবহারের দিক থেকে নাসের খসরুকে কবি কাসায়ি মার্ভাজির অনুসারী বলা যায়। মার্ভাজির জীবনের শেষের দিক ও নাসের খসরুর জীবনের প্রথম দিক ছিল একই যুগ। তাই খ্যাতিমান মার্ভাজির কবিতার স্টাইল খসরুর কবিতায় স্বাভাবিকভাবেই কিছু প্রভাব ফেলেছিল।#
 

পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবু সাঈদ/  ২২

২০১৮-০৭-২২ ২০:৪০ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য